ঢাকা, শনিবার 27 October 2018, ১২ কার্তিক ১৪২৫, ১৬ সফর ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

বাংলাদেশে ইসলামী শিক্ষার ব্যর্থতা ও তার কারণ

মোশারফ হোসেন : মহান আল্লাহ বলেন: “তাদের (মুমিন) প্রত্যেক দলের মধ্যে একটি অংশ থাকবে যারা তাদেরকে দীনের বিষয় বোঝাবে” সুরা তাওবা -১২২। রাসুল (স) বলেন: “আল্লাহ যার কল্যাণ চায় তিনি তাকে দীনের বিষয় বোঝার সক্ষমতা দান করেন” বুখারী ও মুসলিম। প্রজ্ঞা নির্ভর একমাত্র ধর্মের নাম হল ইসলাম। আদি পিতা ও প্রথম মানুষ হযরত আদম (আ) এর ফেরেস্তাদের সাথে জ্ঞানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া থেকে পবিত্র কুরআনের প্রথম অবতারিত বাণী “পড় তোমার প্রভুর নামে ” পর্যন্ত আসমানী  ধর্মের সবটুকুই জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ এক পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা এ ইসলাম।‘জীবন যেখানে ইসলাম সেখানে’ এ স্লোগান নিয়ে যেকোন পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিতে ইসলামী জীবন পরিচালনার স্বার্থে ইসলামী জ্ঞান চর্চা সকল মুসলমানের উপর ফরয করা হয়েছে। পৃথিবীর অন্যতম মুসলিম দেশ বাংলাদেশে এ ফরয ইবাদতটির যে বেহাল দশা  তা অনস্বীকার্য। অবশ্য তার কিছু কারণও রয়েছে যার সমাধান হওয়া সময়ের দাবী।
সহজ কথায় বলতে গেলে যে শিক্ষা মানুষকে পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা ইসলাম সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান দান করে ব্যবহারিক জীবনে পূর্ণ প্রতিফলন ঘটায় বা সাহায্য করে তাকে ইসলামী শিক্ষা বলে।এ ক্ষেত্রে ইসলামী শিক্ষার দুটি দিক রয়েছে- একটি হলো পরকালীন আর অন্যটি হলো পার্থিব। পরকালীন বিষয় সম্পূর্ণ ওহী দ্বারা পরিচালিত আর পার্থিব বিষয় ওহীর নির্দেশনা ও কল্যাণকর উদ্ভাবনী নির্ভর। এর সমর্থনে রাসুল (স) বলেন- “আমাকে পরকালীন জ্ঞান বেশি দেয়া হয়েছে আর তোমাদেরকে দুনিয়াবী জ্ঞান বেশি দেয়া হয়েছ।” আর সাধারণভাবে শিক্ষা মানে হচ্ছে যে জ্ঞানার্জনের ফলে মানুষের দৈহিক,   মানসিক ও আত্মিক উন্নতি ঘটে তাকে শিক্ষা বলে। আর এ উন্নতিকে বলে জাতির মেরুদ-। এ কথা শতসিদ্ধ যে,  যে দেহের মেরুদ- যত বেশি মজবুত সে দেহ তত বেশি শক্তিশালী। তাহলে মুসলিম জাতির মেরুদ- কেমন তা নির্ভর করছে এ জাতির শিক্ষার মান ও তার প্রতিফলনের উপর। নিম্নে  ইসলামী শিক্ষার ব্যর্থতার কতিপয় কারণ তুলে ধরছি-
আজকের বাংলাদেশ উপমহাদেশ থেকে যে কারণে পৃথক হয়েছিল তার একমাত্র প্রধান কারণ হলো ইসলাম ধর্মের স্বকীয়তা রক্ষা ও স্বাধীনতা। তাছাড়াও ছিল অর্থনীতি, রাজনীতি এবং শিক্ষা-সংস্কৃতিতে এ অংশের জনগণের উন্নতি লাভ করা। ভারতীয় উপমহাদেশে যখন প্রশাসনিকভাবে ইসলাম আগমন করে তখন থেকেই এখানকার মানুষ ইসলামী শিক্ষা লাভ করেন দীনের উচ্চ শিক্ষিত দায়ীদের কাছ থেকে এবং তৎকালীন সরকারের নির্ধারিত প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনায়। আর তা ছিল সনদবিহীন এবং একমাত্র দীনের স্বার্থে। আর সে শিক্ষার ফলও ছিল শতভাগ কার্যকরী। যার প্রমাণ সে সময়ে অন্য ধর্মের লোকেরা দলেদলে ইসলাম গ্রহণ করত অগণিত সংখ্যায়।তত্কালীণ ইসলামী শাসন ও শিক্ষার প্রভাব সমাজ ও দেশের শেকড় থেকে শিখরে বিস্তৃতি লাভ করেছিল। প্রাক-বৃটিশ উপমহাদেশে মুসলমানদের ইতিহাস যার জ্বলন্ত সাক্ষী। ব্রিটিশরা উপমহাদেশ দখলের পর ইসলামী শিক্ষা মারাত্মকভাবে আহত হয়ে এতটাই দুর্বল হয়ে পড়ে যে সে দুর্বলতা আজ পর্যন্ত কাটিয়ে উঠতে পারেনি। পরবর্তীতে এ এলাকায় সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে শিক্ষা, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকসহ বিভিন্ন খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন সসাধিত হলেও দু:খজনক বাস্তবতা হচ্ছে উন্নতি হয়নি ইসলামী শিক্ষার। ফলে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ ভূখ- বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের কোন সরকারই রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় পূর্ণাঙ্গ ইসলামী শিক্ষা বাস্তবায়ন করেনি। জাতীয় শিক্ষা কারিকুলামে ইসলামী শিক্ষা যেন ভিন দেশী অতিথি। ফলে দেখা যাচ্ছে প্রজন্মের প্রজন্ম ইসলামী শিক্ষা থেকে নীরবে ছিটকে পড়ছে। ফলে এখনো মুসলমানদের জন্য তৈরি করা যায়নি নির্ভেজাল ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থা এবং বৃটিশ প্রেতাত্মামুক্ত ইসলামী সংবিধান।
ব্রিটিশরা মুসলমানদের কাছ থেকে রাষ্ট্র ক্ষমতা ছিনিয়ে নেয়ায় ব্রিটিশ মুসলমান পরস্পরের মধ্যে সম্পর্ক ছিল সাপে-নেউলে। রাজনৈতিক সন্ত্রাসী ও খ্রিস্টান ধর্মের হওয়ায়  মুসলমানরা যেমন তাদের বিরোধিতা করতে থাকে ব্রিটিশ সরকারও মুসলমানদের শিক্ষা ব্যবস্থা তথা মসজিদ, মাদরাসা,  পাঠাগারসহ অন্যান্য সকল অর্থনৈতিক শেকড় কেটে দেয় এবং হাজার হাজার আলেমকে হত্যা করে। ফলে মুসলমানদের শিক্ষা প্রায় আত্মগোপনে চলে যায়। কারণ তারা জানত একটি জাতিকে ধ্বংস করতে চাইলে তার শিক্ষা ব্যবস্থাকে আগে ধ্বংস করতে হয়। ব্রিটিশরা দেশ ছাড়লেও ব্রিটিশ ফোল্ডার থেকে এ দেশের মানুষ বের হয়ে না আসতে পারায় আর কোন সরকার ইসলামী শিক্ষার হাল না ধরায় যা হবার তা আজ ভোগান্তি হয়ে আমাদের নিত্য সঙ্গী। উল্টো আইন ও নতুন নতুন সিলেবাস করে ইসলামী শিক্ষাকে নির্বাসনে দেয়ার আয়োজন করা হয়েছে শতবার। তারই ধারাবাহিকতায় এখনো বাংলাদেশে ইসলামী শিক্ষা নানা শর্তে আর আইনি বেড়াজালে বন্দি।
যে কোন শিক্ষা বিস্তারে ভৌগোলিক অবস্থান এক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দু’বার স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশ (ব্রিটিশদের কাছ থেকে একবার পাকিস্তানের কাছ থেকে একবার) সব সময়ই ছিল শোষিত অবস্থানে। ফলে এ ভূখণ্ডে গড়ে ওঠেনি পর্যাপ্ত  ইসলামী উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।অপরদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন বন্যা, খরা-ঝরা, ঝড়-তুফান, জলোচ্ছাস, ভূমিকম্পসহ নানান দুর্যোগ সব সময়ই একসারিতে দাঁড় করিয়েছে ধনী-গরিব উভয়কে। অপর দিকে রাষ্ট্রীয় শাসনও ছিল হাজার মাইল দূরে।
বাংলাদেশে ইসলামী শিক্ষার পথে প্রধান যে অন্তরায়টি আবহমান কাল থেকে নিত্য সঙ্গী হয়ে পাশে থেকেছে তা হলো দারিদ্র্য নামের অভিশাপ।কৃষি নির্ভর ক্ষয়িষ্ণু অর্থনীতির দারিদ্র্যক্লিষ্ট মানুষের খাদ্যের যোগান দিতেই যেখানে জীবন হাঁফিয়ে ওঠে সেখানে পয়সা খরচ করে উচ্চতর  ইসলামী বিদ্যা শিক্ষা করার উচ্চাভিলাষ বেশি মানুষের ভাগ্যে অতীতেও যেমন জোটেনি বর্তমানেও সে শূন্যতার মহাগর্জন প্রথম স্থানেই আছে। এখনো ইসলামী শিক্ষার্থীর সিংহভাগ দরিদ্র পরিবারের। যাদের ধর্মীয় উচ্চশিক্ষার প্রতি কোন স্পৃহা জন্মাতে দেয়না অভাব নামের হুতাশন। আজও কর্মসংস্থানের টানে অনেক মেধাবীরা পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে।দারিদ্র্যের কষাঘাতে অর্থের দিকে ছুটতে দেখা যায় এ দেশের প্রায় সকল আলেমকেও। তাঁরা অনেকটা ভুলেই যায় যে তাদের দীনের জন্যই পড়াশোনা ও গবেষণা করা উচিত।
আমাদের সমাজের চরম বাস্তবতা হচ্ছে ইসলামী শিক্ষাকে সব সময়ই বাকা চোখে দেখা হয়। ব্রিটিশদের শেখানো এ শিক্ষাটি দেশের সব্ত্র এতটাই সফলভাবে প্রতিফলিত যে অধিকাংশ মুসলমানদের কাছেও এখন এটি একটি অবহেলিত বা অনেকটা অপ্রয়োজনীয় এক বিষয়ের নাম। সামাজিক এ নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গী যথেষ্ট থামিয়ে দিয়েছে শিক্ষার গতি এবং ঘুরিয়ে দিয়েছে  ইসলামী জীবন ধারা। ইসলামী  শিক্ষা আজ কতটা ক্রান্তিকাল অতিবাহিত করছে প্রতিটি মুসলিম তার প্রত্যক্ষ সাক্ষী।
উপমহাদেশে শত শত বছর ইসলামধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তি অনুপস্থিত থাকায় অন্যান্য মতবাদীয় রাজনৈতিক শক্তি রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে ইসলামী শিক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ ও অনুকম্পা করেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পরও সে শূন্যতা ও দৈন্যতা ইসলামী শিক্ষাকে মুক্তি দিতে পারেনি।যার উদাহরণ ৯০% মুসলিম জনগণের শিক্ষা নীতিতে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ইসলামী শিক্ষা সম্পর্কে সবচেয়ে কম জ্ঞান রাখে। মাদরাসা ও অন্যান্য অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানিক যে টুকু ইসলামী শিক্ষা  আছে তা দিয়ে যে অন্তত কোন জাতি ইসলামের পথ পাবেই না সময়ে সেটুকু ভেবে দেখার লোকও হয়ত পাওয়া যাবেনা একদিন।
ইসলামের ভাষা আরবি আর আমাদের রাষ্ট্র ভাষা বাংলা হলেও ইসলামী শিক্ষা ক্ষেত্রে উর্দু, ফার্সি, পশতু ও অন্যান্য ভাষায় ইসলামী শিক্ষা গ্রহণ যেন এক রকম বাধ্যাবস্থা এদেশে।যদিও অন্য ভাষা শিক্ষা করা ইসলামে অনুমোদিত। কিন্তু অতীতে এমনও দেখা গেছে ভাষা শিক্ষা করাই যেন বড় ধর্ম শিক্ষা বলে মনে করা হত। বাংলায় পর্যাপ্ত অনুবাদ না থাকাই তার প্রমাণ।অপর দিকে সংস্কৃতি সব সময় শিক্ষার সহগামী হয়ে থাকে। বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীর বাস হলো এ দেশে।যাদের সংস্কৃতি  ইসলামী শিক্ষাকে দারুণভাবে প্রভাবিত করে।
অপরিপক্ব সিলেবাসঃ অপ্রাসঙ্গিক সিলেবাস দিকভ্রম নৌকার মত। আমাদের দেশে ইসলামী শিক্ষা উৎকর্ষতা না পাওয়ার অন্যতম কারণ হলো সময়ের সাথে চাহিদানুপাতে পরিবর্তিত অবস্থার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ সিলেবাস না থাকা। আজও পর্যন্ত জাতীয় পর্যায় থেকে ইসলামী শিক্ষার একমুখী সুচারুরূপে স্তরবিন্যাস আকারে যুগোপযোগী সিলেবাস দেয়া যায়নি।পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা ইসলামের শিক্ষা জাতি থেকে যেন অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। দেশের মাদ্রাসাগুলোও এক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই একটুও। কারণ একেক মাদরাসার সিলেবাস একেক রকম। ফলে ইসলামী শিক্ষা যেন এক অমীমাংসীত বিতর্কের শিরোনাম।
বাংলাদেশে ইসলামের আগমন প্রায় হাজার বছর হলেও এ দেশে আগে থেকেই  অবস্থান করা অন্যান্য জাতির ধর্ম বিশ্বাস ও কর্ম মুসলমানদের মাঝে বিভিন্ন রূপে প্রবেশ করায় অনেক ধর্মীয় ও সামাজিক কুসংষ্কার নামক ব্যাধি থেকে মুক্ত করা যায়নি এ অংশের মানুষদের ইসলামী শিক্ষার অভাবে। বরং বিভিন্ন সময়ে সমন্বয়ের সুযোগে স্থায়িত্বপায় ভ্রান্ত আকিদা এবং পরবর্তিতে এর কুপ্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ইসলামী শিক্ষা। এর মধ্যে হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন ও খ্রিস্টান ধর্মের ধ্যান, আধ্যাত্মিকতা, প্রভু দর্শন পদ্ধতি ও তন্ত্রবিদ্যা উল্লেখযেগ্য।তাছাড়া ইসলামী শিক্ষার বিশাল জায়গা জুড়ে শিয়া, মু’তাজিলা, খারেজী, রাফেযি, নাসেবি ইত্যাদি ভ্রান্ত আকিদারও নীরব অনুপ্রবেশ ঘটেছে যার তেমন সংস্কার না হওয়াও ইসলামী শিক্ষা ক্ষতিগ্রস্তের উল্লেখযোগ্য কারণ।
প্রতিটি শিক্ষা ব্যবস্থার বিকাশ ঘটে তার উচ্চতর গবেষণা, নতুন উদ্ভাবনী, সঠিক ব্যবস্থাপনা, উন্নত কৌশলের উপর ভিত্তি করে। আমাদের দেশের ইসলামী শিক্ষা ক্ষেত্রে কোনটিই  নেই বললেই চলে।যা আছে তার প্রয়োগ হয়ত বাণিজ্যিক নয়ত তলানীতে। সময়ের চাহিদায় অন্যান্য শিক্ষা যেখানে প্রযুক্তি নির্ভর হয়ে উন্নত জীবনের দিকে ধাবমান সেখানে আমাদের দেশের ইসলামী শিক্ষা সেকেলে পদ্ধতিতেই চলছে যেন স্রোতবিহীন এক মজ্জা পুকুরের প্রস্তুতির দায় নেয়া হয়েছে। দু:খজনক বাস্তবতা হচ্ছে অধিকাংশ ইসলামী ব্যক্তিত্ব আধুনিক ডিভাইস ব্যবহারে নিজেরা যেমন অদক্ষ তেমনি তারা অতীতের উপমা টেনে এগুলোর সাহায্যে জ্ঞানার্জনকে অনেকে নিরুৎসাহিতও করেন।
আমাদের দেশের ইসলামী শিক্ষা যে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরেই সীমাবদ্ধ তাতে কোন সন্দেহ নেই। সমাজে যারা আলেম,  মুফাসসির, মুহাদ্দিস, মুফতি, শায়খ নামে পরিচিত তারা আসলে ইসলামী শিক্ষার মাধ্যমিক স্তর পাড়ি দিয়েছেন খুব কম সংখ্যকই।কথায় আছে ‘অল্প বিদ্যা ভয়ংকরী’;সমাজে ব্যবহারিক জীবনে ইসলামী শিক্ষার অনুপস্থিতি ও দলাদলির মূল দায়িত্ব যেন তাদেরই কাঁধে। কারণ বাংলদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এদেশে লক্ষ লক্ষ তথা কথিত আলেম তৈরি হলেও প্রায় অর্ধ শতাব্দী দীনের খেদমতের পর এসে দেশের অধিকাংশ মানুষের ধর্মহীন জীবন-যাপন কি তার প্রকৃষ্ট দলিল নয়? দীনের দায়িত্ব পালনের নামে তারা মানুষের মাঝে ধর্মীয় আবেগ তৈরি করেছেন ঠিকই কিন্তু জাতিকে সংগঠিত করতে তারা ব্যর্থতার পরিচয়ও দিয়েছেন প্রায় হতাশার সমান। বাহ্যত দেখা গেছে প্রাতিষ্ঠানিক সনদ গ্রহণের পর জীবনে আর সে কিতাবের সাথে সাক্ষাত হয়না অধিকাংশ আলেমের। আর যে এক শিক্ষা ধারা থেকে বের হয়ে আসে তাকে অন্য ধারার কাউকে যেন সহ্যই করতে পারেন না।
যোগ্য নেতৃত্বের অভাবঃ ব্রিটিশ সময়ে অঘোষিত নির্বাসনে পাঠানো ইসলামী শিক্ষার কোন সরকার যেমন হাল ধরেনি তেমনি এমন কোন যোগ্য নেতার আবির্ভাব হয়নি যিনি ইসলামী শিক্ষাকে এ দেশের জাতীয় বুনিয়াদি শিক্ষায় রুপ দান করেন। যার ফল আমরা দেখতে পাই সবার নিকট গ্রহণযোগ্য আলেম, মুফাসসির, মুহাদ্দিস, ফকিহ, মুফতি বা শায়খ তৈরি হয়নি যারা দেশের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেন। যদিও দু-চারজনের আবির্ভাব হয়েছে তাদেরকে যে কারণেই হোক সফল হতে দেয়া হয়নি।
ইসলাম পরকালকে প্রাধান্য দেয়া ও দুনিয়াকে পরকালের উত্তম আবাদী জমিনে পরিণত করার এমন এক উন্নত ধর্মের শিক্ষা ব্যবস্থা যাদের হাতে তারাই যদি উল্টো পথে হাটে তখন সে শিক্ষা ব্যবস্থার কী করুণ পরিণতি হতে পারে তার ধ্বংসাবশেষের বাস্তব চিত্র চমৎকারভাবে ফুটে ওঠেছে আমাদের সোনার বাংলাদেশে।এ দেশের শিক্ষা কর্ণধারদের শতধা বিভক্তির সবচেয়ে বড় কারণ হলো আলেমদের দুনিয়ামুখীতা। দুনিয়াকে বাদ দিয়ে ইসলাম হয়না ঠিক কিন্তু রাসুল (স) বলেছেন -“যে ব্যক্তি দুনিয়াকে পাওয়ার উদ্দেশ্যে দীনি জ্ঞানার্জন  করে পরকালে সে জান্নাতের সুগন্ধিও পাবেনা” এ অনুভূতি যেন ভুলতে বসেছে মুসলিম জাতি।অথচ এ দেশের আলেমরা পর্যন্ত বিভিন্ন সেক্যুলর দলের কর্মী, শুধু দুনিয়ার অর্থ আর পদলেহীর অন্ধ লালসায় ইসলাম বিরোধী ও বিদ্বেষীদের লবিং-গ্রুপিংয়ে নেতৃত্ব প্রদান বা প্রতিযোগিতামূলক তোষামোদে বনে যাওয়া যেন নিত্য দিনের নজির।
আশার কথা হচ্ছে এত প্রতিবন্ধকতা সত্বেও সর্বকালে ও সর্বযুগে কিছু নিবেদিত প্রাণ ব্যক্তি থাকেন যারা দীনের গোড়ায় প্রাণশক্তি ব্যয় করে যান নীরবে-নিবৃত্তে। যাদের ত্যাগ ও তিতিক্ষার ফলে এত কারণ ও বারণ থাকা সত্ত্বেও ইসলামী শিক্ষা-দীক্ষা আজও আলো বিকিরণ করে যাচ্ছে গ্রীষ্মের মধ্যদুপুরের তেজদীপ্ত সূর্যের ন্যায়। এদেশে ইসলামী শিক্ষা উচ্চ শিখরে উন্নীত করতে হলে, হাজার বছরের শূন্যতা দূর করতে হলে মাদরাসা,  স্কুল, কারিগরি, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল পর্যায়ে ইসলামী শিক্ষার স্তরবিন্যাস আকারে বাধ্যতামূলকভাবে সিলেবাস করতে হবে এবং কুরআন, হাদিস, ইসলামী আইন শাস্ত্র, তুলনামূলক ধর্মতত্বের শুধু বিচ্ছিন্ন বিভাগ খোলা নয় প্রতিটি বিষয়ের একেকটি গবেষণাগার বা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা দরকার। প্রযুক্তি নির্ভর উদ্ভাবনীমূলক উন্নত কৌশলে ইসলামী শিক্ষাকে এগিয়ে নিতে দেশের প্রতিটি দীনদার ব্যক্তিকে সকল ব্যবধান ভুলে এগিয়ে আসতে হবে। তবেই শুধু স্বপ্নের সোনার বাংলা নয় আমাদের দেশ হবে জান্নাতের স্নিগ্ধ আলোয় উদ্ভাসিত। আল্লাহ আমাদের দেশে ইসলামী শিক্ষা পরিপূর্ণভাবে ক্ববুল করুন। আমিন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ