ঢাকা, বুধবার 17 October 2018, ২ কার্তিক ১৪২৫,৬ সফর ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ডাবল ডিজিট সুদে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগে আগ্রহী নন ব্যবসায়ীরা

এইচ এম আকতার : বিনিয়োগের মন্দা কাটাতেই ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে সিঙ্গেল ডিজিটে সুদ হার করার ঘোষণা করে এবিবি। এ ঘোষণা না মেনে ৩১টি ব্যাংক এখনো ১০ শতাংশের ওপরে ঋণের সুদ আদায় করছে গ্রাহকের কাছ থেকে। ব্যাংকের আমানত ও ঋণের সুদহারের ব্যবধান (স্প্রেড) ৪ শতাংশের নিচে রাখার নির্দেশনা থাকলেও অর্ধেকের বেশি ব্যাংক তা মানছে না। এতে করে বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগস্ট মাস শেষে দেখা গেছে ৩১টি বাণিজ্যিক ব্যাংক ঋণের সুদহার ১০ শতাংশের বেশি নিচ্ছে। ৩৪টি ব্যাংকের স্প্রেড ৪ শতাংশীয় পয়েন্টের ওপরে রয়েছে। এ সময় ব্যাংকগুলোর গড় স্প্রেড দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ২৭ শতাংশ। তবে অনেক ব্যাংকে এখনো স্প্রেড ৮ শতাংশের ওপরে।
শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী বিনিয়োগ বাড়াতে এখনই ব্যাংকগুলোর ঋণের সুদ এক অংকে নামিয়ে আনা উচিত।
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি শফিউল ইসলাম (মহিউদ্দিন) বলেন, কয়েকটি ব্যাংক সীমিত কয়েকটি খাতে এক অংকে সুদে ঋণ দিচ্ছে। এটা সব খাতে বাস্তবায়ন করা দরকার। কারণ ডাবল ডিজিটের সুদে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ করা সম্ভব নয়। তবে অধিকাংশ ব্যাংক এখনো ১০ শতাংশের বেশি সুদ নিচ্ছে।
তিনি বলেন, বিনিয়োগ অব্যাহত রাখতে সুদ হার কমানোর বিকল্প নেই। বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়কে এই বিষয়ে জোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
তবে ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংকের আমানতে ৬ ও ঋণে সুদ ৯ শতাংশ বাস্তবায়ন করা কঠিন। কারণ আমানতে সুদ কমে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীরা সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করছে। এতে ব্যাংকে আমানত কমে যাচ্ছে। তাই তারল্যে টান পড়ছে। এছাড়া গ্রাহক থেকে আগে বেশি সুদে আমানত নেয়া হয়েছে। কিন্তু এখন কম সুদে সেই অর্থ ঋণ দিতে গেলে ব্যাংকের ক্ষতি হবে বলে জানান তারা।
এ বিষয়ে এসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, অনেক ব্যাংকই এক অংক সুদে ঋণ দিচ্ছে। তবে ৬ শতাংশ সুদে আমানত নিয়ে ৯ শতাংশ সুদে ঋণ দেয়া কষ্টকর। এটি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ব্যাংক খাত কিছুটা সমস্যায় পড়েছে। পুরোপুরি বাস্তবায়নে আরো সময় লাগবে।
এর আগে এক অংক সুদে ঋণ বিতরণের শর্তে সরকারের কাছ থেকে নানা সুযোগ-সুবিধা নিয়েছিল ব্যাংকগুলো। কিন্তু প্রতিশ্রুতি রাখেনি বলে অভিযোগ উদ্যোক্তাদের। এখনো ১০ শতাংশের ওপরে ঋণের সুদ আদায় করছে বেশিরভাগ ব্যাংক।
তারল্য ব্যবস্থাপনার ওপর বাড়তি চাপকে কেন্দ্র করে সুদহার বাড়তে থাকায় তা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গত ৩০ মে এক নির্দেশনায় বলা হয়, ব্যাংকগুলো বিভিন্ন প্রকার ঋণের সুদহার ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি করছে, যা উদ্বেগজনক। তাই সুদহার যৌক্তিক পর্যায়ে নির্ধারণ করতে ভোক্তা ঋণ ও ক্রেডিট কার্ড ছাড়া অন্য ক্ষেত্রে স্প্রেড ৪ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে। আগে যা ৫ শতাংশ ছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গড়ে ১০ শতাংশের বেশি সুদ নিচ্ছে ৩১ ব্যাংক। এর মধ্যে বিদেশি স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের সুদহার ১০ দশমিক ২১%, কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন ১০ দশমিক ২৬%, বেসরকারি এবি ব্যাংক ১১ দশমিক ৪৭%, সিটি ব্যাংক ১০ দশমিক ৮৩%, আইএফআইসি ১০ দশমিক ০৪%, উত্তরা ব্যাংক ১০দশমিক ২৮%, সীমান্ত ব্যাংক ১০ দশমিক ০৮% , ইস্টার্ন ব্যাংক ১০ দশমিক ৬৬%, এনসিসি ব্যাংক ১০ দশমিক ৫০%, ঢাকা ব্যাংক ১০ দশমিক ৬৬%, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক ১১ দশমিক ১৫%, ডাচ-বাংলা ব্যাংক ১০ দশমিক ২৫%, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক ১০ দশমিক ৫৭%, ওয়ান ব্যাংক ১১ দশমিক ২৬%, এক্সিম ব্যাংক ১০ দশমিক ২৬%, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক ১০ দশমিক ৬৩%, প্রিমিয়ার ব্যাংক ১১ দশমিক ৪৪%, ফাস্ট সিকিউরিটিজ ইসলামী ব্যাংক ১১ দশমিক ৩৭%, ব্যাংক এশিয়া ১০ দশমিক ৩৫%।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মধ্যে স্প্রেড হার সবচেয়ে বেশি স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের। ব্যাংকটিতে আমানতে গড়ে সুদ ১ দশমিক ৭১% হলেও ঋণের ক্ষেত্রে ১০ দশমিক ২১% নিচ্ছে। এতে স্প্রেড দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৫০%। ব্র্যাক ব্যাংক আমানতে সুদ ৪ দশমিক ৮৭%। আর ঋণের ক্ষেত্রে সুদহার ১২ দশমিক ৫৫%। ব্যাংকটির স্প্রেড দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৬৮%। ডাচ বাংলা ব্যাংক সুদ দিয়েছে ২ দশমিক ৬১% আর নিয়েছে ১০ দশমিক ২৫%। এতে স্প্রেড দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৬৪%।
গত আগস্ট শেষে ব্যাংকগুলো গড়ে ৫ দশমিক ৩৬% সুদে আমানত নিয়েছে। আর ঋণ বিতরণ করেছে ৯ দশমিক ৬৩% সুদে। এতে স্প্রেড দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ২৭ পয়েন্ট। স্প্রেড ৪ শতাংশের নিচে না নামানোর তালিকায় রয়েছে রাষ্ট্রীয় মালিকানার একটি ব্যাংক, বিদেশি মালিকানার ৭টি এবং বেসরকারি খাতের ২৬টি ব্যাংক।
আগস্টে রাষ্ট্রীয় মালিকানার ব্যাংকগুলোর গড় স্প্রেড দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৬৯%, বিশেষায়িত ব্যাংকের ৩ দশমিক ২৪%, বিদেশি ব্যাংকগুলোর ৬ দশমিক ৮৫% এবং বেসরকারি ব্যাংকগুলোর ৪ দশমিক ৩৬%।
১ জুলাই থেকে নতুন সুদের হার কার্যকরের কথা থাকলেও তা কার্যকর না হওয়ায়, আবারো সময় বড়িয়ে দেওয়া হয় ৯ আগস্ট পর্যন্ত। দুই দফা সময় বাড়িয়েও অধিকাংশ ব্যাংক সরকারের এ সিন্ধান্ত বাস্তবায়নে চরম অনীহা প্রদর্শন করছে।
তবে ঋণের ক্ষেত্রে সিঙ্গেল ডিজিট সুদহার কার্যকর করতে নজরদারি বাড়াচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সিঙ্গেল ডিজিট সুদহার যাচাইয়ে ব্যাংকে ব্যাংকে পরিদর্শক দল পাঠানো হচ্ছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে।
আমানত গ্রহণে ৬ সুদ শতাংশ কার্যকর হলেও হয়নি ঋনের ক্ষেত্রে ৯ শতাংশ সুদ হার। বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলো সিঙ্গেল ডিজিট সুদে ঋণ বিতরণ করছে কিনা, তা যাচাইয়ে নজরদারি বাড়াচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ঘোষিত সুদহার বাস্তবায়নের  অগ্রগতি জানতে চেয়ে সম্প্রতি ব্যাংকগুলোকে চিঠিও দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। বাংলাদেশ ব্যাংক (পরিদর্শন বিভাগ-১) থেকে ১০টি টিম গঠন করে প্রাথমিকভাবে প্রচলিত ধারার বিভিন্ন ব্যাংকে পরিদর্শক দল পাঠানো হচ্ছে। এছাড়া দ্রত শরিয়াহ্ ভিত্তিক ব্যাংকগুলোতেও পরিদর্শক দল পাঠানো হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকে এসে তারা কমিটমেন্ট করেছে। সব ব্যাংক এর এমডি এবং সিইও এসে কমিটমেন্ট করে গেছেন। এখন আমরা অবজারভেশনে আছি, তারা যে কমিটমেন্ট করেছে তা ফুলফিল করতে পারছে কি না। কোনো  গ্রাহক যদি আমাদের কাছে অভিযোগ করে, তাহলে বাংলাদেশ ব্যাংক অবশ্যই ব্যবস্থা নেবে। তিনি আরও বলেন, পরিদর্শনের কাজ চলছে। বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংক অনেক গুরত্বসহকারে দেখছে। ঘোষিত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ওবায়েদ উল্লাহ আল মাসুদ বলেন, আমাদের যে লোনের পোর্টফলিও, তাতে আমাদের ৭৮ শতাংশ ইতিমধ্যেই ওয়ান ডিজিটে ছিলো। আমাদের ফাইট করতে হয়েছে মাত্র ২৮ শতাংশের জন্য।
অগ্রণী ব্যাংক পরিচালনা পরিষদের সদস্য হাসিনা নেওয়াজ বলেন, কিছু ব্যাংক তাদের সুদের হার নয় শতাংশে নামিয়ে এনেছে। বাকী ব্যাংকগুলো সুদের হার নামিয়ে আনতে কাজ করছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ