ঢাকা, সোমবার 29 October 2018, ১৪ কার্তিক ১৪২৫, ১৮ সফর ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

দরপতনের বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে শেয়ারবাজার

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান : কোনো উদ্যোগই শেয়ারবাজারকে ভালো করতে পারছে না। শেয়ারবাজার ভালো করতে সরকারের সব উদ্যোগই ব্যর্থ। বিনিয়োগকারীদের গালাগাল করে বাজার থেকে বের করে দেয়ার করুণ পরিণতিই এখন ভোগ করতে হচ্ছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ছাড়া যে শেয়ারবাজার ভালো হয় না তা সরকারের ক্ষমতাগ্রহণের পর থেকে বিনিয়োগকারীরা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। ২০১০ সালের মহা কেলেঙ্কারির পর জড়িতদের বিচারের দাবিতে আন্দোলন করে হতাশ হতে হয় বিনিয়োগকারীদের। জড়িতদের বিচারতো হয়ইনি বরং বাজার কারসাজির সাথে জড়িতরাই সক্রিয় বাজারে। সেই সময়ে সরকারের পক্ষে কর্তাব্যক্তিরা বিনিয়োগকারীদের সম্পর্কে নানা কটূকথা বলেন। বিনিয়োগকারীদের ফটকা বিনিয়োগকারীও বলা হয়। এ অবস্থা দেখে মুখ ফিরিয়ে নেয় বিনিয়োগকারীরা। তারা আর বাজারমুখী হয়নি। ফলে বাজারে যা ঘটার তাই ঘটছে। দীর্ঘ ৮ বছরেও মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি শেয়ারবাজার। সরকারের কোনো পদক্ষেপই বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে পারেনি। ফলে মূলধন হারানোর পাশাপাশি দরপতনের বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে শেয়ারবাজার।
গত সপ্তাহের পাঁচ কার্যদিবসের (২১ থেকে ২৫ অক্টোবর) মধ্যে তিন কার্যদিবসেই দেশের শেয়ারবাজারে দরপতন হয়েছে। এমন দরপতনের কারণে এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) বাজার মূলধন হারিয়েছে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা। বড় অঙ্কের বাজার মূলধন হারানোর পাশাপাশি গত সপ্তাহজুড়ে সবকটি মূল্য সূচকের বড় পতন হয়েছে। সেই সঙ্গে কমেছে লেনদেনের পরিমাণ। এদিকে আগের সপ্তাহে ডিএসই বাজার মূলধন হারায় ২ হাজার ৭৮৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ গত দুই সপ্তাহের ব্যবধানে ছয় হাজার কোটি টাকার বেশি বাজার মূলধন হারিয়েছে ডিএসই। ডিএসই সূত্রে জানা গেছে, গত সপ্তাহের শেষ কার্যদিবস শেষে ডিএসইর বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা। যা তার আগের সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে ছিল ৩ লাখ ৮৮ হাজার ৯৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক সপ্তাহে ডিএসইর বাজার মূলধন কমেছে ৩ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা। এদিকে এর আগের সপ্তাহের শেষ কার্যদিবস শেষে ডিএসইর বাজার মূলধন দাঁড়ায় ৩ লাখ ৮৮ হাজার ৯৬ কোটি টাকা যা তারও আগের সপ্তাহের শেষ কার্যদিবসে ছিল ৩ লাখ ৯০ হাজার ৮৮২ কোটি টাকা। ওই সপ্তাহে ডিএসইর বাজার মূলধন কমেছিল ২ হাজার ৭৮৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ গত দুই সপ্তাহের ব্যবধানে ডিএসইর বাজার মূলধন কমেছে ৬ হাজার ২১৪ কোটি টাকা।
এদিকে গতকাল রোববারও বড় দরপতনের বৃত্ত থেকে বের হতে পারেনি শেয়ারবাজার। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) সবকটি মূল্য সূচকের বড় পতন হয়েছে। ডিএসইর প্রধান মূল্য সূচক ডিএসইএক্স কমেছে এক শতাংশের ওপরে। এতে প্রায় দুই বছর আগের স্থানে ফিরে গেছে ডিএসইর প্রধান মূল্য সূচক ডিএসইএক্স। মূল্য সূচকের বড় পতনের পাশাপাশি দুই বাজারেই কমেছে লেনদেনের পরিমাণ। সে সঙ্গে দর হারিয়েছে সিংহভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিট। ডিএসইতে এদিন লেনদেনে অংশ নেয়া মাত্র ৬৪টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম আগের দিনের তুলনায় বেড়েছে। বিপরীতে কমেছে ২৪৭টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম। আর ২৮টির দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম কমায় ডিএসইর প্রধান মূল্য সূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের তুলনায় ৬৯ পয়েন্ট কমে পাঁচ হাজার ২১২ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। ফলে ২০১৭ সালের ৮ জনুয়ারির পর সূচকটি সর্বনিম্নে নেমে এসেছে।
বিশেষজ্ঞ ও বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলতি বছরেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচন নিয়ে সব মহলেই এক ধরনের শঙ্কা রয়েছে। দরপতনের এটি একটি কারণ হতে পারে। এর বাইরে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে বাজার ফেলছে কিনা সেটি নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে (বিএসইসি) ক্ষতিয়ে দেখা উচিত। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ছাড়া যে শেয়ারবাজার ভালো হয় না তা সরকারের ক্ষমতাগ্রহণের পর থেকে বিনিয়োগকারীরা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন।
তারা বলেন, বিনিয়োগকারীদের আস্থা সংকটের কারণেই বাজারে নেতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে। তবে বিনিয়োগকারীদের এ আস্থাহীনতার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। নির্বাচনের প্রভাব হয় তো থাকতে পারে। তবে নির্বাচনকেন্দ্রীক কোনো গোলযোগ এখনও দেখা দেয়নি। সুতরাং শুধুমাত্র নির্বাচনী অনিশ্চয়তার কারণে বাজার পড়ার কোনো কারণ নেই।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, বাজার পড়ার মূল কারণ হলো বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকট। যে কারণেই হোক বিনিয়োগকারীরা বাজারে আস্থা পাচ্ছেন না। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের একটি প্রভাব হয় তো বাজারে থাকতে পারে। তবে শেয়ারবাজারে নির্বাচনের প্রভাব খুব একটা থাকে না। এখন দেখার বিষয় কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে বাজারে নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করছে কিনা।
এদিকে বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, ডিএসইর অপর দুটি মূল্য সূচকের মধ্যে ডিএসই শরিয়াহ্ সূচক আগের দিনের তুলনায় ১৩ পয়েন্ট কমে এক হাজার ২১০ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। আর ডিএসই-৩০ আগের দিনের তুলনায় ২৩ পয়েন্ট কমে এক হাজার ৮৫২ পয়েন্টে অবস্থান করছে। দিনভর ডিএসইতে লেনদেন হয়েছে ৩৭১ কোটি ৭১ লাখ টাকা। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয় ৪২৫ কোটি ১০ লাখ টাকা। সে হিসাবে লেনদেন কমেছে ৫৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা।
টাকার অঙ্কে ডিএসইতে সব থেকে বেশি লেনদেন হয়েছে কেপিসিএলের শেয়ার। কোম্পানিটির ২৪ কোটি ২৬ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। লেনদেনে দ্বিতীয় স্থানে থাকা মুন্নু সিরামিকের ১৭ কোটি ৮১ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। ১৫ কোটি ৩৩ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেনে তৃতীয় স্থানে রয়েছে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক। লেনদেনে এরপর রয়েছে- বিবিএস কেবলস, অ্যাকটিভ ফাইন, ডেল্টা লাইফ, অ্যাডভেন্ট ফার্মা, বিএফএস থ্রেড ডাইং, সামিট পাওয়ার এবং ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশন।
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের সার্বিক মূল্য সূচক সিএসসিএক্স ১২৮ পয়েন্ট কমে ৯ হাজার ৭১৪ পয়েন্টে অবস্থান করছে। লেনদেন হয়েছে ১৪ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। লেনদেন হওয়া ২২৫টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৪৭টির দাম বেড়েছে। কমেছে ১৫২টির। আর অপরিবর্তিত রয়েছে ২৬টির দাম।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ