ঢাকা, বুধবার 7 November 2018, ২৩ কার্তিক ১৪২৫, ২৭ সফর ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

এসওএস শিশু পল্লী: বেওয়ারিশ শিশুর অভিভাবক

আখতার হামিদ খান : গর্ভে ধারণ না করেও ২৪ বছর ধরে সফলভাবে মায়ের দায়িত্ব পালন করে চলেছেন পঞ্চাশোর্ধ্ব আবিদিনা বেগম। দীর্ঘ এ চাকুরি জীবনে আদর যত্নে মমতা দিয়ে ২৫ জন শিশুকে বড় করে তুলেছেন তিনি। সমাজে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তাদের। চার মেয়ে ও এক ছেলেকে বিয়ে দিয়েছেন। শ্যামলীর এসওএস শিশু পল্লীতে মায়ের চাকুরি করেন আবিদিনা বেগম। গর্ভে ধারণ না করেও তিনি অনেক শিশুর মমতাময়ী মা।
মিরপুরের এসওএস শিশু পল্লীতে আবিদিনা বেগমের মতো এমন ১৫ জন মায়ের চাকুরি করেন। তাদের তত্ত্বাবধানে দেড় শতাধিক শিশু বেড়ে উঠছে। কর্তৃপক্ষ একদিন থেকে ৮ বছর বয়সী শিশুদের লালন-পালনের জন্য এই মায়েদের হাতে তুলে দেন। মায়ের মমতায় বেড়ে ওঠে তারা নতুন জীবন শুরু করে। চাকুরিরত মায়েদের কাছে আবার আসে নতুন শিশু। এসওএস শিশু পল্লীতে এভাবেই চলতে থাকে মায়েদের চাকুরি আর শিশু প্রতিপালন।
সরেজমিনে শ্যামলির এক নম্বর রোডে শিশু পল্লীতে চাকুরিরত মা ও শিশুদের সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তারা জানায়, রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও মা-সন্তানের সম্পর্ক এবং তাদের বেড়ে ওঠার গল্প।
তারা জানায়, শিশু পল্লীতে মেয়েরা ২৩ বছর এবং ছেলেরা ১০ বছর পর্যন্ত মায়েদের কাছে অবস্থান করে। পরে ছেলেদের ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে গড়ে ওঠা এসওএস ইন্টারন্যাশনালের যুব পল্লীগুলোতে স্থানান্তর করা হয়। এখানকার মায়েদের আদর-ভালোবাসায় বেড়ে উঠা শিশুরা বড় হয়ে চলে যার যার কর্মস্থলে। মা-সন্তানের সম্পর্ক অটুট থাকে আমৃত্যু।
১৯৭২ সালের ১৭ মে আড়াই একর জমির উপর সোনালী, রহৃপালী এবং মমতা নামের ৩টি পাড়া নিয়ে গড়ে তোলা হয় ১ শ্যামলী মিরপুর রোড ঢাকার এই এসওএস শিশু পল্লী। প্রতি পাড়ায় পাঁচটি করে মোট ১৫টি ঘর রয়েছে। প্রতিটি পাড়ার রূপালী, পূর্বালী, কাকলি, মমতা, সমতা, সততা, জনতা, একতা নামে ঘরগুলোর বাহারী নামও দেয়া হয়েছে।
সোনালী পাড়ার কাকলী নামের ৪ নম্বর রুমের মায়ের দায়িত্ব পালন করছেন এই আবিদিনা বেগম। বর্তমানের তার ঘরে ৪ থেকে ১৭ বছর বয়সী ১০ জন ছেলে-মেয়ে রয়েছে। আলাপচারিতায় আবিদিনা বেগম জানান,‘বর্তমানে তার পরিবারের বড় মেয়ে শাপলা তার কাছে এসেছে যখন তার বয়স  ১১ মাস।
এখন শাপলার বয়স ১৭। এসওএস শিশু পল্লীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত মিরপুর ১৩ নম্বর সেকশনের হারম্যান মেইনার কলেজের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী। তিনি জানান, শাপলা ঘরের বড় মেয়ে হিসেবে তার কাজে সহায়তা করে। এখানে তার মতোই বেড়ে উঠা ছোট ছোট ছেলে-মেয়েদের নিচের আপন ভাইবোনের মতোই ভালোবাসেন শাপলা। মেয়ে শাপলা সম্পর্কে আবিদিনা বেগমের কথাগুলোর প্রমাণ পাওয়া গেলো ৪ বছরের রায়হান, ৫ বছরের মিনু এবং ৭ বছরের তানজিনা যখন খেলাধূলা করে এসে হাত-মুুখ ধুয়ে দেওয়ার জন্য বোনের কাছে ছুটে আসলেন। সেও বিরক্ত না হয়ে ভাই-বোনদের যত্নসহকারে তাদের ময়লা-কাপড় পাল্টে দিলেন। আরো অবাক হলাম শাপলা যখন আবিদিনা বেগম এবং আমার জন্য বিস্কুুট, বুটের এবং সুজির হালুয়া এবং চা দিয়ে আমাদের অ্যাপায়ন করলো। আবিদিনা সুলতানা মেয়ের প্রশংসা করে এই প্রতিবেদকে বললেন,‘আমার মেয়েরাই এই হালুয়া রুটি বানিয়েছেন। তাই নয় দুপুরের খাবার মাংস পোলাও রান্না করেছে। পরিবারের সকল ভাইবোনকে নিয়ে সব সময় ওরা অনেক আনন্দ করে কাটায়। তারই যত্নে বড় হওয়া ছেলে-মেয়েরা সব সময় তার খোঁজ-খবর নেন। মাঝে মধ্যে দেখতে আসেন। তিনি এই প্রতিবেদকে জানান, তার এক ছেলে শাকিল আহমেদ ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করে বর্তমানে গাজীপুরের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকুরি করছে।
আমার শাড়ি থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় সব জিনিস কিনে দেয় আমার এই ছেলে। কোনো কিছু না চাওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় জিনিস এনে হাজির করে। মেয়ে ও মেয়ের জামাইরা বেড়াতে আসে। সঙ্গে ছোট ভাই- বোনদের জন্য খাবারসহ বিভিন্ন ধরনের গিফ্ট নিয়ে আসে। আমি আরো গর্ববোধ করি যখন আমার স্নেহে বেড়ে উঠা ছেলেমেয়েরা সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়, কোনো কাজে সফল হয়। আবিদিনা বেগম সমাজে অসহায় এসব শিশুদের পাশে এসে ওদের দুঃখ-কষ্টগুলোকে মায়ের মমতা দিয়ে যখন উপলদ্ধি করে ওদের আদর-ভালোবাসা দেই তখন তার জন্মকেও স্বার্থক বলে মনে হয় বলে জানালেন আবিদিনা বেগম।
এসওএস শিশু পল্লীর সোনালী পাড়ার ১ নম্বর ঘরের দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন আরেক মা সাবেরা সুলতানা। এই ঘরের ৮ জন শিশুর মা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ৬ বছর যাবৎ। বুধবার বিকাল ৫ টায় যখন এই মায়ের সাথে কথা হয়, সে সময় ৬ থেকে ৭ বছর বয়সী ৮ জন ছেলে-মেয়ে টেবিলে বসে পড়াশুনা করছিল। পাশে বসে তাদের পড়াগুলো দেখিয়ে দিচ্ছেন সাবেরা সুলতানা। এই বিকেল বেলা পড়াশুনা করার কারণ জানতে চাইলে সাবেরা সুলতানা জানালেন, ‘সামনে পরীক্ষা তাই বিকেলে পড়তে বসানো। পড়া শেষ করে সন্ধ্যায় নাস্তা সেরে রাত পৌণে ১০ টা পর্যন্ত পড়াশুনা করবে বাচ্চারা। রাত ১০ টার মধ্যে ভাত খেয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেয়া হবে তাদের। সকাল সাড়ে ৭ টায় আবার স্কুল। তাই ১০ টার মধ্যে ঘুম পাড়িয়ে দেই। না হয়, ওরা সকালে ঘুম থেকে উঠতে গড়িমসি করে।
এক সঙ্গে এতগুলো বাচ্চার দায়িত্ব পালন করছেন, কেমন লাগছে এই প্রতিবেদকে এমন প্রশ্নের জবাবে, ‘সাবেরা সুলতানা সারল্যে উত্তর, ‘আমি ওদের গর্ভে ধারণ না করলেও এখন ওরাই আমার সব। ওদের ছাড়া এক মুহূর্ত থাকতে পারি না আমি। এই তো ক’দিন আগে এসওএস শিশু পল্লীর মিরপুরের ট্রেনিং সেন্টারে ১০ দিনের ট্রেনিং-এর জন্য গিয়ে ছিলাম। ১০ দিন ওদের কাছে থাকবো না, এটা শুনেই বাচ্চার কাঁদছিল, সন্তানদের চোখের পানি দেখে আমিও কান্না ধরে রাখতে পারিনি। কথাগুলো বলার সময়ও চোখে পানি ছলছল করছিল মা  সাবেরা সুলতানা। বছরের ২১ দিন ছুটি পান তিনি। সে সময় তিনি তার নিজ পরিবারের বেড়াতে যান, সেখানে মন টিকে না তার। সাবেরা সুলতানা বলেন,‘সারাক্ষণই মনে হয়, ঢাকায় আমার ছেলে-মেয়েরা কি করছে, ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করছে তো। ওরা ভালো আছে তো, ওদের কোনো বিপদ হলো না তো। এমন হাজারো প্রশ্ন মনের ভেতর ভিড় করে। সব সময় ফোন করে ওদের খোঁজ-খবর নেই। তার অনুপস্থিতিতে তার সন্তানদের দেখভাল করেন এসওএস শিশু পল্লীর মায়েদের সহযোগী খালাম্মারা। সাবেরা সুলতানা বলেন, ‘গর্ভে ধারন করিনি তো কি হয়েছে। মা তো মা-ই’ কথাগুলো বলতে বলতে কেঁদে ফেলেন তিনি। ৫ বছরের সাজিদ, লাফ দিয়ে মায়ের কোলে মাকে আদর করা শুরু করল। সন্তানকেও  চুম্বনে ভরিয়ে দিলেন মা। তৃতীয় শ্রেণীর সাদিয়া এবং আরিফ মা ক্ষুধা পেয়েছে, ভাত দাও। তৃতীয় শ্রেণীর সোমা ও স্বপ্নার আবদার মা ঘরে বিস্কুট আছে, থাকলে দাও। সন্তানদের এমনো হাজার আবদার, অভিযোগ-অনুযোগ শুনতেই শুনতেই দিন কেটে যায় তার। এখন আমার সন্তানরাই আমার সব, আমার পুরো পৃথিবীটাই যেন ওদের ঘিরে। আমার চাকুরি জীবনের পুরো সময়ই আমি ওদের মতো ছেলে-মেয়েদের মা হয়ে দায়িত্ব পালন করে যেতে চাই’।
এসওএস শিশু পল্লীতে যেভাবে মা নিয়োগ দেয়া হয়ঃ শারীরিক ও মানসিক যোগ্যতা সম্পূর্ণ ২৫ থেকে ৪৪ বছর বয়সী সমাজের বিধবা, নিঃসন্তান এবং তালাকপ্রাপ্ত মহিলাকে ইন্টারভিউর মাধ্যমে নিয়োগ দেয়া হয়। নিয়োগ দেয়ার পর পল্লীর ছেলেমেয়েদের সঠিকভাবে লালন পালনের জন্য নিয়োগ প্রাপ্ত মায়েদের উন্নতমানের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। কমপক্ষে দুই বছর সফলভাবে বুনিয়াদী এবং বাস্তব প্রশিক্ষণ সমাপ্তির পর মা হিসেবে দায়িত্ব পালনের যোগ্যতা অর্জন করেন তারা। নিয়োগপ্রাপ্ত মায়েরা যদি পল্লীতে ২০ বছর সফলভাবে মায়ের দায়িত্ব পালন করতে পারেন তাহলে এসওএস ইন্টান্যাশনালের চাকুরিবীধি অনুযায়ী আজীবন পেনশনভোগী হবেন। একজন মা কমপক্ষে ৬০ বছর পর্যন্ত চাকুরী করতে পারবেন। চাকুরি থেকে অবসরে যাওয়ার পর তাদের দায়িত্ব নেয়ার মতো আপনজন যদি কেউ না থাকে তাহলে এসব মায়েদের মা শেষ বয়সে এসওএস শিশু পল্লীর ভেতর স্থাপতি ‘মাদার রিটায়ার্ড হোম’ মৃত্যুর আগ মূহূর্ত পর্যন্ত থাকতে পারবেন।
এসওএস শিশু পল্লীর ইতিহাস ঘেটে পাওয়া যায়, ড. প্রফেসর হারম্যান মেইনার ১৯১৯ সালে অষ্ট্রেলিয়ায় জন্ম গ্রহণ করেন। ছোট বেলায় বাবা-মাকে হারান। তারা দশ-ভইবোন ছিলেন। তার বড় বোনই মায়ের মতো মমতা দিয়ে তাদের লেখাপড়া শিখিয়ে বড় করে তোলেন। বিশ্বযুদ্ধের পর অনেক শিশু বাবা-মা হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়েন। তিনি যেহেতু এতিম ছিলেন। তাই এতিম শিশুদের দুঃখ-কষ্ট তিনি অন্তরের অন্তস্থল থেকে উপলব্ধি করে ছিলেন। সেই উপলব্ধি থেকেই ড. প্রফেসর হারম্যান মেইনার ১৯৪৯ সালে অষ্ট্রেলিয়ার ইমল্ট শহরে প্রথম শুরু করে এসওএস শিশু পল্লীর কার্যক্রম। সেই পল্লীতে সম্পূর্ণ পারিবারিক পরিবেশে মায়ের মমতা দিয়ে বড় করে তোলেন। প্রথমে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এবং পরে ১৯৬৩ সালে এশিয়ার বিভিন্ন দেশেও ছড়িয়ে দেন এসওএস শিশু পল্লীর কার্যক্রম। সমাজের সুবিধা-বঞ্চিত এতিম শিশুদের অভিভাবক হারম্যান মেইনার ১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিল পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নেন। রেখে যান সমাজের এতিম ও অসহায় শিশুদের সুস্থ ও সুন্দরভাবে বেড়ে উঠার জন্য একটি নিরাপদ আবাসস্থল। বর্তমানে বিশে^র ১৩২টি দেশে এই পল্লীর কার্যক্রম চালু রয়েছে। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাসহ রাজশাহী, খুলনা, চট্রগ্রাম, বগুড়া, সিলেট, বরিশালে এসওএস শিশু পল্লীর কার্যক্রম পরিচালিত রয়েছে। এছাড়াও ঢাকা, খুলনা, চট্রগ্রাম এবং  বগুড়ায় রয়েছে এসওএস যুব পল্লী।
এসওএস শিশু পল্লীর কার্যক্রম সম্পর্কে প্রকল্প পরিচালক সাইফুল ইসলাম বলেন, ৪টি প্রধান নীতিমালা নিয়ে চলছে এসওএস শিশু পল্লীর কার্যক্রম। প্রথমতো একটি পরিবারে মা এবং ভাই-বোন থাকবে। এছাড়াও থাকবে বাসস্থান এবং সামাজিক জীব হিসেবে বেড়ে উঠার জন্য একটি পল্লী। যেখানে মায়ের অকৃত্রিম ভালোবাসায় এবং ভাইবোনদের পারস্পারিক সানিধ্যে ওরা বেড়ে উঠবে।
প্রতিটি পরিবারের মা রয়েছে, বাবা নেই কেন, প্রতিবেদকের এমন প্রশ্নের জবাবে সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রত্যেক পল্লীতেই একজন করে প্রকল্প পরিচালক রয়েছে তারই মূলত বাবার ভূমিকায় অবতীর্ণ থেকে কাজ করেন এবং মায়েদের প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা প্রদান করেন। এখান থেকে বেড়ে উঠা শিশুরা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হয়ে সমাজ উন্নয়নে অবদান রাখছে বলে জানালেন সাইফুল ইসলাম।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ