ঢাকা, সোমবার 15 October 2018, ৩০ আশ্বিন ১৪২৫, ৪ সফর ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ভোটের মওসুমে জোটের রূপ!

ড. মুহাম্মদ রেজাউল করিম : প্রায় চার হাজার বছর পূর্বে পৃথিবীতে খ্রিস্টপূর্ব (১৭৯২-১৭৫০) সর্বপ্রথম আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সম্রাট হাম্মুরাবি (King Hammurabi)। প্রাচীন ব্যাবিলনের আইনশাস্ত্রের আদি জন্মদাতাও তাকে বলা হয়। প্রাচীনকালে সিরীয় মরু অঞ্চল থেকে নোমাডিক (Nomadic) নামে একটি জাতি দক্ষিণ ইরাকে এসে বসতি স্থাপন করে। সম্রাট হাম্মুরাবি আইনে মিথ্যে ভেলকিবাজি, মিথ্যে সাক্ষ্যদান, বাড়ির ধনসম্পদ লুট, ব্যাভিচার, মিথ্যে অপবাদ, তালাক, নারী-পুরুষের অবৈধ সম্পর্কের শাস্তি মৃত্যুদ-। যৌতুক, উত্তরাধিকার, আইনের বরখেলাপ করলে এই বিধান মোতাবেক শাস্তি ছিল মৃত্যুদ-। শুধু আইন প্রণয়ন নয়, আইনের প্রয়োগও যাতে সুষ্ঠুভাবে হয় তারও ব্যবস্থা করেছিলেন হাম্মুরাবি। তিনি যখন সিংহাসনে আরোহণ করেন তখন প্রত্যেকের সাথে যোগাযোগ করে একটি ঐক্য গড়ে তুলতে সক্ষম হন। এই বিশাল ঐক্যই তাঁর নেতৃত্বকে স্বীকার করে নেয়। সকলের ঐক্যবদ্ধ শক্তির ফলে গড়ে ওঠে একটি সামরিক জোট। এটি ছিল হাম্মুরাবির সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব। দুষ্টের ও অন্যায়ের দমন এবং সৎ ব্যক্তির পালনই আইনের কাজ। তিনি সামাজিক ও পারিবারিক আইনকে সর্বপ্রথম লিপিবদ্ধ করেন।
আজকের লেখায় প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর পূর্বের ইতিহাস টানবার কারণ হচ্ছে, আওয়ামী লীগ আজ যে দুঃশাসনের ইতিহাস সৃষ্টি করেছে তার বিচার সম্রাট হাম্মুরাবি আইনে হলেও অপরাধীকে মৃত্যুদন্ডসহ অনেক সাজা ভোগ করতে হতো। তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে যে ঐক্য গড়ে তুলেছেন তা ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। পাশাপাশি বিরোধী ঐক্য জাতির এই দুর্দিনে সম্রাট হাম্মুরাবির মত নিঃস্বার্থভাবে নেতৃত্ব দিতে কতটুকু সক্ষম হবে তাই দেখবার জন্য জনগণ প্রহর গুনছে।
আমাদের জন্মভূমি বাংলাদেশ আজ কঠিন ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। দেশের জনগণ আওয়ামী লীগের দুঃশাসন, নিপীড়ন, লুটপাট, দুর্নীতি, হত্যা, গুম, খুনসহ নাগরিক জীবন বিপন্নকারী কর্মকান্ড থেকে মুক্তি চায়। দেশের  স্বৈরশাসনের যাঁতাকলের পিষ্ঠ থেকে জনগণ বাঁচতে চায়। এখানে ক্ষমতার ভাগাভাগি, বিদ্বেষ, স্বার্থপরতা আর বিভেদ, বড়-ছোট’র রাজনীতি কোনটিই দেশের জনগণ ভালো চোখে দেখছে না। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য অনেকেই বিভেদ, বিভ্রান্তি ও বিভাজন সৃষ্টি করছে। এ নিয়ে চলছে দেশে-বিদেশে, সোস্যাল মিডিয়ায় দারুন আলোচনা-সমালোচনা।
এ প্রশ্নও সাথে দেখা দিয়েছে তাহলে বিশ্বরাজনীতির গুণগত পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিকরা কতটা উদার? জাতীয় স্বার্থে কতটুকু ঐক্যবদ্ধ? স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কতটুকু আপোষহীন। কারণ রাজনীতি যদি হয় দেশের জনগণের প্রয়োজনে তাহলে সবার আগে দেশের স্বার্থ ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা অগ্রগণ্য নয় কি? নিকট অতীতে সেই দৃষ্টান্ত রয়েছে অনেক। জার্মানির বর্তমান চ্যান্সেলর এঙ্গেলা মের্কেল গত নির্বাচনে নিজের চ্যান্সেলর পদটিকে ধরে রাখতে অধিকাংশ মন্ত্রীত্ব অন্য দলকে দিতে চান। মূলত যারা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিতে বিশ্বাসী তারা অবশ্যই বৃহত্তর স্বার্থে আত্মত্যাগে দ্বিধা করেন না। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ বিভেদ ভুলে জাতির ক্রান্তিকালে বৃহত্তর স্বার্থে কোয়ালিশন করে ক্ষমতায় আসেন। হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন আনোয়ার ইব্রাহীমও।
পৃথিবীর গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে সরকার গঠন হয়ে থাকে জনগণের অবাধ ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে। জনমতের মূল্যায়নে দেশ পরিচালনা করবে রাজনৈতিক দল এটাই স্বাভাবিক। রাজনৈতিক দলগুলোর একক বিজয় এখন আর খুব বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে না। ফলে রাষ্ট্র পরিচালিত হচ্ছে কোয়ালিশন সরকারের মাধ্যমে। নির্বাচনপূর্ব বা নির্বাচনউত্তর গঠিত হচ্ছে জোট। বাংলাদেশে জোটের রাজনীতির সূচনা হয়েছে মূলত সত্তরের দশকের শেষ থেকেই আশির দশকে বড় বড় জোট গঠিত হয় এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। আন্দোলনের পদ্ধতি ছিল যুগপথ। এখনো সেই দৃষ্টান্ত বিরোধী দল বা জোট অনুসরণ করতে অসুবিধা কোথায়? একই প্লাটফর্মে না এসেও অভিন্ন দাবিতে আন্দোলন করা যায়।
বিরোধী রাজনৈতিক দল বা জোটের অন্যতম লক্ষ্য প্রয়োজন গণতন্ত্রের পূর্ণ প্রতিষ্ঠা ও আইনের শাসন নিশ্চিত করার মাধ্যমে ইনসাফ কায়েম করা। মত প্রকাশের স্বাধীনতা, ভূলুন্ঠিত মানবাধিকার ও দুর্নীতিতে জিরোটলারেন্স। সর্বপরি দেশকে আধিপত্যবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের অপশক্তির হাত থেকে বিপদমুক্ত করা। অধিকতর জনসেবা বা জনহিতকর কাজ করার পরিবেশ বা সুযোগ নিশ্চিত করা। গণতন্ত্রকে সুসংহত করে সন্ত্রাস, ফ্যাসিবাদ জঙ্গিবাদ স্বৈরাচারকে রুখে দেয়া। কোন ছোট ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র দল বা ব্যক্তিগণ বড় দল বা জোটকে ডিকটেক্ট করবে না। নির্দেশদাতা হবেন না তাদের সমর্থন ও অবস্থানের অধিক!! বড় দলের মধ্যেও থাকবে না আত্ম অহংকার কিংবা দাম্ভিকতা। তাতে ঐ ব্যক্তি বা দলের ঊদ্দেশ্য নিয়ে জনগণের মধ্যে দেখা দিচ্ছে মিশ্র প্রতিক্রয়া।
দুর্ভাগ্যজনক হলো স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের যতগুলো সরকার গঠিত হয়েছে তা  বৈচিত্র্যপূর্ণ। গণতন্ত্র, বাকশাল, সামরিক অভ্যুত্থান, একনায়কতন্ত্র, কখনো গণতন্ত্রের মোড়কে একনায়কতান্ত্রিক শাসন পদ্ধতিতে আবর্তন করছে। এখন চলছে বিনা ভোটের ”নিউ ডেমোক্রেসি”। প্রত্যেকে তার সুবিধা মাথায় রেখে গণতন্ত্রকে সংজ্ঞায়িত করছে।
বর্তমানে দেশে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪ দলীয় জোট এবং বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট। ২০০১ সালে ৪ দলীয় জোট সরকার গঠন করে দেশ একটি চরম সংকট থেকে মুক্তি লাভ করে। এই জোটের একটি প্রধান শরীক দল হলো বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। আওয়ামী লীগ সরকারের অপকর্মের প্রতিবাদে জামায়াতে ইসলামী অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে, ফলে হত্যা করা হয়েছে জামায়াতের শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে কারারুদ্ধ করেছে অনেকেকে। যা দেশবাসী প্রত্যক্ষ করেছে। এ সবের মাঝে ও দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব রক্ষা, স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন, কেয়ারটেকার সরকার প্রতিষ্ঠা আন্দোলন,গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন সংগ্রামে রাজপথে জামায়াত ছিল প্রথম কাতারে।
জামায়াত জাতীয় ঐক্যের বিষয়ে বরাবরই বদ্ধপরিকর। জামায়াত মনে করে বৃহত্তর স্বার্থে জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে দেশের সিনিয়র সিটিজেন ও আপামর জনসাধারণকে নিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতি উপলব্ধি করে সামনের রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণ করে এগিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। দালালী, আপোষকামিতা ও মীর জাফরদের দেশ-জাতি প্রত্যাখ্যান করবে।  কিন্তু কারো অদূরদর্শিতার কারণে জাতীয় স্বার্থ যাতে ক্ষুণ্ণ না হয় তা সর্বদা বিবেচনায় রাখতে হবে।
জামায়াত নিয়ে কতিপয় রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী, সুশীল, মিডিয়া যেন কিছু একটা বলতে পারলেই হিট! পত্রিকার কাটতি বেশি, রাজনীতিবিদদের কদর বেশী, বুদ্ধিজীবীদের বুদ্ধি পোক্ত বলে মনে হয়। সুশীলের শীলতা বাড়ে। জামায়াত নিয়ে নাড়াচাড়া করলে এসব সুশীল, রাজনীতিবিদদের কতিপয় মিডিয়ার নিকট কদর বাড়ে! জামায়াত নিয়ে কথা বললে অনেকে খুশি হয়!। কারো কারো প্রমোশন! সুযোগ সুবিধাও বাড়ে। তাই নয় কি? জাতীয় রাজনীতিতে জামায়াত এখন হট ইস্যু। শাহাদাত, জুলুম, নির্যাতন, মিথ্যাচার, নিবন্ধন ও প্রতীক বাতিল, করেও জামায়াত এর এত ভোট পায় কেন ? স্থানীয় নির্বাচনে এত জনপ্রিয়তাই এই ঈর্ষার কারণ বই কি?
জামায়াতে ইসলামী স্বাধীনতা পরবর্তী প্রতিটি জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিয়ে সাফল্য অর্জন করেছে। জামায়াতের ধারাবাহিক জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়া, জনগণকে সাথে নিয়ে গঠনমূলক রাজনীতির মাধ্যমে মানবকল্যাণ নিশ্চিত করাই প্রমাণ করে জামায়াত কতটা জনপ্রিয় আপামর মানুষের কাছে। অতীতের সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অংশ নিয়ে জামায়াত বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে, আলহামদুলিল্লাহ। এত জুলুম নির্যাতন, হামলা মামলার পর জামায়াতের এগিয়ে যাওয়াই অনেকের চক্ষুশুল ও গা জ্বালার আসল কারণ কি?
অনেকেই জামায়াতের সাথে বিএনপির দূরত্ব তৈরির মাধ্যমে বিভেদ তৈরি করে আওয়ামী লীগের এজেন্ডা বাস্তবায়নের চেষ্টা করছেন কি? সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও ২০ দলীয় জোটের আপোষহীন, জনপ্রিয়, নির্যাতিত নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কারারুদ্ধতার সুযোগে বিশদলীয় জোটের আন্দোলন সংগ্রামের অন্যতম শরীক জামায়াতে ইসলামীর সাথে রাজনৈতিক সম্পর্ক বিনষ্টের চক্রান্তে প্রবলভাবে মেতে উঠেছে। তারা ভালো করেই জানে বিএনপি জামায়াতের ঐক্যেই কেবল আওয়ামী দুঃশাসনের কবল থেকে জাতিকে মুক্ত করতে পারে। সেই জন্য জামায়াত বিএনপির ঐক্য বিনষ্টের ভাংগা রেকর্ড বাজানো হচ্ছে এখনো।
আওয়ামী দুঃশাসনের কবল থেকে দেশকে মুক্ত করতে জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপি’র নেতা-কর্মীরা যে ত্যাগ স্বীকার করেছে তা অবিস্বরণীয় হয়ে থাকবে। এই ত্যাগের উপরই দাঁড়িয়ে অনেকে লম্বা লম্বা নসিহত করছেন। কেউ যদি প্ররোচণায় বিভ্রান্ত হয়ে বিভাজনের রেখায় কেউ পা ফেলেন তবে তা হবে শহীদের রক্তের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা। মজলুম মানবতার সাথে বেঈমানী।
আওয়ামী দুঃশাসনের কবল থেকে দেশকে মুক্ত করতে জামায়াত-বিএনপির পারস্পরিক সম্পর্ক অটুট রেখে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেয়াই সময়ের অনিবার্য দাবী। তাই তো রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলতে হয়- যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে...তবে একলা চলরে...২০ দলীয় জোটের প্রধান এজেন্ডা বেগম খালেদা জিয়াসহ রাজবন্দীদের মুক্ত করে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন নিশ্চিত করাই জনগণের প্রাণের দাবি।
আজ বাংলাদেশে ইসলামী আন্দোলনের সাফল্য, জনপ্রিয়তা ও অগ্রগতিতে অস্থির হয়ে পড়েছেন অনেকেই। বিগত দিনের উপজেলা নির্বাচন ও স্থানীয় নির্বাচনের ঈর্ষনীয় ফলাফল অনেককে নতুন  ভাবনায় ফেলেছে। অনেকের মধ্যে আফসোস ও হতাশার জন্ম দিয়েছে। যারা জাতীয় পার্টিকে বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসিয়ে আনন্দের ঢেকুর দিচ্ছিল, অথচ উপজেলা নির্বাচনের ডাবল শূন্য ফলাফল আর সর্বশেষ সিটি নির্বাচনে তিন প্রার্থীর জামানত হারিয়ে হতাশা এবং বিষণœতায় আক্রান্ত ? ২০১৪ সালে উপজেলা নির্বাচনে জামায়াত ৩৬ জন চেয়ারম্যান, ১২৯ জন ভাইস চেয়ারম্যান, ৩৬ জন মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছে। এত জুলুম-নির্যাতনের পরও এ অভূতপূর্ব ফলাফল সর্বত্র সাড়া ফেলে দিয়েছে।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা নূহ-উল-আলম লেলিন একটি টিভি টকশোতে মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের একটি মন্তব্যের জবাবে বলেছিলেন সত্তরের দশক থেকে এখন পর্যন্ত জামায়াত প্রতিটি নির্বাচনে ধারাবাহিকভাবে ৬% ভোট পেয়ে আসছে। অন্যদিকে সেলিম সাহেবদের মত যারা খ্যাতিমান ব্যক্তি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের চেয়াম্যান ও বড় বড় বুলি আওড়ান তাদের অবস্থান জামায়াতের ধারে কাছে নেই। তবে লেলিন সাহেবের পরিসংখ্যানটির যে উন্নতি হয়েছে তাতে কোন সন্দেহ নেই, যার প্রমাণ হলো আওয়ামী দুঃশাসনের মধ্যেও স্থানীয় নির্বাচনগুলোয় জামায়াতের বিপুল বিজয়।
বাংলাদেশে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার ক্ষেত্রে জামায়াতের ভূমিকা এ দেশের ১৬ কোটি মানুষের হৃদয়ে গ্রোথিত আছে। জামায়াতের জনপ্রিয়তা ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। জামায়াতে ইসলামী একমাত্র দল যারা প্রতিষ্ঠাকাল থেকেই দলের অভ্যন্তরে পূর্ণ গণতন্ত্র চর্চা করে আসছে। ফলে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়মিত নেতৃত্বের পরিবর্তন, নেতৃত্বের বিকাশ, অভ্যন্তরীণ শৃংখলা ও শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো গঠনে সক্ষম হয়েছে।
‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল: গণতন্ত্রায়নের চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সিপিডির ফেলো ড. রওনক জাহান প্রধান চারটি রাজনৈতিক দলের চরিত্রের বিশ্লেষণ করে বলেন-বর্তমান যেসব রাজনৈতিক দল রয়েছে, তাদের মধ্যে সুনির্দিষ্ট কোন আদর্শ খুঁজে পাওয়া যায় না। রওনক জাহান বলেন, প্রধান দলগুলোর কেউই তাদের গঠনতন্ত্র মেনে রাজনীতি করে না। প্রত্যেক তিন বছর পর কাউন্সিলে নতুন নেতৃত্ব তৈরির কথা বলা হলেও একমাত্র জামায়াতে ইসলামী ছাড়া কেউ সেটি করছে না। এক্ষেত্রে জামায়াতকে আদর্শিক দল দেখিয়ে গবেষণায় বলা হয়েছে, দলটির আদর্শ অন্যদের থেকে আলাদা। জামায়াত তাদের সাংগঠনিক কাজ খুবই সুষ্ঠুভাবে করে থাকে। বিশেষ করে মাঠ পর্যায়ের কর্মী সংগ্রহকে দলটি খুব বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকে।
এছাড়া জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা দল পরিচালনায় নির্দিষ্ট পরিমাণে অর্থায়ন (চাঁদা) দেয় এবং সেগুলো রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে হিসাবও রাখা হয়। জামায়াত তাদের সকল পর্যায়ে ক্যাডারভিত্তিক রাজনীতির চর্চা করে থাকে। কিন্তু অন্য কোন দলের মধ্যে কর্মী সংগ্রহ বা দলীয় অর্থায়নের চাঁদার সুনির্দিষ্ট কোন হিসাব দেখা যায় না।
গবেষণায় বলা হয় জামায়াতেরও বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষ জনপ্রিয়তা রয়েছে। এর সঙ্গে তাদের রাজনৈতিক দর্শন ধর্মীয় হওয়ায় বিভিন্ন অঞ্চলে ধর্মীয় জনপ্রিয়তার ক্ষেত্রে জামায়াত জাতীয় পার্টির চেয়ে বেশি এগিয়ে রয়েছে। ‘নির্বাচনে জাতীয় পার্টির বিলীন হওয়ার বিষয় স্পষ্ট হয়ে গেছে”।
 দেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে জামায়াতে ইসলামীই সর্বপ্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণা প্রদান করে। ভাষা সৈনিক অধ্যাপক মহরহুম গোলাম আযম সাহেব এর প্রবক্তা। জামায়াতের এই সব কৃতিত্বপূর্ন জাতীয় অবদানের কারণে একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবীরা জামায়াতের জনপ্রিয়তা আর অগ্রগতিতে দিশেহার হয়ে উদ্ভট বক্তব্য দিচ্ছে!!
আওয়ামী লীগের আক্রোস হচ্ছে জামায়াতের বিরুদ্ধে দেড় লক্ষাধিক মামলা দিয়ে ১০ লক্ষাধিক আসামী, আর প্রায় এক লক্ষ ত্রিশ হাজারের অধিক গ্রেফতার, হাজার-হাজার নেতা-কর্মীকে হত্যা, গুম, অপহরণ করেও জামায়াত নিশ্চিহ্ন হল না কেন?। জামায়াত নেতাদের ফাঁসি রাজনৈতিক হয়রানি, হামলা, মামলা, অত্যাচার ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে, কিন্তু গণতন্ত্রে বিশ্বাসী দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াত কখনও সহিংসতার পথ বেছে নেয়নি এবং নেবেও না। কতিপয় মিডিয়া জামায়াতের ব্যাপারে যতই নাশকতার আজগুবি গল্প তৈরি করুক না কেন, আজকের যুগে এতো মিডিয়া থাকার পরও জামায়াতের কোন নেতা-কর্মীকে প্রকাশ্যে অস্ত্র ব্যবহারের কোন প্রমাণ আজ পর্যন্ত দিতে পারেনি। জামায়াত কখনও সশস্ত্র সংগ্রাম, চরমপন্থা, উগ্রপন্থা, গোপন কার্যক্রমে বিশ্বাস করে না। দেশবাসী এবং আন্তর্জাতিক মহল খুব ভালো করেই তা জানে। অথচ সরকারী দলের অঙ্গ সংগঠনগুলো প্রতিনিয়ত দলের অভ্যন্তরে এবং বাহিরে হত্যা, খুন, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, অস্ত্রের মহড়া দিয়েই যাচ্ছে।
প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট- এবনে গোলাম সামাদ লিখেছেন- “বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী একটা গোড়া ধর্মান্ধ মৌলবাদী ইসলামপন্থী দল নয়। জামায়াতে ইসলামী একটি চরমপন্থী দল নয়। মুসলিম মূল্যবোধে বিশ্বাসী একটি মধ্যপন্থী দল। সম্প্রতি ইউরোপ ও আমেরিকার অনেক নেতা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে একটি মধ্যপন্থী ইসলামী দল হিসেবে বিবেচনা করেছেন। আওয়ামী লীগ এখন প্রমাণ করতে চাচ্ছে, জামায়াতে ইসলামী হলো একটি গোঁড়া ধর্মান্ধ ইসলামপন্থী দল। তাই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না থাকলে জামায়াত ক্ষমতায় আসবে। আর এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ইউরো-মার্কিন জোট। কিন্তু ইউরো-মার্কিন জোটের অনেক নেতাই হতে পারছেন না আওয়ামী লীগের দৃষ্টিভঙ্গির সাথে একমত। (সুত্র: নয়া দিগন্ত )
মূলত ২০০১-২০০৬ পর্যন্ত সরকার পরিচালনায় জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ দুই নেতার সফল মন্ত্রিত্ব, সততা, দক্ষতা ও দেশপ্রেমের উজ্জ্বল নজির প্রত্যক্ষ করেছে। জামায়াতে ইসলামীর এই গ্যারান্টিপূর্ণ চ্যালেঞ্জ দেশে সেক্যুলারপন্থী গোটা শিবিরকে দিশেহারা করে তুলেছে। শিক্ষাঙ্গনে ছাত্রলীগের সন্ত্রাস, হত্যা-খুন, শিক্ষক-ছাত্রী লাঞ্ছনা, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ভর্তি বাণিজ্যের বিপরীতে ইসলামী ছাত্রশিবির তাদের মেধা, সততা ও দেশপ্রেমের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে ছাত্রকল্যাণ ও জনকল্যামূলক কাজের মাধ্যমে সাধারণ ছাত্র-শিক্ষকসহ সর্ব পর্যায়ে জনপ্রিয়তা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। এতে আওয়ামী বামপন্থিদের মাথা খারাপ হয়ে গেছে। টিভি টকশো আলোচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফজলুর রহমান বলেন, “জামায়াতের সততা সমাজের মানুষের কাছে এই পর্যায়ে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে, জামায়াতের কোন লোক ওষুধের দোকান দিলেও তার বিক্রি এখন বেশি হয়।”
তাই দেশপ্রেমে চেতনায় উদ্ধুদ্ধ হয়ে মানবতার মুক্তি আন্দোলনে ভূমিকা রাখি। রাজনীতির প্রাচীন ইতিহাস হচ্ছে জাতির মহাপুরুষেরা দেশের মানব-সমাজকে বাঁচাবার জন্যে অসীম প্রেমে, অনন্ত ব্যথা-অনুভূতিতে পাগল হয়ে যেতেন। সকলেই ত্যাগের চেতনায় এগিয়ে আসবেন এটাই জাতির প্রত্যাশা। দেশের তরুন প্রজন্মের আশা করে বিভেদকে উস্কে না দিয়ে বৃহত্তর ঐক্যসাধনে উদার মানসিকতাই কাম্য। আমাদের সম্ভাবনাময় এই প্রিয় দেশেকে গড়তে এই মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হই- not what your country can do for you, ask what you can do for your country. এটাই হোক আমাদের অঈীকার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ