ঢাকা, সোমবার 15 October 2018, ৩০ আশ্বিন ১৪২৫, ৪ সফর ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ঐক্যের আলোচনায় আগ্রহী থাকলেও ছিটকে দেয়া হয়েছে -বি. চৌধুরী

স্টাফ রিপোর্টার : বিএনপির সঙ্গে ড. কামাল হোসেন যে ঐক্য গড়তে চাইছে সেটি পরোক্ষভাবে স্বাধীনতা বিরোধীদের সঙ্গেই হচ্ছে বলে মূল্যায়ন করছে এই ঐক্যের আলোচনা থেকে দৃশ্যত ছিটকে পড়া বিকল্পধারা।
কামাল হোসেনের জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া, বিএনপি এবং এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী (বি. চৌধুরীর) যুক্তফ্রন্টের দুই শরিক জেএসডি ও নাগরিক ঐক্য নিয়ে ‘ঐক্য ফ্রন্টের ঘোষণা’ আসার পর পর বারিধারায় সাংবাদিক সম্মেলন করেন বি. চৌধুরী। তিনি জানান, ঐক্যের আলোচনায় আগ্রহী থাকলেও তাকে ছিটকে দেয়া হয়েছে।
আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে কামাল হোসেনের গণফোরাম এবং বি. চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্টের সঙ্গে ঐক্য গড়তে মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে বিএনপি যাকে তারা বলছে জাতীয় ঐক্য।
এই আলোচনার শুরু থেকেই বিএনপিকে জামায়াত ছাড়ার শর্ত দিয়েছেন বি. চৌধুরী ও কামাল হোসেন। গতকাল শনিবার এই আলোচনা করতে গিয়ে গণফোরাম নেতার বেইলি রোডের বাসা থেকে ফিরে এসেছেন বি. চৌধুরী আর তাকে বাদ দিয়েই বিএনপি এবং যুক্তফ্রন্টের অন্য শরিকদের নিয়ে বৈঠক করেন কামাল হোসেন।
এর মধ্যে সন্ধ্যায় জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে ঐক্য ফ্রন্টের ঘোষণা দেয় কামাল হোসেনের জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া, বিএনপি, জেএসডি ও নাগরিক ঐক্য। একই সময় নিজ বাসভবনে ব্রিফিং ডাকেন বি. চৌধুরী। তিনি এ সময় বিএনপির সঙ্গে ঐক্যের আলোচনা নিয়ে কী হয়েছে, সেটা তুলে ধরেন।
ব্রিফিংয়ে প্রথমে কথা বলেন বি. চৌধুরীর ছেলে মাহী বি চৌধুরী, এরপর কথা বলেন বিকল্পধারার নেতা নিজে। আর সবশেষে দলের পক্ষ থেকে বক্তব্য তুলে ধরেন মহাসচিব আবদুল মান্নান।
লিখিত বক্তব্যে ঐক্য ফ্রন্ট নিয়ে মান্নান বলেন, ‘আজ দুটো বিষয় স্পষ্ট হয়ে গেছে। ১. জনগণকে ধোঁয়াশার মধ্যে রেখে স্বাধীনতাবিরোধীদের সাথে পরোক্ষভাবে একটি ঐক্য গড়ে তোলার অপচেষ্ট; ২. নীতি ও আদর্শের প্রশ্নে বিকল্পধারার অনঢ় অবস্থানকে বিবেচনায় রেখে একটি চক্রের জাতির প্রত্যাশিত ও স্বপ্নের জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়াকে বিনষ্ট করা। কারা এই ঐক্যকে বিনষ্ট করতে চায় এটা আজ জাতির সামনে পরিস্কার।’
‘আজকের পর থেকে জাতীয় ঐক্যের নামে বিএনপির সাথে কোনো বৈঠকে বসে জাতিকে বিভ্রান্ত করার সুযোগ বিকল্পধারা দেবে না। স্বাধীনতা বিরোধীদের সঙ্গ ত্যাগ করে জাতীয় সংসদে ভারসাম্যের ভিত্তিতে স্বেচ্ছাচারমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার ব্যাপারে কোনো সুস্পষ্ট ঘোষণা বিএনপির পক্ষ থেকে না আসা পর্যন্ত শুধুমাত্র বিএনপিকে এককভাবে ক্ষমতায় বসানোর জন্য বিকল্পধারা দেশে কোনো চক্রান্তের সাথে সম্পৃক্ত হবে না।’ সংবাদ সম্মেলনে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি কবিতাও পড়ে শোনান বিকল্পধারার মহাসচিব। ‘হে মোর দুর্ভাগা দেশ, যাদের করেছো অপমান, অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান। /মানুষের অধিকারে বঞ্চিত করেছো যারে, সন্মুখে দাঁড়ায়ে রেখে তবু কোলে দাও নাই স্থান। /অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।’
বি. চৌধুরী বলেন, আজকের দু:শাসনের হাত থেকে জাতির মুক্তির জন্য তারা অনেক দিন থেকে প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছেন। আর এ জন্য প্রথম দফায় আমরা জেএসডি এবং নাগরিক ঐক্যকে নিয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠন করেন। পরে ড. কামাল হোসেনের ঐক্য প্রক্রিয়ার সাথে সুনির্দিষ্ট কিছু দাবি ও লক্ষ্য নিয়ে বৃহত্তর ঐক্যের প্রক্রিয়া শুরু করেন।
এ বিষয়ে বিকল্পধারা সবসময়েই আন্তরিক ছিল জানিয়ে বি. চৌধুরী বলেন, মাহমুদুর রহমান মান্নাকে নিয়ে ঐক্য প্রক্রিয়ার আপত্তি থাকলেও তারা তার পক্ষে শক্ত অবস্থান গ্রহণ করেন এবং দুই পক্ষের সাথে আলোচনা করে বৃহত্তর ঐক্য গঠনে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। পরে বিএনপির সাথে ঐক্য প্রক্রিয়া সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বিকল্পধারা সব সময়ই সচেষ্ট ছিল।
বিকল্পধারা এই ঐক্য প্রক্রিয়াকে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য সচেষ্ট ছিল জানিয়ে বি. চৌধুরী বলেন, ‘শুধুমাত্র নীতির প্রশ্নে দুটো প্রধান দাবিকে সামনে রেখে বিকল্পধারা অনঢ় অবস্থান গ্রহণ করে।...প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে স্বাধীনতাবিরোধী রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তিদের বাদ দিয়ে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে বিকল্পধারা অনঢ় ভূমিকা পালন করে। ...একই সাথে বিকল্পধারা জাতীয় সংসদে কোনো দলের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে স্বেচ্ছাচারী সরকারের হাত থেকে রক্ষার জন্য ভারসাম্যের বিষয়টিকে আলোচনায় নিয়ে আসে।’
বিকল্পধারার চেয়ারম্যান বলেন, ‘কোনো একটি নির্দিষ্ট দলকে (বিএনপি) একক সংখ্যাগরিষ্ঠতায় রাষ্ট্র ক্ষমতায় বসানোর জন্য বৃহত্তর ঐক্য প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠা হলে জনগণের স্বেচ্ছাচারমুক্ত বাংলাদেশ গঠনের প্রত্যাশার সাথে প্রতারণা করা হবে।’
আগের দিন আ স ম আবদুর রবের বাসায় অনুষ্ঠিত বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গতকাল বিকাল সাড়ে তিনটায় গণফোরাম নেতা মোস্তফা মহসিন মন্টু বি. চৌধুরীকে ড. কামাল হোসেনের বেইলি রোডের বাসায় দাওয়াত দেন বলে জানানো হয় সাংবাদিক সম্মেলনে। বি. চৌধুরী বিকাল সাড়ে তিনটায় সেখানে পৌঁছান। কিন্তু ড. কামাল তখন বাড়িতে ছিলেন না এবং তার বাড়ির দরোজা খোলার জন্য কোনো লোকও ছিল না। ‘এটা শিষ্টাচারের কোন পর্যায়ে পড়ে তা সহজেই অনুমেয়’- এই খেদ প্রকাশ করে বিকল্পধারা। 
মাহী বি. চৌধুরী জানান, তারা কামাল হোসেনের বাসায় যাওয়ার সময় বার বার ফোনে যোগাযোগ করেছেন। বার বার বলা হয়েছে, তাদেরকে জানানো হবে। আর বাসায় গিয়ে কেউ দরজা না খোলার পর কামাল হোসেনের পক্ষ থেকে একজন ফোন করে তাদেরকে তার মতিঝিলের চেম্বারে যেতে বলেন। তখন বি. চৌধুরী তার ছেলেকে বলেন, যথেষ্ট হয়েছে। আর নয়। তারা ফিরে যান বারিধারার বাসায়।
এদিকে বিএনপির সঙ্গে ঐক্যের আলোচনা চলার সময় এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বিকল্পধারায় দেখা দিয়েছে ভাঙন। দলের সভাপতির সিদ্ধান্তের বাইরেই একটি অংশ এই ঐক্যের আলোচনায় থাকায় ক্ষুব্ধ হয়েছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি। বহিষ্কার করেছেন দুইজন নেতাকে। গতকাল শনিবার দলের সহ-সভাপতি শাহ আহাম্মেদ বাদল এবং কৃষি বিষয়ক সম্পাদক জানে আলম হাওলাদারকে দলবিরোধী কাযর্কলাপের জন্য পদ থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে।
সাবেক রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব জাহাঙ্গীর আলম স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়। এতে বলা হয়, গত ১৬ সেপ্টেম্বর দুই নেতার প্রাথমিক সদস্যপদসহ সকল পদ স্থগিত করা হয়। বিকল্পধারার মহাসচিব আবদুল মান্নান বিকল্পধারার গঠনতন্ত্রের অনুচ্ছেদ ৫ এর ৫:২ গ ধারা অনুযায়ী এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। আর গতকাল তাদের দুইজনকে চূড়ান্তভাবে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
এই বিজ্ঞপ্তিতে বহিষ্কারের কারণ জানানো না হলেও দলের সূত্র জানায়, বিএনপির সঙ্গে ঐক্য নিয়ে বি. চৌধুরীর নানা শর্ত আছে। এসব শর্ত পূরণ না হলেও বহিষ্কার করা দুই নেতা ঐক্য গড়তে আগ্রহী। এ কারণেই দুই নেতাকে দল থেকে বের করে দেয়া হয়েছে।
বিকল্পধারার বহিষ্কৃত নেতা শাহ আহাম্মেদ বাদল গণমাধ্যমকর্মীদেরকে বলেন, ‘বি. চৌধুরী, মাহী বি. চৌধুরী যা করছেন, তা গ্রহণযোগ্য নয়। আমরা বিকল্পধারা থেকে বের হয়ে এসে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ায় যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ঐক্য প্রক্রিয়ার নেতারাও আমাদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেছেন। আমরা একমত আছি।’
মাহী বি. চৌধুরী অবশ্য সাংবাদিকদেরকে বলেন, দুই জনকে বহিষ্কারে দলে ভাঙন ধরার কারণ নেই। কারণ, তাদের দলে তিনি, তার বাবা বি. চৌধুরী ও মহাসচিব আবদুল মান্নান ছাড়া আর কেউ নেতা নন।
বিকল্প ধারার দুই নেতা বহিষ্কার: বিকল্পধারার সহ-সভাপতি এডভোকেট শাহ আহাম্মেদ বাদল এবং কৃষি বিষয়ক সম্পাদক জানে আলম হাওলাদারকে দলবিরোধী কাযর্কলাপের জন্য তাদের পদ থেকে স্থায়ীভাবে বহিস্কার করা হয়েছে। এর আগে গত ১৬/৯/১৮ তারিখে দুই জনের প্রাথমিক সদস্যপদসহ সকল পদ স্থগিত করা হয়। বিকল্পধারার মহাসচিব মেজর অব আবদুল মান্নান বিকল্পধারার গঠনতন্ত্রের অনুচ্ছেদ ৫ এর ৫:২ গ ধারা শৃংখলামূলক ব্যবস্থা অনুযায়ী তাদের প্রাথমিক সদস্যপদসহ দলের সকল পদ স্থগিত করা হয়। গতকাল শনিবার তাদের দুইজনকে চূড়ান্তভাবে দল থেকে বহিস্কার করা হয়। এক প্রেস বিজ্ঞপিতে একথা জানানো হয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ