ঢাকা,মঙ্গলবার 30 October 2018, ১৫ কার্তিক ১৪২৫, ১৯ সফর ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

আগামী সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে যা প্রত্যাশা

মুহাম্মদ ওয়াছিয়ার রহমান : আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অতি সন্নিকটে। এমন সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নানাবিধ প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের ইশতেহার ঘোষণা করে থাকে। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় রাজনৈতিক দলগুলো তাদের ইশতেহারে ঘোষিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো বাস্তবায়িত করে না। অথবা ঘোষিত প্রতিশ্রুতির বাইরে রাজনৈতিক স্বার্থে অনেক বিষয় বাস্তবায়ন করে। আগামী নির্বাচনে ইশতেহারে জনগণ কি কি বিষয় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেখতে চায়। এক্ষেত্রে কিছু কিছু বিষয় নির্বাচন বহির্ভূত হলেও ক্ষমতায় গেলে ওই দল রাজনৈতিক সংস্কৃতি পরিবর্তনের লক্ষ্যে এগুলো বাস্তবায়ন করবে কিনা ? এমন প্রতিশ্রতি কাম্য।
এদেশের মানুষ যেহেতু নব্বই ভাগ মুসলমান তাই সংবিধানের মহান স্রষ্টার প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস পুনঃস্থাপন। পঞ্চদশ ও ষোড়শ সংশোধনী বাতিল, মৌলিক অধিকারের ২৬-৪৭ অনুচ্ছেদের সাথে অসামঞ্জস্য যে কোনো আইন ও বিধান বাতিল বা অনরূপ বিধান পরিপন্থী কোন আইন-কানুন না প্রণয়ন। সংবিধানের ৪৮(২) অনুচ্ছেদ মতে রাষ্ট্রপতি যেহেতু রাষ্ট্রের প্রধান তাই অন্য কোন বিধান বা অনুচ্ছেদ দিয়ে তার প্রাধান্য ক্ষুণ্ণ না করা বা পূর্বে চলে আসা এমন বিধান বাতিল করা। ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুসারে রাষ্ট্রপতি কেবলমাত্র নির্বাহী বিভাগের রুটিন কাজ ছাড়া অন্য কোন বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ গ্রহণ পরিহার করা। মন্ত্রিসভা ছাড়া যে কোনো সাংবিধানিক পদে নিয়োগকালেও এটার প্রয়োগ বারিত করা। এক্ষেত্রেও রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ শুনতে বাধ্য নন এমন বিধান প্রণয়ন। আইন ও বিচার বিভাগের কোনো বিষয়ে নির্বাহী বিভাগ তাদের স্বাধীনতা ও স্বাতন্ত্র্যতা বজায় রাখবে। সংবিধানের কোনো অনুচ্ছেদ প্রণয়ন বা সংশোধন করতে গেলে অন্য কোন অনুচ্ছেদের কার্যকারিতা বাতিল বা রহিত করণ না করা, এমন অনুচ্ছেদ থাকলে তা ইতিবাচকভাবে সংশোধন করা।
রাজনৈতিক সংস্কার কর্মসূচীর অংশ হিসাবে ৫৫(১) ও ৫৬(১) অনুচ্ছেদে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা বা অভিপ্রায় বাদ দিয়ে জনসংখ্যানুপাতে প্রধানমন্ত্রী ছাড়া প্রতি কোটি জনসংখ্যার জন্য অনধিক একজন করে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী নিযুক্ত করতে পারবেন রাষ্ট্রপতি, এমন বিধান সংযোজন করা। সেক্ষেত্রে কোন ব্যক্তি দু’বারের বেশী প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী হতে পারবেন না। একই সময়ে একই ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী, সংসদ নেতা ও দলীয় প্রধান পদে থাকা বারিত করা এবং এক্ষেত্রে সংবিধানের ৫৬(৩) অনুচ্ছেদ সংশোধন করা। সংসদে বিরোধী দলকে মন্ত্রী সভায় নেয়া বারিত করা, যাতে বিরোধী দল সঠিক ভূমিকা রাখতে পারে। কোনো রাজনৈতিক দলের কমিটির মেয়াদ শেষ হলে পুনঃনির্বাচন না হলে আগের কমিটি মেয়াদান্তে সরকার ও রাষ্ট্রের প্রচলিত নিয়ম অনুসারে তা বাতিল নিশ্চিত করা। দলীয় প্রধান ও মহাসচিব বা সাধারণ সম্পাদক পদে পর পর দুই টার্মের বেশী থাকাকে বারিত করা এবং এসব পদ কেন্দ্রীয় কমিটির সর্বজ্যেষ্ঠ দশ নেতার মধ্যে থাকাই বাঞ্ছনীয়। সব দলের কমিটির মেয়াদ সর্বোচ্চ তিন বছর  করা। একনায়কতন্ত্র, পরিবারতন্ত্র ও ব্যক্তিতন্ত্র পরিহার করার লক্ষ্যে দলীয় প্রধান ও সাধারণ সম্পাদক অথবা মহাসচিব পদে একাধিক প্রার্থী না থাকলে নির্বাচন বাতিল বলে গণ্য করা। এক্ষেত্রে প্রতিপদে তিনজন প্রার্থী থাকা বাঞ্ছনীয়। প্রার্থী না থাকলে ধরে নেয়া যে, দলটির বাকী সদস্যরা নির্বাচন বর্জন করেছে অথবা সিন্ডিকেট করে কাউকে দাঁড়াতে দেয়া হয়নি।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে কেবলমাত্র ফ্লোর ক্রসিংয়ের বিষয়ে বর্তমান বিধান চালু রেখে বাকিটা সংশোধন করা। অর্থাৎ আইন সভা ৭০ অনুচ্ছেদের বিধান প্রতিপালন করতে গিয়ে মৌলিক অধিকারের বিধান ৩২ ও ৩৯ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করা যাবে না। কোন দল তার দলের কেন্দ্রীয় সর্বজ্যেষ্ঠ দশ জনের বাইরে কাউকে দলীয় প্রধানের অনুপস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব প্রদান না করা। সংবিধানের ২৯(৩) অনুচ্ছেদের বিধান ব্যতিরেকে সব কোটা বাতিল করা অথবা কোটা নিয়ে ক্ষমতায় গেলে তারা কি করবে, তা ইশতেহারে উল্লেখ করা। বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড বন্ধ, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ ও ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইন বাতিল করা। বন্ধ সবগণমাধ্যম চালু করা। ফৌজদারী অপরাধে সরকারী কর্মচারীদের গ্রেফতার করতে সরকারের অনুমতি লাগবে এ সম্পর্কে রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে করণীয় উল্লেখ করা। সংবিধানের ৭(২) অনুচ্ছেদ অনুসারে জনগণই সব ক্ষমতার মালিক এবং সার্বভৌম, একথা সব দলের ইশতেহারে নিশ্চিত করা। সংবিধানের মৌলিক অধিকারসমূহের অনুচ্ছেদগুলো পরিবর্তন, পরিবর্ধন, পরিমার্জন, সংযোজন ও বিয়োজন করতে গণভোট করতে হবে এমন বিধান নিশ্চিত করা। রাষ্ট্রপতি, স্পীকার, ডেপুটি স্পীকার ও এ্যাটর্নি জেনারেলের পদ যেহেতু অরাজনৈতিক তাই এই পদগুলোতে অরাজনৈতিক ব্যক্তিকে বসাতে ইশতেহারে নির্দেশনা থাকা বাঞ্ছনীয়।
সাংবিধানিক পদ প্রধান বিচারপতি, আপীল বিভাগের বিচারপতি, বিভিন্ন বাহিনী, দফতর ও সংস্থা প্রধান, মন্ত্রী পরিষদ সচিব, অন্যান্য সচিবসহ বিভিন্ন পদে পদায়নকালে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের কালো সংস্কৃতি রোধ। এখানে রাজনৈতিক গুরুত্ব উপেক্ষা করে মেধা, যোগ্যতা, সততা, নিষ্ঠা, আন্তরিকতা ও জ্যেষ্ঠতাকে প্রধান্য দেয়া। চাকরি প্রার্থীর ক্ষেত্রে মেধা উপেক্ষা করে কোটা প্রথা ও পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে রাজনৈতিক হয়রানি বন্ধ করা। সাংবিধানিক সব পদে নিয়োগ দানকালে রাজনৈতিক দলগুলোর পরামর্শের ভিত্তিতে অধিকাংশের মতামতের আলোকে সাংবিধানিক ‘নিয়োগ কমিশন’ গঠন এবং তার মাধ্যমে নিয়োগের ব্যবস্থা করা। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক খরচ নির্বাহের জন্য সংশ্লিষ্ট দফতরের চাহিদা ও রাষ্ট্রের সামর্থ্যরে আলোকে অর্থ নির্দিষ্ট করা। প্রতিবছর বাজেট বৃদ্ধির আকার অনুপাতে বিগত বছরের উপর বর্ধিত হারে বরাদ্দ নির্ধারণ করা। অর্থাৎ এসব প্রতিষ্ঠানকে নির্বাহী বিভাগের করুণা প্রার্থীর দায় মুক্তি দেয়া। সরকারী বিভিন্ন সংস্থাকে প্রতিপক্ষকে দমনের কাজ থেকে বিরত রাখা।
সংবিধান থেকে যে কোন দন্ডের বিধান সংবিধান তুলে দেয়া, প্রয়োজনে ফৌজদারী কার্যবিধিতে তা সংযোজন করা। জাতীয় পর্যায়ে জনগনের নির্বাচিত প্রতিনিধি যার কর্মক্ষেত্র সমগ্র দেশ ব্যাপী এমন ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারোর গাড়ীতে জাতীয় পতাকা তুলে না দেয়া। সরকারী কোন বিষয়ে উপদেষ্টা নিয়োগ করতে গেলে ঐ বক্তিকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কমপক্ষে বিশ বছরের অভিজ্ঞতা থাকা। উপদেষ্টার সংখ্যা মন্ত্রী সভার সদস্য সংখ্যার এক-পঁচিশাংশের বেশী হবে না। সরকারী অফিস বা ভবনে অথবা মাঠ বা চত্ত্বরে বিনা ভাড়ায় কোনো রাজনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনা করার বিধান করা। সরকারি সফর বা খরচে কোথাও গিয়ে অথবা সরকারি সুযোগ সুবিধা ব্যবহার করে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচীতে অংশ না নেয়া। বিগত নির্বাচনের ইশতেহারে অবস্তাবায়নকৃত ওয়াদাগুলোর অপারগতার কারণ ব্যাখ্যা দিয়ে বাস্তবায়ন করতে না পারার জন্য জনগনের কাছে ক্ষমা চাওয়া। রাজনৈতিক সরকার গুলো প্রায়ই দেখা যায় নির্বাচনের দুই-এক বছর আগে সাধারনতঃ কোন ধরনের বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস, ফোন বিল ও বিভিন্ন কর বৃদ্ধি না করে নির্বাচন হয়ে গেলে ও গুলোর খড়গো বৃদ্ধি করে থাকে, তা ইশতেহারে স্পষ্ট উল্লেখ করা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ