ঢাকা, শনিবার 27 October 2018, ১২ কার্তিক ১৪২৫, ১৬ সফর ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

বেড়ে চলা শিশু হত্যা ও শিশু নির্যাতন এবং সামাজিক অবক্ষয়

আবু আফজাল মোহা: সালেহ : সম্প্রতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে, বাংলাদেশে শিশু ও নারী হত্যা, নির্যাতনের হার চরমভাবে বেড়ে গেছে। যা চিন্তার বিষয় এবং তা আশংকার! শিশু ও নারী নির্যাতন বা হত্যার পেছনের কারণগুলো সহজভাবে ও সারসংক্ষেপ করে বলতে পারি
পেশাদার খুনির বদলে শিশুরা খুন হচ্ছে পরিচিতিজন বা আত্মীয়স্বজনের হাতে। এমনকি মা-বাবার হাতেও খুন হচ্ছে অনেক শিশু। যা সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের চরম বহিঃপ্রকাশ! খুন হওয়ার আগে ধর্ষিত হচ্ছে অনেক মেয়েশিশু। গৃহশিক্ষক বা আত্মীয়স্বজন/পরিচিতজনের লালসার শিকার হচ্ছে। ধর্ষণ-পরবর্তী বা অসামাজিক অথবা অপরাধমূলক কর্মকা-ের প্রকাশ যাতে না হয় তারজন্য শিশুরা খুন হচ্ছে। কারণ শিশুরা যা দেখে তাই বলে দেয় জনসম্মুখে। এতে অপরাধীদের কর্মকা- প্রকাশ হওয়ার আশংকা দূর করতে বাড়ির/পথের শিশু খুন করছে। বাড়ির মালিকের বা তাদের ছেলেমেয়েদের অনেকেই পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ছে। এরকম অপরাধমূলক কোন কার্যক্রম দেখে ফেললে শিশুরা খুনের বা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে!
অসুস্থ প্রতিযোগিতা, পরকীয়া, লোভ, অনৈতিক কার্যকলাপ ইত্যাদির কারণে বেড়ে যাচ্ছে শিশু হত্যা বা নির্যাতন। কোন কোন ক্ষেত্রে ঘটছে ধর্ষণের অপরাধ। প্রতিহিংসাপরায়ণ থেকেও ধর্ষণ বা হত্যার ঘটনা ঘটছে। কোন ফ্যামিলিকে দমিয়ে রাখতে বা সমাজে হেয় করতেও ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। নিজের শিশু-বাচ্চারা যখন পাশের বা আত্মীয় স্বজনের শিশুদেরকে অনেকক্ষেত্রে অবহেলা করা হয় ইচ্ছাকৃতভাবে! বা কোন কোন কোন ক্ষেত্রে সামাজিক মর্যাদার প্রতিযোগিতায় হেরে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকলে সম্ভাবনাময় শিশুকে হত্যা বা মেয়ে শিশুকে ধর্ষণের মত ঘটনা ঘটিয়ে দমিয়ে রাখার এবং সমাজে হেয় করার অপচেষ্টা করা হয় অনেক ক্ষেত্রে!
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন- শিশুদের প্রতিহিংসার জন্য আকাশ সংস্কৃতি ও প্রযুক্তির অপব্যবহার অনেকাংশে দায়ী। ফেসবুক, ইন্টারনেট, ইমো/ভাইবার, পর্ণোগ্রাফি, অনৈতিক চ্যাটিং ইত্যাদি নৈতিকতা বা মূল্যবোধ কমিয়ে দিচ্ছে। অনেকক্ষেত্রে হতাশা থেকে হত্যা, নির্যাতন বা ধর্ষণের মত অপরাধ ঘটাতে সাহায্য করছে। অপ্রাপ্তি, অবহেলা, অবিচার কোন কোন ক্ষেত্রে বিচারহীনতা, মাদকাসক্তি ইত্যাদিও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ এমনকি হত্যা সংঘটিত হচ্ছে। এবং এ হার বাড়িয়ে দিচ্ছে। শিশুর বাসযোগ্য পরিবেশ, পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশ গড়ে তুলতে আমরা ব্যর্থ হচ্ছি অনেক ক্ষেত্রে। বিরূপ পরিবেশ মূল্যবােধ ও নৈতিক অবক্ষয় ঘটাতে তরান্বিত করছে। পারিবারিক ও দাম্পত্য কলহ, পারস্পারিক অপ্রাপ্তি, পরকীয়া ইত্যাদি মানসিক বিকৃতি ঘটিয়ে শিশু নির্যাতন বাড়িয়ে দিচ্ছে। অনেক বিদেশি (ক্ষেত্রমতে দেশি) অনেক টিভি চ্যানেল সংস্কৃতি বিরোধী আচরণ/উপস্থাপন করে থাকে। এতে অন্য জাতির জন্য ঐতিহ্য হারায় এবং অন্য দেশের সংস্কৃতি ঢুকে পড়ে। এতে পরিবেশ অসুস্থ হতে পারে!
শিশুদেরকে সহজে টার্গেট করা যায়। কোন কিছু সহজে উদ্দেশ্য হাসিল করার জন্য শিশুরা সহজ টার্গেট। দেখা যায়, একটি চকলেট বা একটু লোভনীয়/পছন্দসই জিনিসে সহজেই শিশুরা লোকটির প্রতি অনুগত হয়। শিশুরা কোমলমতি মন। তাই বড়দের প্রতি বা শিক্ষকদের প্রতি দুর্বলতা থাকে। একটু সহযোগিতা পেলেই শিশুরা নাগালের মধ্যে চলে আসে! তাই সহজে শিশু হত্যা ও নির্যাতন বা ধর্ষণ করা সম্ভব হয়!
বিচারহীনতা শিশুহত্যা বা শিশু নির্যাতনের অন্যতম কারণ। সাগর-রুনি বা তনু, রূপাদের বিষয়ে এখনো কোন কার্যকরী সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়নি। তাইতো আসফিয়া, আসিফাদের মত ঘটনা ঘটছে। অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। শনাক্ত না করতে পেরে!
ধর্মীয় অনুশাসন ও সামাজিক মূল্যবোধ বৃদ্ধি এ অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে! এ ব্যাপারে ধর্মীয় নেতাদের অধিক প্রচার করতে হবে। শিক্ষকগণ যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম। তারা ক্লাস বা বাইরে মূল্যবোধ নিয়ে আলোচনা করতে পারেন। আবার সাংবাদিক/লেখকগণ পত্রিকায় লেখার মাধ্যমে ব্যাপক জনমত সৃষ্টি করতে সক্ষম। এ ব্যাপারে তারাও অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারেন। অপরাধের ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে আমাদেরকে বা প্রশাসনকে। অপরাধীকে সামাজিকভাবে বয়কট করতে হবে। ভ্রাম্যমাণ আদালত বা দ্রুতবিচার ট্রাইবুনালে এসব বিচার করা যেতে পারে। বিচারবিভাগীয় তদন্ত/নিরপেক্ষ তদন্তের ব্যবস্থা করতে পারে সরকার। অবশ্য অপরাধী ধরতে আমাদেরকে শতভাগ সাহায্য ও সহযোগিতা করতে হবে। তদুপরি কঠোর ও শক্তিশালী আইন প্রণয়ন ও তার কঠোর প্রয়োগ অবক্ষয় বা বিকৃত এ রোগ থেকে মুক্তি দিতে পারে! যেন আইনের ফাঁক-ফোঁকর গলিয়ে অপরাধীরা পার না পায় সে বিষয়ে সবাইকে খেয়াল রাখতে হবে! সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। শিক্ষা বা ধর্মীয় অপব্যাখ্যা বন্ধ করতে হবে। এজন্য ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ ব্যবস্থা তদারকি করতে হবে কঠোরভাবে। জনসাধারণকে এ ব্যাপারে পূর্ণ সহযোগিতা করতে হবে। তাই বলা যায় সরকার, জনসাধারণ, বুদ্ধিজীবীগণ সবাইকে একই প্লাটফরমে আসতে হবে। তাহলেই শিশু নির্যাতন ও সামাজিক অবক্ষয় থেকে বাঁচা যাবে!

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ