ঢাকা, শনিবার 27 October 2018, ১২ কার্তিক ১৪২৫, ১৬ সফর ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

দিনাজপুরের প্রথম মুসলিম গ্রাজুয়েট খান বাহাদুর একিনউদ্দিন আহমদ

-মো. জোবায়ের আলী জুয়েল

বাংলাদেশে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজ্যলাভে সৃষ্ট আদি জেলা শহরগুলো অন্যতম শহর ছিল দিনাজপুর। পলাশী যুদ্ধের আট বছর পরে ১৭৬৫ সালে ইংরেজ সেনাবাহিনী কর্তৃক অত্র এলাকা বিজিত হওয়ার ফলে নবাবী শাসনের অবসানের সাথে সাবেক রাজধানী ঘোড়াঘাট নগরের পতন হয়। ১৭৮৭ সালের পর থেকে ঘোড়াঘাটের পরিবর্তে নতুন শহর গড়ে উঠতে শুরু করে দিনাজপুরে। ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে কোট-কাচারী, অফিস-আদালত। বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষের আগমন ঘটে গড়ে ওঠা এই নতুন শহর। হিন্দুদের পাশাপাশি শিক্ষিত ও খান্দানি মুসলমান ব্যক্তিত্বের পদচারণায় দিনাজপুরের মাটি ও মানুষ ধন্য হয় তাঁদের  মধ্যে অন্যতম ছিলেন খান বাহাদুর একিনউদ্দিন আহমদ। তৎকালে মৌলভী একিনউদ্দিন নামেও তার আর এক পরিচয় ছিল।
খান বাহাদুর একিনউদ্দিন আহমদ অবিভক্ত বাংলার দিনাজপুর জেলার অন্তর্গত বোদা থানার (তৎকালীন জলপাইগুড়ি জেলা) চন্দনবাড়ী গ্রামে ঐতিহ্যবাহী টি ফ্যামিলিতে জন্মগ্রহণ করেন ১৮৬২ সালে। মাতা তাহেরন নেছা। তাঁর নানা ছিলেন মুন্সী মোহাম্মদ তরিকুল্লাহ। তিনি সরকারী অফিসে প্রথমে সেরেস্তাদার ও পরে রাজস্ব অফিসার ছিলেন। অনেকের মতে তিনি অনারারী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। ১৯১১ সালে ৯৩ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। জলপাইগুড়ির টি ফ্যামিলির কর্তা হিসেবে তাঁর যেমন ছিল প্রভাব তেমনি ছিল পরিচিতি। চন্দনবাড়ী গ্রামেই তারা নয় পুুরুষ যাবত বসবাস করে আসছেন। মুন্সী মোহাম্মদ তরিকুল্লাহর ১২ জন ছেলে-মেয়েদের মধ্যে একমাত্র কন্যা তাহরন নেছা।
আধুনিক কালে প্রথম মুসলমান লেখিকা কে? আমরাও সে সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে পারি না। কিন্তু বেগম রোকেয়া (১৮৮০-১৯৩২ খ্রি.) অথবা ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী নওয়াব (১৮৩৪-১৯০৩ খ্রি.) যে নন তা’ নিঃসন্দেহে বলা যায়। ১৮৬৫ খ্রিষ্টাব্দে তাহেরন নেছার একটি নারীশিক্ষা বিষয়ক গদ্য প্রবন্ধ উমেশচন্দ্র সম্পাদিত কলকাতার ‘বামা বোধিনী’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। এই মুসলিম মহিলা তাহেরণ নেছাকেই অবিভক্ত বাংলার প্রথম মুসলমি গদ্য লেখিকা হিসেবে আখ্যা দেয়া যেতে পারে। তিনি ছিলেন বৃহত্তর দিনাজপুরের বোদা থানার চন্দবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা এবং দিনাজপুরের প্রথম মুসলিম গ্রাজুয়েট খান বাহাদুর একিন উদ্দিন আহমদ (১৮৮৬ খ্রি. কলকাতার প্রেসিডেন্সী কলেজ থেকে বি.এ ডিগ্রী লাভ করেন) এর মাতা। বিবি তাহেরণ নেছা প্রথম যুগের মুসলমান গদ্য রচয়িতাদের মধ্যে তো বটেই এমনকি তাবৎ মহিলা লেখকের মধ্যে ও একটি বিশিষ্ট স্থান লাভ করতে পারে।
অপর দিকে তৃতীয়পুত্র তসলিম উদ্দিন আহমদ (১৮৫২-১৯২৭ খ্রি.) ইনি রংপুর জেলা স্কুল থেকে ১৮৭৩ সালে এন্ট্রান্স পাশ করেন এবং ১৮৮২ সালে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এল ডিগ্রী লাভ করে আইন পেশায় যুক্ত হন। আইন পেশায় সুনাম অর্জনের জন্য তিনি জলপাইগুড়ি থেকে রংপুরে গমন করেন এবং শহরের মুন্সীপাড়ায় স্বপরিবারে বসবাস শুরু করেন। ১৯১২ সালে ইংরেজ সরকার তাঁর বিদ্যা, কর্তব্যনিষ্ঠা, ধর্মনুরাগ, দেশপ্রেম, আইন বিষয়ে অভিজ্ঞতা, সততা, সমাজসেবা ইত্যাদি কারনে (তাঁকে) খান বাহাদুর উপাধিতে ভূষিত করেন। তিনি পবিত্র কোরআন শরীফ বাংলা ভাষায় পূণার্ঙ্গ অনুবাদ করেছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া পায়। এই তসলিম উদ্দিন আহমদ ছিলেন খান বাহাদুর একিন উদ্দিন এর মামা। ভাগ্নে ১০ বছরের ছোট আর মামা তসলিম উদ্দিন ১০ বছরের বড়। বলতে গেলে মামা-ভাগ্নে সমবয়সী। মামা তসলিম উদ্দিন আহমদ রংপুর শহরে ওকালতী পেশায় যুক্ত হয়ে যেমন সুনাম অর্জন করেন তেমনি ভাগ্নে একিন উদ্দিন আহমদও দিনাজপুর শহরে খ্যাতি যশ ও প্রতিপত্তি লাভে সমর্থ হন।
যতদুর জানা যায়, খান বাহাদুর একিন উদ্দিন শৈশবে বোদা থানার চন্দনবাড়ী মডেল স্কুলে পড়ালেখা শুরু করেন। তিনি ছিলেন মেধাবী ছাত্র। জলপাইগুড়ি জেলা স্কুল থেকে কৃতিত্বের সাথে এন্ট্রান্স পাশ করেন ১৮৭৮ সালে। তিনি ১৮৮৪ সালে কোলকাতা প্রেসিডেন্সী কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে বি.এ ডিগ্রী লাভ করেন। তিনি দিনাজপুর জেলার প্রথম মুসলিম গ্রাজুয়েট। ১৮৬৬ সালে কোলকাতা সিটি কলেজ থেকে বিএল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ১৮৯২ সালে তিনি দিনাজপুর বারে ইংরেজী শিক্ষানবীশ প্রথম মুসলমান আইনজীবী হিসেবে ওকালতি পেশা আরম্ভ করেন। তাঁর বাসা ছিল দিনাজপুর শহরের বালুবাড়ীতে।
তৎকালে দিনাজপুর বারে মুসলিম আইনজীবী সংখ্যা খুবই কম ছিল। ১৯১৬ সালে দিনাজপুর জেলা জজের আদালতে তালিকাভুক্ত ৪৪ জন আইনজীবীর মধ্যে মাত্র ২ জন মুসলমান আইনজীবী ছিলেন। দুইজন আইনজীবীর মধ্যে একজন হলেন খান বাহাদুর একিন উদ্দিন আহমদ ও অপর জন মির্জা কাদের বক্স। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, সে সময়ে দিনাজপুরের জেলা ও দায়রা জজ একই সাথে জলপাইগুড়িরও জেলা ও দায়রা জজের দায়িত্ব পালন করতেন। দিনাজপুরের একজন খ্যাতিমান মুসলমান আইনজীবী হিসেবেও খান বাহাদুর একিনউদ্দিন প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। মামলা মোকদ্দমার জটিল বিষয় সমূহের সহজ নিষ্পত্তির ব্যাপারে তাঁর মেধা ও দক্ষতার পরিচয় পাওয়া যায়। আইনি লড়াইয়ে তাঁর সমকক্ষ পারঙ্গম আইনবিদ সে সময় খুবই কম ছিল।
সা¤্রাজ্য শাসন ক্ষমতা হারিয়ে ইংরেজ ও ইংরেজী শিক্ষার প্রতি দীর্ঘকাল বৈরী মনোভাব পোষণ করার পর উপ-মহাদেশে মুসলমানদের যখন নিজেদের পশ্চাদপদতা কাটিয়ে ওঠার জন্য ইংরেজী শিক্ষার প্রয়োজনীতা উপলব্ধি হতে শুরু করেছিল উনবিংশ শতাব্দীর সেই সন্ধিলগ্নেই খান বাহাদুর একিন উদ্দিন আহমদের আর্বিভাব ঘটে দিনাজপুরে। তাঁর জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তিনি ছিলেন দিনাজপুরের প্রথম গ্রাজুয়েট, মুসলিম নব জাগরনের স্থপতি, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, প্রথিতযশা আইনজীবী, দক্ষ সংগঠক, সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ। একের মধ্যে বহুত্বের প্রকাশ ঘ্েটছে বর্ণাঢ্য ঐতিহ্যে। নীতি নৈতিকতার অবক্ষয়ের যুগে তাঁর কর্মাদর্শ ও ত্যাগের মহিমা আজকের প্রজন্মের মনে সৃষ্টি করতে পারে নবতর চেতনা।
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, তৎকালে বাংলায় মুসলমান সমাজ ইংরেজ বিরোধি মনোভাবের ছিল। এই বৈরী মনোভাবের দরুণ ইংরেজী শিক্ষা থেকেও মুলমানেরা ছিল অনেক দূরে। অপর দিকে হিন্দু সম্প্রদায় ইংরেজদের শিক্ষাগ্রহণ ও তার সহযোগিতা করায় চাকুরী, রাজনীতি ও ব্যবসাসহ রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে তাদের অবস্থান সুদৃঢ় করে নিতে সমর্থ হয়। মুসলমান সমাজ সবকিছু হারিয়ে সামাজিক, রাজনৈতিক ও ব্যবসা বানিজ্যের ক্ষেত্রে অনেক দূরে পিছিয়ে পড়ে। এমন অবস্থা দেশের অন্যান্য জেলার মতো দিনাজপুরেও ছিল। মুসলমানদের এমন পশ্চাৎপদতা দেখে খান বাহাদুর একিন উদ্দিন অত্যন্ত মর্মাহত হন। তিনি নিজ জেলার মুসলমানদের এমন দুরবস্থার পরিবর্তন করতে সচেষ্ট হন। আইন পেশার পাশাপাশি মুসলিম জাগরণ, সমাজ কল্যাণ, রাজনীতি, শিক্ষা সংগঠন সাহিত্য চর্চায় তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। বলতে গেলে দিনাজপুরের মুসলিম পুনজাগরণ ও রাজনৈতিক আন্দোলনের তিনি ছিলেন অগ্রদূত। জীবনের মূল্যবান সময় ব্যয় করে তিনি নিজ জেলার কল্যাণের জন্য যে সাহসী ভূমিকা পালন করেছেন তা অবশ্যই শ্রদ্ধার সাথে স্মরণযোগ্য। তার কর্মজীবনের পরিসরে মুসলিম সমাজ গঠনে এমন সফলতার দৃষ্টান্ত অনেক রয়েছে।
খান বাহাদুর একিন উদ্দিন ছিলেন দিনাজপুরের প্রথম মুসলিম ছাত্রাবাসের স্থপতি। তখনকার দিনে গ্রামাঞ্চল থেকে মুসলমান ছাত্ররা জেলা স্কুলে পড়তে এলে তাদের থাকার জন্য কোন ছাত্রাবাস ছিল না। ১৯১০ সালে তার অক্লান্ত চেষ্টায় স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তির সহযোগীতা ও সরকারী সাহায্যে জেলা স্কুলের পেছনে কেবল মুসলমান ছাত্রদের জন্য এই ‘মুসলিম হোস্টেল’ গড়ে ওঠে। আসলে এটি ছিল ওয়াকফ ট্রাস্ট এবং খান বাহাদুর একিন উদ্দিন ট্রাষ্টকমিটির নেতৃত্ব ছিলেন। এটি উদ্ধোধনের সময় কালেক্টর ছিলেন মি. ভ্যাস (১৯০৯-১৯১০)। জেলার মুসলমানদের মাঝে আধুনিক শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি করতে তার এই প্রাণবন্তকর চেষ্টা। এই ছাত্রবাসটি কেবল ছাত্রদের থাকার সুযোগসৃষ্টিই করেনি একই সাথে এটি ছিল মুসলমান ছাত্রদরে একটি শ্রেষ্ঠ মিলন কেন্দ্র। বিশ শতকের প্রথমার্ধে হোস্টেলটি দিনাজপুর শহরে মুসলিম ছাত্রদের শিক্ষার অগ্রগতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এখানে উল্লেখ্য, এই ছাত্রাবাসটি কেবল জেলা স্কুলের মুসলিম ছাত্রদের জন্য নির্দিষ্ট না থেকে শহরের অন্যান্য স্কুলের মুসলিম ছাত্রদের জন্যও উন্মুক্ত রাখা হয়েছিল।
সরকারী পৃষ্টপোষকতায় মুসলমান ছাত্রদের সতন্ত্র ছাত্রাবাস নির্মিত হওয়ায় হিন্দুদের মধ্যে মুসলিম বিদ্বেষ ও রাজনৈতিক অসন্তোষ আরো বেড়ে যায়। এ ব্যাপারে দিনাজপুরের মহারাজা গিরিজানাথ এগিয়ে আসেন। তিনি হিন্দু ছাত্রদের শিক্ষা সুবিধা সৃষ্টির জন্য একটি নতুন হোস্টেল তৈরী করে দিতে বৃটিশ সরকারের হাতে প্রয়োজনীয় অর্থ তুলে দেন। সেই অর্থ দিয়েই জেলা স্কুলের দক্ষিণ দিকে (রেল লাইনের ওপারে) একটি দ্বি-তল হোস্টেল নির্মিত হয় ১৯১৩ সালে। হোস্টেলটি উদ্বোধন করেন তৎকালীন বাংলার ছোট লাট মি. পিসি লিওন। তার নামই হোস্টেলটির নামকরণ করা হয় ‘লিওন হোস্টেল’।
মৌলভী একিনউদ্দিন আহমদ একজন ভালো সংগঠন সমাজ দরদী মানুষ ছিলেন। দিনাজপুরের মুসলিম  পূর্নজাগরণ ও রাজনৈতিক আন্দোলনে তিনি ছিলেন অগ্রদূত। তার অক্লান্ত চেষ্টায় ১৮৯৪ সালে দিনাজপুরে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘দি মোহামেডান এসোসিয়েশন অব দি আঞ্জুমান-ই-ইসলামিয়া দিনাজপুর’ নামের একটি মুসলিম সংগঠন। দিনাজপুর জেলার মুসলমানদের শিক্ষা ও ধর্মীয় অধিকার নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় বজার রাখার জন্য এ প্রতিষ্ঠানটির জন্ম। এর সভাপতি ছিলেন মৌলভী একিন উদ্দিন এবং সেক্রেটারী ছিলেন মৌলভী চৌধুরী মো: ঈশা বি.এল দিনাজপুর বার। সংগঠনটির উদ্দেশ্য ছিল- (১) সরকারী চাকুরীতে মুসলমানদের অধিক হারে নিয়োগ, (২) দিনাজপুরে মুসলমানদের শিক্ষাক্ষেত্রে উন্নতি সাধন, (৩) মুসলমান ছাত্রদের জন্য অধিক সংখ্যক মক্তব, মাদ্রাসা, এমই স্কুল হোস্টেল প্রতিষ্ঠা করা, (৪) মুসলমানদের ধর্মীয় সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন সাধন ইত্যাদি।
এর ফলে দিনাজপুরের মুসলমান বুদ্ধিজীবীরা ধর্ম, শিক্ষা ও রাজনৈতিক বিষয়াবলী নিয়ে খোলামেলা আলোচনাসহ বিভিন্ন দাবী দাওয়া সরকারের কাছ পেশ করার সুযোগ পান। পরবর্তীকালে শেরে বাংলা ফজলূল হকসহ দেশ বরেণ্য অনেক রাজনীতিবিদগণ ‘মুসলমান সভায়’ এসেছিলেন। মুসলমান সভা প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য ছিল জেলার মুসলমান বুদ্ধিজীবীদের সংগঠিত করা ও তাদের মাঝে রাজনৈতিক সচেতনতা সৃষ্টি করা। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের পটভূমিতে মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষায় একিন উদ্দিন আহমদ যথেষ্ট অবদান রাখেন। যার ফলশ্রুতিতে ১৯১৯ সালে অবিভক্ত ভারতে ভারত শাসন আইনের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। খান বাহাদুর একিন উদ্দিন এই নির্বাচনে দিনাজপুর জেলার একমাত্র মুসলমান নিবাচর্নী কেন্দ্র থেকে বঙ্গীয় আইন পরিষদের প্রথম মুসলমান সদস্য/ এম এল এ নির্বাচিত হন ১৯২০ সালে। এ থেকেই তার জনপ্রিয়তা ও রাজনৈতিক কর্মকান্ড আরো বিস্তৃত হয় বলে জানা যায়।
এছাড়া দিনাজপুরের নাট্য আন্দোলন, ক্রীড়া সংগঠক, আর্য পাঠাগার প্রতিষ্ঠা, জনশিক্ষা উন্নয়ন, মাদ্রাসা শিক্ষা বিস্তার, দিনাজপুর ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠাসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকান্ডের সাথে আমৃত্যু জড়িত ছিলেন তিনি। দিনাজপুরের মুসলমানদের রাজনৈতিক আন্দোলনের অগ্রপথিক ও সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের পুরষ্কার স্বরূপ ১৯২৫ সালে বৃটিশ সরকার একিন উদ্দিন আহমদকে “খান বাহাদুর” উপাধিতে ভূষিত করেন। এখানে উল্লেখ্য যে, তাঁর আগে দিনাজপুর শহরের আর একজন কৃতিসন্তান ১৮৮৫ সালে “খান বাহাদুর’ উপাধি পেয়েছিলেন- তিনি হলেন ক্ষেত্রীপাড়া নিবাসী মুসলমান জমিদার মুন্সী মোহাম্মদ আলী।
খানবাহাদুর একিন উদ্দিন আহমদ কেবল একজন আইনজীবী, রাজনৈতিক নেতা ও দক্ষ সংগঠকই ছিলেন না, তিনি একজন ভালো সাহিত্যসেবীও ছিলেন। ‘ইসলাম ধর্মনীতি’ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন তিনি। উক্ত গ্রন্থে ইসলামের মূল নীতি, আদর্শ ও মুসলমানদের অনুসরণীয় বিষয়াবলী বর্ণনা করেছেন। এছাড়াও তৎকালীন বহুল প্রচারিত সাহিত্য পত্রিকা- সুলতান, নবনূর, মিহির, আল-ইসলাম, কোহিনূর, দিনাজপুর পত্রিকাসহ অনেক পত্রিকায় তাঁর রচনা প্রকাশিত হয়ে সুধী সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সমর্থ হয়। তিনি ১৯১৭ সালে কোলকাতায় অনুষ্ঠিত প্রথম মুসলমান সাহিত্য সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেছিলেন, এ থেকেই তার সাহিত্যপ্রীতি সহজে উপলব্ধি করা যায়।
খান সাহেব একিন উদ্দিন একজন নামকরা আইনজীবী ও সমাজহিতৈষী মানুষ হওয়ায় স্থানীয় ও বহিরাগত নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিদের সাথে তার সম্পর্ক ছিল হৃদ্যতাপূর্ণ। তৎকালীন দেশের নামকরা রাজনীতিবিদ, পন্ডিত ও সাহিত্যসেবীরা তাকে ভালোভাবে চিনতেন ও জানতেন। জানা যায়, দিনাজপুরের জমিদার মহারাজ গিরিজানাথ এর সাথে তার হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। জমিদারের ব্যক্তিগত জুরীগাড়ী প্রায় খান সাহেব একিনউদ্দিনের বালুবাড়ীস্থ গৃহে যাওয়া আসা করত।
দিনাজপুরের মুসলিম জাগরণের অগ্রদূত ও রাজনীতির পথিকৃৎ জনদরদী প্রিয় মানুষ খান সাহেব একিনউদ্দিন আহমদ ১৯৩৩ সালে শহরের বালুবাড়ীতে নিজ বাস ভবনে পরলোক গমন করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭১ বছর। দুঃখের বিষয় এই কল্যাণকামী মানুষটির পরিচয় এখন ম্লান হতে চলেছে। তাঁর নামে বড় ধরণের কিছু একটা করা এখন সময়ের দাবী। তিনি যেমন স্মরণীয় তেমনি বরণীয়।
সহায়ক গ্রন্থ :
১। খান সাহেব তসলিম উদ্দিন আহমদ ঃ মোতাহার হোসেন সূফী।
২। জেলা গেজেটিয়ার দিনাজপুরঃ সম্পাদনায় নূরুল ইসলাম খান, ১৯৯১।
৩। দিনাজপুর জেলাস্কুল বার্ষিকী- ২০০৫।
৪। রঙ্গপুরের বরেণ্য ব্যক্তিত্ব ঃ সম্পাদনায় মোতাহার হোসেন সূফী।
৫। অতীতের কথা (আত্মজীবনী)ঃ আফতাব উদ্দিন চৌধুরী- ১৯৬৯।
লেখক - সাহিত্যিক, কলামিস্ট, গবেষক, ইতিহাসবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা
jewelwriter53@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ