ঢাকা, শুক্রবার 9 November 2018, ২৫ কার্তিক ১৪২৫, ২৯ সফর ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ফলহীন সংলাপ

৭ নবেম্বর বিএনপিসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের দ্বিতীয় দফা বৈঠকের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিক সংলাপের সমাপ্তি ঘটেছে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সেদিনই জানিয়ে দিয়েছেন, সংকট সমাধানের লক্ষ্যে ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে আর কোনো সংলাপ হবে না। তবে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট ছোটখাটো বিভিন্ন বিষয়ে সময়ে সময়ে আলোচনা হতে পারে। সে ব্যাপারে ক্ষমতাসীনদের আপত্তি নেই। তবে নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুয়ায়ী নির্ধারিত তারিখেই সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনের তারিখ কোনোক্রমেই পেছানো হবে না। উল্লেখ্য, সংলাপে সমঝোতা হওয়ার আগে তফসিল ঘোষণা না করার জন্য নির্বাচন কমিশনের প্রতি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট আহ্বান জানিয়েছিল। 

অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমামের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের এক প্রতিনিধি দল পূর্ব পরিকল্পনা অনুসারে তফসিল ঘোষণার আহ্বান জানিয়ে ৭ নভেম্বরই কমিশনকে বলে এসেছেন, তারা কমিশনের পক্ষে থাকবেন এবং ঘোষিত হলে সে তফসিল অনুয়ায়ী নির্বাচনে অংশ নেবেন। জাতীয় পার্টিসহ সরকার সমর্থক অন্য কয়েকটি দলও একই অবস্থানে থাকবে অর্থাৎ নির্বাচনে অংশ নেবে বলে জানিয়ে দিয়েছে। এসবের মধ্য দিয়ে পরিষ্কার হয়ে গেছে, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের সংলাপ কোনো সুফল বয়ে আনতে পারেনি বরং ব্যর্থ হয়েছে।

উভয় পক্ষের নেতাদের বক্তব্যে জানা গেছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবির পাশাপাশি ঐক্যফ্রন্ট বিদ্যমান সংসদ ভেঙে দেয়ার এবং নির্বাচনকালীন সরকারের দায়িত্ব পালনের জন্য বিরোধী দলগুলোর সমন্বয়ে একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু সংবিধানে তেমন কোনো ব্যবস্থার সুযোগ নেই জানিয়ে ক্ষমতাসীনরা সে প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন। ওবায়দুল কাদের প্রসঙ্গক্রমে বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেয়ার আহ্বান এবং প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যা বলেন তা করেও দেখান। তিনি যেহেতু বলেছেন, তার নেতৃত্বেই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করে দেখিয়ে দেবেন সেহেতু সকল দলের উচিত প্রধানমন্ত্রীর অঙ্গীকারের ওপর আস্থা রাখা এবং নির্বাচনে অংশ নেয়া। ওবায়দুল কাদের আরো বলেছেন, নির্বাচনে অংশ নিয়েই দেখুন, সে নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয় কি না। নির্বাচন সত্যিই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ না হলে তারা কি করবেন এবং বিরোধী দলগুলোরই বা কি করা উচিত হবেÑ এসব বিষয়ে অবশ্য কিছুই বলেননি মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।

এদিকে সংলাপ ব্যর্থ ও সমাপ্ত হওয়ার খবরে জনগণের মধ্যে ভীতি ও আশংকা ছড়িয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক অঙ্গনেও সৃষ্টি হয়েছে অনিশ্চয়তার। এটাই অবশ্য স্বাভাবিক। কারণ, দীর্ঘদিন পর্যন্ত সংলাপের ব্যাপারে না বলার পর ক্ষমতাসীনরা হঠাৎ সম্মতি জানানোর এবং গত ১ নভেম্বর থেকে সংলাপ শুরু হওয়ার পর রাজনৈতিক অঙ্গনের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও সংকট কাটিয়ে ওঠার ব্যাপারে গভীর আশাবাদের সৃষ্টি হয়েছিল। অন্যদিকে ক্ষমতাসীনরা কিন্তু শুরু থেকেই নেতিবাচক মনোভাবের প্রকাশ ঘটিয়েছিলেন। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট যে সাত দফা পেশ করেছিল তার জবাবে কোনোটির প্রসঙ্গে আদালতের এবং কোনো কোনেটির প্রসঙ্গে সংবিধানের যুক্তি হাজির করেছিলেন তারা। অর্থাৎ সরাসরিভাবে না হলেও প্রকৃতপক্ষে সাত দফাকে নাকচই করা হয়েছিল। তা সত্ত্বেও ঐক্যফ্রন্টের নেতারা দ্বিতীয় দফা সংলাপে গিয়েছিলেন। পেশ করেছিলেন সংসদ ভেঙে দেয়ার এবং উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করার প্রস্তাব। কিন্তু এবারও এমন এক সংবিধানেরই দোহাই শুনতে হয়েছে, যে সংবিধানকে ক্ষমতাসীনরা দফায় দফায় নিজেদের ইচ্ছামতো সংশোধন করে রেখেছেন। ফলে সংলাপ ব্যর্থ হয়ে গেছে।

কথা শুধু সংবিধানেরই দোহাইসহ বিভিন্ন যুক্তির কারণে ওঠেনি। সরকারের কিছু কর্মকান্ড থেকেও বোঝা যাচ্ছিল, ক্ষমতাসীনরা আসলে সংকট কাটিয়ে ওঠার ব্যাপারে আন্তরিক নন। এসব কর্মকান্ডের মধ্যে গণগ্রেফতার এবং ‘গায়েবি’ মামলা এসেছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে। গত ৬ নভেম্বর রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঐক্যফ্রন্ট যে বিশাল সমাবেশের আয়োজন করেছিল তাকে ভন্ডুল করে দেয়ার জন্য সরকার সর্বাত্মকভাবে চেষ্টা চালিয়েছে। পথে পথে যানবাহন আটকে দেয়ার এবং হোটেলে পর্যন্ত ঢুকে গণহারে গ্রেফতার করার মধ্যেই তারা সীমাবদ্ধ থাকেননি, পুলিশ এমনকি সমাবেশ চলাকালে সমাবেশের ভেতরে ঢুকেও অসংখ্য নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে। আদালতে হাজির করে ‘গায়েবি’ মামলায় তাদের রিমান্ডে নিয়েছে। 

রাজশাহীতে ৯ নভেম্বর হতে যাওয়া সমাবেশের প্রাক্কালেও একই ধরনের কর্মকান্ডকে সর্বাত্মক করা হয়েছে। ঢাকা থেকে রাজশাহী যাওয়ার পথে যে সব জেলা রয়েছে সেগুলোর শত শত নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হচ্ছে বলে বিএনপি অভিযোগ করেছে। ঘটনাপ্রবাহে প্রধান খবর হিসেবে এসেছে যানবাহনের ধর্মঘট। বিশেষ কোনো কারণ ছাড়াই বুধবার আকস্মিকভাবে রাজশাহী থেকে সকল রুটের যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। বিএনপি নেতাদের অভিযোগ, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সমাবেশে জনগণ যাতে আসতে ও অংশ নিতে না পারে সেজন্যই সরকারের ইঙ্গিতে পরিবহন সেক্টরের সরকারপন্থী নেতারা ধর্মঘটের নামে যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখার আয়োজন করেছেন। 

এদিকে সর্বশেষ খবর হয়েছেন বেগম খালেদা জিয়া। বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের দাবি এবং আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে নাজিমউদ্দিন রোডের পরিত্যক্ত কারাগারে বন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে চিকিৎসার উদ্দেশ্যে বিএসএমএমইউ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। সেখানে তার চিকিৎসাও চলছিল। কিন্তু তিনি সুস্থ হওয়ার আগেই সংলাপ ব্যর্থ হওয়ার পরদিন ৮ নভেম্বরই তাকে আবারও নাজিমউদ্দিন রোডের পরিত্যক্ত কারাগারে ফিরিয়ে নেয়া হয়েছে। এজন্য তার চিকিৎসকদের অনুমোদন বা সম্মতি নেয়া হয়নি। সরকার বরং চাপ দিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সম্মতি আদায় করেছে। এ ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে নাইকো দুর্নীতি মামলায় বিশেষ আদালতে হাজির করার অজুহাত দেখানো হলেও বাস্তবে তাকে আরো একবার জেলের ভাত খাওয়ানোর পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। বলা হচ্ছে, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে সংলাপ ব্যর্থ হওয়ার কারণেই সরকার এই প্রতিহিংসামূলক পদক্ষেপ নিয়েছে।

বলার অপেক্ষা রাখে না, গণগ্রেফতার ও ‘গায়েবি’ মামলা থেকে রাজশাহীতে যানবাহনের আকস্মিক ধর্মঘট এবং খালেদা জিয়াকে আবারও জেলখানায় ফিরিয়ে নেয়া পর্যন্ত কর্মকান্ডগুলোর কোনোটিই প্রমাণ করে না যে, সংলাপ এবং সমঝোতার ব্যাপারে ক্ষমতাসীনদের সামান্য সদিচ্ছা বা আগ্রহ রয়েছে। তারা বরং যে কোনো প্রকারে আরো একটি প্রহসনের নির্বাচন করার পথেই এগিয়ে যেতে চাচ্ছেন। সেটা তারা চাইতেই পারেন। কিন্তু মনে রাখা দরকার, জনগণ সবই লক্ষ্য করছে। সুতরাং ক্ষমতাসীনদের সব ইচ্ছা ও পরিকল্পনা এবার সফল নাও হতে পারে। আমরা অবশ্য বিরোধী দলগুলোর সুরে ও ভাষায় এখনই গণঅভ্যুত্থানের ব্যাপারে সতর্ক করার পক্ষপাতী নই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ