ঢাকা,বৃহস্পতিবার 1 November 2018, ১৭ কার্তিক ১৪২৫, ২১ সফর ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ইভিএম প্রসঙ্গে

বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের বিরোধিতা উপেক্ষা করে আগামী জাতীয় নির্বাচনে ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিন- ইভিএম ব্যবহারের অনুমতি দেয়ার উদ্দেশ্যে সরকার গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ বা আরপিও সংশোধন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সংবিধানে আরপিও সংশোধনের জন্য জাতীয় সংসদের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেয়ার স্পষ্ট নির্দেশনা থাকলেও গত ২৯ অক্টোবর অনুষ্ঠিত মন্ত্রি পরিষদের সাপ্তাহিক সভায় সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করেছেন ক্ষমতাসীনরা। সম্ভাব্য বিরোধিতার পরিপ্রেক্ষিতে জানানো হয়েছে, এ বিষয়ে রাষ্ট্রপতি একটি অধ্যাদেশ জারি করবেন এবং পরবর্তীকালে সংসদের মাধ্যমে সে অধ্যাদেশকে আইনে পরিণত করা হবে।
সরকারের এ সিদ্ধান্তের ফলে বেশ কিছুদিন ধরে ইভিএম আমদানির জন্য নির্বাচন কমিশন যে তৎপরতা চালাচ্ছে তা সফল হবে এবং আগামী জাতীয় নির্বাচনে ভোটারদের ইভিএম দিয়েই ভোট দিতে হবে। উল্লেখ্য, সামর্থ্য ও প্রশিক্ষণসহ মৌলিক ও প্রয়োজনীয় বিষয়গুলোতে প্রস্তুতি সম্পন্ন না করেই কমিশন তিন হাজার ৮২৯ কোটি টাকায় ব্যয়ে প্রায় দেড় লাখ ইভিএম কেনার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। কমিশনের পরিকল্পনায় রয়েছে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তথা একশটি আসনে ইভিএম ব্যবহার করা। এই পরিকল্পনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্তটি তাই বলে সর্বসম্মতভাবে নেয়া সম্ভব হয়নি। গত ২৯ আগস্ট কমিশনের এ সংক্রান্ত সভায় আপত্তি ও ভিন্নমত জানিয়ে এবং সভা বর্জন করে বেরিয়ে এসেছেন অন্যতম নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার। কিন্তু তা সত্ত্বেও কমিশন এ উদ্দেশ্যে আরপিও সংশোধনের প্রস্তাব পাঠিয়েছে সর্বোচ্চ পর্যায়ে। তার ভিত্তিতেই মন্ত্রি পরিষদও আরপিও সংশোধন করেছে।
এদিকে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সরকারের এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। উল্লেখযোগ্য দলগুলোর মধ্যে প্রথমে প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির সহকারী সক্রেটারি জেনারেল মওলানা রফিকুল ইসলাম খান এক বিবৃতিতে বলেছেন. সকল মহলের মতামত উপেক্ষা করে আগামী সংসদ নির্বাচনে আংশিকভাবে ইভিএম ব্যবহারের পেছনে যে সরকারের অসৎ উদ্দেশ্য রয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোটকে বিজয়ী করার জন্য সরকার এবং তার আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশন গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে বলেই একতরফাভাবে ইভিএম ব্যবহারের জন্য কমিশন মরিয়া হয়ে উঠেছে। মানুষকে ধোঁকা দিয়ে ছলে-বলে-কৌশলে নির্বাচনে জয়লাভ করাই তাদের উদ্দেশ্য। ইভিএম ব্যবহারের এই অপচেষ্টাকে দুরভিসন্ধিমূলক বলে আখ্যায়িত করে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল তার বিবৃতিতে আরপিও সংশোধনের জন্য মন্ত্রি পরিষদের সভায় গৃহীত সিদ্ধান্ত বাতিল করার দাবি জানিয়ে বলেছেন, জোর করে ইভিএম ব্যবহারের অযৌক্তিক ও অন্যায় সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়া হলে দেশের জনগণ তা প্রত্যাখ্যান করতে বাধ্য হবে।
আমরা প্রতিবাদসহ জামায়াতে ইসলামীর এই প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করি। কারণ, নির্বাচন কমিশন এবং সরকার এমন এক মেশিনের জন্য উঠে-পড়ে লেগেছে, যে ইভিএম বিশ্বের ৯০ শতাংশেরও বেশি দেশে এরই মধ্যে বাতিল ঘোষিত হয়েছে। ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং জার্মানিসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত যে দেশগুলোকে গণতন্ত্রের জন্য বিশ্বের অনুকরণীয় হিসেবে চিহ্নিত করা হয় সেসব দেশের কোনো একটিও তাদের জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করে না। দেশগুলো ইভিএম নিয়ে বিভিন্ন সময়ে পরীক্ষা করে দেখেছে। কিন্তু কোনো দেশেরই অভিজ্ঞতা ভালো হয়নি। প্রতিটি দেশকেই কমবেশি বরং হ্যাকিং-এর শিকার হতে হয়েছে। হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির সাইবার আইন বিভাগ সুইজারল্যান্ডের ই-ভোটিং নিয়ে গবেষণা চালিয়ে এই উপসংহারে পৌঁছেছে যে, ইভিএম ব্যবহারে বিশেষ করে হ্যাকিং-এর প্রচন্ড ঝুঁকি রয়েছে। ইভিএম-এর সফ্টওয়ারগুলো ভোটের আগে, ভোট গ্রহাণের সময় এবং ভোটের পরে হ্যাকিং-এর কবলে পড়তে পারে। পড়ে থাকেও। প্রাসঙ্গিক উদাহরণ দেয়ার জন্য বিশ্বজুড়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিগত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের কথা উল্লেখ করা হচ্ছে- যে নির্বাচনে রাশিয়া হ্যাকিং করেছিল বলেই ডোনাল্ড ট্রাম্প বিজয়ী হতে পেরেছিলেন বলে প্রচারণা রয়েছে। এই প্রচারণার পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণও রয়েছে।
মূলত সে কারণেই অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ইভিএম পরিত্যাগ করেছে ইইউভুক্ত আটটি দেশ। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি রাজ্যে ইভিএম ব্যবহার করা হলেও পাশাপাশি কাগজের ব্যালট পেপার রাখাকেও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অর্থাৎ ভোটাররা চাইলে ইভিএম-এর পরিবর্তে ব্যালট পেপারে ভোট দিতে পারবে। প্রতিবেশি রাষ্ট্র ভারতেও ইভিএম-এর ব্যবহার নিয়ে তুমুল বিতর্ক চলছে এবং অধিকাংশ রাজনৈতিক দলই এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। সে কারণে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ইভিএম-এর পাশাপাশি কাগজের রেকর্ড রাখার সুপারিশ করেছে, যাতে প্রশ্ন উঠলে বা প্রয়োজন দেখা দিলে কাগজেপত্রে প্রমাণ করা সম্ভব হয়। ভারতের নির্বাচন কমিশন সুপ্রিম কোর্টের রায়টিকে মেনে নিয়েছে, যার ফলে ভারতে এখনো ইভিএম-এর ব্যবহার শুরু হয়নি। আদৌ কখনো শুরু হবে বলেও মনে করছেন না তথ্যাভিজ্ঞরা। অন্যদিকে সারা বিশ্বে যখন ইভিএম বাতিল ও পরিত্যক্ত হচ্ছে বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন তখন ব্যতিক্রম ঘটানোর উদ্যোগ নিয়েছে। শুধু তা-ই নয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশেও যেখানে ইভিএম-এর পাশাপাশি ব্যালট পেপার রাখাকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং ভারতে যেখানে ব্যালট পেপার রাখার মাধ্যমে প্রমাণ করার ব্যবস্থা রাখার জন্য সুপ্রিম কোর্ট সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে, বাংলাদেশে সেখানে ব্যালট পেপার বা কাগজে প্রমাণ রাখার কোনো ব্যবস্থাই নেয়া হয়নি। নির্বাচন কমিশন যে ব্যবস্থা নিতে চলেছে সে ব্যবস্থায় ভোট কেন্দ্রগুলোতে কেবল ইভিএমই থাকবে। আপত্তির কারণ হলো, একদিকে বাংলাদেশের নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটাররা কাগজের ব্যালট পেপারে টিপ সই দিয়ে ভোট দিতে অভ্যস্ত, অন্যদিকে ইভিএম ব্যবহারের ন্যূনতম প্রশিক্ষণও কাউকে দেয়া হয়নি। নির্বাচন কমিশনের লোকজনও ইভিএম-এর বিষয়ে কিছু জানে না বললেই চলে।
এমন অবস্থায় হঠাৎ করে ইভিএম ব্যবহার করা হলে হ্যাকিং-এর পাশাপাশি ডিজিটাল জালিয়াতিও ঘটবে যথেচ্ছভাবে। এজন্যই জামায়াতে ইসলামী বলেছে এবং আমরাও মনে করি, ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও তার জোটকে জিতিয়ে আনার দুরভিসন্ধি। আমরা তাই আরপিও সংশোধন এবং ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত বাতিল করার দাবি জানাই। ইভিএম-এর ব্যবহার যদি করতেই হয় তাহলে যথেষ্ট প্রস্তুতি ও সময় নিয়ে ভবিষ্যতে এ সম্পর্কে চিন্তা করা ও সিদ্ধান্ত নেয়া যেতে পারে। কিন্তু মাত্র তিন মাসেরও কম সময়ের মধ্যে অনুষ্ঠেয় একাদশ সংসদ নির্বাচনে ইভিএম-এর ব্যবহার করা চলবে না।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ