ঢাকা, শনিবার 27 October 2018, ১২ কার্তিক ১৪২৫, ১৬ সফর ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ইসলাম প্রতিষ্ঠার শাশ্বত নীতি

মনসুর আহমদ : ইসলামকে বিজয়ী দীন হিসেবে রসুল (স:) প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন বর্তমান সময় থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর আগে। ইসলাম দীন ও দুনিয়ার মধ্যে কোন বিভেদ রেখা টানে না। রাষ্ট্রব্যবস্থা ইসলামের একাটি অংশ এবং সরকার, প্রশাসন ব্যবস্থা সহ রাষ্ট্রীয় বিধি বিধান ইসলামের সাথে গভীর সম্পর্ক যুক্ত। এ কারণে হজরত ওসমান (রা.) বলেন, আল্লাহ তা’য়ালা কোরআন দ্বারা যা করান, তা রাষ্ট্র শক্তি দ্বারা সম্পন্ন করিয়ে থাকেন”। ইসলাম বিশেষ কোন যুগ বা কালের ধর্ম নয়। ইসলাম প্রতিষ্ঠার বিধানও সমস্ত কালের সমস্ত অবস্থার জন্য এক ও অপরিবর্তনীয় বিধান। রসুল (স:)-এর জামানার আগেও বিভিন্ন কালের বিভিন্ন নবী রসুলগণ দীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করে গেছেন। দীন ও দীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তাঁদের একই কর্মসূচি ছিল। কোরআনের ভাষায়, “তিনি তোমাদের জন্য দীনের সেই নিয়ম বিধান নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন, যার হুকুম তিনি নূহ (আ:)কে দিয়েছিলেন। আর যা (হে মুহাম্মদ!)এখন তোমার প্রতি আমার ওহীর মাধ্যমে পাঠিয়েছি। আর যার হেদায়াত আমরা ইবরাহীম, মুসা ও ঈসাকে দিয়েছিলাম এই তাকিদ সহকারে যে, কায়েম কর এই দীনকে এবং এ ব্যাপারে বিভিন্ন হয়ে যেও না। (শুরা)
মানুষের সকল অবস্থায় তাদের মধ্যে সুষ্ঠু শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন ও নিয়ম শৃক্সক্ষলা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যেই শরিয়তের আবির্ভাব। সকল কালের সকল অবস্থার সামান্য ও নগন্য খুটিনাটি বিষয়ে তাতে কোন নির্দেশ পাওয়া যায় না। শরিয়ত মূলতঃ সাধারণ মূল নীতিমালা উপাস্থাপিত করেছে। শরিয়ত প্রবর্তকের অবর্তমানে শরিয়ত ইসলামী আইনের মূল নীতির ভিত্তিতে ‘উলিল আমর’কে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়নের অধিকার দিয়েছে। কিন্তু এ অধিকার নিরঙ্কুশ নয়। ইচ্ছামত যে কোন আইন রচনার অধিকার তাঁদেরকে দেয়া হয়নি। ‘উলিল আমর’- এর অধিকার শর্তাধীন ও সীমাবদ্ধ। যত আইনই রচনা করা হোকনা কেন, তা অবশ্যই শরিয়তের মূল নীতি ভিত্তিক এবং শরিয়তের মৌল ভাব ধারার সাথে সামঞ্জস্য পূর্ণ হতে হবে।
আল্লাহর বিধান রাষ্ঠ্রীয় ভাবে প্রতিষ্ঠা করে গেছেন রসুল (স:)। বর্তমান কালে রাষ্ট্রে খোদায়ী বিধান প্রতিষ্ঠার উপায় নিয়ে মুসলিম সমাজে বিভিন্ন চিন্তা ধারা ও পথের উদয় হয়েছে। সে সবের মধ্যে মৌলিক চিন্তা ধারা ও পথ গুলি হল ১) দাওয়াত ও তাবলীগ ২) সশস্ত্র বিপ্লব। ৩) গণতান্ত্রিক উপায়ে রাষ্ট্্রীয় ক্ষমতা অর্জন।
এ পথ গুলির মধ্যে সঠিক পথ কোনটি তা খুঁজে নেয়ার বড়ই প্রয়োজন। প্রথমে আলোচনা করা যাক দাওয়াত ও তাবলীগ নিয়ে।
দাওয়াত ও তাবলীহ-এ ব্যাপারে আলোচনা করতে গিয়ে প্রথমে অনুধাবন করা প্রয়োজন যে, রাষ্ট্রে খোদায়ী শাসন প্রবর্তন বলকে কী বুঝায়। আল্লাহ তায়ালার শাসন প্রতিষ্ঠা বলতে যা বুঝায় তা হচ্ছে এই যে, রাষ্ট্রে খোদায়ী আইনের প্রধান্য স্বীকৃতি লাভ করবে এবং সকল বিষয় ও চ ূড়ান্ত ফায়সালার জন্য আল্লাহর দেয়া বিধানকেই গ্রহণ করতে হবে। আমরা জানি যে, যে দেশে দেশে আজ মানুষের বাদশাহী এবং খোদা বিরোধীদের হাতে শাসন ক্ষমতা বিদ্যমান। তাই কোন ভূখ-ে খোদায়ী শাসন প্রবর্তন করতে হলে এসব খোদাদ্রোহী জালেমদের হাত থেকে শাসন কর্ততৃ ছিনিয়ে নিয়ে মানব রচিত আইন বাতিল করে খোদা প্রদত্ত আইন এবং তার আলোকে বিধি বিধান সমাজে বাস্তবায়িত করতে হবে। আর এমন একটি কঠিন কাজ নিছক তাবলীগ ও দাওয়াতের মাধ্যমে সম্পন্ন সম্ভব হতে পারে না। যারা মানুষের উপর কর্তৃত¦ কায়েম করে রেখেছে প্রচার ও তাবলীগে অভিভুত হয়ে তারা ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে আল্লাহর বিধান মেনে নেবে না। নবী রসুলগণ ও ইতিহাস তার সাক্ষী। নবী রসুলগণ সাধারণ মানুষই শুধু নয়, নিচু থেকে উঁচু সব স্তরের এমনকি শক্তি শালী রাজা বাদশাহদেরকেও ইসলাম ও ইসলামী অনুশাসন মেনে নেয়ার দাওয়াত প্রদান করেছেন। নবী রসুলগণের ইতিহাস তার সাক্ষী। নবীগণের কাহিনী এবং বহু শতাব্দী ব্যাপী দীনে হক প্রতিষ্ঠার ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, বর্তমান কালের তথা কথিত দাওয়াত ও তাবলীগের পদ্ধতিতে কারও পক্ষে দীন প্রতিষ্ঠার কাজ সম্ভব হয়নি। 
২) সশস্ত্র বিপ্লব : বর্তমান কালে বিভিন্ন দেশে এ চিন্তাটি বেশ গুরুত্ব পেয়েছে। চিন্তা জগতে হেগেলের এন্টিথিসিস ধারণা থেকে এ চিন্তার জন্ম হয়েছে। গণতন্ত্রের প্রতি মানুষের আস্থা লোপ পেয়েছে। গণতন্ত্রের অপপ্রয়োগের কারণে বাট্রা- রাসেল বলেছেন, ‘সাম্প্রতিক কাল পর্যন্ত গণতন্ত্র কোন দ্ব্যর্থ বোধক শব্দ ছিল না। জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা গঠিত সরকার ব্যবস্থার নামই ছিল গণতান্ত্রিক সরকার। গণতন্ত্র তার এই তাৎপর্য এখন হারিয়ে ফেলেছে- রাশিয়ায় একটি সামরিক নিপীড়নের দ্বারা পরিচালিত সরকার, আর আমেরিকার এটা বিত্তবানদের পরিচালিত সরকার অথবা তা এমন একটা সরকার যেখানে বিত্তবানদের ভূমিকা অপ্রতিহত।’ ইংল্যা- যখন নয়া গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করছিল, চীন ও ভারতবর্ষকে তখন সে দাসত্বের শৃংখলে আবদ্ধ করছিল। এ সব কারণে অনেকেই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি উষ্মা প্রকাশ করে থাকেন।
তা ছাড় গণতন্ত্র পরিচালিত দেশে দেশে ইসলামপন্থীদের উপরে নির্যাতন, বিশেষ করে জনগণের রায় নিয়ে ক্ষমতা গ্রহণের পর পরই তাদের বিরুদ্ধে এন্টি ইসলামী শক্তির সহায়তায় দেশের মধ্যে চুপটি মেরে থাকা স্বার্থান্বেষী মহলের ক্ষমতা গ্রহণ ও ইসলাম পন্থীদের নির্মূল অভিযানের নিউটনীয়ান প্রতিক্রিয়ায় সশস্ত্র বিপ্লব চিন্তা জন্ম নিয়েছে। আলজেরিয়া সহ বিভিন্ন মুসলিম দেশের বিশেষ করে মিশরের সাম্প্রতিককালের ইখওয়ানের বিরুদ্ধে নব্য ফিরাউনী তৎপরতায় এ চিন্তাটির মূলে দৃঢ়তা অর্জনের রস পেয়েছে।
এ চিন্তাটি নবুয়তী কার্যধারার বিরোধী। কোন কালেই কোন নবীই এমন বিপ্লবী পথ অবলম্বন করে দীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে এগিয়ে যাননি। মানুষ যদি আগ্রহ চিত্তে খোদার বিধান মেনে নিতে রাজি না হয় তা হলে শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে তা মানুষের বহির্জগতে সাময়িক ভাবে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হলেও তা হৃদয়ে আশ্রয় না নেয়ার ফলে এর বিরুদ্ধে বিদ্বেষ সৃষ্টি হবে। ফলে দীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ব্যর্থ হবে। এ সত্য প্রতিফলিত হয়েছে আল্লাহর বাণী “লা ইকরাহা ফিদ্দীন”, “লাকুম দীনুকুম ওয় লিয়াদীন” ঘোষণা বাণীতে।
এ সত্য স্বীকার করেছেন বর্তমান কালের বিভিন্ন দার্শনিকগণ। যেমন রুশো বলেন, শাসন প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনা শক্তির উপরে । শক্তি অধিকার গড়তে পারে না, আর মানুষ আইসঙ্গত ক্ষমতা মানতে বাধ্য”। তাই সশস্ত্র্র বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে দীনের উপর রাষ্ট্র পরিচালনা কোন কালেই সম্ভব নয়। কারণ হিংসা প্রতিহিংসার জন্ম দেয়। তাই অস্ত্রের জোরে ক্ষমতা অর্জনের পর তা টিকিয়ে রাখতে হলে অস্ত্রের প্রয়োগ ব্যতীত তা টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। তাই সেখানে একর পর এক অস্ত্রের প্রয়োগ চলতেই থাকবে, .মানুষের কল্যাণ সাধনের কোন সুযোগ ঘটবে না। 
রাষ্ট্রক্ষমতা যদি জনগণের সম্মতি গ্রাহ্য না করে রূঢ় শক্তির উপর নির্ভর করে শাসন চালায় তা হলে তখন জনগণ অভ্যুত্থান বা বিপ্লবের পথ বেছে নেয়। এ অবস্থাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের কেউ কেউ গ্রহণ করতে রাজি হন। লক বলেন, ‘সমস্ত অবস্থা ও পরিস্থিতিতে স্বেচ্ছাচারের শক্তির বিরুদ্ধে সেরা উপায় হল শক্তি দিয়েই তার প্রতিরোধ। ক্ষমতাধিকার না থাকলে যে শক্তি প্রয়োগ করে, সে আগ্রাসক গিয়ে দাঁড়ায় যুদ্ধের অবস্থায় এবং তদনুযায়ী উপায়ে তার সঙ্গে আচরণের অধিকার মেলে।’ লকের এই থিসিসে কেন্ডাল দেখেছেন নৈরাজ্যবাদী প্রবণতা। তার মতে লকের যুক্তিযুক্ত অনুসিদ্ধান্ত হওয়া উচিত ছিল অভ্যুত্থানের অধিকার নয়, এমন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের কল্পনা যাতে জনগণ কিছুকাল পর পর ভোট মারফত ভবিষ্যত রাজনীতি ও সরকারের সংবিন্যাস সম্পর্কে নিজেদের পছন্দ অপছন্দ জ্ঞাপন করতে পারে।
সশস্ত্র বিপ্লব একটি অনিশ্চিত পথ। অতীতে দেখা গেছে এ ধরনের বিপ্লবের পর বিপ্লব লাইন ধরে এসেছে। এ ধরনের বিপ্লব জনগণের সমস্যার কোন সমাধান করতে পারে না। বিদেশী শক্তির সাহায্যে যারা এ পথে অগ্রসর হয়েছে তারাও ব্যর্থ হয়েছে। যেমন আফগানিস্তানে নূর মুহাম্মদ তারাকী, হাফিজুল্লাহ আমীন ও কারমালের উদাহরণ এ ব্যাপারে যথেষ্ট।
এ পদ্ধতিটি ভয়ানক তা অনুধাবন করে ইসলামী আন্দোলনের অগ্রসেনানী আল্লামা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী (রহ:) ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দে পবিত্র মক্কার মসজিদে দেহলবীতে, এক যুবসমাবেশে ভাষণ দিতে গিয়ে বলেন, “ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের প্রতি আমার সর্বশেষ ও সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ হলো, গোপন আন্দোলন পরিচালনা এবং সশস্ত্র বিপ্লব করার চেষ্টা থেকে অবশ্যি দূরে থাকুন। এ পথও মূলত অধৈর্য এবং তাড়াহুড়ারই রকম ফের মাত্র। ফলাফলের দিক থেকে এ পথ অন্য অবস্থাগুলোর তুলনায় অনেক বেশি মন্দ।”
ইসলামী আন্দোলনের বিশিষ্ট সিপাহসালার সাঈদ নুরসী। তিনিও এই ব্যাপারের বিরুদ্ধে ভিন্ন মত প্রকাশ করতেন। তিনি শেষ বয়সে প্রত্যক্ষ রাজনীতি থেকে দূরে অবস্থান করছিলেন। তবুও বিভিন্ন গোত্রের সরদার ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা তাঁর কাছে আসা যাওয়া করত। সরকারের ইসলামী বিরোধী কার্যকলাপে তুর্কীর অনেকে বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন। এ সময় জনৈক শেখ সরকারের বিরূদ্ধে লড়াই করার জৈন্য একটি সশস্ত্র গ্রুপ তৈরী করেন। হুসাইন পাশা নামক জনৈক সর্দার নুরসীর সাথে সাক্ষাত করে সরকারের বিরূদ্ধে লড়াই করার অনুমতি চান। তিনি তার এই ইচ্ছার বিরুদ্ধে ভিন্ন মত প্রকাশ করেন এবং ঐ ধরনের তৎপরতায় আগ্রহী ব্যক্তিদেরকে নিরুৎসাহিত করতে থাকেন। তথাপিও কিছু আবেগপ্রবণ লোক এদিকে ঝুঁকে পড়েন। ১৯২৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারী সর্দার শায়খ সাঈদের নেতৃত্বে সশস্ত্র লড়াই শুরু হয়। মুস্তফা কামাল পাশার সৈন্যরা দুই মাসের মধ্যে এই বিদ্রোহ দমন করে। বিদ্রোহ দমনের পর ইনডিপেনডে›স ট্রাইবুনালে এক বিচারের প্রহসনের মধ্য দিয়ে বহু লোককে শাস্তি দেয়া হয়।
খোদায়ী বিধান প্রতিষ্ঠায় অপশক্তির প্রয়োগ কার্যকরী পদ্ধতি নয়, শক্তির এমন প্রয়োগ খোদায়ী বিধান প্রতিষ্ঠা সম্পূর্ণ অসম্ভব। তাই মুসলিম দার্শনিকগণের এবং কেন্ডালের অভিমত কে গ্রহণ করে গণতান্ত্রিক পন্থায় ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠার আন্দোনকে যারা ভুল পদ্ধতি বলতে চান তারা ঐতিহাসিক বাস্তবতাকে এড়িয়ে চলতে চান।
একটি রাষ্ট্রে খোদায়ী বিধান প্রতিষ্ঠার জন্য তৃতীয় পদ্ধতি হল গণতন্ত্র। গণতন্ত্রের অনেক দুর্বল দিক রয়েছে। দুর্বল দিকগুলোর উল্লেখ করে হবস (১৫৮৮-১৬৭১) বলেছেন, “গণতন্ত্রে সব কিছু নির্ধারিত হয় সংখ্যাধিক্যে, আর সংখ্যাধিক্যেরা যেহেতু ব্যাপার- স্যাপার সম্পর্কে স্বল্পজ্ঞানী, তাই, তার মতে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে কর্ম ও সিদ্ধান্ত হবে বেঠিক।’ হবসের মতে ‘আইনের অদৃঢ়তাও, গণতন্ত্রের একটি ত্রুটি, তারও কারণ এই যে [বিধান] সভায় সংখ্যাধিক্য ঘটে কখনো এক পার্টির, কখনো অন্য পার্টির । তিনি লিখেছেন, ‘ঢেউয়ে ভেসে যাওয়ার মত আইন এ ক্ষেত্রে এক দিক থেকে অন্য দিকে যায়।’ (হবস ট.। নির্বাচত রচনাবলী .. .., খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৬৮।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত আমাদের দেশের পার্লামেন্টে যে আইন প্রণয়ন করা হয় তা জনগণ প্রবর্তিত নয়, কিছু লোকের হ্যাঁ ভোটের জয়যুক্ততার মাধ্যমে আইন পাশ হয়ে থাকে, যার মধ্যে থাকে বিশেষ গোষ্ঠির স্বার্থ জড়িত, তাতে দেশের জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটে না, প্রতিফলন ঘটে না, প্রতিফলন ঘটে না গোটা জাতির কল্যাণের। সে কারণে রুশোর ব্যাখ্যা অনুযায়ী সে আইন আইন রূপে বিবেচ্য হতে পারে না।
এ সব কারণে রুশো ইংল্যান্ডের প্রতিনিধিত্ব মূলক গণতন্ত্রকে আদৌ গণতন্ত্র বলে স্বীকার করেন নি। তার মতে ইংরেজ জাতি স্বাধীনতা ভোগ করে কেবল মাত্র সংসদ নির্বাচন প্রক্কালে। নির্বাচোনোত্তর সময়ে তারা ক্ষমতা শূন্য গোলামে পরিণত হয়। এ সত্যটি শুধু ইংরেজ জাতির জন্যই নয়, প্রায় সব দেশের ক্ষেত্রে বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রগুলোর জন্য শতভাগ সত্য। 
এত সব ত্রুটির পরেও গণতন্ত্রের বিকল্প কোন পদ্ধতি নেই যার মাধ্যমে কোন ভূখণ্ডে দীন প্রতিষ্ঠা লাভ করতে পারে। তবে সেই গণতন্ত্রের রূপ হবহু পশ্চিমা ধাঁচের গণতন্ত্র নাও হতে পারে। কারণ রসুলুল্লাহ (স:) এবং খোলাফায়ে রাশেদার যুগে মতামত প্রকাশ ও সিদ্ধান্ত নেয়ার দায়িত্ব ছিল সমাজের সব চেয়ে জ্ঞানী ও খোদাভীরু লোকদের উপরে। যাকে আধুনিক পরিভাষায় অভিজাততন্ত্রও বলা যেতে পারে। এ ব্যবস্থাটি নিঃসন্দেহে উৎকৃষ্ট। রুশোর মতে শ্রেষ্ঠ ব্যবস্থা হলো নির্বাচিত অভিজাততন্ত্র। এ ব্যবস্থায় জ্ঞান বৃদ্ধরাই শাসক। স্বল্প সংখ্যক ব্যক্তির মধ্যে এখানে শাসকের পদ সীমাবদ্ধ এবং তারা ক্ষমতা লাভ করেন নির্বাচনের মাধ্যমে। রুশোর মতে এই কতিপয় শাসকের সততা, বিচার বুদ্ধি এবং অভিজ্ঞতা জনগণের সুশাসিত হবার জামিন স্বরূপ। দেশে শরিয়তি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য এমন ব্যক্তিদের শাসন প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমান কালের রাষ্ট্রের বিশালতা ও জনসংখ্যার আধিক্য হেতু প্রচলিত গণতান্ত্রিক ধারাকে বাদ দিয়ে অভিজাততন্ত্রের চর্চা অত্যন্ত কঠিন বা অসম্ভব বলা চলে।
আধুনিক গণতন্ত্রের উদ্ভব ঘটে ফরাসী বিপ্লবের পরে। ইউরোপীয় রাজনৈতিক চিন্তার জগতে ১৭৭৯ সালে ফরাসী বিপ্লব ঘটে। যা ইউরোপীয় জনগণের মধ্যৈ ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি ঘটায় ইহা অতীত স্বৈরতন্ত্রের ও রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে রাজনৈতিক জগতে গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটায়। এর সাথে মিলন ঘটে রুশো( ১৭১২-১৭৭৮), হবস ( ১৫৮৮-১৬৭১)দেও চিন্তা ধারা । কিন্তু তাদের প্রায় এক হাজার বছর পূর্বে রসুল (স:) এবং সাহবা কেরাম যে গণতন্ত্র জগতকে উপহার দিয়েছিলেন তা ছিল সম্পূর্ণ ত্রুটি মূক্ত। “ রসুল (স:) কে স্বয়ং আল্লাহ রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োগ দিয়েছেন। তাই তাঁর ব্যাপারে নির্বাচনের কোন প্রশ্নই উঠে না। তাঁর পরে কে সরকারী ক্ষমতার অধিকারী হবেন সে বিষয়ে তিনি কোন নির্দেশ দিয়ে যাননি। মদীনার আনসার ও মুহাজিরগণ হযরত আবু বকর (রা.)কে আমীরুল মুমিনীন নির্বাচিত করেন। হযরত আবু বকর (রা.) তাঁর ইন্তেকালের পূর্বে মদীনা বাসীকে সমবেত করে হযরত ওমরকে এ দায়িত্ব দেবার প্রস্তাব দিলে সবাই তা সমর্থন করেন। হযরত ওমর (রা.) তাঁর ইন্তেকালের পূর্বে ৬ জন বিশিষ্ট সাহাবীর এক প্যানেল গঠন করেন। প্যানেলের অন্যতম সদস্য হযরত আবদুর রহমান বিন আউফ রাঃ) বাকী ৫ জনের ব্যাপারে নারী পুরুষ নির্বিশেষে ঘরে ঘরে যেয়ে জনমত সংগ্রহ করেন। অধিকাংশ মদীনাবাসী হযরত ওসমানের ( রা.) পক্ষে রায় দেন। হযরত ওসমান (রা.) নিহত হবার পর মদীনা বাসীরা হযরত আলী (রা.)কে দায়িত্ব গ্রহণের জন্য দাবী জানান। রসুল (স:)-এর ইন্তেকালের পর যেভাবে মদীনাবাসীরা হযরত আবুবকরের (রা.)হাতে বাইয়াত হন তেমনি ভাবে তারা হযরত আলীর (রা.) নিকট বাইয়াত হন। হযরত আলী (রা.) নিজের উদ্যোগে খলীফা হননি। 
ইতিহাস থেকে প্রমাণিত যে প্রথম ৪ খলিফা নিজেরা চেষ্টা করে ক্ষমতা দখল করেননি। তারা একই পদ্ধতিতে নির্বাচত হননি, কিন্তু অবশ্যই তারা নির্বাচিত হয়েছেন। এ থেকে এ কথাই প্রমাণিত হয় যে ইসলাম নির্বাচনের নির্দিষ্ট কোন পদ্ধতি বাধ্যতামূলক করেনি। বিভিন্ন যুগে, বিভিন্ন দেশে নিজেদের উপযোগী নির্বাচন পদ্ধতি গ্রহণ করার স্বাধীনতা রয়েছে। পদ্ধতি যে রকমেরই হোক এক মাত্র নির্বাচনের মাধ্যমেই ক্ষমতাসীন হতে হবে এটাই ইসলামের সুস্পষ্ট বিধান। সাহাবাগণের যুগেই এই নীতি প্রতিষ্ঠিত হয়। ”(ইসলাম ও গণতন্ত্র-অধ্যাপক গোলাম আযম)
খোলাফায়েরাশেদীনের পর দুনিয়ায় মুসলিম শাসন কম পক্ষে এক হাজার বছর চালু ছিল এই দীর্ঘ শাসনামলে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার পরিবর্তন হয়নি। কিন্তু ইসলামের আদালত ও আইন চালু থাকায় ঐ শাসনকালকে ইসলামী মনে করা স্বাভাবিক ছিল। তা ছাড়া জনগণের বিদ্রোহের কারণে মুসলিম শাসনামলে ক্ষমতার পরিবর্তন হয়েছে ইতিহাস এ কথা বলে না। সাহবাদের পরে বহু শতাব্দী চলে গেছে। পৃথিবীর রাষ্ট্রনৈতিক ইতিহাসে বহু পরিবর্তন এসেছে। বহুচিন্তার উদ্ভব হয়েঠে। বিভিন্ন মুসলিম দেশেও ক্ষমতা বদলের ব্যাপার নিয়ে না না চিন্তার সৃষ্ঠি হয়েছে। কিন্তু মুসলিম দেশের বড় ট্রাজেডী হল অনেক মুসলিম দেশে মুসলমান মংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার পরেও সে সব দেশে Universal suffrage চালু হওয়ার কারণে ইসলামী গোষ্ঠীর হাতে ক্ষমতা অর্পণ বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে। গণতন্ত্রকে এড়িয়ে চলা বর্তমান কালে মোটেই সম্ভব নয়। তাই আমাদের এ অবস্থায় করণীয় সম্পর্কে ভাবতে হবে।
বর্তমান বিশ্বে গণতন্ত্রের বিকাশ প্রাসার ও প্রতিষ্ঠার পরেও গণতান্ত্রিক দেশেও অস্থিরতা বিরাজ করছে। কারণ গণতাত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা সম্পর্কে লিংকনের ঐতিহাসিক উক্তি, “goverment of the people, by the people and for the people” ব্যাপক ভাবে সমাদৃত হলেও এ কথাটির মাঝে কোন্ ধরণের মানূষ গণতত্রের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসবে, আর কোন চরিত্রের মানুষ এই প্রতিনিধি নির্বাচন করবে তার কোন উল্লেখ নেই। যে কারণে গণতন্ত্রের সুফল লাভ করা সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও মুসলিম দেশ সমূহে দীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলন সহজ হচ্ছে না।
এ সমস্যার সমাধানের জন্য আধুনিক যুগের মহান ইসলামী চিন্তানায়ক যে কথাটি বলেছেন তা অনুধাবন করে কর্মপন্থা নির্ধারণ করতে হবে।তিনি বলেছেন, “গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ক্ষমতা তো সেই সব লোকদের হাতেই আসবে, যারা ভোটারদের সমর্থন লাভ করতে সক্ষম হবে। ভোটারদের মধ্যে যদি ইসলামী চিন্তা ও মানসিকতাই সৃষ্টি না হয়, যথার্থ ইসলামী নৈতিক চরিত্র গঠনের আগ্রহই যদি তাদেও না থাকে এবং ইসলামের সেই সুবিচারপূর্ণ অলংঘনীয় মূলনীতি সমূহ তারা মেনে চলতে প্রস্তুত না হয়, যেগুলির ভিত্তিতে ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালিত হবে, তবে তাদের ভোটে কখনো খাঁটি মুসলমান নির্বাচিত হয়ে পার্লামেন্টে আসতে পারবে না। এ পন্থায় তো কেবল ঐ সব লোকেরাই নেতৃত্ব হাসিল করবে, যারা আদমশুমারী অনুযায়ী মুসলমান বটে, কিন্তু দৃষ্টিভংগি, কর্মনীতি এবং কর্মপন্থার দিক থেকে তাদের গায়ে ইসলামের বাতাসও লাগেনি।” (ইসলামী রাষ্ট্র কিভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়- সাইয়েদ আবুল আলা মওদূদী)
ইসলামী আন্দেলনের সাফল্যের শর্তাবলীর উপরে অনেক জ্ঞানগর্ভ আলোচনা রয়েছে। আমি সে সবের আলোচনা না করে মৌলিক দুই একটি বাস্তব কাজ সম্পর্কে পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই।
কোন জনপদে ইসলামী আন্দোলন সফল করার জন্য প্রথম শর্ত হল সমাজে যারা মুসলমান বলে দাবী করেন তাদেরকে কলেমার সঠিক তাৎপর্য অনুধাবন করান। যে দেশের জনপদের অধিকাংশ জনগণ মুসলমান বলে দাবী করে কিন্তু কলেমার তাৎপর্য অনুধাবনে ব্যর্থ তাদেরকে কলেমার তাৎপর্য বুঝাতে হবে। কলেমা কয়েকটি শব্দের উচ্চারণই নয়, কলেমার তাৎপর্য হচ্ছে জীবনের সকল দিক ও বিভাগে আল্লাহ তায়ালার সার্বভৌমত্ব স্বীকার করে নেয়া এবং যারা আল্লাহর সার্বভৌমত্যের বিপরীত রাষ্ট্র বা জনগণের সার্বভৌমত্ব দাবী করে তাদের কর্তৃত্ব অস্বীকার করা। ইসলামী আকিদা বিশ্বাসের উরোক্ত তাৎপর্য গ্রহণের পর নিজেদের মন মস্তিষ্ক, জীবন যাত্রা, চাল চলনে এ বিশ্বাসের প্রতিফলন ঘটাতে হবে। যখন উপরোক্ত চিন্তা ও আদর্শে একটি সমাজ জন্ম লাভ করবে এবং ইসলামী শিক্ষাই যে সমাজের ভিত্তি হিসেবে গৃহিত হবে তখনই সেই সমাজ পারিপার্শিক প্রয়োজনে ইসলামী বিধান প্রণয়ন করতে এগিয়ে অসবে। ইসলামী জীবনাদর্শ প্রবর্তনের এটাই হচ্ছে রসুল প্রদর্শিত বাস্তবসম্মত এবং বিজ্ঞানসম্মত কর্মপন্থা। ইসলামী জীবনাদর্শের বিস্তারিত আইন কানুন মানুষকে অবহিত করে তাদেরকে এদিকে আকৃষ্ট করার আগে তাদের অন্তরে আলাøহর প্রতি গভীর ঈমান এবং অপরাপর সকল বিধান বাতিল করে দিয়ে খোদা প্রদত্ত বিধানের প্রতি পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণের মধ্যে রয়েছে মানুষের কল্যাণ। এ সত্যটিকে স্বীকার করে রুশো যে মতামত প্রকাশ করেছেন তা বিবেবচনার যোগ্য। তিনি মানবীয় সার্বভৌমত্বের ব্যর্থতার কথা তুলে ধরে বলেন, ‘সার্বভৗমত্ব নিহিত একমাত্র সাধারণ অভিপ্রায়ে, যার প্রতিনিধিত্ব চলে না। লোকসভা সদস্যরা জনগণের প্রতিনিধি হতে পারে না। তারা কেবল তার কমিসার (Commissar), যারা চূড়ান্ত রূপে কিছু স্থির করতে পারে না। জনগণ যদি সরাসরি প্রবর্তিত না করে, তা হলে কোনো আইন বলবৎ নয়, আদপেই ওটা আইন নয়।” (গ্রন্থিকা -পৃ: ২২২)
মুসলমানদেরকে আল্লাহর প্রতি পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ ও অন্যান্য মানবীয় দাসত্ব বর্জনের আহ্বান জানানোর সাথে মুসলমান অমুসলমান সবার জন্য সাধারণ আহ্বান, “হে আহলে কিতাবগণ! এস আমরা এবং তোমরা একটি সাধারণ নীতিতে একমত হই। তা হলো এই যে, আমরা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো দাসত্ব করবো না। তার সঙ্গে কোন অংশীদার থাকার কথা বিশ্বাস করবো না এবং আল্লাহকে ছেড়ে দিয়ে অন্য কোন শক্তিকেই রব হিসেবে গ্রহন করবো না। ” এ ভাবে আল্লাহর নিকট পরিপূর্ণ ভাবে আত্মসমর্পণ ও মানবীয় দাসত্ব গ্রহণের অস্বীকৃতির ফলে আল্লাহর শরিয়তে প্রতি ভালবাসা সৃষ্টি হবে। সমাজে এমন অবস্থা সৃষ্টি হলেই সে সমাজে দীন বিজয়ী শক্তি রূপে আত্ম প্রকাশ করতে সক্ষম হবে। এমন কাজটিই সম্পন্ন করেছিলেন শরিয়ত প্রণেতা রসুল মুহাম্মদ (স:)। মানুষের অন্তর ছাড়াও রয়েছে উদর। তাই মানুষের সামনে নিছক নীতিমালা আলোচনা ছাড়াও মানুষের দৈনন্দিন জীবনে যে সব নিত্য নৈমিত্তিক সমস্যাদি দেখা দেয় সেগুলির সমাধান কল্পেই ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদেরকে তাদের কল্যাণকামী বিবেচনা করে তাদের ডাকে সহজে সাড়া দিতে হবে।
দ্বিতীয় শর্ত হল মৌলিক ইসলামী বিশ্বাসী ও ইসলাম দরদীদেরকে পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে সক্রিয় হয়ে ওঠা। দুনিয়ায় মৌলিক ইসলাম বিশ্বাসী ও ইসলাম দরদীদের সংখ্যা যত বেশি হোক না, তারা যতদিন পর্যন্ত না সহযোগিতার মাধ্যমে সক্রিয় হয়ে উঠবে এবং জীবন্ত মানব দেহের প্রতিটি অঙ্গ প্রতঙ্গের মত যত দিন পর্যন্ত না বিভিন্ন লোক সংগঠিত হয়ে তাদের শক্তি বৃদ্ধি করবে এবং আক্রমণকারীর বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ আন্দোলন শুরু করবে, সে পর্যন্ত ইসলামী সমাজ কায়েম হতে পারবে না। এ সত্যের প্রমাণ দেশে দেশে ইসলামী আন্দোলনের পরিণতি। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনতার রায়ে সরকার গঠন করার সুযোগ লাভ করেও এলিট ও সেনাবাহিনীর অসহায়তার কারণে তারা উৎখাত হল। তাই ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠা ও তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য  সব ধরনের লোকদেরকে হুকুমতে ইলাহিয়ার প্রতি আকৃষ্ট করে তোলা একান্ত প্রয়োজন। বিশেষ প্রয়োজন ওলামায়ে কেরামদের চিন্তার ঐক্য ও পারস্পরিক আন্তরিকতা ও দৃঢ়তা। ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই যে, খেদিব ইসমাইল মিশরে শরিয়ত ও বিভিন্ন মাযহাব থেকে গৃহিত আইন বিধান প্রবর্তন করতে চেয়েছিলেন। এ জন্য জামে’ আজহারের মনীষীদের কাছে এ ধরনের একটি আইনগ্রন্থ প্রণয়ন করার দাবী জানিয়েছিলেন। কিন্তু বিভিন্ন মতালম্বীদের মাঝে পারস্পরিক মতবিরোধ, হিংসা ও বিদ্বেষের কারণে এ প্রচেষ্টা সম্পুর্ণ ব্যর্থ হয়ে যায়। যার ফলে সেখানে ইসলামী আইন বিধান প্রবর্তনের সুযোগ চিরতরে নষ্ট হয়ে যায়। সম্প্রতি একটি নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার উৎখাতে ইসলামী দলের মধ্যকার বিভেদের সুযোগ গ্রহণ করেছে সেনাবাহিনী। যার পরিণতিতে আজ সেখানে লাশের পিরামিড সৃষ্টি হচ্ছে।
তৃতীয় শর্ত : কর্মীদের জ্ঞানের পরিধি বিস্তৃত করা। বর্তমানে পৃখিবীর বিভিন্ন দেশে এমন লোক রয়েছেন যারা তাদের দেশে ইসলামকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত দেখতে চান। আর এ ব্যাপারে তারা কোন অত্যাচারীর অত্যাচার এবং উৎপীড়কের উৎপীড়ন কে ভয় করেন না। কিন্তু তাদের অনেকে দাওয়াত ও তাবলীগের মাধ্যমে ইসলামের বিজয় ও প্রতিষ্ঠা কামনা করেন। কিন্তু এ জন্য তাদের গতানুগতিক প্রচেষ্টাই যথেষ্ট নয়। তারা কেবল তাদের প্রচেষ্টা সাধারণ ও স্বল্প লোকদের মাঝে সীমাবদ্ধ রেখেছেন। কিন্তু যারা সমস্ত জনজীবনের উপরে কর্তৃত্ব করছেন এমন শিক্ষিত ইউরোপেীয় শিক্ষা সংস্কৃতি প্রভাবিত লোকদের মধ্যে চেষ্টার কমতি রয়েছে। ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠার জন্য এদেরকে ইসলামী বিধান জানিয়ে দেয়া প্রয়োজন। ইউরোপীয় আইন যে ইসলামী শরিয়তের পরিপন্থী ও ত্রুটিপূর্ণ তা তাদের সামনে তুলে ধরা জরুরী। এ কাজটি করার জন্য যদি প্রাণপণ চেষ্টা করা হয় তা হলে গণতান্ত্রিক দেশে জনমত প্রভাবিত করে বাস্তবে ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হবে।
একটি সফল বিপ্লবের জন্য যা প্রয়েজন তা আমাদের জানা থাকা প্রয়োজন। “একটি বিশেষ ধরনের বিপ্লব ঠিক সেই ধরনের আন্দোলন, অনুরূপ নেতৃত্ব ও কর্মী বাহিনী, অনুরূপ সামষ্টিক ও সামাজিক চেতনা এবং অনুরূপ সাংস্কৃতিক ও নৈতিক পরিবেশ দাবী করে। ফরাসী বিপ্লবের জন্যে সেই বিশেষ ধরনের নৈতিক ও মানসিক ভিত রচনারই প্রয়োজন ছিল, যা তৈরী করেছিলেন রুশো, ভল্টেয়ার ও মন্টেস্কোর মত দার্শনিক । কার্ল মার্ক্সের দর্শন এবং লেনিন ও ট্রটস্কির নেতৃত্ব আর হাজার হাজার সমাজতান্ত্রিক কর্মীর ত্যাগের বদৌলতেই রুশ বিপ্লব সম্ভব হয়েছিল, যারা নিজেদের জীবনকে সমাজতন্ত্রের ছাঁচে ঢেলে গঠন করেছিল। জার্মানীর জাতীয় সমাজতন্ত্রের পক্ষে সেই বিশেষ নৈতিক, মনস্তাত্বিক ও সাংস্কৃতিক মাটিতে শিকড় গাড়া সম্ভব হয়েছিল, যা সৃষ্টি করেছিল হেগেল, ফিসটে, গ্যেটে এবং নিটশের মতো অসংখ্য চিন্তাবিদদের দর্শন ও মতাদর্শ, আর হিটলারের দুর্ধর্ষ নেতৃত্ব। ঠিক তেমনি, ইসলামী বিপ্লব কেবল তখনি সংগঠিত হতে পারেব, যখন কুরআনী দর্শন ও মুহাম্মদ রসুলুল্লাহর (স:) আদর্শের ভিত্তিতে একটি প্রচণ্ড গণআন্দোলন উত্থিত হবে এবং সামাজিক জীবনের মানসিক, নৈতিক, মনস্তাত্বিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তিসমূহকে সংগ্রামের প্রচণ্ডতায় আমূল পরিবর্তিত করে দেয়া সম্বব হবে। ” (ইসলামী রাষ্ট্র কিভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়- সাইয়েদ আবুল আলা মওদূদী) 
তাই ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের জ্ঞানের পরিধি অনেক বিস্তৃত হতে হবে। জ্ঞানের পরিধি শুধুমাত্র আকিদা- বিশ্বাস, দীনি কর্তব্য এবং শরিয়তের পর্যন্তই সীমাবদ্ধ রাখা চলবে না। তাদের জ্ঞানের পরিধি হতে হবে আরও বিস্তৃত। আকিদা- বিশ্বাস, দীনি কর্তব্য এবং শরিয়তের সঙ্গে জ্ঞানের যে সম্পর্ক, সে পরিমাণ সম্পর্ক রয়েছে প্রাকৃতিক আইন এবং দুনিয়ার উপরে মানুষের খেলাফত, প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা সম্পর্কিত সকল বিষয়ে। তাই দীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলন কারীরা এ সব বিষয়ে জ্ঞান অর্জন না করতে পারলে মহাকাল তাদেরকে দূরে নিক্ষেপ করবে।
চতুর্থ শর্ত : আন্দোলন কারীদেরকে জান্নাতের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হবে। ইসলামী আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য হল যে, যারা দুনিয়াতে দাওয়াতে দীনের কাজ করবে তাদের যাত্রা পথে আসবে বিভিন্ন বাধা। নেমে আসবে তাদের উপর লোমহর্ষক নানা নির্যাতন জুলুম। দীনি আন্দোলনের সৈনিকদের ঈমান তাদের নশ্বর দেহের চাহিদার উপর যখন বিজয়ী হয় তখন তারা অত্যাচারীর ভয় ভীতি ও সন্ত্রাস সৃষ্টিতে বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে তাদের সাথে সংগ্রাম করে তিলে তিলে মৃত্যুবরণ করতে ভয় করে না। কোরআনের বিভিন্ন কাহিনী বর্ণনার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা ঈমানদারদের চলার পথে যে সব বাধা বিপত্তি আসতে পারে তা উল্লেখ করে তার বিপরীত মোকাবেলায় টিকে থাকার জন্য উৎসাহ যুগিয়েছেন। ইসলামী আন্দোলনের বিজয়াকাঙ্খীদের পার্থিব জীবনের কোন প্রতিদানের প্রাপ্তির আশা ব্যতিরেকেই দীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যখন তারা সাহসিকতার সাথে প্রতিটি পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন এবং পার্থিব ধনসম্পদের পরিবর্তে আখেরাতের সুখ সমৃদ্ধির প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছেন, যখন তারা আখেরাতকেই হক ও বাতিলে মীমাংসার ক্ষেত্র বিবেচনা করেছেন তখন আল্লাহ তায়ালা তাদের আন্তরিকতা, দৃঢ়তা, ত্যাগ ও ঐকান্তিকতায় সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং দুনিয়াতে তাদের প্রতি সাহয্য নাজিল করেছেন। তখনই পৃথিবীতে খেণলাফত পরিচালনার পবিত্র অমানত আল্লাহ তাদের হাতে সোপর্দ করেছেন। আজকেও দীনের বিজয়ের জন্য আমাদেরকে এমন সব বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হতে হবে।
এটা সত্য যে প্রচলিত গণতন্ত্রের মাধ্যমে ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠার আন্দোলন কোন কোন দেশে সফল হবার পরেও ইসলামী শক্তি বিারোধী শক্তির কাছে মার খেয়েছে। যে কারণে কেউ কেউ হতাশ হয়ে গণতান্ত্রিক পদ্ধতি বাদ দিয়ে বিকল্প পদ্ধতির কথা ভাবছেন। একটি শ্বাশ্বত বিধানকে বিপদগ্রস্ত দেখে হতাশ হয়ে তা পরিত্যাগ করে অন্য কিছুর আশ্রয় গ্রহণ করা বোকামী ব্যতীত কিছুই নয়। এমন পরিস্থিতিতে আন্দোলনকে সফল করতে হলে অন্দোলনের কর্মীদেরকে নবুয়তী ধারায় সাহসী ও শ্রম সাধ্য কাজ করতে হবে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ