ঢাকা, বুধবার 7 November 2018, ২৩ কার্তিক ১৪২৫, ২৭ সফর ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

সংলাপের মূষিক প্রসব

ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী : অনেক ঢাকঢোল পিটিয়ে অবশেষে গত বৃহস্পতিবার নবগঠিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও সরকারের মধ্যে কথিত সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই সংলাপ নিয়ে গত এক সপ্তাহ ধরে অনেক আলোচনা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার কাছে গণফোরাম নেতা ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট এর প্রধান ডক্টর কামাল হোসেন তাদের সাত দফা দাবি সম্বলিত একটি চিঠি পাঠান। তাতে সাত দফা দাবি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে সংলাপের জন্য আহ্বান জানানো হয়। যথাযথ আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে সে চিঠি আওয়ামী লীগ সভাপতির দফতরে পৌঁছে দেয়া হয়। প্রধানমন্ত্রীর ধানমন্ডির কার্যালয়ে আওয়ামী লীগ নেতারা সে চিঠি গ্রহণ করেন। পরদিন ওই চিঠির জবাব দেন শেখ হাসিনা। তাতে তিনি বলেন যে, সংলাপ হতে পারে, তবে তা হবে সাংবিধানিক কাঠামোর ভিত্তিতে। তার বাইরে কোনো আলোচনা হবে না। এই সাংবিধানিক কাঠামোয় আসলে একটি শর্ত হয়ে দাঁড়ায়। তখন থেকেই সকল মহলে আলোচনা শুরু হয় যে, যদি কাঠামোর বাইরে কোনো আলোচনা না হয়, তাহলে এ সংলাপ সফল হবে না। তবে প্রধানমন্ত্রী সংলাপের প্রস্তাব গ্রহণ করায় সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা আশার সঞ্চার হয়। মানুষ আশা করে যে, দেশব্যাপী যে রাজনৈতিক সঙ্কটের সৃষ্টি হয়েছে, তার একটা সমাধান খুঁজে পাওয়া যাবে। ফলে সাধারণ মানুষ অধীর আগ্রহে সংলাপের দিকে তাকিয়ে থাকেন। অনেকেই অবশ্য মনে করেছেন যে, এই সংলাপ একটি ধোঁকা ছাড়া আর কিছুই নয়। কেউ কেউ আশাবাদীও ছিলেন। সংলাপের আলোচ্যসূচি ও আগে থেকেই প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
সে আলোচ্যসূচিতে ছিল সাত দফা দাবি। দফাগুলো ছিল নিম্নরূপ:
১. অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের লক্ষ্যে সরকারের পদত্যাগ, জাতীয় সংসদ বাতিল, নিরপেক্ষ সরকার গঠন এবং খালেদা জিয়াসহ সব রাজবন্দীর মুক্তি ও মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার।
২. নির্বাচন কমিশনের পুনর্গঠন ও নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করার নিশ্চয়তা দেয়া।
৩. বাক-ব্যক্তি সংবাদপত্র টেলিভিশন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও সব রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।
৪. কোটা সংস্কার ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন, সামাজিক গণমাধ্যমে মত প্রকাশের অভিযোগে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার ও গ্রেপ্তারকৃতদের মুক্তি দিতে হবে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করা।
৫. নির্বাচনে ১০ দিন আগে থেকে নির্বাচনের পর সরকার গঠন পর্যন্ত বিচারিক ক্ষমতাসহ সেনাবাহিনী মোতায়েন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়ন্ত্রণের পূর্ণ ক্ষমতা নির্বাচন কমিশনকে দেয়া।
৬. নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং সম্পূর্ণ নির্বাচন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণে তাদের উপর কোনো ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ না করা এবং গণমাধ্যমকর্মীদের উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ না করা।
৭. তফসিল ঘোষণার তারিখ থেকে নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত সব রাজনৈতিক মামলা স্থগিত রাখা এবং মামলা না দেওয়ার নিশ্চয়তা দেওয়া।
এই দাবিগুলো খুবই সাধারণ মানের ছিল। এমন কোনো কঠিন বা সমাধানের অযোগ্য কোনো দাবি উত্থাপন করা হয়নি। ১ নম্বর দাবি সম্পর্কে সরকারের বক্তব্য ছিল এটি সংবিধানসম্মত নয়। সুতরাং তা আলোচনার যোগ্য নয়। এছাড়া খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ক দাবিকে সরকার হাইকোর্ট দেখিয়ে দিয়েছে। তারা বলেছে, এটি আদালতের ব্যাপার, এ বিষয়ে তাদের কিছুই করার নেই। ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেছেন যে, আইনগতভাবেই বেগম খালেদা জিয়া জামিনে মুক্তি পেতে পারেন। তারা যখন উচ্চ আদালতে বেগম খালেদা জিয়ার জামিনের জন্য আপিল করেন, তখন সরকার পক্ষ আপিলের বিরোধিতা না করলে তিনি জামিন পেতে পারেন। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর তরফ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। প্রধানমন্ত্রী যেদিন এই সংলাপের চিঠি দিয়েছেন, সে দিনই কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। একটি হলো নিম্ন আদালত বেগম খালেদা জিয়াকে এক মামলায় সাত বছর কারাদ-ে দ-িত করে। অপর একটি মামলায় নিম্ন আদালতের ৫ বছরের জেল বাড়িয়ে ১০ বছর করা হয়। এ এক অভূতপূর্ব ঘটনা। সাধারণত মানুষ নিম্ন আদালত থেকে উচ্চ আদালতে যায় সাজা কমানোর জন্য কিন্তু হাইকোর্ট সে সাজা দ্বিগুণ করে দিয়েছে। এক্ষেত্রেও সরকার বলতে পারে যে, আদালত দ্বিগুণ করেছে, তা আমাদের কি করার আছে। অনেক কিছু আছে ছিল। প্রথম কথা হচ্ছে দেশে যে রাজনৈতিক সঙ্কট চলছে, তার ন্যায়সঙ্গত মীমাংসা সরকার চায় কিনা। যদি তারা এর ন্যায়সঙ্গত মীমাংসা চায়, তাহলে আদালতের মাধ্যমেও সে মীমাংসা অর্জন করা সম্ভব। কিন্তু সরকারের তরফ থেকে তেমন কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।
সরকার সংবিধানের দোহাই দিচ্ছে। কিন্তু ১৯৯৬ সালে আমরা দেখেছি সংবিধান বহির্ভূত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে জাতীয় পার্টি, জামায়াত ও আওয়ামী লীগ মিলে ১৮৩ দিন হরতাল করেছিল। তাছাড়া জ্বালাও পোড়াও আন্দোলন তো ছিলই। তখন সংবিধানের জন্য আওয়ামী লীগের এত মায়া কোথায় ছিল। সংবিধান সংশোধনের অযোগ্য নয়। আর সংবিধান কীভাবে সংশোধন করতে হবে, তার বিধান সংবিধানের ভেতরেই রয়েছে। সেই কারণেই ড. কামাল হোসেন বলেছেন যে, সংবিধান সংশোধন করা এক মিনিটের ব্যাপার। এর আগে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী তথা বাকশালী ব্যবস্থা মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে পাস ও চালু করা হয়েছিল। অর্থাৎ সংবিধান সংশোধন করা যায়। আওয়ামী লীগও বর্তমান সংবিধান বেশ কয়েকবার সংশোধন করেছেন। সুতরাং সংবিধানের দোহাই কোন যুক্তির বিষয় নয়।
সংলাপে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের দ্বিতীয় দফা দাবিও উপেক্ষিত হয়েছে। ঐক্যফ্রন্ট চেয়েছিল, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করতে হবে। কিন্তু সরকার সেদিকে অগ্রসর হয়নি। এক সময় নির্বাচন কমিশনের প্রধান হতেন দেশের সাবেক কোনো প্রধান বিচারপতি। এখন নির্বাচন কমিশনের প্রধান হয়েছেন অবসরের পর প্রমোশন পাওয়া এক যুগ্ম-সচিব। সুতরাং নির্বাচন কমিশনের মান কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের দাবি ছিল আসন্ন নির্বাচনে ইভিএম বন্ধ করতে হবে। সে প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী অবশ্য বলেছেন যে, ইভিএম সীমিত পর্যায়ে ব্যবহার করা হবে। কিন্তু কেন তা দরকার। কেন ১১ হাজার টাকার দামের ইভিএম লক্ষাধিক টাকায় কেনা হচ্ছে। সে কি শুধুই নির্বাচন সুষ্ঠু করার জন্য। নাকি দুর্নীতির মাধ্যমে কাউকে কোটি কোটি টাকা পাইয়ে দেয়ার জন্য। সে প্রশ্ন এখন সবার।
রাজনৈতিক দলগুলোর সভা-সমাবেশ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত পজিটিভ কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, এখন থেকে যে কেউ নির্বিঘেœ সভা-সমাবেশ করতে পারবে। তবে যে স্থানে সভা করবে, তার ভাড়া দিতে হবে। এ নিয়ম আগে চালু ছিল না। প্রধানমন্ত্রী সম্ভবত নতুন নিয়ম চালু করলেন। কিন্তু বৃহস্পতিবারই আমরা একটি ঘটনা লক্ষ্য করলাম। কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীরা একটি পুনর্মিলনীর আয়োজন করেছিল। পুলিশ গিয়ে বাধা দেয়। পুলিশ বলেছে, এই পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানের জন্য পূর্বানুমতি নেয়া হয়নি। ছাত্ররা বলেছে, প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন যে, সভা-সমাবেশের জন্য আর কোনো পূর্বানুমতি লাগবে না। পুলিশ প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণাও মানতে চায়নি। কিন্তু ছাত্ররা সভাস্থল ত্যাগ করেননি। শেষ পর্যন্ত তাদের কিছু সময়ের জন্য সেখানে সমাবেশ করার অনুমতি দেয়া হয়। সভা-সমাবেশ নির্বিঘœ করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা সবাই শুনেছেন। শুধু কি পুলিশ শোনেনি? এভাবেই পুলিশ ‘দেশের রাজা’ হয়ে উঠেছে বর্তমান সরকারের আমলে।
জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সাত নম্বর দাবি ছিল, তফসিল ঘোষণার তারিখ থেকে নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত চলমান সব রাজনৈতিক মামলা স্থগিত রাখা ও নতুন কোনো মামলা না দেয়ার নিশ্চয়তা দেওয়া। এ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, যেসব মামলা রাজনৈতিক বলে বিরোধী দল মনে করছে, সেসব মামলার তালিকা ও নথিপত্র দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের কাছে পৌঁছে দিতে। তিনি সেগুলো বিচার বিবেচনা করে দেখবেন। কিন্তু আশ্চর্যের ঘটনা হলো এই যে, বিএনপির বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত সরকার ৯৫ হাজার মামলা করেছে। যার আসামীর সংখ্যা ২৫ লাখের ওপর। এগুলো চিহ্নিত করে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে দিতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হবে। নির্বাচন হয়ে যাবে। অবাধ নিরপেক্ষ নির্বাচনের আশা সুদূর পরাহত হয়ে যাবে। একটি উদ্বেগজনক ব্যাপার আগে থেকেই ঘটে আসছে। আর তা হলো নির্বাচনের আগেও বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের পাইকারিভাবে গ্রেপ্তার, গায়েবি মামলা দায়ের, অসুস্থ ব্যক্তিদের ভুয়া মামলা দিয়ে ডান্ডাবেড়ি পরিয়ে আদালতে হাজির করা সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষণ নয়। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের গণভবনে যখন বৈঠক চলছিল, তখনও পুলিশ ব্যস্ত ছিল বিএনপিসহ বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের গ্রেফতারে। বাড়ি বাড়ি চলছিল তল্লাশি। অর্থাৎ সংলাপে ডাকলেও সরকার ৫ জানুয়ারির পথেই এগিয়ে যাচ্ছে। সংলাপ একটি তামাশা মাত্র।
এদিকে বি. চৌধুরী বা যুক্তফ্রন্ট সংলাপের জন্য চিঠি দিয়েছিল। সরকারের সঙ্গে তারাও বৈঠক করেছে। সরকারের শরীক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সংলাপ করেন। শুধু তিনিই নন, সরকারের আরেক শরীফ আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর জাপা। তিনিও সরকারের সঙ্গে সংলাপ করবেন। আর বাম জোটকে ডেকেছেন প্রধানমন্ত্রী। তাদের সঙ্গে সংলাপ হবে। বাম জোট না হয় বুঝলাম, কিন্তু এরশাদ বা আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর সঙ্গে সরকারের সংলাপের হেতু কী? সরকারের সঙ্গেই আছেন। সরকারের মন্ত্রী, সরকারের সমর্থক, সরকারের অনুগতজনরা, তা সত্ত্বেও তাদের সঙ্গে সংলাপের প্রয়োজন কী? প্রয়োজন যদি থাকেই তবে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে কিংবা সংসদ ভবনের ভেতরে তা সম্পন্ন করা যেত। তবে সংলাপ সম্পর্কে এরশাদ অবশ্য খোলাখুলিই বলেছেন যে, সংলাপে তাদের বিশেষ কোনো দাবি-দাওয়া নেই। আসন বাড়িয়ে চাইবেন। তারপর খেয়ে-দেয়ে চলে আসবেন। এতে করে আনুষ্ঠানিক সংলাপ এক হাস্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। অর্থাৎ বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে সংলাপকে হাস্যকর পর্যায়ে পৌঁছে দেয়ার জন্য সরকার সম্ভবত এসব আয়োজন করেছে। সেটা আমাদের জন্য কম বিস্ময়কর নয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ