ঢাকা, বৃহস্পতিবার 8 November 2018, ২৪ কার্তিক ১৪২৫, ২৮ সফর ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

যেখানে মানুষের চেয়ে গরুর মূল্য বেশি

মানুষকে মানুষ থাকতে হলে ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপন করতে হয়, সুস্থ থাকতে হয়। সুস্থ থাকাটা আসলে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অসুস্থ মানুষ কারো কল্যাণ করতে পারে না, এমনকি নিজেরও নয়। বরং অসুস্থ মানুষের অসুস্থ চিন্তা মানুষের এবং সমাজের ক্ষতির কারণ হতে পারে। প্রসঙ্গত প্রশ্ন জাগে, শুধু মানুষই কি অসুস্থ হয়, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ভাবনাও কি অসুস্থ হয়ে ওঠে না? আমরা জানি, মানুষ শুধু Organic নয়, Moral-ও বটে। দেহান্ত্রের ভেতর মানুষের Moral ও থাকে। এ দু’য়ের সমন্বয়েই মানুষ। এ কারণেই জৈবসত্তার পাশাপাশি মানুষকে নৈতিক সত্তার সুস্থতা ও বিকাশ নিয়েও ভাবতে হয়। এই ভাবনায় সমন্বয়ের বদলে প্রান্তিকতা কিংবা খণ্ডিত বোধের প্রশ্রয় ঘটলে শুধু ব্যক্তি মানুষে নয়, সমাজ এবং রাষ্ট্রেও অসুস্থতা দেখা দেয়। প্রসঙ্গত এখানে উল্লেখ করা যায় যে, শুধু মানুষই এখন Organic ও Moral-এর সমন্বয়- সংকটে ভুগছেনা; আমাদের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ভাবনাও এখন Ritual ও Spiritual-এর সমন্বয়-সংকটে ধুঁকছে। ভাবনা জগতেরও একটা প্রদর্শনগত অবয়ব আছে, তবে উপলব্ধিগত মননটাই এর আসল।
আমাদের উপমহাদেশের রাজনৈতিক ও ধর্মভাবনায় সঙ্গত উপলব্ধির সংকট আছে। অসুস্থ স্বার্থচিন্তা এবং উগ্র ভাবাবেগ এখনো কাক্সিক্ষত মানবিক সমাজ বিনির্মাণের পথে বাধা হয়ে আছে। আমরা জানি, বিশ্ব হিন্দু পরিষদের মুখপত্রের নাম ‘বিশ্ব হিন্দু বার্তা’। এর কার্তিক, ১৪২৫ সংখ্যায় মুদ্রিত ‘হিন্দু সমাজ ভাবনা’ শীর্ষক প্রবন্ধে নৃসিংহ প্রসাদ দে মুসলমানদের ভোটাধিকার হরণ করার প্রস্তাব করেছেন। তিনি লিখেছেন, হিন্দুস্থান হিন্দুদের, তাই অন্যদের ভোটাধিকার এখনই বন্ধ করা উচিত। ১৯৪৭ সাল থেকেই এটি করা উচিত ছিল। তিনি আরো লিখেছেন, রাষ্ট্র পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের সকল সুযোগ একমাত্র হিন্দুদেরই থাকা উচিত। মুসলমানরা একমাত্র হিন্দুত্বে ফিরে আসলেই পাবে ভোটাধিকার।
অবশ্য নৃসিংহ প্রসাদের মতের সাথে সহমত হননি বিশ্ব হিন্দু পরিষদের পূর্বাঞ্চল প্রধান শচীন্দ্রনাথ সিংহ। তিনি বলেন, মুসলিমরা দেশের অংশ। সাংবিধানিকভাবে তাদের ভোটাধিকার স্বীকৃত। অবশ্যই তা সুরক্ষিত থাক। এখন প্রশ্ন জাগে, তাহলে এমন একটি প্রবন্ধ কী করে স্থান পেল তাদের মুখপত্র ‘বিশ্ব হিন্দু বার্তায়’? বিষয়টি নিয়ে কি তাঁরা ঘৃণ্য রাজনীতি করছেন? তাহলে তো   বলতে হয়, বিশ্ব হিন্দু পরিষদের রাজনীতি সুস্থ ধারায় চলছে না।
ভারত সরকারের দৃষ্টিভঙ্গিই বা কেমন? বন্ধুরাষ্ট্রের আচরণ এমন হয় কেমন করে? ‘বিএসএফের বিরুদ্ধে বাংলাদেশিকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ’ শিরোনামের খবরটি মুদ্রিত হয়েছে প্রথম আলোয়। ৫ নভেম্বর মুদ্রিত খবরটিতে বলা হয়, চাঁপাইনবাবগঞ্জের ওয়াহেদপুর সীমান্তে ভারতীয় ভূখন্ডে ডালিম মাঝি (২২) নামের এক বাংলাদেশি রাখালকে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) পিটিয়ে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। নিহত ডালিম মাঝির বাড়ি শিবগঞ্জের নিশিপাড়া গ্রামে। বাবার নাম মংলু মাঝি। ৪ নভেম্বর সকালে ডালিমের লাশ বাড়িতে এনে  দাফন করা হয়েছে।
এলাকাবাসী ও স্থানীয় পাঁকা ইউপি চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান বলেন, একদল বাংলাদেশি গত শনিবার রাতে জহরপুরটেক সীমান্ত দিয়ে ভারতে গরু আনতে যান। গরু নিয়ে আসার পথে ভারতের পাতলাটোলা ক্যাম্পের বিএসএফ সদস্যরা তাদের ধাওয়া করে। অন্যরা পালিয়ে আসতে পারলেও ডালিম ধরা পড়েন। ডালিমকে ধরার পর বিএসএফের সদস্যরা তাকে রাইফেলের বাঁট দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করেন। সীমান্ত দিয়ে গরু আনার ঘটনা নতুন কিছু নয়। যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশ ও ভারতের নাগরিকরা এই গরু ব্যবসার সাথে জড়িত। আগে এনিয়ে তেমন সমস্যা হতো না। তবে সাম্প্রতিককালে উগ্ররাজনীতির কারণে গরু আনা-নেয়া নিয়ে নিষ্ঠুর ঘটনা ঘটছে, হত্যার ঘটনাও ঘটে চলেছে অব্যাহতভাবে। আর ভারতে গো-রক্ষা আন্দোলনের কথা তো বিশ্ববাসী অবগত হয়েছে। গরুর গোস্ত রাখা ও খাওয়ার অপরাধে মানুষ পর্যন্ত হত্যা করা হয়েছে। বিশ্ববাসী অবাক হয়েছে এ কথা জেনে যে, ভারতে মানুষের চেয়ে গরুর মূল্য বেশি!
সীমান্ত পথে গরু আনা-নেয়ার ঘটনায় আইনের প্রসঙ্গও তোলা হয়। বলা হয় এই ব্যবসা অবৈধ। অবৈধ হলেতো তা আইনের মাধ্যমেই অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। আর অবৈধ কাজের শাস্তি তো আইনেই নির্দিষ্ট থাকার কথা। সেই আইনের কোথাও কি লেখা আছে, ভারত থেকে গরু আনার অপরাধে বিএসএফ সদস্যরা কাউকে রাইফেলের বাঁট দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করতে পারবে? এমন কোনো বিধান না থাকলেতো বিএসএফ সদস্যরা হত্যার অপরাধ করেছে। এ অপরাধের কোনো বিচার হবে কী? বাংলাদেশ সরকার কোনো উদ্যোগ নেবে কী? ভাবতে অবাক লাগে, লঘু পাপে এমন গুরুদন্ড হয় কেমন করে?

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ