ঢাকা, শুক্রবার 16 November 2018, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ভয়াবহ মিথেন গ্যাসের ঝুঁকিতে ঢাকা

মুহাম্মদ নূরে আলম: ‘সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে ভয়াবহ মিথেন গ্যাসের ঝুঁকিতে রয়েছে ঢাকাসহ  দেশের শহরগুলো। এটি কার্বন ডাই অক্সসাইডের চেয়েও ২১ গুণ বেশি বিপজ্জনক। ঢাকা শহরে প্রতিজন মানুষ প্রতিদিন ০.৫৬ কেজি বর্জ্য উৎপাদন করছে জানিয়ে গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রতিদিন ৩ হাজার ৮০০ টন বর্জ্য তৈরি হচ্ছে। এর মধ্যে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই অর্গানিক বর্জ্য। এসব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত দুর্বল। ফলে বর্জ্য পচে গিয়ে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে এর সঙ্গে মিথেন গ্যাস ছড়িয়ে পড়ছে। যা জনস্বাস্থ্যসহ গ্রিন হাউজ প্রক্রিয়ায় ব্যাপক ক্ষতিকর প্রভাব সৃষ্টি করছে। গত অক্টোবর মাসে মিথেন গ্যাসের তীব্রতায় কমলাপুরের বক্স কালভার্ট বাস্ট হয়ে জনমনে আতঙ্ক তৈরী করে। আগামী ২০২৫ সালে সেটি বেড়ে গিয়ে দাঁড়াতে পারে ৪৭ হাজার ৫৪ টনে (সম্ভাব্য)। এ অবস্থায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিশেষ করে অর্গানিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিশেষ নজর দেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। বায়ুম-লে মিথেন গ্যাসের মাত্রা যে হারে বাড়ছে তাতে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন বিজ্ঞানীরা। মিথেন প্রথম আবিষ্কার করেন আলেসান্দ্রো ভোল্টা ১৭৭৬ সালের নবেম্বর মাসে। তিনি বেঞ্জামিন ফ্র্যাংকলিন কর্তৃক লেখা প্রজ্বলনীয় বাতাস পড়ার পর ঐ প্রজ্বলনীয় বাতাস অনুসন্ধান করার জন্য অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন মাগিওরি নামক এক জলাভূমিতে। ভোল্টা জলাভূমি থেকে ঊর্ধ্বগামী গ্যাস সংগ্রহ করেন এবং ১৭৭৮ সালে মিথেনকে একক গ্যাস হিসেবে পৃথক করেন। তিনি একটি বৈদ্যুতিক স্ফুলিঙ্গ দিয়ে এই গ্যাস প্রজ্বলিত করার উপায় প্রদর্শন করেন। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সূত্রে এই তথ্য জানাযায়। 

গবেষণায় বলা হয়, দিনে দিনে ঢাকায় শহরে ব্যাপক জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে ব্যাপক পরিমাণে অর্গানিজ (সবজি বা অন্যান্য পচনযোগ্য বর্জ্য) বর্জ্য উৎপাদন হচ্ছে। অর্থাৎ যেসব বর্জ্য পচে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে ঢাকা সিটি করপোরেশনের সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকায় এই ঝুঁকি দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে ঢাকার দরিদ্র জনগোষ্ঠী এই ক্ষতির শিকার বেশি হচ্ছে। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. এ টি এম নুরুল আলম বলেন, ‘অর্গানিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নজর দেওয়া খুবই প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সরকারিভাবে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসতে হবে।’

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকা শহরে জনসংখ্যার ঘনত্ব বাড়ছে। এক্ষেত্রে ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রতি স্কয়ার কিলোমিটারে ১৯৯১ সালে জনসংখ্যার ঘনত্ব ছিল ১৫ হাজার ৩৩৩ জন। সেটি বেড়ে ২০০৪ সালে হয়েছে ১৮ হাজার ৫৫ জন। ২০১১ সালে জনসংখ্যার এই ঘনত্ব আরও বেড়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছে ২৩ হাজার ২৯ জনে। ফলে ঢাকা শহরে বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। এগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বেকারত্ব, জ্বালানি শক্তির সংকট, পরিবেশ দূষণ এবং সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা।

গবেষণা প্রতিবেদনে, ঢাকার বাইরে পুরো দেশের শহরাঞ্চলের বর্জ্য উৎপাদনের একটি চিত্রও তুলে ধরা হয়েছে। এক্ষেত্রে বলা হয়েছে, ১৯৯১ সালের দেশের শহরগুলোতে প্রতিদিন ৬ হাজার ৪৯৩ টন বর্জ্য উৎপাদন হতো। ২০০৫ সালে এসে সেটি বেড়ে গিয়ে দাঁড়ায় ১৩ হাজার ৩০০ টনে। আবার আগামী ২০২৫ সালে সেটি বেড়ে গিয়ে দাঁড়াতে পারে ৪৭ হাজার ৫৪ টনে (সম্ভাব্য)। এ অবস্থায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিশেষ করে অর্গানিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিশেষ নজর দেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে বলা হয়েছে, প্লাস্টিক, সিলভারসহ এ ধরনের বর্জ্যগুলো এখন কিছুটা রিসাক্লিনিং করে পুনরায় ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু পুরো বর্জ্যের মধ্যে ৭৮ শতাংশ অর্গানিক বর্জ্যের কোনো ব্যবস্থাপনা হচ্ছে না। ঢাকা সিটি করপোরশেনের জনবল কম থাকায় তারা বর্জ্য সংগ্রহ করে জমিতে ফেলছে। ফলে সেখানে বর্জ্য পচে গিয়ে মাটি এবং ভূ-অভ্যন্তরীণ পানির উৎস এবং বাতাস দূষিত করছে।

প্রতিবেদনে এসবের জন্য ছোট আকারে মানুষ তাদের বাড়ির ছাদের উপর মাত্র দু’টি গাড়ির টায়ার ব্যবহার করে বায়োগ্যাস উৎপাদন করতে পারে। এতে পরিবারের রান্নার জ্বালানি চাহিদা পূরণের পাশাপাশি এখন থেকে যেসব বর্জ্য উৎপাদন হবে তা জৈব সার হিসেবে গাছে ব্যবহার করা যাবে। এটি বড় আকারে সরকারিভাবে যদি উদ্যোগ নেওয়া হয় তাহলে অর্গানিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বায়োগ্যাস উৎপাদন করা হলে মিথেন গ্যাস উৎপাদন বন্ধ হবে। পাশাপাশি কৃষকরা জমিতে জৈব সার হিসেবে উচ্ছিষ্টগুলো ব্যবহার করতে পারবে।

জমিতে জৈব সার ব্যবহার করা হলে তা রাসায়নিক সারের ব্যবহার ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ কম ব্যবহার করার প্রয়োজন হবে। পাশাপাশি ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে ৩০ শতাংশ, বলেও উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে। মিথেন গ্যাসের একটি বড় উৎস গবাদি পশু। কার্বন ডাই অক্সাইডের নির্গমন কমানোর মধ্য দিয়ে আমরা যে অগ্রগতি অর্জন করেছি, মিথেন গ্যাসের ছড়িয়েছে পড়ার কারণে সেই অগ্রগতি নষ্ট হয়ে যেতে পারে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, কার্বন ডাই অক্সাইডের তুলনায়, মিথেন গ্যাস, বায়ুম-লে তাপমাত্রা এক শতাব্দী কাল সময়ব্যাপী ৩০ গুণ বেশি ধরে রাখতে পারে।

সান ফ্রান্সিসকোতে অ্যামেরিকান জিওফিজিক্যাল ইউনিয়নের সম্মেলনের আগে প্রফেসর জ্যাকসন, মিথেনের ব্যাপারে বিজ্ঞানীদের সতর্ক করে দিয়েছেন। হঠাৎ করে মিথেনের ছড়িয়ে পড়ার মাত্রা কেনো বেড়ে গেছে- তার কারণ এখনও খুব একটা স্পষ্ট নয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ২০০০ সাল থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত মিথেন গ্যাস নির্গমনের হার, একটা পর্যায়ে এসে থিতু হয়ে পড়েছিলো। বায়ুম-লের তাপমাত্রা বেড়ে গেলে জলবায়ুতে বড়ো রকমের পরিবর্তন ঘটতে পারে।বায়ুম-লের তাপমাত্রা বেড়ে গেলে জলবায়ুতে বড়ো রকমের পরিবর্তন ঘটতে পারে। 

প্রফেসর জ্যাকসান বলছেন, মিথেনের অনেক উৎস আছে। তবে এই গ্যাস নির্গমনের হার এতো বেশি বেড়ে যাওয়ার পেছনে একটা কারণ হতে পারে - সম্ভবত কৃষি। মিথেনের প্রতিটি অনুতে আছে এক পরমাণু কার্বন ও চার পরমাণু হাইড্রোজেন। এটি একটি অ্যালকেন এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রধান উপাদান। মিথেনের আপেক্ষিক প্রাচুর্যতা এটিকে একটি আকর্ষণীয় জ্বালানীতে পরিনত করেছে। কিন্তু,সাধারণ তাপমাত্রায় যেহেতু এটি গ্যাসীয় অবস্থায় থাকে তাই মিথেনকে উৎস থেকে পরিবহন করা কষ্টসাধ্য। বায়ুমন্ডলীয় মিথেন একটি শক্তিশালী গ্রিনহাউজ গ্যাস (প্রতি এককে কার্বন ডাই অক্সাইড অপেক্ষা বেশি)। মিথেন একটি টেট্রাহাইড্রাল অণু যাতে চারটি সমতুল্য কার্বন-হাইড্রোজেন বন্ধন আছে। স্বাভাবিক তাপমাত্রা ও চাপে মিথেন একটি বর্ণহীন ও গন্ধহীন গ্যাস। নিরাপত্তার জন্য বাড়িতে ব্যবহৃত প্রাকৃতিক গ্যাসে পরিচিত গন্ধ সাধারণত ট্রেট-বিউথাইল নামক সুগন্ধক যোগ করার কারনে হয়। এক বায়ুমন্ডলীয় চাপে মিথেনের স্ফুটনাঙ্ক হচ্ছে -১৬১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বাতাসে যখন এর ঘনত্ব একটি সংকীর্ণ পরিসীমায় ৫ থেকে ১৫ শতাংশ এটি তখন শুধুমাত্র প্রজ্বলিত হয়। তরল মিথেন উচ্চ চাপ ছাড়া (সাধারনত ৪ থেকে ৫ বায়ুমন্ডলীয় চাপ) প্রজ্বলিত হয় না।

বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, প্রচুর মিথেন বায়ুমন্ডলে ছড়িয়ে পড়ছে উত্তর মহাসাগরের পারমাফ্রস্টের আবরণ ভেদ করে। পারমাফ্রস্ট হলো এক ধরনের মাটি। কয়েক বছর ধরে এ নিয়ে ব্যাপক গবেষণা চালান যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কা ফেয়ারব্যাংকস ইউনিভার্সিটির গবেষকরা। তাদের এ প্রতিবেদন ছাপা হয় নেচারে। এটি ছাপা হওয়ার পর থেকে মানুষের মধ্যে এ সংক্রান্ত সচেতনতা একটু হলেও বাড়ে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ