ঢাকা, শনিবার 3 November 2018, ১৯ কার্তিক ১৪২৫, ২৩ সফর ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

মাদকের আগ্রাসন রুখতে হবে

মো. তোফাজ্জল বিন আমীন : একটি দেশে সামাজিক, রাজনৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় যখন সর্বত্র বিরাজ করে তখন সেখানে হত্যা, গুম, অপহরণ সড়ক দুর্ঘটনা, ধর্ষণ ও মাদকের আগ্রাসন মানুষের জীবনকে বিষিয়ে তুলে। ওইসব অনাকাক্সিক্ষত ঘটনাগুলো রাষ্ট্রে তখনই বিরাজ করে যখন একটি সমাজ ও রাষ্ট্রে শুধুমাত্র ক্ষমতায় যাওয়া ও ক্ষমতায় টিকে থাকার রাজনীতির লড়াই চলে। বিশ্বব্যাপী ক্ষমতাসীনরা ক্ষমতার মগডালে থাকাকালীন সময়ে অন্যের সমালোচনা সহ্য করার ক্ষমতাটুকু রাখে না। যারাই রাষ্ট্রশক্তির গঠনমূলক সমালোচনা করেছে তাদেরই উপর অবিচারের মাত্রা প্রয়োগ করা হয়েছে। প্রতিবাদের ভাষা যখন সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে উধাও হয়ে যায় তখন বর্ষার বাদলে নাগরিকদের জীবন ও ইজ্জত ডুবে যায়। আমরা সবাই জানি মাদকের নেশা সর্বনাশা। এই সর্বনাশা জীবনবিনাশী মাদক আগামী দিনের কর্ণধার তরুণ প্রজন্ম থেকে শুরু করে সব শ্রেণিপেশার মানুষকে এক ভয়াবহ ধ্বংস ও বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। দেশের আনাচে-কানাচে অবাধে চলছে মাদকের ব্যবহার। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইনজীবী, ব্যবসায়ী, শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, উচ্চবিত্ত পরিবারের মহিলাসহ আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকজনও নেশায় আসক্ত হয়ে পড়েছে। এখন হাত বাড়ালেই গাঁজা, ফেনসিডিল, ইয়াবা, সিসা, বাংলা মদ, হেরোইন সহজে পাওয়া যায়। মাদকের ভয়াবহতা কত নিষ্ঠুর কত বেদনাদায়ক হতে পারে তা নিজ আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে কেউ নেশাগ্রস্ত থাকলে সহজে অনুধাবন করা যায়। সরকারের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা প্রখ্যাত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মোহিত কামালের কাছে এসে বলেন, ইয়াবা না খেলে তিনি স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে পারেন না। অফিসের কাজ এলোমেলো হয়ে যায়। সভা-সেমিনারে বক্তব্য রাখতে পারেন না। এ অবস্থা থেকে কীভাবে মুক্তি পেতে পারেন সে জন্য ডাক্তারের কাছে পরামর্শ চেয়েছেন। ডা. মোহিত কামাল আরও বলেছেন, আমাদের কাছে ইয়াবা আসক্ত শতশত রোগী আসছেন। আমরা জরিপ করে দেখেছি, এমন কোন পেশার লোক নেই যে, সেখানে ইয়াবা আসক্ত নেই। এটা বাংলাদেশের জন্য অশনিসংকেত। সূত্র: ইত্তেফাক, ৩১ জুলাই-২০১৭।
জাতিসঙ্ঘ মাদক ও অপরাধবিষয়ক কার্যালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে বাংলাদেশে কমপক্ষে ৭০ লাখ মানুষ মাদকাসক্ত যাদের বেশিরভাগই তরুণ-তরুণী। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ বার্ষিক প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, ২০১২ সালে মোট মাদকসেবীর মধ্যে ইয়াবায় আসক্ত রোগীর সংখ্যা ছিল প্রায় ছয় শতাংশ। ২০১৬ সালে এ হার বেড়ে প্রায় ৩২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ২০১১ সালে জব্দ হওয়া ইয়াবার সংখ্যা ছিল ১৩ লাখ ৬০ হাজার আর ২০১৬ সালে সেটা দাঁড়ায় দুই কোটি ৯৪ লাখে। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ২০১৭ সালে সেটা দাঁড়ায় তিন কোটি ৮০ লাখ ৯১ হাজার পিসে। ২০১৬ সালের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে বিশ্বব্যাপী প্রায় ৪৫ লাখ লোক হেরোইন, ভাং ও কোকেনের নেশাগ্রস্ততার দরুন প্রায় ৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করছে। ২০১৬ সালের অন্য এক রিপোর্টে দেখা গেছে বিশ্বব্যাপী ১৫ থেকে ৬৪ বছরের লোকদের মধ্যে ড্রাগজনিত কারণে মৃত্যুর হার ০.৫ থেকে ১.৩ শতাংশ। ইঞ্জেকশন নিয়ে যারা নেশা করে এমন ১৪০ লাখ লোকের মধ্যে ১৬ লাখ লোক এইচআইভি, ৭২ লাখ হেপাটাইটিস সি ও ১২ লাখ লোক হেপাটাইটিস বি-তে ভুগছে। কতটা দ্রুত ইয়াবা বা মাদকের ব্যবহার বিশ্বব্যাপী বাড়ছে তা এই পরিসংখ্যান থেকে সহজে অনুধাবন করা যায়।
কি শহর কি গ্রাম সর্বত্র হাত বাড়ালেই পাওয়া যাচ্ছে মাদক। সরকারি-বেসরকারি কোন উদ্যোগই মাদক প্রতিরোধ করতে পারছে না বলেই এখনও পত্রিকার পাতায় মুদ্রিত হচ্ছে থানায় মাদকের হাট শিরোনাম। একটা সময় গাজার কথা শোনা গেলেও এখন ইয়াবার কথা প্রতিনিয়ত শোনা যাচ্ছে। ইয়াবা ব্যবসার সাথে সমাজের অনেক নামি-দামী ব্যক্তির নাম যখন পত্রিকার পাতায় মুদ্রিত হয় তখন সত্যিই মনে দাগ কাটে। চট্টগ্রামে ১৪ হাজার পিস ইয়াবাসহ গ্রেফতার হয়েছে এক নারী ক্রিকেটার। গতকাল ভোরে মহানগরীর বাকলিয়া থানাধীন শাহ আমানত সেতুর গোলচত্বর এলাকা থেকে মাদকসহ ওই নারী ক্রিকেটারকে আটক করে পুলিশ। নাজরীন খান মুক্তা ঢাকা মহিলা প্রিমিয়ার লীগে আনসার দলের হয়ে নিয়মিত ক্রিকেট খেলতেন। (সূত্র মানবজমিন ২৩ এপ্রিল ২০১৮) একটা সময় গোপনে মাদক ব্যবসা চলতো। কিন্তু এখন অনেকটা রাখঢাক ছাড়াই মাদকের ব্যবসা চলছে। আইনপ্রয়োগকারী বাহিনীর নাকের ডগায় বসে মাদক ব্যবসা চললেও বেশির ভাগ সময়ই তাদের নীরবতা দেখা যায়। ফলে বেড়েই চলছে মাদকের কেনাবেচা আর সেবন। মাদকদ্রব্য নেশা প্রতিরোধ নিরোধ সংস্থা (মানস) এর তথ্যমতে দেশে বর্তমানে মাদক সেবনের সঙ্গে ৭০ লাখ মানুষ জড়িত। এর মধ্যে নারী মাদকাসক্তের সংখ্যা ৫ লাখ ছাড়িয়েছে। মাদক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন আগামী ২০২০ সালের ভেতরে দেশে অন্তত কোটি লোক নেশায় আসক্ত হবে। বাংলাদেশের মাদক পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, দেশে এখন ৭০ লাখ মাদকাসক্ত। এছাড়া মাদকাসক্তদের মধ্যে ৮৪ ভাগ পুরুষ ও ১৬ ভাগ নারী। এছাড়া আরেক জরিপে বলা হয়েছে, মাদকাসক্ত শিশুদের ড্রাগ গ্রহণ ও বিক্রয়ের সঙ্গে জড়িত ৪৪ শতাংশ পথশিশু, পিকেটিংয়ে ৩৫ শতাংশ, ছিনতাইয়ে ১২ শতাংশ, মানব পাচারের সহায়তার কাছে ১১ শতাংশ জড়িত। ঢাকা আহছানিয়া মিশনের এক জরিপ থেকে জানা যায়, তাদের কাছে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের মধ্যে ২৫ শতাংশ ফেনসিডিল, গাঁজা ৩৮ শতাংশ, ইয়াবা ৪১ শতাংশ, হেরোইন ৭ শতাংশ ও ইনজেকশনের মাধ্যমে নেশা গ্রহণ করে ৫ শতাংশ। আইনের সঠিক প্রয়োগ না থাকার ফলে দেশে আশংকাজনকভাবে মাদক ও ইয়াবাসেবীর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলছে।
মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে বন্যার ¯্রােতের মতো মাদক প্রবেশ করলেও দুর্বল প্রযুক্তির অভাবে তা প্রতিরোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। মাদকের ভয়াবহত প্রতিরোধে যারা মাঠপর্যায়ে দায়িত্বপালন করছে তাদের ভাষ্যমতে, আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তা ছাড়া ইয়াবার মতো মাদকের লাগাম টেনে ধরা অসম্ভব। ইয়াবা ও মাদকের বিরুদ্ধে মাঝে মধ্যে অভিযান চালানো হলেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে বিভিন্ন অভিযানে মোট ৩ কোটি ৮০ লাখ ৯১ হাজার ৮৬৫টি ইয়াবা জব্দ করা হয়েছে। বাংলাদেশ মিয়ানমার সীমান্তের ১৫টি স্থান দিয়ে ইয়াবা দেশে ঢুকছে বলে সরকারি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়,২০১১ সালে জব্দ হওয়া ইয়াবার পরিমাণ ছিল ১৩ লাখ ৬০ হাজার আর ২০১৬ সালে হয়েছে ২ কোটি ৯৪ লাখ। আর ২০১৭ সালে তা গিয়ে দাঁড়িয়েছে চার কোটিতে। ফ্যামিলি হেলফ ইন্টারন্যাশনালের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে-শুধু ভারত থেকে প্রতি বছর প্রায় ৬০০ কোটি টাকার বিভিন্ন ধরনের মাদকদ্রব্য দেশে আসে যার মধ্যে ফেনসিডিলই আসে ২২০ কোটি টাকারও বেশি। এসব মাদকের অর্থ জোগাড় করতে গিয়ে প্রায় ৬০ ভাগ মাদকাসক্ত নানা অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ছে।
দেশজুড়ে মাদকের অভিশপ্ত মরণনেশার আগ্রাসন যেভাবে চলছে তা যদি এখনই বন্ধ করা না যায় তাহলে সামনে আরো দুঃসংবাদ হয়তো আমাদেরকে তাড়িয়ে বেড়াবে। কারণ মাদকাসক্ত ব্যক্তি শিক্ষিত হলেও মুর্খের মতো আচার-আচরণ করে। এমনকি ভদ্র ঘরের সন্তান হলেও অভদ্র ব্যবহার করতে কুন্ঠাবোধ করে না। তেলাপোকা কিংবা মুরগী জবাই করতে ভয় পাইলেও ঠান্ডা মাথায় মানুষ খুন করতে দ্বিধাবোধ করে না। কারণ মাদক গ্রহণের ফলে মাদকাসক্ত মানুষটি হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। যার বাস্তব নমুনা তো আমাদের চোখের সামনেই হরহামেশাই ঘটছে। নিকট অতীতে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী পৌরসভায় এক ধনাঢ্য পরিবারের মাদকাসক্ত সন্তান তার জন্মদাতা বাবাকে কুপিয়ে নির্মমভাবে খুন করেছে। মাদকসেবী সন্তান তার বাবাকে লোহার রড দিয়ে ক্ষত-বিক্ষত করে দিলেও সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস কেউ করেনি। কারণ বাসার চারদিকে বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে রেখেছে যাতে কেউ তাঁর কাছে যেতে না পারে। অবশেষে থানার পুলিশ ভেতরে ঢুকার চেষ্টা করলে তাদের মাথায় আঘাত করে। পুলিশ বাধ্য হয়ে গুলি করার চেষ্টা করলে মৃত্যুপ্রায় বাবা নিষেধ করেন। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস! হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা, স্নেহ, মায়া মমতা যার জন্যে বিলিয়ে দিয়েছিলেন সেই মাদকসেবী সন্তানের নিষ্ঠুর আঘাতে আঘাতে জীবন দিতে হয়েছে বাবাকে।  গত ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭ সালে নারায়ণগঞ্জে মাদকাসক্ত ছোট ভাইয়ের হাতে বড় ভাই খুন হয়েছে। ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৭ সালে নেশার টাকার জন্য গাজীপুরের শ্রীপুরে এক পাষান্ড বাবা তার কলিজার টুকরা সন্তানকে বিক্রি করে দিয়েছিল। এ ঘটনায় পালিত বাবা-মা ও জন্মদাতা পিতাকে আটক করেছিল পুলিশ। মাদকসেবী সন্তান তার প্রিয় মা-বাবাকে পর্যন্ত খুন করতে কুন্ঠাবোধ করছে না। একটি দৈনিক পত্রিকার নিজস্ব রিপোর্টে জানানো হয়, গত ১০ বছরে মাদকাসক্ত ছেলের হাতে কমপক্ষে ২০০ বাবা-মা নির্মমভাবে প্রাণ হারিয়েছেন। মাদকসেবী স্বামীর হাতে প্রাণ দিয়েছেন ২৫০ জনেরও বেশি নারী। নিকট অতীতে রাজধানীর বুকে মাদকাসক্ত কিশোরীর হাতে পুলিশ অফিসার বাবা, সেই সাথে মা খুন হয়েছে। এই কথাগুলো লিখলাম শুধু শিক্ষা নেয়ার জন্য। মাদকের ছোবলে অনেক পরিবার ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে।
একটি দেশ বা রাষ্ট্রের বড় সম্পদ হচ্ছে তরুণ সমাজ। তারা বড় হয়ে নিজেদের মেধা ও চরিত্র দিয়ে দেশকে পরিচালিত করবে এটাই তো সবার প্রত্যাশা। কিন্তু সেই তরুণ প্রজন্ম যদি মাদকাসক্তির মতো ঘৃণ্যকর্মে জড়িয়ে পড়ে তখন আর কষ্টের সীমা থাকে না। ৫৬ হাজার বর্গমাইলের এই দেশকে যদি মাদকমুক্ত করতে হয় তাহলে আইনের পাশাপাশি ধর্মীয় শিক্ষার প্রসার পরিবার থেকে শুরু করতে হবে। সন্তানের বয়স সাত বছর হলেই বাবা মায়ের উচিত ধর্মীয় শিক্ষার গুরুত্ব বুঝানো। বিশেষ করে নবী ও রাসূলের জীবনী পড়ার জন্য জোর তাগিদ দিতে হবে।
দেশ সমাজ ও রাষ্ট্রের অস্থিরতা দূর করতে হলে ৭০ লাখ বিপথগামী তরুণ-তরুণীকে মাদকের ছোবল থেকে রক্ষা করতে হবে। পরিশেষে একটি আবেদন ও প্রস্তাব রাখছি, সরকার থেকে শুরু করে দেশের সুশীলসমাজ, ইসলামী ব্যক্তিত্ব, মসজিদের সম্মানিত খতিব, ইমাম, অভিভাবক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তি, রাজনৈতিক নেতা ও আইনপ্রয়োগকারী বাহিনী সকলের কাছে- আসুন দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে মাদকের আগ্রাসনের হাত থেকে দেশের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা করি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ