ঢাকা, সোমবার 15 October 2018, ৩০ আশ্বিন ১৪২৫, ৪ সফর ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ভোটের বছর বলে...

আশিকুল হামিদ : সাধারণ মানুষের মনে আস্থা ও আগ্রহ তৈরি না হলেও এবং নির্বাচনকালীন সরকারসহ বিভিন্ন প্রশ্নে রাজনৈতিক সংকট ক্রমাগত ঘনীভূত হতে থাকলেও সরকার, আওয়ামী লীগ এবং তাদের সমর্থকদের পক্ষ থেকে দেশে ভোটের হাওয়া বইয়ে দেয়ার জোর তৎপরতা শুরু হয়েছে। শুরু হয়েছেও বেশ কিছুদিন আগে থেকেই। আজকাল যে কোনো টেলিভিশন খুললেই দেখা যাচ্ছে, মসজিদ, মাদরাসা ও স্কুলের ভবন থেকে শুরু করে রাস্তাঘাট ও ব্রিজ-কালভার্ট পর্যন্ত বহু কিছুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হচ্ছে। হচ্ছে একই স্থানে দাঁড়িয়ে বেশ কয়েকটি তথা ‘গুচ্ছ’ প্রকল্পের উদ্বোধনও। আর এসব কর্ম করে বেড়াচ্ছেন ওইসব এলাকার সংসদ সদস্যরা। তাদের সকলেই আবার ক্ষমতাসীন দলের নেতা বা সদস্য।
যেমন শনিবার (১৩ অক্টোবর) একটি জাতীয় দৈনিকের প্রথম পৃষ্ঠায় ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের খরচায় নির্বাচনী প্রচারণা’ শিরোনামে প্রকাশিত রিপোর্টে জানানো হয়েছে, ঠাকুরগাঁও-১ আসন এলাকার কুমারপুর হাইস্কুলে সেদিন ‘সাজ সাজ রব’ পড়ে গিয়েছিল। সড়কের দুই পাশ সাজানো হয়েছিল আকর্ষণীয়ভাবে। প্রধান অতিথি অর্থাৎ এমপি সাহেব আসারও অনেক আগে থেকে মঞ্চে চলছিল গান-বাজনা। উপলক্ষ ছিল স্কুলের জন্য চারতলাভবনের ভিত্তিফলক উন্মোচন। সদলবলে সেখানে এসে এমপি সাহেব শুধু ফলকই উন্মোচন করে গেছেন। নগদে কোনো সাহায্য দেননি। দেয়ার ঘোষণাও শোনেনি মানুষ। অন্যদিকে এমপি এবং তার সঙ্গীরা আগামী নির্বাচনে নৌকা মার্কায় ভোট দেয়ার অঙ্গীকার আদায় করেছেন স্থানীয়দের কাছ থেকে।  প্রকাশিত রিপোর্টে আরো জানানো হয়েছে, আওয়ামী লীগের ওই একই এমপি তার নির্বাচনী এলাকায় ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে ১২ অক্টোবর পর্যন্ত সময়ের মধ্যে এমন ১৬টি প্রকল্পের ভিত্তিফলক উন্মোচন করেছেন, যেগুলোর কোনো একটির জন্যও প্রাক্কলন তৈরি ও দরপত্র আহ্বান করা এবং ঠিকাদার নিয়োগ দেয়ার মতো প্রাথমিক কোনো কাজই সম্পন্ন করা হয়নি। ওদিকে খবর নেই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় বাজেট বা অর্থেরও। তা সত্ত্বেও এমপি সাহেব শুধু ভিত্তিফলকই উন্মোচন করে বেড়াচ্ছেন না, তাকে সংবর্ধনা দেয়ার ও আপ্যায়িত করার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে ৪০-৪৫ থেকে ৫০-৬০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচও করতে হচ্ছে! 
এখানে উদাহরণ দেয়ার জন্য ঠাকুরগাঁওয়ের একটি এলাকার ঘটনা উল্লেখ করা হলেও বাস্তবে সারাদেশেই এখন উন্নয়ন প্রকল্পের নামে অনুষ্ঠান এবং নাচ ও গান-বাজনার ধুম পড়ে গেছে। ১১ অক্টোবর এরকম এক ঘটনায় যশোরের একজন এমপি তার সঙ্গীদের নিয়ে একটি গার্লস স্কুলে লাইন ধরে চেয়ারে বসেছিলেন। তাদের প্রত্যেককে ছাত্রীদের রীতিমতো পূজার স্টাইলে হাত জোড় করে এবং উঠে ও বসে নমস্কার করতে দেখা গেছে। একবার বা দু’বার মাত্র নয়, নবম-দশম শ্রেণীর স্কুল ড্রেস পরা জনা পনেরো ছাত্রী এমপি ও তার সঙ্গীদের গলায় গাঁদা ফুলের বিরাট বিরাট মালাও পরিয়ে দিয়েছে। মাইকে তখন ‘ধন ধান্যে পুষ্পে ভরা’ গানটি বাজানো হচ্ছিল।
ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া দৃশ্যটি দেখলে যে কেউ ক্ষুব্ধ না হয়ে পারবেন না। কারণ, বেশির ভাগ মেয়ে হিজাব পরা অবস্থায় ছিল। মুসলিম ওই ছাত্রীদের দিয়েই নমস্কার করানো এবং মালা পরানো হয়েছে- যেভাবে হিন্দুরা দেব-দেবীর সামনে গিয়ে প্রথমে বসে মাথা নত করে এবং তারপর দাঁড়িয়ে মাথা নিচু রেখেই ফুলের মালা বা পূজার অর্ঘ্য বাড়িয়ে দেয়। রাখে দেব-দেবীর চরণতলে। যশোরের ঘটনায় অবশ্য চরণতলে রাখতে হয়নি। এমপি এবং তার সঙ্গীদের গলায় পরিয়ে দিতে হয়েছে। উল্লেখ্য, ‘নৈতিকতা বিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত করে ঘটনাটির ভিডিও ফেসবুকে ছেড়েছেন একজন হিন্দু ধর্মাবলম্বী। তার কাছেও মুসলিম ওই এমপির কর্মকান্ড অস্বাভাবিক এবং অন্যায় বলে মনে হয়েছে।
এভাবেই নতুন জাতীয় নির্বাচনের সময় এগিয়ে আসায় দেশজুড়ে উন্নয়ন প্রকল্প উদ্বোধন ও বাস্তবায়নের নামে উৎসব-অনুষ্ঠানের হিড়িক পড়ে গেছে। সে কারণে নতুন নতুন প্রকল্প অনুমোদনের জন্য সরকারের ওপর চাপও বাড়তে শুরু করেছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত রিপোর্টে জানা যাচ্ছে, প্রকল্প অনুমোদনের প্রচন্ড চাপে এরই মধ্যে পরিকল্পনা কমিশনের নাভিশ্বাস উঠেছে। ব্যস্ততা ও কাজের চাপে একনেক কর্মকর্তারা নাকি আজকাল ঘুমানোর এবং বিশ্রাম নেয়ার সময় পর্যন্ত পাচ্ছেন না। কারণ, সাধারণ সময়ে যেখানে মাসে দুটি বা একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়, সাম্প্রতিক সময়ে সেখানে সপ্তাহেও দুটি সভা হচ্ছে। চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাই থেকে গত ১১ অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে একনেকের সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে ১০টি। এ এক অস্বাভাবিক ব্যাপার। এসব সভায় পাস হয়েছে ১২৬টি প্রকল্প, যেগুলোর বাস্তবায়ন করতে লাগবে এক লক্ষ ১২ হাজার ১১২ কোটি টাকা। প্রকল্পগুলোর মধ্যে স্কুল-কলেজ-মাদরাসা, মসজিদ থেকে ব্রিজ-কালভার্টসহ অবকাঠামো নির্মাণ তো রয়েছেই, রয়েছে এমনকি রাস্তাঘাট নির্মাণ ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা পর্যন্ত আরো অনেক কিছু। এসব প্রকল্পের মধ্যে বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে সংসদ সদস্যদের জন্য নেয়া মাদরাসা উন্নয়ন প্রকল্প। শুধু এই প্রকল্পগুলোর জন্যই সরকারকে ৫ হাজার ৯১৮ কোটি ৬৩ লাখ টাকা ব্যয় করতে হবে। পাশাপাশি রয়েছে রাস্তাঘাট, ব্রিজ কালভার্ট এবং ভৌত অবকাঠামো সংক্রান্ত অসংখ্য প্রকল্প। এসব প্রকল্প সাধারণত স্থানীয় সরকার বিভাগ তথা এলজিইডির মাধ্যমে ঠিকাদারদের দিয়ে বাস্তবায়ন করা হয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নতুন প্রকল্প অনুমোদনের জন্য ভৌত অবকাঠামো বিভাগ এবং কৃষি, পানি সম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের ওপর চাপ সবচেয়ে বেশি। এর কারণ, এ দুটি বিভাগই রাস্তাঘাট ও ব্রিজ-কালভার্টসহ এমন সব প্রকল্প প্রক্রিয়াকরণ করে থাকে, যেগুলোর সঙ্গে ভোটারদের আকৃষ্ট ও সন্তুষ্ট করার ব্যাপার জড়িত রয়েছে। তথ্যটির মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে একথাই জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে, নির্বাচন যেহেতু এগিয়ে এসেছে সেহেতু বর্তমান এমপিদের পাশাপাশি ক্ষমতাসীন দলের এমন অনেকেও দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন, যারা আগামী নির্বাচনে প্রার্থী হতে চান।
প্রসঙ্গক্রমে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের তৎপরতার কথাও জানানো হয়েছে। কারণ, নির্বাচনকালীন সরকার গঠিত হলে বর্তমান মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের অনেকেই বাদ পড়তে পারেন। ওদিকে এই মর্মে বিধান রয়েছে যে, সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর নতুন কোনো প্রকল্প অনুমোদন বা বাস্তবায়ন করা যাবে না। এজন্যও তড়িঘড়ি করে প্রকল্প পাস করিয়ে নেয়ার জন্য জোর তৎপরতা চলছে। এসব প্রকল্পের খুব কম সংখ্যকেরই সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের ওপর চাপও তাই অনেক বেড়ে গেছে। প্রতিদিনই প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির কয়েকটি পর্যন্ত বৈঠক করতে হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, আগে তথা সাধারণ সময়ে যেখানে কোনো প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি বা পিইসিতে সংশোধিত হয়ে পরিকল্পনা কমিশনের কাছে আসতে দেড় থেকে দু’মাস সময় লাগতো, এখন সেখানে এসে যাচ্ছে এক সপ্তাহের মধ্যেই। অর্থাৎ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও এমপিরা যথেষ্ট তৎপর হয়ে উঠেছেন। অন্যদিকে চাপের মুখে কর্মকর্তাদের নাভিশ্বাস উঠলেও পরিকল্পনা কমিশনকে ওপরের আদেশ পালন করতে হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদসহ বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে আসলে প্রকল্প অনুমোদন করিয়ে নেয়ার জন্য তড়িঘড়ির পাশাপাশি চাপ সৃষ্টির পরিপ্রেক্ষিতে। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এবং অন্য কয়েকজন বিশেষজ্ঞ বলেছেন, জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে এ ধরনের চাপ ও তৎপরতা স্বাভাবিক হলেও বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার, অনুমোদনের জন্য প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলোর প্রকৃত উদ্দেশ্য কি। এগুলো কি কেবলই ভোটারদের আকৃষ্ট ও সন্তুষ্ট করার জন্য নাকি বাস্তবেও এসব প্রকল্পের মাধ্যমে দেশ ও জনগণের উপকার তথা কল্যাণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তথ্যাভিজ্ঞরা জানিয়েছেন, অবস্থা এমন হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি- যখন দু’-চার লাখ টাকা খরচ করে কয়েক কোটি টাকার প্রকল্প উদ্বোধনের মাধ্যমে ভোটার জনগণকে তুষ্ট ও আকৃষ্ট করার পদক্ষেপ নেয়া হবে। ঠাকুরগাঁও ও যশোরের মতো ঘটনাগুলোতে তেমন লক্ষণই স্পষ্ট হয়েছে। 
অর্থনীতিবিদসহ বিশেষজ্ঞদের এ ধরনের অভিমত ও সংশয় নিঃসন্দেহে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, স্বাভাবিক সময়েও দেশে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাটের মহোৎসব হয়ে থাকে। চুরি-দুর্নীতি সীমা ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের লোকজন জড়িত থাকে বলে কোনো অপরাধেরই বিচার হয় না। দুর্নীতিবাজরাও সব সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। সে কারণে জনগণের ট্যাক্সের অর্থের অপচয় ঘটে। তাছাড়া খুব কম প্রকল্পই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এবং প্রথমে বরাদ্দকৃত অর্থে বাস্তবায়িত হয়। ঠিকাদাররা বরং দফায় দফায় নানা অজুহাত দেখিয়ে সময় ও টাকা দুটোই বাড়িয়ে নেয়। প্রাসঙ্গিক সর্বশেষ উদাহরণ দেয়ার জন্য মেট্রোরেল প্রকল্পের কথা উল্লেখ করা যায়। মাত্র দিন কয়েক আগে প্রকাশিত বিভিন্ন দৈনিকের খবরে জানানো হয়েছে, উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত প্রকল্পের কাজ ২০১৯ সালের জুন মাসে সমাপ্ত হওয়ার কথা থাকলেও এ পর্যন্ত অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ১৬ দশমিক ৫ শতাংশের। অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ে মেট্রোরেল প্রকল্পের কাজ সমাপ্ত হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই। একই কথা সাধারণভাবে সরকারের অন্য সব ছোট-বড় প্রকল্পের ক্ষেত্রেও সত্য।
সরকারের একেবারে শেষ সময়ে এসে নতুন নতুন উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন করিয়ে নেয়ার জন্য যে তৎপরতা চালানো হচ্ছে এবং যেভাবে যেখানে-সেখানে ভিত্তিফলক উন্মোচন করা হচ্ছে তার কারণে সচেতন সকল মহলে স্বাভাবিকভাবেই গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। সরকারের উচিত পরিকল্পনা কমিশনকে আইনের বাইরে না যাওয়ার নির্দেশ দেয়া এবং কমিশন যাতে তড়িঘড়ি করে নতুন নতুন প্রকল্পের অনুমোদন না দেয় সে বিষয়ে লক্ষ্য রাখা। ভোটারদের আকৃষ্ট করার জন্য উন্নয়ন প্রকল্পের নামে অর্থের অপচয় অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। একই সঙ্গে লক্ষ্য রাখতে হবে, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের নামে যাতে নাচ-গানের আয়োজন না করা হয় এবং হিজাব পরা ছাত্রীদের দিয়ে যাতে পুজা-অর্চনা করানোর কেউ সাহস না পায়। ভিত্তিফলক উন্মোচন করতে গিয়ে নৌকার পক্ষে ভোট চাওয়ার ব্যাপারেও সরকারকে সতর্ক হতে হবে। কারণ, এসব বিষয়ে জনগণের প্রতিক্রিয়া ক্ষমতাসীনদের পক্ষে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ