ঢাকা, মঙ্গলবার 20 November 2018, ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের নামে ১৩ হাজার মামলা ॥ আসামী ৩ লক্ষাধিক

* তফসিল ঘোষনার পর মামলা দেয়া হয়েছে ১১৫টি
* ২০১১ সাল থেকে কেন্দ্রীয় ও মহানগরী কার্যালয় বন্ধ
সামছুল আরেফীন : নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে গ্রেফতার অভিযান ততই বাড়ছে। গত রোববার বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর চট্টগ্রাম মহানগরী শাখার নায়েবে আমীর আফসার উদ্দিন চৌধুরীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এ নিয়ে আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে জামায়াতের ৯০ হাজার ৯১৩ জন নেতাকর্মী গ্রেফতার হয়েছে। ছাত্রশিবিরের ৯ হাজার ৫৮৪ জন। জামায়াতের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ১৩ হাজার ৯৫৪ জন, এতে আসামী করা হয়েছে ৩ লক্ষাধিক। গায়েবে মামলায় হয়েছে ১ হাজার ৩২৯টি। আর তফসিল ঘোষণার পর মামলা হয়েছে ১১৫টি। শুধু গ্রেফতার ও মামলাই নয় ২০১১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে বন্ধ রয়েছে জামায়াতে ইসলামী কেন্দ্রীয় ও ঢাকা মহানগরীর কার্যালয়। বন্ধ রয়েছে বিভিন্ন মহানগরসহ সারা দেশের কার্যালয়গুলো। জামায়াতে ইসলামীর কোনো অফিসেই কার্যক্রম চালাতে পারছে না দলের নেতাকর্মীরা।
বাংলাদেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ভূমিকা পালন করেছে জামায়াতে ইসলামী। অংশ নিয়েছে জাতীয় সংসদ থেকে শুরু করে স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিটি নির্বাচনে। আন্দোলন সংগ্রামের কারণে জামায়াতে ইসলামীর বহু নেতাকর্মী প্রাণ দিয়েছেন, পগুত্ব বরণ করছে অগণিত নেতাকর্মী। ২০০৯ সালে নির্বাচনের মধ্যদিয়ে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। এরপর বিরোধীদলের সভা সমাবেশে বাধা দেয়া শুরু হয়। এক পর্যায়ে জামায়াতে ইসলামীর সভা সমাবেশ অঘোষিতভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। ধীরে ধীরে ঘরোয়া বৈঠক বন্ধ করে দেয়া হয়। গ্রেফতার করা হয় জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে। ২০১১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর রাজধানীতে মিছিলকে কেন্দ্র করে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া বা ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।  ২০১১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর রাত ৮টা ৪০ মিনিটে পুলিশ জামায়াতের তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজহারুল ইসলামের মগবাজারের ওয়্যারলেস রেলগেটের এফ টাওয়ারস্থ বাসা ঘিরে ফেলে। এরপর পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে যায়। একই সময় পুলিশ মগবাজারস্থ জামায়াতের কেন্দ্রীয় অফিস ঘিরে ব্যাপক তল্লাশি চালায়। সেখান থেকে কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগের সেক্রেটারি অধ্যাপক তাসনীম আলম, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য অধ্যক্ষ ইজ্জত উল্লাহসহ ২৩ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। একই দিনে রাত ৮টার দিকে পল্টন থানা পুলিশ মহানগর জামায়াত অফিস থেকে বেশ কয়েকজন স্টাফকে আটক করে নিয়ে যায়। এ সময় পুলিশ মহানগর অফিসে তল্লাশির তাণ্ডব চালায়। তারা অফিস তছনছ করে। এরপর থেকেই বন্ধ রয়েছে কেন্দ্রীয় ও মহানগরী কার্যালয়সহ সারাদেশে কার্যালয়গুলো।
শুধু কার্যালয় বন্ধ করাই নয়, সারাদেশে নির্বিচারে গ্রেফতার ও গণহারে মামলা দেয়া হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত জামায়াতের নেতাকর্মীদের নামে মামলা হয়েছে ১৩ হাজার ৯৪৫টি। এতে আসামী করা হয়েছে ৩ লাখ। গ্রেফতার হয়েছে ৯০ হাজার ৯১৩ জন, এর মধ্যে মহিলা নেতাকর্মী রয়েছেন ১ হাজার ৫১ জন। ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের নামে মামলা হয়েছে ৯ হাজার ৫৮৪টি, আসামী করা হয়েছে ৩০ হাজার ৪৮৫ জন, গ্রেফতার হয়েছে ১৭ হাজার ২৫০ জন। এ ছাড়া ছাত্রী গ্রেফতার হয়েছে ৬৪৪জন। এ ছাড়া জামায়াতের নেতাকর্মীদের জন্য ১ হাজার ৩২৯টি গায়েবী মামলা হয়েছে। এ ছাড়া তফসিল ঘোষণার পর সারাদেশে মামলা হয়েছে ১১৫টি।
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিবেন এমন কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের মধ্যে কারাগারে আছেন নায়েবে আমীর মাওলানা আ.ন.ম শামসুল ইসলাম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ, কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সেক্রেটারি মুহাদ্দিস আবদুল খালেক, খুলনা মহানগরীর আমীর আবুল কালাম আজাদ, কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সদস্য শাহজাহান চৌধুরী, ঠাকুরগাও জেলা আমীর মাওলানা আবদুল হাকিম। কারাগারে রয়েছেন কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সেক্রেটারি অধ্যাপক আহসান উল্লাহ। সিরাজগঞ্জ-৪ (উল্লাপাড়া) আসনে সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খানের মনোনয়নপত্র সংগ্রহের পরই গ্রেফতার হয়েছেন জেলা আমীর মাওলানা শাহিনুর আলম।
এ ছাড়া দীর্ঘ দিন যাবত কারারুদ্ধ আছেন আর্ন্তজাতিক খ্যাতি সম্পন্ন মুফাসিসিরে কুরআন, কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, মাওলানা আবদুস সুবহান, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজহারুল ইসলাম।
জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর এবং সাবেক এমপি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য সেক্রেটারি জেনারেলের পক্ষে ৮ দফা দাবি জানানো হয়েছিল। কিন্তু কোনটাই মানা হয়নি। তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী নির্বাচনমুখী দল। এজন্যই আমরা নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সব দলই নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। কিন্তু বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে কিনা এই সন্দেহ রয়ে গেছে। তিনি বলেন, প্রার্থীদের ক্ষেত্রে এখনও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করা হয়নি। এক স্থানে ২জন খুনের ঘটনায় কেউ গ্রেফতার হয় না, আরেক স্থানে মামলা দিয়ে নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করা হয়। তিনি আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রী এখন স্বপদে থেকে প্রশাসনে প্রভাব বিস্তার করছেন। সিইসিও যা বলছেন, তা কতটুকু বাস্তবায়ন করতে পারবেন, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।  তিনি বলেন, তফসিল ঘোষণার পর বিভিন্ন স্থানে নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। এমন একটা পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে, এতে জাতির মনে সন্দেহঘনিভূত হচ্ছে আদৌ গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে কিনা। যদি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন না হয়, তাহলে ফ্যাসিবাদী শাসন দীর্ঘায়িত হবে, যা জাতির জন্য চরম দুর্ভাগ্য।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ