ঢাকা,বৃহস্পতিবার 1 November 2018, ১৭ কার্তিক ১৪২৫, ২১ সফর ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

জামায়াতকে নির্বাচনে অংশ নিতে না দেওয়ার প্রস্তাব ল্যান্ড লর্ডদের

খান মুহাম্মদ ইয়াকুব আলী : ছোটবেলা থেকেই কাজেকর্মে ফাঁকি দেওয়ার একটা প্রবণতা আমার ছিলো। এ কারণে বেশি দিন কোন প্রতিক্ষণে গোলামী করা সম্ভব হয়নি। পেটে ক্ষুদা অথচ জমিদার, এমন একটি ভাবসাব নিয়ে বর্তমানে দিন কাটে। বেকার আর অকর্ম হলে যা হয়। পরিবারে অনাদর আর অযত্নের দরুন, খাই না খাই দিন কাটে ল্যান্ড লর্ডদের স্টাইলে। এক জমিদার অন্য জমিদারকে সহ্য করতে পারে না এটা একটা চিরাচরিত কথা তাই জমিদারদের নিয়ে আজকের এ লেখা। বর্তমানে আমার সময় কাটানোর একমাত্র স্থান চায়ের দোকান। বেকারদের যা হয় আর কি। সেখানে বেশকিছু লোক কথা বলছিলেন। তারা কেউ জামায়াতের লোক নন, অথচ এমন ভাবে কথা বলছেন মনে হয় জামায়াতের কোন নির্ভেজাল কর্মী। চুপ তেকে কথা শুনলাম এবং ভাবলাম এমন একটি ওষুদের নাম জামায়াত, যার কথা শুনলে কারো গায়ে জ্বালা ধরে আবার কারো জ্বালা প্রশমিত হয়। একজন বলছে জামায়াত দলের নামে নির্বাচন করবে না স্বতন্ত্রভাবে বিভিন্ন ব্যক্তি নির্বাচন করবে এতে কারো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। যদি সে ব্যক্তিকে কেউ ভোট দেয় তবে নির্বাচনে জয়ী হবে অন্যথায় হবে না। এখানে নির্বাচন করতে না দেওয়ার প্রস্তাব করা কেমন কথা? তখন রাগ করে একজন বলে ফেললো মনে হয় দেশটা ওদের। সাধারণ জনগণের মনের ভাব দেখে একটু লিখতে মনে চাইলো। যদিও জামায়াতপন্থী কবি সাহিত্যিক বা বুদ্ধিজীবিরা আমার মতো নাম না জানা লেখককে চিনেনই না। তথাপি ন্যায় অন্যায় বা সত্য মিথ্যা বুঝার কিঞ্চিত ক্ষমতা থাকার কারণে, কিছু কথায় কেমন যেন আহত হই। জামায়াতের লোকেরা এসব কথা নিয়ে মোটেও মাথা ঘামায় না। আবার এগুলোকে তুচ্ছ আর মূল্যহীনও মনে করে। অন্যদিকে তাদের মরহুম নেতা আল্লামা মওদূদী (র.) এর কথা অনুসরণ করে বলেই মনে হয়। যিনি বলেছিলেন আমি যদি ওসব কথার উত্তরদেই তবে মূল কাজ আর করা হবে না। আমরা যারা সাধারণ নাগরিক তারা অতসব বুঝি না আমরা যা বুঝি তা টকশোতে বিএনপির এক নেত্রী পাপিয়া বলেছেন “কেউ যদি প্রশ্ন করে। তবে প্রশ্নটা যেমন তার উত্তর ঠিক তেমন না হলে জনগণ দুর্বল ভাবে।” তিনি যথার্থই বলেছেন। এক পক্ষ বলে যাবে আর অন্যপক্ষ নিরবে ধৈর্য্যরে পরিচয় দিবে সব সময় এমনটি মানায়ও না। যারা জামায়াতকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখার প্রস্তাব দিয়েছেন এ প্রস্তাব নির্বাচন কমিশন আমলে নিয়েছে কি নেয় নাই সেটাও বড় বিষয় নয়। কারা নির্বাচন কমিশনে প্রস্তাব পেশ করতে পারে সেটাও বড় নয়। এখানে নির্বাচন কমিশনার ব্যাখ্যায় বলেও দিয়েছেন, ভোটার হলেই সে নির্বাচন কমিশনে প্রস্তাব, পরামর্শ বা দাবি পেশ করতে পারে। আমার জানতে ইচ্ছে করে প্রস্তাবকারীদের ভাষায় যে জামায়াত শেষ। সে জামায়াত নির্বাচনে অংশ নিলো কি নিলো না তা নিয়ে কেন এত ঘুম হারাম হবে? আওয়ামী লীগের প্রয়াত বর্ষীয়ান নেতা বাবু সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত বলেছিলেন “কই জামায়াত বলে কি করবেন? অথচ তাদের নিজামীরে ফাঁসি দিলো একটা মাছিও তো নড়লো না।” বাবুর কথার সাথে আমিও একমত। জামায়াতের ৫ জন শীর্ষ নেতার ফাঁসি ৩ জন সিংহ পুরুষ জেলে অথচ একটা মাছিও তারা নড়াতে পারে নি। সে জামায়াত নিয়ে এত ভাবনার কি আছে। এত কষ্ট করে সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ কেন নির্বাচন কমিশন অফিসে গিয়ে এ প্রস্তাব করবেন? একটা চিঠি পিয়ন দিয়ে পাঠিয়ে দিলেই ভালো হতো না কি? দুটি ঘটনা ছাড়া এটা বুঝাতে পারবো না। গৃহস্তের অভাবী সন্তান হওয়ায়, ক্ষেতে ধান কাটছিলাম। ধান কাটার পর নাড়া কাটার পাল্লা দেওয়া হল। আমি যখন সবার আগে চলে যাচ্ছিলাম তখন এক প্রতিযোগী মোজাফফর বললো, “আমার আঙ্গুল কেটে গেছে আর ইয়াকুব ভাই নাড়া কেটেই চলছে, আমি থেমে আছি তাকেও থামতে হবে।” যখন বিচারক বলেছিলেন, “বেটা তোর পা কাটুক আর কান কাটুক তাতে আরেক জনের কি? তুই না পারায় এখন কত তামাশা করবি।” অন্য ঘটনা হলো, ছাত্রজীবনে কোন উপস্থিত বক্তৃতা হলে কেন যেন প্রথম পুরস্কারটি পেয়ে যেতাম। একদিন একটি সংগঠনের উপস্থিত বক্তৃতায় নাম লেখাতে বলা হল। সেখানেও এর পূর্বে আরো বক্তৃতায় প্রথম পুরস্কারই পেয়েছিলাম। এবার প্রতিযোগিতার পূর্বেই কয়েকজন বললো “ভাই আপনি বক্তৃতা দিলে আমরা প্রথম হতে পারবো না। ওদের কথায় আমি প্রতিযোগির তালিকায় নাম লিখালাম না। অনেকেই পরে জিজ্ঞেস করেছিলেন আপনার কি হলো? কেন অংশগ্রহণ করলেন না।” তখন উত্তর দিতে পারিনি। আজ প্রসঙ্গক্রমে এটা উল্লেখ করলাম মাত্র, এটা আমার কোন গুণ প্রকাশের জন্য নয়। যারা বলছেন জামায়াত কে নির্বাচনে অংশ নিতে দেয়া যেন না হয় তাদের সমস্যা ওই একটাই। জামায়াত নিজেকে যতটা চিনতে না পেরেছে তার চেয়ে বেশি চিনেছেন ওই ভদ্রলোকেরা। এজন্যই জামায়াত নেতা হামিদুর রহমান আযাদ বলেছিলেন “আমাদের একাউন্টেন আবুল বারাকাত সেই ভালো জানে আমাদের কোথায় কি সম্পদ আছে।” ঠিক বর্তমানে যারা জামায়াতকে এবং যুদ্ধাপরাধীদের সন্তানদের নির্বাচন থেকে দূরে রাখার প্রস্তাব করে, তারা দেখেছে জামায়াত নেতা মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছোকরা পোলা মাসুদ সাঈদী উপজেলা চেয়ারম্যান হয়েছেন। তিনি ভোট পেয়েছেন ২১ হাজার আর আওয়ামী লীগ প্রার্থী পেয়েছেন মাত্র ৭ হাজার। ল্যান্ড লর্ডরা এ দুঃখ রাখে কোথায়? যে পিরোজপুরে হিন্দু ভোটার ছাড়া পাশ করা অসম্ভব, সেখানে যদি এই হয়। তাদের মাথা কি এমনিতেই এলোমেলো হয়েছে? কতটা জনপ্রিয় আর ভালো মানুষ হলে হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় সাঈদী পুত্র অসাধারণ ফলাফল করে। এসব প্রস্তাবকারীদের চরিত্র যে ফুলের মতো পবিত্র তাতে সন্দেহ করে, আবার মঈনুল হোসেন এর কাছে যেতে চাই না। এদের যোগ্যতাও কম কিসের? মুক্তাঙ্গনে একদিন দেখি বজ্রকণ্ঠে বক্তৃতায় মাইকটা মনে হয় ছিটকে পড়বে। কৌতুহলী হয়ে সেখানে গেলাম। গিয়ে মাইক দেখি জনগণ? এমন কি বক্তাও খুঁজে পাই না। এরপর দেখলাম বক্তা একাই একটা ছোট কামরার ভেতর থেকে বক্তৃতা দিচ্ছেন। দূর থেকে মনে হলো লাখো মানুষের ভিড়ে কোনো মাঠ কাপানো নেতা বক্তৃতা দিচ্ছেন। এসব নেতারা জামায়াতকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখার প্রস্তাব করে। জামায়াত নির্বাচন করলে ওসব দলের বক্তা তো ঘরের পেয়েছি, তাদের ভোটার খুঁজতে যাবো কোথায়? মানুষের বিভিন্ন রকমের রুচি থাকে। সব রুচির কথা বলাও যায় না। আবার কিছু রোগ আছে তা বুঝানো কঠিন। একদিন এক বন্ধুর বাসায় গিয়ে দেখি তার ছেলেটা বাবার সমস্ত শরীর পারাচ্ছে। জিজ্ঞেস করলাম একি? সে বললো শরীরটা চাবায় কামড়ায়, হাত দিয়ে ম্যাসেজ করলে হয় না। তাই শরীরের উপর উঠে পারাচ্ছে। এতদিন ভেবেছিলাম প্রস্তাবকারীদের মুখের সমস্যা, অন্যদের মাস্টারী না করলে শরীর বা মুখ চাবায় কামরায়। এখন দেখছি চোখেও সমস্যা। সিলেটে জাতীয় ঐক্য ফ্রন্টের জনসভায় অসংখ্য লোকের সমাগম। তারা নাকি দেখেছে ৩/৪শ লোক। এটারও একটা কারণ আছে। বদর যুদ্ধে মুসলিম সৈন্যের সংখ্যা ছিল ৩১৩ জন, আর কাফেররা দেখেছে হাজার হাজার। ফেরেশতারা সংখ্যা বৃদ্ধি করে কাফেরদের মনে ভীতি সৃষ্টি করেছে, এটা মহান আল্লাহর কথা। এখন হয়তো বা সে ফেরেশতারাই এসব প্রস্তাবকারী দেশপ্রেমিক পুত-পবিত্র চরিত্রের লোকগুলোকে দেখাচ্ছে, দেখ ওরা মাত্র কজন লোক। এমনটি হওয়া অসম্ভব নয়। জাকের পার্টি এক সময় ৩০০’ আসনে নির্বাচন করেছিল। আমাদের ছেলে ফুটবলায় কায়সার হামিদও তখন একজন সম্মানিত সংসদ সদস্য প্রার্থী ছিলেন। তখন তাদের এক কর্মী বলেছিল, ‘দেখবেন ব্যালট বাক্স জ্বিনে ভর্তি করে দিবে।’ জ্বিনেরা মনে হয় অন্য কাজে ব্যস্ত ছিল সে জন্য ৩০০ আসনের একটিতেও জামানত থাকেনি। জামায়াতের না আছে এতসব বাঘা বুদ্ধিজীবী আর না আছে জ্বিনের উপর নিয়ন্ত্রণ। কাজেই এমন একটি গণতন্ত্রিক ও আদর্শের লালনকারী দল নির্বাচনে গিয়ে কেন সম্মান হারাবে? প্রস্তাবকারীরা সে বিষয়টি বিবেচনায় রেখেও এমন প্রস্তাব করতে যাবে বলে মনে হয়। বলা তো যায় না, উপর দিয়ে জামায়াত পছন্দ না করলেও সে ভেতরে ভেতরে জামায়াত ভক্ত হয়ে গেছে। ক্ষমতা ব্যবসা-বাণিজ্য বা অন্যসব কারণে কিছু লোক ক্ষমতাশালীদের সাথে থাকে। আবার একদিন দেখলাম গ্রামের এক লোক এক জামায়াত নেতাকে বলছে, ‘আমরাও কিন্তু জামায়াতের লোক, আমাদের কথা মনে রাখবেন। অন্যজন বলছে, ‘কি বলেন, আমার বাবা এবং দাদা ছিলেন মুসলিম লীগ। সে বুঝাতে চেয়েছে তাকেও যেন জামায়াত মনে করা হয়। দেখা গিয়েছে, সাতক্ষীরার মরহুম নেতা সাবেক ৩ বারের সংসদ সদস্য কাজী শামসুর রহমানের নিকট পানি পড়া আনতে যেতেন, সেসব লোকেরা জামায়াতকে বকা না দিলে যাদের দানা হজম হয় না। তাই বলি যতই জামায়াত এলার্জি থাক, পেটের ব্যথা শুরু হলে ঠিকই পানি পড়া আনতে জামায়াতের নিকট যাবে। বদরুল হায়দার চৌধুরী যখন রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হয়েছিলেন। তখন এসব চরিত্রবান লোকেরা জামায়াতের মগবাজার কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গিয়ে কত জোড়া জুতা ছিড়ে ফেলেছেন তার হিসেব কে রাখে?
অতএব, প্রস্তাব করেছেন তাতে জামায়াত তো কোন প্রতিক্রিয়া দেখাইনি। বরং এটা তারা কোন গুরুত্বই দেয়নি। আমার কেন পাগড়ি আটকালো এত কথা বলতে হবে? আমার মনে হয়, জামায়াত নেতারা আমার এ লেখা পড়বে কিনা সন্দেহ। আর পড়লেও হয়তো বলবে, ‘বেটা তোকে কি আমরা বলেছি এ বিষয় লিখতে? যদি ভুল করে থাকি গোস্তাগি মাফ করবেন। তবে প্রস্তাবকারী ব্যক্তিগণের প্রতি সবিনয় একটি আবেদন করতে চাই। চরিত্রের কথা বলে বেয়াদবি করতে চাই না।
কারণ চরিত্র নিয়ে যে টানাটানি চলছে তাতেই মানুষ দিশেহারা। আমার মতে, আপনারা দেশপ্রেমিক তো বটেই, আবার পুত-পবিত্র চরিত্রেরও অধিকারী। কেবল এতটুকু আশা করি, দিনের চরিত্র আর রাতের চরিত্র যেন একই থাকে। আমরা যে বড়ই অসহায় আজ মানুষের চরিত্রে এমন ঘুন ধরেছে যে, কারা নাকি দেখেছে মাওলানা সাঈদী যখন লুটপাট করেছেন তখন তার বগলের নিচে ছিল টিন আর মাথায় ছিল হাড়িপাতিলের ঝাঁকা। প্রশ্ন জাগে, বগলে করে কি কেউ টিন নিতে পারে? আর যদি বগলে টিন নেয় আবার মাথায় ঝাঁকা নিলেন কিভাবে॥ তার হাত কয়টা ছিল। এসব যারা দেখেছেন তাদের কে, কি চরিত্রহীন বলা ঠিক হবে, আজ্ঞে না। তারা হয়তো চোখে কম দেখেছেন অথবা মাওলানা সাঈদী যত বড় আলেম হতেও তো পারে জ্বিনেরা এক হাত দিয়ে তার ঝাঁকা ধরে রেখেছিল। মানুষের চোখে দেখা নিয়ে এত কথা বলা মোটেও উচিত নয়। ভক্তবৃন্দরা একটু বেশিই ভালো দেখে, আবার অভক্তরা ভিন্নভাবে দেখে। জামায়াতের লোকেরা না দেখলেও অন্যরা সাঈদী হুজুরকে চাঁদে দেখেছে। এখানে জামায়াতের কি করার আছে। কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। মরহুম নেতা শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীকে প্রশ্ন করা হয়েছিল ‘আপনারা মন্ত্রিসভায় আছেন, তবে কেন এই করেন না, ওই করেন না।’ তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, ৬০ জনের মন্ত্রিসভায় আছেন তবে কেন এই করেন না ওই করেন না। তিনি উত্তর দিয়েছিলেন ‘৬০ জনের মন্ত্রিসভায় আমরা মাত্র ২ জন, এখানে প্রস্তাব দিলেই কি সব প্রস্তাব পাস হবে? প্রস্তাব নাকোচ হয়ে যাওয়ার চেয়ে না দেয়া ভালো নয় কি? অতএব বলতে, চাই, যিনি যেভাবে বুঝেন সেটাই তার জন্য মানায়। কেউ আছে, সারাদিন রাস্তায় চেঁচামেচি করতে থাকে। এতে কোন কাজ না হলে কি হবে? শাসকগোষ্ঠীর আস্থাভাজন তো হওয়া গেল। কাজ হয়ে যাওয়ার পর শাসকগোষ্ঠী চাটুকারদের সাথে কি আচরণ করে তা অন্যরা না বুঝলেও হৃদয় দিয়ে বুঝতে পেরেছেন ডা. ইমরান এইচ সরকার সাহেব। তাই বলি, স্যার একটু হুঁশজ্ঞান করেই কথা বলা ভালো নয় কি?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ