ঢাকা, সোমবার 15 October 2018, ৩০ আশ্বিন ১৪২৫, ৪ সফর ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

সাতক্ষীরায় ঘেরের মাচায় সবজি চাষে বৈপ্লবিক পরিবর্তন

সাতক্ষীরা জেলার পাটকেলঘাটা নগরঘাটা বিল এলাকায় মাচায় সবজি চাষে কৃষিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে -সংগ্রাম

আবু সাইদ বিশ্বাস, সাতক্ষীরা: সাতক্ষীরায় মাচায় সবজি চাষে বৈপ্লিবিক পরিবর্তন এসেছে। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি হওয়ায় বর্তমানে বাজারে সবজির দাম অনেকটা কম। বিশেষ করে মাছের ঘেরে মাচা পদ্ধতিতে সবুজ সবজির চাষ কৃষিতে নবদিগন্তের দ্বার উন্মোচন করেছে। মাছা পদ্ধতিতে সবজি চাষে বদলে গেছে  জেলার বহু কৃষকের ভাগ্য। প্রতি দিন হাজার হাজার মণ সবজি জেলার চাহিদা মিটিয়ে রাজধানিতে সরবরাহ করা হচ্ছে। মাছের ঘের যেন এখন সবুজের বিপ্লব। দ্বিগন্ত জুড়ে সবজির সমারহ। গত কয়েক বছর ধরে মাছের ঘেরে মাছা পদ্ধতিতে সবজি চাষ কৃষকদের মাঝে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে। যে দিকে চোখ যায় ঘেরের মাছায় ঝুলতে দেখায় বরবটি, করলা, ঢেঁড়স, লাউ, পুঁইশাক, লাউ, কুমড়া, সহ হরেক রকমের সবজি। জেলা কৃষি খামার বাড়ির পক্ষ থেকে চাষিদের সার্বিক পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। বর্তমানে প্রায় ৫০ হাজার নারী ও পুরুষের সবজি চাষে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু উৎপাদিত সবজি ন্যায দামে বিক্রি করতে না পেরে হতাশ চাষিরা। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও বাজার মনিটরিং এর দাবি সংশ্লিষ্টদের।
 জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিস সূত্রে জানা যায়,চলতি মৌসুমে জেলায় ৭ হাজার ১৯০ হেক্টর জমিতে সবজির চাষ হয়েছে। যা লক্ষ্য মাত্রা চেয়ে ১১০ হেক্টর বেশি। সদরে আবাদ হয়েছে ২৫০ হেক্টর, কলারোয়াতে ৮৫০ হেক্টর,
তালায় ১৬১০ হেক্টর, দেবহাটায় ২২৫ হেক্টর, কালিগঞ্জে ১৪২০ হেক্টর, আশাশুনিতে ৫১৫ হেক্টও ও শ্যামনগরে ৫২০ হেক্টর জমিতে সবজির আবাদ হয়েছে।
এর মধ্যে লাউ ২০৭ হেক্টর, লালশাক ২৩০ হেক্টর, পুইশাক ৬৪০ হেক্টর, ঢেড়শ ৫৯৫ হেক্টর, ডাটা ৩১০হেক্টর, বরবটি ২৪৯ হেক্টর, চালকুমড়া ১৬৫ হেক্টর, উ্েচ্ছ ৫০ হেক্টর, পটল ৪৯৫ হেক্টও জমিতে আবাদ হয়েছে। তবে চাষীরা বলছে বাস্তবে ঘেরে মাছা পদ্ধতিতে সবজির আবাদের সংখ্যা আরো বেশি ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেবে, একজন মানুষের দৈনিক ২২৫ গ্রাম সবজি খাওয়া উচিত। সে হিসেবে আমাদের সবজি খাওয়ার পরিমাণ অনেক কম। বাংলাদেশ পরিসংখ্যন ব্যুরো বলছে সবজি উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের স্থান তৃতীয়। যার উল্লেখ্য যোগ সবজি ইদানিং সাতক্ষীরা জেলাতে উৎপাদিত হচ্ছে।
সূত্রমতে প্রতি বছর ৫০টি দেশে ৭শ কোটি টাকার সবজি রফতানি হচ্ছে। এতে বদলে যাচ্ছে কৃষকের ভাগ্য। সবজি চাষে এগিয়ে আসছেন জেলার শিক্ষিত তরুণরাও। উন্নত প্রযুক্ত আর মেধার কারণে তারা আশাতীত সাফল্য পাচ্ছেন। কীটনাশক ব্যবহার না করে বিষমুক্ত সবজি চাষ করে অনেকেই ইতোমধ্যে সাড়া ফেলেছেন।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) হিসেবে, গত চল্লিশ বছরে বাংলাদেশে সবজি উতৎপাদন বেড়েছে পাঁচ গুণ। বেড়েছে সবজি জমির পরিমাণও। গত এক দশকে দেশে সবজির আবাদি জমির পরিমাণ বেড়েছে ৫ শতাংশ হারে। সেখানে জেলাতে সবজির আবাদ বেড়েছে ৬ শতাংশ হারে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিবছর উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত পৌঁছাতে উৎপাদিত সবজির ৪০ ভাগ নষ্ট হচ্ছে। অবকাঠামো ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি পর্যাপ্ত সবজি সংরক্ষণাগার নির্মাণ করা হলে এত সবজি নষ্ট হতো না। বর্তমানে দেশে ৬০ ধরনের ও ২০০টি জাতের সবজি উৎপাদিত হচ্ছে। এসব সবজির ৯০ শতাংশ বীজ দেশে উৎপাদিত হয়।
দেশে চাষযোগ্য জমির মাত্র ১.৮ শতাংশ জমিতে শাকসবজি চাষ হয়। আর সাতক্ষীরা জেলাতে বর্তমানে ২ শতাংশ জমিতে সবজির চাষ হচ্ছে বলে সূত্র জানায়।
তালার নগরঘাটা ইউনিয়নের কাবাস ডাঙ্গা গামের কার্তিক মন্ডল এবছর ৮ বিঘা জমিতে মাচা পদ্ধতিতে সবজির চাষ করেছে। তার স্ত্রী জোনাকি মন্ডল প্রতিদিন সবজি তুলে বিক্রি করেন। দুজন মিলে প্রতি দিন সকালে তাদের উৎপাদিত সবজি সাতক্ষীরা খুলনা মহাসড়কে পাইকারী ব্যাপারীদের কাছে বিক্রি করেন। এতে তাপদের সংসার চলেও কিছু টাকা উদ্বৃত্ত থাকেন। সেই টাকা দিয়ে ঘেরে মাছের খাবার কেনেন।
একই এলাকার শানতলা গ্রামের হাফিজুর রহমান নগরঘাটা দক্ষিণ বিলে ২২ বিঘা জমিতে মাচা পদ্ধতিতে সবজি চাষ করেছেন। তার ঘেরে উৎপাদিত সবজি বিভিন্ন বাজারে বিক্রয় করেন। কিন্তু এবছর সবজির দাম তুলনা মুলক কম থাকায় লাভের পরিমাণ কম হবে বলে তিনি চিন্তিত।
মিঠাবাড়ির হাবিবুর। ১০ বছর ধরে সবজি চাষ করেন। প্রতিদিন তার ঘেরে মাছায় প্রায় দেড় থেকে দুইশ চালকুমড়া ও লাউ বিক্রি করেন। তিনি জানান,প্রতিটা লাউ পাইকারী ৫ টাকা এবং কুমড়ার জালি ৪ টাকা হারে বিক্রি হচ্ছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় জেলার বেশিরভাগ ঘেরের বেড়িতে ঝুলছে কুমড়া, লাউ, ঝিঙে, বরবটি, উচ্ছে, ঢেঁড়শ, খিরায়, পুইশাকসহ বিভিন্ন প্রকার সবজি।
মিঠাবাড়ীর সবজি ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান ও আমজাদ হোসেন পাইকারী ব্যবসায়ী। তারা জানান, পাটকেলঘাটার ভৈরবনগর মোড় থেকে প্রতিদন ৪০-৫০ জন চাষির কাছ থেকে দেড়-দু’শ ক্যারেট সবজি ক্রয় করি। এসব সবজি পটুয়খালী, ময়মনসিংহ, বরিশাল, ও চট্টগ্রামে বাজারজাত করা হয়।
পাটকেলঘাটা শাকদাহ গ্রামের মাছ চাষি মো. জাহাঙ্গীর আলম জানান, তিনি গত দু’বছর ধরে শাকদাহ বিলে ২৫ বিঘার একটি ঘেরে মাছের পাশাপাশি বেড়িতে নানা ধরনের সবজি চাষ করছেন। বছরে তিনি লক্ষাধিক টাকার সবজি বিক্রি করেন। তিনি আরো বলেন, তার দেখাদেখি এলাকার অনেকেই সবজি চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।
মিঠবাড়ী গ্রামের ঘের চাষী আবুল হোসেন জানান, তিনি দীর্ঘদিন মাছ চাষ করেন, মাছে ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ায় লাভবান হতে না পারলেও উপজেলা কৃষি কর্মকতার পরামর্শে ঘেরের বেড়িতে সবজি চাষ করে লাভের মুখ দেখছি। এক বিঘা জমির মৎস্য ঘেরের বেড়িতে সবজি চাষ করতে খরচ হয় প্রায় তিন হাজার টাকা। কিন্তু শ্রাবণ, ভাদ্র ও আশ্বিন এই তিন মাসে একটি এক বিঘা ঘেরের বেড়িত সবজি চাষ করে ৫০-৬০ হাজার টাকা মুনাফা অর্জন করা যায়।
সবজির ক্ষেত সংলগ্ন সড়কে প্রতি দিন একাধিক অস্থায়ী কাঁচা মালের বাজার বসে। জেলা সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তরের পাইকারী ব্যবসায়ীরা সেখানে সবজি ক্রয় করেন। পাইকারী ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে সবজির দাম নির্ধারণ করায় চাষীরা ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখিন বলে অভিযোগ উঠেছে। পাইকারী ব্যবসায়ীরা পানির দামে সেই সবজি ক্রয় করে চড়া দামে জেলা শহরের বিভিন্ন বাজারের বিক্রয় করেন বলে ও অভিযোগ।
ভুক্ত ভোগীদের অভিযোগ বাজার মনিটরিং এর ব্যবস্থা না থাকায় চাষীর কাছ থেকে যে সবজি পাইকারী ৫ টাকা দরে ক্রয় করা হয় খুচরা বাজারে তা দাড়ায় ১৫ থেকে ২০ টাকায়।
 তবে জমির আইল, বাড়ির উঠান, এমনকি টিনের চালাতেও সবজি চাষ করা হচ্ছে। এছাড়া নদী ও জলাশয়ে ভাসমান পদ্ধতিতে সবজি চাষ জনপ্রিয় হচ্ছে। টমেটো, লাউ, ফুলকপিসহ প্রায় ২০ থেকে ২৫ জাতের সবজি এখন সারাবছরই জেলাতে পাওয়া যায়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গবেষণার মাধ্যমে উন্নত বীজ উদ্ভাবন ও কৃষিতে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বর্তমানে উৎপাদিত সবজির অতিরিক্ত আরো ৩০ ভাগ সবজি উৎপাদন করা সম্ভব।
এ বিষয়ে তালা উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, আধুনিক পদ্ধতিতে মৎস্য ঘেরে সবজি চাষ করে চাষিরা লাভবান হওয়ার পাশাপাশি ঘেরের লিজের টাকাও পরিশোধ করতে পারছেন চাষীরা। তাছাড়া এই পদ্ধতিতে সবজি চাষ করতে তেমন বেশি খরচ হয় না।
সাতক্ষীরা জেলা কৃষি খামার বাড়ির উপপরিচালক কৃষিবিদ আব্দুল মান্নান জানান, সাতক্ষীরা জেলাতে সবজি চাষে চাষিদের আগ্রহী করে তোলা হচ্ছে। সবজি চাষে বিভিন্ন করণীয় সম্পর্কে তাদের সচেতন করা হচ্ছে। এতে কৃষিতে সবজি চাষে সবুজ বিপ্লব সৃষ্টি হতে চলেছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ