ঢাকা, সোমবার 12 November 2018, ২৮ কার্তিক ১৪২৫, ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

আন্দোলনের অংশ হিসেবে নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের

গতকাল রোববার জাতীয় প্রেস ক্লাবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন ফ্রন্টের নেতা ড. কামাল হোসেন -সংগ্রাম

# দাবি মানা না হলে উদ্ভূত পরিস্থিতির দায় সরকার ও নির্বাচন কমিশনের--- ড. কামাল
# বর্তমান পরিস্থিতিতে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হওয়া অসম্ভব ব্যাপার --- মির্জা ফখরুল
স্টাফ রিপোর্টার : আন্দোলনের অংশ হিসেবে নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। গতকাল রোববার দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক জনাকীর্ণ সাংবাদিক সম্মেলনে ঐক্যফ্রন্টের পক্ষে বিএনপি মহাসচিব ও ফ্রন্টের মুখপাত্র মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই ঘোষণা দেন। এসময় তিনি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন স্বাক্ষরিত বক্তব্য পড়ে শুনান।
ড. কামাল হোসেন বলেন, ভীষণ প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলনের অংশ হিসেবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একইসঙ্গে নির্বাচনের বর্তমান তফসিল এক মাস পেছানোর দাবি জানিয়েছে তারা। তিনি বলেন, আমরা নির্বাচনের বর্তমান তফসিল বাতিল করে এক মাস পিছিয়ে দিয়ে নতুন তফসিল ঘোষণার দাবি করছি। সেই ক্ষেত্রেও বর্তমান সংসদের মেয়াদকালেই নির্বাচন করা সম্ভব হবে।
এখানে উল্লেখ্য, ২০০৮ সালের নির্বাচনে তৎকালীন ৪ দলীয় জোটের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার স্বার্থে নির্বাচনের তফসিল ২ দফা পিছিয়ে দেয়া হয়েছিলো। এসব দাবি আদায়ের সংগ্রাম জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট অব্যাহত রাখবে। সেই আন্দোলন সংগ্রামের পথে নির্বাচনে অংশগ্রহণকেও আন্দোলনের অংশ হিসেবেই বিবেচনা করবে ফ্রন্ট।
ড. কামাল তার লিখিত বক্তব্যে হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, একটা অংশগ্রহণমূলক এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের যাবতীয় দায়িত্ব সরকার ও নির্বাচন কমিশনের। নির্বাচনে অংশ নেয়ার প্রস্তুতির পাশাপাশি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট কড়া নজর রাখবে সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের আচরণের প্রতি। আমরা বলে দিতে চাই, জনগণের দাবি মানা না হলে উদ্ভূত পরিস্থিতির দায়-দায়িত্ব সরকার ও নির্বাচন কমিশনকেই নিতে হবে।
তিনি বলেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির তথাকথিত নির্বাচন মানুষের ন্যূনতম গণতান্ত্রিক অধিকার, স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার হরণ করেছে। নিশ্চিতভাবে আগামী নির্বাচনটি দেশের মানুষের ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের নির্বাচন হবে। সেই লক্ষ্যে মানুষ তার নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করার জন্য ভোটের ময়দানে থাকবে। আমরা বিশ্বাস করি, দশম সংসদ নির্বাচনের পর দেশে গণতন্ত্রের যে গভীর সংকট তৈরি হয়েছে, সেই সংকট দূর করে আমাদের ঘোষিত ১১ দফা লক্ষ্যের ভিত্তিতে একটা সুখী, সুন্দর, আগামীর বাংলাদেশ গড়ে তোলার সংগ্রামে দেশের জনগণ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পাশে থাকবে।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী আগামী ২৩ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ১৯ নবেম্বর মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন। বিএনপিকে জোটগতভাবে নির্বাচন করতে হলে শরিকদের প্রতীক বরাদ্দের জন্য রোববারের মধ্যে নির্বাচন কমিশনকে জানানোর বাধ্যবাধকতা ছিল। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, তফসিল ঘোষণার পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে নির্বাচন কমিশনকে জানানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তারই অংশ হিসেবে গতকাল নির্বাচন কমিশনকে বিএনপি জোটগতভাবে নির্বাচন করতে ইসিকে চিঠি দিয়েছে। তারা চিঠিতে বলেছে, ধানের শীষের অধীনে ৮টি নিবন্ধিত দল আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনে অংশ নেবে।
ড. কামাল হোসেন বলেন, দাবি আদায়ের আন্দোলন শুরু হয়ে গেছে। নির্বাচনের অংশগ্রহণ করার জন্য ও নির্বাচনে পরিবেশ ঠিক করার জন্য আন্দোলন চলবে। যখনই প্রয়োজন হবে সব কিছু করা হবে।
ঐক্যফ্রন্টের নির্বাচনের প্রতীক কী হবে প্রশ্ন করা হলে ড. কামাল হোসেন বলেন, প্রতীক পরে জানানো হবে। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট কী একক প্রতীকে নির্বাচন করবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা পরে সিদ্ধান্ত করে জানানো হবে।
আরপিও অনুযায়ী প্রচারণার জন্য সময়সীমা থাকা উচিত ২১ দিন। সেক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন যখন তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে তখন ছিলো ২৩ দিন। সেক্ষেত্রে আপনারা সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে আদালতে যাবেন কিনা জানতে চাইলে ড. কামাল হোসেন বলেন, আইনের আশ্রয় নিতে হলে সেটাও নেয়া হবে।
নির্বাচন কমিশনের সরকারের পক্ষে আজ্ঞাবহ কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে কামাল হোসেন বলেন, নির্বাচন কমিশন তড়িঘড়ি করে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করলো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার নির্ধারিত ৯০ দিনের ৩৫ দিন বাকী থাকতেই। তফসিল ঘোষণা করার পর দেশের নানা স্থানে সরকারি দলের আনন্দ মিছিল প্রমাণ করে এই কমিশন আসলে সরকারের চাহিদা মতোই তফসিল ঘোষণা করেছে।
১৯৯৬ সালে নির্ধারতি ৯০ তিন সময় শেষ হবার ১৩দিন আগে, ২০০১ সালে ১২ দিন আগে, ২০১৪ সালে ২০ দিন আগে নির্বাচন কমিশনের অতি তড়িঘড়ি করে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা আবারো প্রমাণ করে সরকার আসলে আলোচনার মাধ্যমে কোনো সমঝোতা চায়নি। এটা স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়, সরকারের যাবতীয় চেষ্টার উদ্দেশ্য হলো জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে নির্বাচনের বাইরে রেখে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির আদলে আরেকটি নির্বাচন করা।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য অত্যাবশ্যকীয় প্ল্যায়িং ফিল্ড এর ন্যূনতম শর্ত এখন পর্যন্ত পূরণ হয়নি। নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পরও বিটিভিসহ বিভিন্ন ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম নিয়ে ব্যাপক প্রচার চালানো হচ্ছে। যা নির্বাচনী আচরণ বিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। নির্বাচনে ইভিএম বাতিল না করারও সমালোচনা করেন ফ্রন্টের এই শীর্ষ নেতা।
ড. কামাল বলেন, আমরা জনগণের ঐক্যের ওপর জোর দিচ্ছি। আমাদের ইতিহাসে দেখা গেছে, যখনই জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়েছে তারা বিজয় ছিনিয়ে এনেছে। ইনশাল্লাহ এবারও হবে। জনগণ ঐক্যবদ্ধ হবে। সবচেয়ে বড় দাবি পরিবর্তন। সংবিধানের মূল্যবোধকে কেন্দ্র করে এই ঐক্য গঠন করা হয়েছে। নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের আস্থা অর্জন করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য এই ঐক্য।
সাংবাদিক সম্মেলনে বিএনপির ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার, জেএসডির আসম আবদুর রব, আবদুল মালেক রতন, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, গণফোরামের মোস্তফা মহসিন মন্টু, সুব্রত চৌধুরী, নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সুলতান মো. মনসুর আহমদ, গণস্বাস্থ্য সংস্থার ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীসহ ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
এছাড়া বিএনপির আবদুস সালাম, হাবিবুর রহমান, আইয়ুব ভুঁইয়া, গণফোরামের মোকাব্বির খান, জগলুল হায়দার আফ্রিক, আওম শফিকউল্লাহ, মোশতাক আহমেদ, রফিকুল ইসলাম পথিক, নাগরিক ঐক্যের আতিকুর রহমান জেএসডির শহিদ উদ্দিন মাহমুদ স্বপন, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের হাবিবুর রহমান খোকা প্রমুখ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্র ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট চিঠি দিয়ে সরকারের সঙ্গে সংলাপ করেছে। কিন্তু সংলাপের পর সরকারি দল সমঝোতার কোনও মনোভাব দেখায়নি। সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে আমরা সরকারের কাছে যে সাত দফা দাবি দিয়েছি, তার প্রায় সবগুলো তারা পূরণের কোনও আশ্বাস তো দেনইনি, উপরন্তু কয়েকটিকে অসাংবিধানিক অভিহিত করেছে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংলাপে বলেছিলেন আমরা সভা করলে কোনও বিধিনিষেধ থাকবে না। এছাড়া গায়েবি মামলায় বিএনপি নেতাদের ধরপাকড় বন্ধ করা হবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। রাজশাহীতে বিএনপির জনসভায় নেতাকর্মীদের আসতে বাধা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া একদিনেই প্রায় ৫২ জনেরও বেশি বিএনপি নেতাকর্মীকে আটক করা হয়েছে।
বর্তমান সরকারের চাহিদা অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণা করেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের তফসিল পেছানোর আহ্বানে সরকার সাড়া দেয়নি। আর নির্বাচন কমিশনার সরকারের চাহিদা অনুযায়ী তড়িঘড়ি করে তফসিল ঘোষণা করেছে। তড়িঘড়ি করে একাদশ জাতীয় সংসদের তফসিল ঘোষণা প্রমাণ করে সরকার সংলাপের পর কোনও সমঝোতায় যায়নি। কোনও শর্তই সরকার পালন করেনি। এই পরিস্থিতিতে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হওয়া অসম্ভব ব্যাপার। তারপরও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তিনি নির্বাচনের তারিখ এক মাস পিছিয়ে দেওয়ার দাবি জানান।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ