ঢাকা, শনিবার 27 October 2018, ১২ কার্তিক ১৪২৫, ১৬ সফর ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

লালমনিরহাটের ৩টি আসনে নির্বাচনী আমেজ

মোঃ লাভলু শেখ লালমনিরহাট : লালমনিরহাট একটি সীমান্তবর্তী জেলা। মহান মুক্তিযুদ্ধে পাটগ্রাম উপজেলা শত্রুমুক্ত ছিল। মুক্তাঞ্চলের বুড়িমারীতে ৬ নং সেক্টর প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত করা হয়েছিল। স্বাধীনতার পর সব কয়টি আসনে আওয়ামী লীগ বিজয়ী হয়েছিল। ৭৫ এর পর এই আসন ৩টি বিএনপির দখলে চলে যায়। বিএনপির পর সব কয়টি আসনে জাতীয় পার্টি বিজয়ী হয়েছিল। শুধু মাত্র একবার  আওয়ামী লীগ এর প্রাথী আবুল হোসেন বিজয়ী হয়েছিলেন। ৫ম সংসদীয় নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ৩টি আসনে বিজয়ী হয়েছিল। ৬ষ্ঠ সংসদীয় নির্বাচনে বিএনপি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় নির্বাচিত হয়। ৭ম সংসদীয় নির্বাচনে জাতীয় পাটি ৩টি আসনে বিজয়ী হয়েছিল। ৮ম সংসদীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১টি আসনে, জাতীয় পার্টি ১টি আসনে ও বিএনপি ১টি আসনে বিজয়ী হয়েছিল। ৯ম সংসদীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একটি ও জাতীয় পার্টি ২টি আসনে বিজয়ী হয়েছিল। ১০ম  সংসদীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৩ টি আসনে বিজয়ী হয়েছিল। একাদশ সংসদীয় নির্বাচন দলভিত্তিতে হলে ৩ দলের মাঝে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে।
অপর দিকে জোট ভিত্তিক নির্বাচন হলে মহাজোট প্রাথীর সাথে বিএনপির প্রতিযোগিতা হবে। দলীয় মনোনয়ন নিয়ে প্রতিটি আসনে একাধিক দলীয় প্রার্থী রয়েছে। এই দলীয় প্রার্থীরা দলের মার্কা পেতে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে সারা জেলা জুড়ে নির্বাচনী আমেজ পরিলক্ষিত হচ্ছে। সাধারন ভোটারেরা দলীয় প্রাথীদের চেয়ে নির্দলীয়, সৎ, নিষ্ঠাবান  প্রাথী খুঁজছেন। কিন্তু নির্দলীয় প্রাথী হতে কেহই আগ্রহ প্রকাশ করছেন না। কারন দলীয় কর্মী ও সমর্থকদের সংখ্যা এতো বেশি যে নির্দলীয় প্রাথীকে তার সমর্থক ও কর্মীবাহিনী সৃষ্ঠি করা খুবই কষ্টকর। তার উপর রয়েছে টাকার খেলা। যে প্রাথীর টাকার পরিমান বেশি সেখানেই দলীয় কর্মী সমর্থক ও নিবাচিত গণপ্রতিনিধিদের সমর্থন বেশি। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে টাকা অন্যতম ফ্যাক্টর বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দ। আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দের পক্ষে জোরালো দাবি হচ্ছে, বিগত ৪ বছরে লালমনিরহাট জেলায় কয়েক হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে শিক্ষা ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে বৈপ্লাবিক পরিবর্তন ঘটিয়েছে। সেই সাথে দরিদ্র জনগোষ্ঠির আর্থ সামাজিক উন্নয়নে ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহন করা হয়েছে। লালমনিরহাট জেলাকে দরিদ্র, নিরক্ষর ও ভিক্ষুক মুক্ত করতে বর্তমান সরকার নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সে ক্ষেত্রে আগামী নির্বাচনে জেলার ৩টি আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিজয়ী হবে। অপর দিকে বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয় যে সুষ্ঠ, নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে অর্থাৎ সাধারন ভোটারেরা নির্বিঘেœ ভোট কেন্দ্রে গিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারলে প্রতিটি আসনে বিএনপির বিজয় সুনিশ্চিত। এ দিকে জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকে দাবি করা হয় যে মহাজোট ভিত্তিক নির্বাচন ছাড়াও জাতীয় পার্টি একক ভাবে নির্বাচন করলে ফলাফল তাদের পক্ষে থাকবে। ক্ষমতাসীন দল ছাড়া বিএনপি ও জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকে নির্বাচনকালীন সময়ে সার্বক্ষণিক সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবি করা হয়। তাছাড়াও বিএনপির পক্ষ থেকে নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকার গঠন। শক্তিশালী নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে নির্বাচন পরিচালনার দাবি জানানো হয়েছে। 
লালমনিরহাট-১ (হাতীবান্ধা-পাটগ্রাম) : জেলার পাটগ্রাম-হাতীবান্ধা ২টি উপজেলার ১৯টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা নিয়ে লালমনিরাহাট-১ আসন গঠিত। এ আসনে দেশের বৃহত্তম স্থল বন্দর বুড়িমারী এবং তিনবিঘা করিডোর পেরিয়ে দহগ্রাম ইউনিয়ন রয়েছে। এখানে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ৬ নং সেক্টর প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছিল।
এ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে বর্তমান প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী মোতাহার হোসেন এমপি। তিনি তার নির্বাচনী এলাকার জন্য ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন। প্রতিনিয়তই তিনি দলীয় ও প্রশাসনিক সভায় উপস্থিত থাকছেন। অন্যদিক তার বড় ছেলে হাতীবান্ধা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক মাহমুদুল হাসান সোহাগ এর জন্য তার কিছুটা সুনাম ক্ষুন্ন হলেও তিনি ওই এলাকার জনগণের কাছে নেতা হিসাবে এখনো পরিচিত আছেন। অন্যদিকে এ আসন থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী পাটগ্রাম উপজেলা চেয়ারম্যান রুহুল আমিন বাবুল ও প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা মেজর (অবঃ) মকবুল হোসেন।
জাতীয় পর্টির মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও উপজেলা জাতীয় পার্টির আহবায়ক এমজি মোস্তফা ও অপর জন হলেন জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য মেজর খালিদ আক্তার। এদের মধ্যে এমজি মোস্তফা মনোনয়ন পেতে এলাকায় গণসংযোগ করে যাচ্ছে। কিন্তু মেজর (অব.) খালিদ আকতার এলাকায় তেমন কোন পরিচিতি লাভ করতে পারেন নি।
এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে কেন্দ্রীয় বিএনপির অন্যতম সদস্য ব্যারিস্টার হাসান রাজিব প্রধান, সাবেক এমপি ও জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি জয়নুল আবেদীন, ছাত্র দলের কেন্দ্রীয় কমিটির শাহীন আকন্দের নাম শোনা যাচ্ছে। তাছাড়াও জাসদ নেতা সাদেকুল ইসলাম প্রাথী হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বলে জানা যায়।
লালমনিরহাট-২ (কালীগঞ্জ-আদিতমারী) : জেলার কালীগঞ্জ-আদিতমারী ২ টি উপজেলার ১৬ টি ইউনিয়ন নিয়ে লালমনিরাহট-২ আসন গঠিত । এ আসন জেলার  ভৌগোলিকভাবে মধ্যবর্তী উপজেলা।
এ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে বর্তমান সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহম্মেদ। তার মনোনয়ন অনেকটাই সুনিশ্চিত।
দশম সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির ৭ বারের এমপি মজিবর রহমান অংশগ্রহণ না করায় নুরুজ্জামান আহমেদ বিনা প্রতিদ্বন্দি¦তায় এমপি নির্বাচিত হন। তিনি প্রথমবারের মত এমপি নির্বাচিত হয়ে খাদ্য প্রতিমন্ত্রী ও পরে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অন্যদিকে এই আসনে আদিতমারী উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ সভাপতি সিরাজুল হক মনোনয়ন প্রত্যাশী।
বিএনপির প্রার্থী হিসেবে জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ও সাবেক এমপি সালেহ উদ্দিন আহম্মেদ হেলাল ও কালীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাধারন সম্পাদক ও চন্দ্রপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম মনোনয়ন প্রত্যাশী।
এই আসনে জাতীয় পার্টি থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সমাজকল্যাণ সম্পাদক রোকন উদ্দিন বাবুল মনোনয়ন পাওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় ভাবে দৌড়ঝাপ করছেন।
লালমনিরহাট-৩ (সদর) : লালমানরহাট সদর উপজেলার ১টি পৌরসভা ও ৯টি ইউনিয়ন নিয়ে লালমনিরহাট-৩ আসন গঠিত। এ আসন থেকে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছে বর্তমান সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়র আবু সাঈদ দুলাল।
তার শারীরিক অসুস্থতার কারনে বিগত বছরগুলোতে লালমনিরহাট মানুষের মাঝে বেশি সময় দিতে না পারলেও এখন দলীয়, প্রশাসনিক সভায় উপস্থিত থাকছেন। এই আসনে কুড়িগ্রাম-লালমনিরহাট সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য এ্যাড. সফুরা বেগম রুমী, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক এ্যাড. মতিয়ার রহমান, জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও গোকুন্ডা ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা স্বপন মনোনয়ন প্রত্যাশী।
জাতীয় পার্টি থেকে সাবেক বাণিজ্য মন্ত্রী ও জাতীয় পার্টির কো চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের এর মনোনয়ন সুনিশ্চিত। তবে এ আসন থেকে জেলা জাতীয় পার্টির সাধারন সম্পাদক অধ্যক্ষ মাহবুবুল আলম মিঠু মনোনয়ন প্রত্যাশী। বিএনপির একক প্রাথী জেলা বিএনপির সভাপতি সাবেক উপমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু এর মনোনয়ন সুনিশ্চিত। তিনি লালমনিরহাট জেলা বিএনপির মুল কান্ডারি হিসাবে পরিচিত।
এই আসনটিতে মহাজোট ভিত্তিক নির্বাচন হলে গোলাম মোহাম্মাদ কাদের মহাজোটের প্রাথী। এ ক্ষেত্রে বিএনপির প্রাথী আসাদুল হাবিব দুলুর সাথে প্রতিদ্বন্দি¦তা হবে। তবে দলীয় ভাবে নির্বাচন হলে বিএনপির প্রার্থীই বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ