ঢাকা, শুক্রবার 2 November 2018, ১৮ কার্তিক ১৪২৫, ২২ সফর ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ডিগবাজির রাজনীতি পোড়া মবিল ও সংলাপ

মোঃ এমদাদ উল্যাহ : শমসের মবিন চৌধুরী। একজন কূটনীতিক এবং সেনা অফিসার ছিলেন। ২০১৫ সালের ২৮ অক্টোবর বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার উদ্দেশে খোলা চিঠি লিখে ভাইস চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ ও রাজনীতি থেকে অবসর নেন। চিঠিতে তিনি শারীরিক অসুস্থতার কারণ উল্লেখ করেন। বিএনপির রাজনীতিতে শমসের মবিন চৌধুরীর উত্থানটাও ছিল বেশ নাটকীয়। বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়ে শমসের মবিন চৌধুরীকে পররাষ্ট্র সচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ২০০৫ সালে তাকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত করে পাঠানো হয় যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে দুই বছর দায়িত্ব পালন শেষে ২০০৭ সালে তিনি অবসরে যান। ২০০৮ সালে তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। ২০০৯ সালে দলের ভাইস চেয়ারম্যান হন। পদত্যাগের আগ পর্যন্ত তিনি বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। বিএনপির দুঃসময়ে তাঁর আচমকা  ঘোষণায় নেতাকর্মীরা বেশ অবাক হয়েছিল। তিন বছর পর ‘ডিগবাজি’ দিয়ে গত ২৬ অক্টোবর শুক্রবার বিকল্প যুবধারার বিশেষ কাউন্সিল অনুষ্ঠানে বদরুদ্দোজা চৌধুরীর হাতে ফুল দিয়ে বিকল্পধারায় যোগদান করেন। বিএনপি ছেড়ে ছিলেন আর কেন বিকল্পধারায় যোগ দিলেন এমন প্রশ্নে সাংবাদিকদের শমসের মবিন চৌধুরী জানান, সাবেক প্রেসিডেন্ট বদরুদ্দোজা চৌধুরীর সঙ্গে তার ব্যক্তিগত পরিচয় ছিল এবং তার সঙ্গে গত কিছুদিন ধরে কথাবার্তা চলছিল। উনি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব। উনার অনেক কিছুর সঙ্গে, নীতির সঙ্গে, আদর্শেও সঙ্গে, কথাবার্তার সঙ্গে আমার মিলে যায়। তো মতের মিল থাকাতে, মনে হলো একটা চেষ্টা করে দেখি। সেই কথা ভেবেই আমি আনুষ্ঠানিকভাবে বিকল্পধারা বাংলাদেশে যোগ দিয়েছি। অনুষ্ঠানে বিকল্পধারায় যোগ দেওয়া অন্য নেতাদের মধ্যে আছেন এরশাদ সরকারের প্রতিমন্ত্রী গোলাম সারোয়ার মিলন ও  সাবেক প্রতিমন্ত্রী নাজিম উদ্দিন আল আজাদ। যোগদান অনুষ্ঠানে শমসের মবিন বলেন, মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর আদর্শের রাজনীতি যারা করেন তাদের সাথে রাজনীতি করা যায়। তিনি বি. চৌধুরীর দৃঢ় নেতৃত্বের প্রশংসা করেন। বিকল্পধারায় যোগদানের একদিন পরেই ২৮ অক্টোবর রোববার শমসের মবিন চৌধুরীকে বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা মনোনীত করা হয়। হঠাৎ করে শমসের মবিন চৌধুরীর আবার রাজনীতিতে ফেরার ঘোষণা দেওয়ার পর কারণ খুঁজে বেড়াচ্ছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। 

গত ২৮ অক্টোবর রোববার সকাল ৬টা থেকে পরদিন সোমবার রাত পর্যন্ত সারাদেশে দুইদিনের ধর্মঘট পালন করেছে পরিবহন শ্রমিকরা। জাতীয় সংসদে পাস হওয়া ‘সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮’-এর কয়েকটি ধারা সংশোধনসহ ৮ দফা দাবি দিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন। এই ধর্মঘটে দেশের সকল মহাসড়কে দূর-পাল্লার কোন গাড়ি চলাচল করেনি। ফলে যাত্রীদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। পরিবহন না থাকায় গন্তব্যে যেতে বেগ পেতে হয় নারী-শিশুসহ অসুস্থদের রোগীদের। অনেককে দেখা গেছে, পায়ে হেঁটে গন্তব্যে যেতে। ধর্মঘট চলাকালে ঢাকার কেরানীগঞ্জে চালকদের মুখে ‘পোড়া মবিল’ লাগিয়ে দিয়েছে শ্রমিকরা। পুলিশ তখন নীরব দর্শকের ভূমিক পালন করেছে বলেও ভুক্তভোগীরা গণমাধ্যমে অভিযোগ করেছেন। বিশেষ করে কলেজ ছাত্রীর ড্রেসে পোড়া মবিল লাগানোর ছবিটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছে। দুইদিনের ধর্মঘটে এ্যাম্বুলেন্সে থাকা দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি সংসদ সদস্য ওয়াজিউদ্দিন খান ও সাধারণ সম্পাদক উছমান আলী স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গত ১৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে ‘সড়ক পরিবহন আইন -২০১৮’ পাস হয়েছে। এ আইনে শ্রমিক স্বার্থ রক্ষা ও পরিপন্থী উভয় ধারা রয়েছে। এছাড়া সড়ক দুর্ঘটনাকে দুর্ঘটনা হিসেবে গণ্য না করে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে আইন পাস করা হয়েছে। আইনে সড়ক দুর্ঘটনা মামলায় অপরাধী হয়ে ফাঁসির ঝুঁকি রয়েছে। এমনই অনিশ্চিত ও আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পেশায় দায়িত্ব পালন করা শ্রমিকদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। এর কারণে আন্দোলন ছাড়া বিকল্প কোনো পথ সামনে খোলা নেই। আন্দোলনে পরিবহন শ্রমিকদের আট দফা দাবির মধ্যে ছিল : সড়ক দুর্ঘটনায় মামলা জামিনযোগ্য করতে হবে। শ্রমিকদের অর্থদন্ড ৫ লাখ টাকা করা যাবে না। ওয়েটস্কেলে (ওজন স্কেল) জরিমানা কমানোসহ শাস্তি বাতিল করতে হবে। সড়কে পুলিশের হয়রানি বন্ধ করতে হবে। গাড়ির রেজিস্ট্রেশনের সময় শ্রমিকদের নিয়োগপত্র সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সত্যায়িত স্বাক্ষর থাকার ব্যবস্থা করতে হবে। সব জেলায় শ্রমিকদের ব্যাপক হারে প্রশিক্ষণ দিয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স ইস্যু করতে হবে এবং লাইসেন্স ইস্যুর ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধ করতে হবে। বেঁধে দেয়া সময়ের মধ্যে দাবি মানা না হলে লাগাতার ধর্মঘটেরও ঘোষণা দেয় সংগঠনটি।

গত ৩০ অক্টোবর মঙ্গলবার দশম জাতীয় সংসদের শেষ অধিবেশন সম্পন্ন হয়েছে। এর মাধ্যমে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ক্ষণগণনা শুরু হয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী ২৯ অক্টোবর থেকে ২৯ জানুয়ারির মধ্যে হতে হবে জাতীয় নির্বাচনের ভোট। রাজনৈতিক দলগুলোও নির্বাচনী প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশনও। চলতি সপ্তাহে তফসিল ঘোষণা করতে পারে নির্বাচন কমিশন।

এর আগে গত ১৩ অক্টোবর শনিবার একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় সংবিধান বিশেষজ্ঞ গণফোরামের সভাপতি ড. কামালের নেতৃত্বে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট আত্মপ্রকাশ করে। এরপর ১৮ অক্টোবর বৃহস্পতিবার জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সাথে মতবিনিময় সভা করে। সেখানে ঐক্যফ্রন্টের ৭ দফা ও ১১ লক্ষ্যের বিষয়ে কটনীতিকদের অবহিত করেন ড. কামাল। এ সময় যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, ইইউভুক্ত দেশগুলোসহ ২০ থেকে ২৫টি দেশের কূটনীতিক ও তাঁদের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ঐক্যফ্রন্টের অন্যান্য নেতৃবৃন্দ হলেন; বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ, নজরুল ইসলাম খান, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, আবদুল মঈন খান, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহম্মদ, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা মইনুল হোসেন, জেএসডির সভাপতি আ স ম আব্দুর রব, তাঁর স্ত্রী তানিয়া রব, জেএসডির সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক রতন, গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু, কার্যকরী সভাপতি সুব্রত চৌধুরী, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা জাফরুল্লাহ চৌধুরী, ঐক্য প্রক্রিয়ার নেতা সুলতান মোহাম্মদ মনসুর প্রমুখ। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ৭ দফা দাবি হলো; ১. অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে সরকারের পদত্যাগ, জাতীয় সংসদ বাতিল, আলোচনা করে নিরপেক্ষ সরকার গঠন এবং খালেদা জিয়াসহ সকল রাজবন্দির মুক্তি ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার। ২. গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে নির্বাচন কমিশনের পুনর্গঠন ও নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করার নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে। ৩. বাক, ব্যক্তি, সংবাদপত্র, টেলিভিশন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও সকল রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশের স্বাধীনতা এবং নির্বাচনের লেভেলপ্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে হবে। ৪. কোটা সংস্কার আন্দোলন ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, সাংবাদিকদের আন্দোলন এবং সামাজিক গণমাধ্যমে স্বাধীন মত প্রকাশের অভিযোগে দায়েরকৃত মামলা প্রত্যাহার ও গ্রেপ্তারকৃতদের মুক্তির নিশ্চয়তা দিতে হবে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনসহ সকল কালো আইন বাতিল করতে হবে। ৫. নির্বাচনের ১০ দিন পূর্ব থেকে নির্বাচনের পর সরকার গঠন পর্যন্ত বিচারিক ক্ষমতাসহ সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হবে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়োজিত ও নিয়ন্ত্রণের পূর্ণ ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনের ওপর ন্যস্ত করতে হবে। ৬. নির্বাচনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং সম্পূর্ণ নির্বাচন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণে ভোট কেন্দ্র, পোলিং বুথ, ভোট গণনাস্থল ও কন্ট্রোল রুমে তাদের প্রবেশের ওপর  কোনো ধরনের বিধি-নিষেধ আরোপ না করা এবং নির্বাচনকালীন সময়ে গণমাধ্যমকর্মীদের উপর যে কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ বন্ধ করতে হবে। ৭. তফসিল ঘোষণার তারিখ থেকে নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত চলমান সব রাজনৈতিক মামলা স্থগিত রাখা এবং নতুন কোনো মামলা না দেওয়ার নিশ্চয়তা দিতে হবে। এরই মধ্যে আতঙ্ক ছড়াতে মইনুল হোসেনকে গ্রেফতার ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সমন্বয়ক মনিরুল হক চৌধুরীর কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের মামলায় জামিন না মঞ্জুর করে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। এনিয়ে সুশীল সমাজের মাঝে বিরূপ প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। ৭ দফা দাবির প্রেক্ষিতে জনমত তৈরির উদ্দেশ্যে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ২৪ অক্টোবর বুধবার সিলেটে ও ২৭ অক্টোবর শনিবার চট্টগ্রামে সমাবেশ করেছে। দুইটি সমাবেশে ৭ দফা আদায়ে সরকারকে সংলাপের আহবান জানান। প্রথম দিকে সরকারের মন্ত্রীরা এক দফাও মানা হবে না বলে হুশিয়ারী করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বয়ং ড. কামাল, মাহমুদুর রহমান মান্না ও মইনুল হোসেনের সমালোচনা করেন। কিন্তু ড. কামাল সিদ্ধান্তে অটল থেকেই গত ২৮ অক্টোবর রোববার সন্ধ্যায় আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সংলাপের আহ্বান জানিয়ে সাত দফা দাবি এবং ১১টি লক্ষ্য সংবলিত চিঠি দেয় জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। সংলাপে রাজি হয়ে ৩০ অক্টোবর মঙ্গলবার সকালে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম শীর্ষ নেতা ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনকে আনুষ্ঠানিক চিঠি পৌঁছে দেয় আওয়ামী লীগ। দেশের রাজনীতিবিদ, সুশীল সমাজ, কূটনীতিক মহল এ সংলাপকে সাধুবাদ জানিয়েছেন। তবে সংলাপের ফলাফলের উপর নির্ভর করবে আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কিভাবে হবে, না   দেশ এক গভীর সঙ্কটে পড়বে। 

লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ