ঢাকা, মঙ্গলবার 20 November 2018, ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

পুলিশ প্রশাসনের ওপর নির্বাচন কমিশনের ন্যূনতম নিয়ন্ত্রণ নেই

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : পুলিশ ও জনপ্রশাসনের ওপর নির্বাচন কমিশনের নূূ্যূনতম কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই বলে মনে করছেন দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, তফসিল ঘোষণার আগে এবং পরে প্রধানমন্ত্রী এবং সিইসি একাধিকবার বলেছেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য। কিন্তু তফসিল ঘোষণার পর ১২ দিন অতিবাহিত হলেও এখনো তাদের দেয়া প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন দেখা যাচ্ছে না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সরকারের নির্দেশেই কাজ করছে। যদিও তফসিল ঘোষণার পর পুলিশ বাহিনী ইসির নির্দেশেই কাজ করার কথা। বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি ঘটনার উদাহরণ দিয়ে বলেন, মনোনয়নপত্র কেনা ও জমা দেয়ার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা ছিল খুবই প্রশ্নবিদ্ধ। শত শত গাড়ি আর হাজার হাজার নেতাকর্মী নিয়ে রাস্তা বন্ধ করে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীরা মনোনয়ন নিলেও সেখানে নির্বাচনের পরিবেশের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। পুলিশ ও প্রশাসন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা তো দূরের কথা কোন কথাই বলেনি। অথচ দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপির ক্ষেত্রে ঘটেছে তার উল্টোটা। দলটির মনোনয়ন প্রত্যাশীরা যখন নেতাকর্মীদের নিয়ে ফরম কিনতে আসলেন তখনই নির্বাচনী আচরণ বিধি নাকি লংঘন হয়েছে। তাদেরকে ইসির পক্ষ থেকে চিঠি দেয়া হলো। এমনকি নেতাকর্মী সরাতে গুলী ও লাঠিচার্জ করা হয়েছে। এছাড়া নির্বাচনী সহিংসতায় মোহাম্মদপুরে ক্ষমতাসীন দলের দুই নেতা মারা গেলেও এ নিয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি পুলিশ। মামলা হলেও মূল আসামী পরের দিনই জামিনে বের হয়ে আসেন। কারণ তিনি আওয়ামী লীগ নেতা। এছাড়া তফসিল ঘোষণার পরও নির্বাচনী কাজে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের পুলিশ গোপনে যেভাবে দলীয় পরিচয় খুঁজে বেড়াচ্ছে তাতে সর্বত্র সমালোচনার ঝড় বইছে। মানুষ জানতে চাইছে-পুলিশ এখন সরকার নাকি ইসির অধীনে। তারা পুলিশ ও প্রশাসনের এমন আচরণে নিরপেক্ষ নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন। তারা বলছেন, এই অবস্থা চলতে থাকলে কিভাবে নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকার ও ইসির এমন আচরণের কারণে বিরোধীসহ ভোটাররা ম্যাজেস্ট্রেসি ক্ষমতা দিয়ে সেনা মোতায়েনের দাবি জানিয়ে আসছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যে কোনো সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রথম ধাপ হচ্ছে-‘সবার অংশগ্রহণ’ নিশ্চিত করা। যা ইতিমধ্যে নিশ্চিত হয়েছে। নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও সরকারবিরোধীরা নির্বাচনে অংশগ্রহণের ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু তাদেরকে ভোটের মাঠে ধরে রাখতে বাকি ধাপগুলোও বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্লেষকরা। ধাপগুলো হচ্ছে- লেভেলপ্লেয়িং ফিল্ড (সবার জন্য সমান সুযোগ), আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ প্রশাসনের নিরপেক্ষ আচরণ, ভোটারদের নির্ভয়ে ভোট দেয়ার সুযোগ এবং স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ভোট গ্রহণ ও গণনার মাধ্যমে নির্বাচিত প্রার্থীকে বিজয়ী ঘোষণা। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা এবং ভোটাররা নির্ভয়ে ভোট দিতে পারবেন কিনা, সে বিষয় এখনও নিশ্চিত করা হয়নি বলে অভিযোগ সরকার বিরোধীদের।
সূত্র মতে, নানা জল্পনা-কল্পনার পর আসন্ন সংসদ নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়েছে। এখন অপেক্ষা- অবাধ, সুষ্ঠু ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচনের। বিশ্লেষকরা বলছেন, যা পুরোপুরি নির্ভর করছে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বৈষম্যহীন আচরণের ওপর। তাদের মতে, সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, সেগুলো এখনই কার্যকর করে দৃশ্যমান হওয়া খুবই জরুরি। এতেই নিশ্চিত হবে ‘লেভেলপ্লেয়িং ফিল্ড (সবার জন্য সমান সুযোগ)’।
আর এ ধরনের একটি অনুকূল পরিবেশে ভোটের আয়োজন করে নতুন ইতিহাস গড়ার ব্যাপারে ইতিমধ্যে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন সিইসি। কিন্তু এসব প্রতিশ্রুতি মাঠপর্যায়ে কতটুকু বাস্তবায়ন হবে- তা নিয়ে এখনও আছে যথেষ্ট সংশয়। আর যদি কোনো কারণে প্রধানমন্ত্রী ও সিইসির দেয়া বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা সম্ভব না হয়, তাহলে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে ভোটের মাঠে ধরে রাখা কঠিন হবে বলে শঙ্কা বিশ্লেষকদের।
এ ব্যাপারে ইতিমধ্যে আভাস দিয়েছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্র ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গত বুধবার ইসির সঙ্গে ঐক্যফ্রন্টের বৈঠক শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, বিরোধী দলের নির্বাচনে টিকে থাকাটা ইসি ও সরকারের আচরণের ওপর নির্ভর করছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত, বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো সবার অংশগ্রহণে এমন একটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে- যেখানে সংসদ রেখে এবং বর্তমান মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা (এমপি) স্বপদে থেকে নির্বাচন করবেন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মাঠপর্যায়ে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেন এমপিরা। তারা গত দশ বছরে তৃণমূলে সংশ্লিষ্ট সবার ওপর এক ধরনের প্রভাব বলয় সৃষ্টি করেছেন। আর এ বলয় ভেঙে প্রভাবমুক্ত হয়ে ইসির সংশ্লিষ্টরা কতটুকু নির্বিঘেœ কাজ করতে পারবেন, তা নিয়ে আছে শঙ্কা।
সূত্র মতে, আগামী ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠেয় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ‘লেভেলপ্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করতে বুধবার বেশ কয়েকটি বিষয় ইসির নজরে এনেছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। এগুলো হচ্ছে- ভোটের তারিখ তিন সপ্তাহ পেছানো, ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) একেবারেই ব্যবহার না করা, প্রতি কেন্দ্রে সেনাবাহিনী মোতায়েন, গায়েবি মামলা ও হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার ও কারাবন্দী নেতাকর্মীদের নিঃশর্ত মুক্তি দেয়া, জনপ্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনে রদবদল। প্রত্যেকটি বিষয়ে গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করার আশ্বাস দিয়েছে ইসি। তবে ইসির কাছে ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে এসব দাবি তুলে ধরার পর বিএনপির মহাসচিব সাংবাদিকদের বলেছেন, আমরা আমাদের দাবিগুলো তুলে ধরেছি, তারা বলেছে দেখবেন। আলোচনা করে জানাবেন। তারা তো সব সময়ই এ কথা বলেন। কতটুকু দেখবেন এখন সেটাই দেখার বিষয়। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে আসার ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে তিনি সবকিছুই করবেন। নির্বাচনে কোনো প্রকার কারচুপি-জালিয়াতি, কোনো কিছু হবে না। ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার (অবাধ ও সুষ্ঠু), ক্রেডিবল (বিশ্বাসযোগ্য) এবং অ্যাকসেপ্টেবল (গ্রহণযোগ্য) ইলেকশন হবে। জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী এবং নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে এসব প্রতিশ্রুতির কোনটিই পূরণ করা হয়নি। বরং বিরোধীদের পদে পদে নাজেহাল ও হয়রানি করা হচ্ছে। গ্রেফতারের ঘটনা চলছেই। প্রতিদিন বিরোধী নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। এমনকি নতুন নতুন মামলাও দেয়া হচ্ছে।
জানতে চাইলে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. সা’দত হুসাইন বলেন, অবাধ, সুষ্ঠু ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য সবার আগে প্রয়োজন ‘লেভেলপ্লেয়িং ফিল্ড’। এ ক্ষেত্রে সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) বৈষম্যহীন আচরণের প্রতি নিবেদিত হতে হবে। নির্বাচনের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী যেসব ওয়াদা করেছেন, সেগুলো রক্ষা করা খুবই জরুরি। পাশাপাশি ইসিকে সব ধরনের প্রভাবমুক্ত থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী আইন মোতাবেক নিজস্ব ক্ষমতা প্রয়োগ করতে হবে। বিশেষ করে প্রশাসন অথবা পুলিশের যেসব সদস্য আগের থেকেই দলীয়ভাবে চিহ্নিত তাদেরকে দ্রুত বদলে ফেলতে হবে। তিনি আরও বলেন, যারা রাজনীতির সঙ্গে জড়িত, তাদের গ্রেফতার করা থেকে বিরত থাকবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। প্রশ্ন উঠতে পারে যদি তারা অপরাধ করে তাহলে কি পুলিশ বসে থাকবে। আমার উত্তর হল, বসে থাকবে। কারণ যখন গ্রেফতার করা হয় তখন তো রাজনৈতিক কারণ দেখায় না। তখন দেখানো হয় ফৌজদারি অপরাধ বা গরু চুরি ইত্যাদি। তবে কেউ যদি জঘন্য অপরাধ (খুন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, অপহরণ, ঘুষ ইত্যাদি) করে, তাদেরকে গ্রেফতার করবে। এ ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কারণসহ ইসির অনুমতি নেয়া বাধ্যতামূলক হতে হবে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দু’তিন জায়গায় দেখেছি, গ্রেফতার না করার বিষয়ে হাইকোর্ট থেকে নির্দেশনা আনতে হয়েছে সংশ্লিষ্টদের। হাইকোর্টের নির্দেশনার মতো ইসিরও উচিত হবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সেই রকম কঠোর নির্দেশনা দেয়া।
সূত্র মতে, প্রশাসনে বদলী,পদোন্নতি এবং উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের কাজ ইসি অনুমোদন ছাড়া করা যাবে না চিঠি দেয়ার একদিন পরে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের ইকোনমিক ক্যাডার এবং প্রশাসন ক্যাডার একীভূত করলো সরকার। এ দুই ক্যাডার একীভূতকরণের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।
জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক উপদেষ্টা ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, বিরোধীদের নির্বাচনে আসার ঘোষণায় মানুষের মধ্যে প্রাথমিক স্বস্তি এসেছে। কিন্তু সরকার নিয়ন্ত্রণমূলক নির্বাচনের আকাক্সক্ষা থেকে সরে এসেছে, তার পুরোপুরি নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি। প্রচার-প্রচারণার দিক থেকে ‘লেভেলপ্লেয়িং ফিল্ড’ নেই। এ ক্ষেত্রে গায়েবি মামলা দিয়ে বিরোধীদের হয়রানির একটি চিত্র আমরা লক্ষ করছি। এসব মামলায় নিরীহ মানুষকেও হয়রানি করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সংবিধানের দোহাই দেয়ার অবকাশ নেই। কারণ সংবিধান গায়েবি মামলার অনুমতি দেয়নি। তার মতে, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা অপরিসীম। বিশ্বাসযোগ্যতার জায়গাগুলো তারা নিশ্চিত করতে পারবে কিনা, সেটি দেখার বিষয়। তিনি বলেন, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে নির্বাচন কমিশনের লোকজনের থাকা উচিত ছিল। কিন্তু সেখানে প্রশাসন থেকে বানানো হয়েছে। এ ক্ষেত্রে প্রভাবিত করার একটি সুযোগ থাকে। ড. হোসেন জিল্লুর বলেন, ভোটাররা ভোট দিতে যেতে পারবেন কিনা সেটি বড় প্রশ্ন। কারণ কিছু কিছু প্রার্থীর আচরণে দেখা গেছে ভোটের দরকার নেই, দলের মনোনয়ন পেলেই মনে করেন, তারা এমপি হয়ে গেছেন। এটি একটি ভয়ের কারণ।
পুলিশ ও প্রশাসন যে নির্বাচন কমিশনের অধীনে নেই তার বড় প্রমাণ হলো নির্বাচনী আচরণবিধি মানা হচ্ছে না। আচরণবিধি অনুযায়ী, ভোটের ২১ দিন আগে কোনো ধরনের প্রচার-প্রচারণা চালানো যাবে না। বাস্তবে প্রচার-প্রচারণা চালানো হচ্ছে। শোডাউন ও মিছিল চলছে। গাড়ি বহর নিয়েও প্রচারণা চালাতে দেখা গেছে সরকার দলীয়দের। নৌকার প্রতীকসহ ছবি, ভোট দেয়ার আহ্বান সম্বলিত পোস্টার গাড়ির সামনে সেঁটে বিরাট এক গাড়ির বহর নিয়ে সিলেটে দুটি মাজার জিয়ারত করেছেন। ওদিকে নির্বাচন কমিশন আচরণবিধি অনুযায়ী রাজধানীসহ সারাদেশে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সাঁটানো পোস্টার ব্যানার, বিলবোর্ড ইত্যাদি অপসারণে দু’দফা সময় বেধে দিলেও ওইসব প্রচার-সামগ্রী বেশির ভাগ স্থানে বিরাজমান রয়েছে। আচরণবিধি ভঙ্গের কাজটি প্রথম করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী দু’জনের সমর্থকদের মধ্যে তুমুল সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে এবং তার জেরে দু’জন গাড়ি চাপায় নিহত হয়। পক্ষান্তরে বিএনপির কেন্দ্রীয় অফিসের সামনে পুলিশ ও বিএনপি কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা এবং দু’পক্ষে শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনী আচরণবিধি কার্যকর করা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব। কিন্তু নির্বাচন কমিশন এখন পর্যন্ত তার নিরপেক্ষতা প্রদর্শন করতে পারেনি। শুরু থেকেই যদি আচরণবিধি কার্যকর করার ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হতো তাহলে আচরণবিধি লংঘনের ঘটনা এভাবে ঘটতে পারতো না। নির্বাচনী প্রতীক বরাদ্দের পর নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা শুরু হবে। তখন আচরণবিধি লংঘনের আশংকা বাড়বে।
নির্বাচন নিয়ে ইসির ব্যর্থতা ফুটে উঠছে তাদের বক্তব্যেই। নির্বাচন কমিশনার মাহবুর তালুকদার রির্টানিং অফিসারদের উদ্দেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেন, অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক হলেও বলতে হচ্ছে, এই নির্বাচন কমিশনের অধীনে স্থানীয় সরকার পর্যায়ের অনেকগুলো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও ব্যক্তিক্রম বাদে কোনো নির্বাচনই অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়নি। জনগণ, বিরোধী রাজনৈতিক দল ও পর্যবেক্ষক মহল এই নির্বাচন কমিশনে হতাশ। অনেকে এমন কি এও বলতে চান, এ নির্বাচন কমিশন পূর্ববর্তী নির্বাচন কমিশনের চেয়েও দুর্বল ও আজ্ঞাবাহী। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন কি জনগণের অধিকার ফিরিয়ে দিতে আন্তরিক ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ? অবস্থাদৃষ্টে সেটা মনে হয় না। বরং মনে হয়, সরকারের ইচ্ছাপূরণেই নির্বাচন কমিশন অধিকতর সক্রিয়। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে এটি আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানম সহকারী রিটার্নিং অফিসারদের উদ্দেশে দেয়া বক্তব্যে বলেছেন, নির্বাচন শতভাগ সুষ্ঠু হবে না। এটা পৃথিবীর কোনো দেশেই হয় না। একজন নির্বাচন কমিশনারের পক্ষে এধরনের মন্তব্য করা কতটা সমীচীন, তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। এতে নির্বাচন কমিশনের অক্ষমতাই স্পষ্ট হয়নি, আন্তরিকতাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। এর মাধ্যমে নির্বাচন সংশ্লিষ্টদের কাছে একটি বার্তা গেছে। বার্তাটি হলো, নির্বাচনে কিছু এদিক-সেদিক হলেও তেমন কিছু হবে না। জনগণসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এ থেকে একটা ভিন্ন বার্তা পেয়ে যেতে পারে। তাহলো, নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না, সুষ্ঠু করার সদিচ্ছা নির্বাচন কমিশনের নেই। স্মরণ করা যেতে পারে, গত আগস্ট মাসে সিইসি ‘জাতীয় নির্বাচনে অনিয়ম হবে না, এমন নিশ্চয়তা দেয়ার সুযোগ নেই’, বলে মন্তব্য করেছিলেন। সে সময় তার এ বক্তব্য নিয়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। তখন কবিতা খানমসহ চার নির্বাচন কমিশনার তার বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বলেছিলেন, এটা ইসির বক্তব্য নয়, সিইসির ব্যক্তিগত অভিমত। তখন মাহবুব তালুকদার একটু এগিয়ে গিয়ে বলেছিলেন, সিইসির এমন বক্তব্য নির্বাচনে অনিয়মকারীদের উস্কে দিতে পারে। সিইসির বক্তব্যে দ্বিমত পোষণকারী সেই কবিতা খানমই এখন সিইসির বক্তব্যকে অন্যভাবে প্রত্যায়ন করেছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বাচনের অনুকূল পরিবেশ বলতে যা বুঝায় তা এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। পরিবেশ প্রতিষ্ঠার জন্য নির্বাচন কমিশনের কার্যকর কোনো প্রয়াসও দেখা যাচ্ছেনা। জাতীয় ঐক্যফ্রণ্টের সঙ্গে দৈনিক পত্রিকার সম্পাদকদের মত বিনিময় সভায় বক্তরা বলেন, সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টিই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। লেভেলপ্লেয়িং ফিল্ড ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন আশা করা যায় না। নির্বাচন কমিশন ও সরকারকেই সেটা নিশ্চিত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, নির্বাচন দলীয় সরকারের অধীনে হতে যাচ্ছে, সংসদ বহাল রেখে হতে হতে যাচ্ছে। অন্যদিকে সরকার সিভিল প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনকে নিজের মতো করে সাজিয়ে রেখেছে। এমতাবস্থায় নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং প্রতিষ্ঠা বা নির্বাচনের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা খুবই কঠিন কাজ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেছেন, পৃথিবীর কোনো দেশের নির্বাচন কমিশনই সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যাপারে সন্দেহমূলক কোনো কথা বলেন না। কেননা, এতে জনগণের মধ্যে ভীতি সৃষ্টির পাশাপাশি নির্বাচন কমিশন সম্পর্কে ভুল বার্তা যায়। বরং বহু দেশেই শতভাগ সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, নেপাল ও ভুটান এর বড় প্রমাণ। তারা বলেন, শতভাগ সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়’- এ ধরনের কথা বললে নির্বাচনে যারা অনিয়ম করে, তাদের উৎসাহিত করা হয়। সুতরাং সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যাপারে ইসির কোনো অজুহাত ও দৃষ্টান্ত মানুষ গ্রহণ করবে না। মানুষ একটি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু, অবাধ, শান্তিপূর্ণ এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আশায় অধীর আগ্রহে বসে আছে। বিশ্লেষকদের আরও অভিমত, বড় দু’দলের মনোনয়ন ফরম বিক্রিকে কেন্দ্র করে যে ঘটনা ঘটেছে তাতে প্রমাণিত হয় যে, খোদ ইসিই অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারছে না।
সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, সম্প্রতি বড় দুটি দলের মনোনয়ন বিক্রিকে কেন্দ্র করে যে ঘটনা ঘটেছে সেটা প্রমাণ করে এই কমিশন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারছে না। এসব ঘটনা ও তার পরিপ্রেক্ষিতে বিলম্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ তাদের নিরপক্ষেতা ও দক্ষতার অভাবের পরিচায়ক। তারা নিরপেক্ষ না থেকে নির্বাচন পরিচালনা করলে কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।
এদিকে নির্বাচন কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা ব্যক্তিদের সম্পর্কে কি পুলিশ বা গোয়েন্দা বিভাগ খোঁজখবর নিতে পারে?  এনিয়ে দেশে বিদেশে সমালোচনার ঝড় বইছে। অনেকে বলছেন, নিয়োগ পাওয়ার আগে সরকার ইুচ্ছে করলে সেটি পারে।  কিন্তু নিয়োগ পাওয়ার পর এ বিষয়ে অন্য কারও নাক গলানো উচিত নয়। বিষয়টি পুরোপুরি নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ারে। তারা যাকে যোগ্য মনে করেছেন, তাকে নির্বাচনের দায়িত্ব দিয়েছেন। বাংলাদেশ সংবিধানের ১২০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘নির্বাচন কমিশনের ওপর ন্যস্ত দায়িত্ব পালনের জন্য যেরূপ কর্মচারীদের প্রয়োজন হইবে, নির্বাচন কমিশন অনুরোধ করিলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কমিশনকে সেইরূপ কর্মচারী প্রদানের ব্যবস্থা করিবেন।’ এর অর্থ হলো নির্বাচন কমিশন যাকে নিয়োগ দেবে, তাকেই মেনে নিতে হবে। কিন্তু গত কয়েক দিন পত্রিকায় নির্বাচন কর্মকর্তাদের সম্পর্কে পুলিশ বিভাগ যেভাবে খোঁজখবর নিচ্ছে, তা শুধু এখতিয়ারবহির্ভূত নয়, বেআইনিও। সংশ্লিষ্টদের মনে রাখা প্রয়োজন, নির্বাচন কর্মকর্তারা নিয়োগ পেয়েছেন বিরোধী দলের তালিকা অনুযায়ী নয়, নির্বাচন কমিশনের পক্ষে রিটার্নিং কর্মকর্তারাই এই তালিকা তৈরি করেছেন, যারা সদাশয় সরকারের মাঠপর্যায়ের শীর্ষ কর্মকর্তাও। এখন নির্বাচন কর্মকর্তাদের সম্পর্কে পুলিশের খবরদারি করা রিটার্নিং কর্মকর্তা তথা নির্বাচন কমিশনকে চ্যালেঞ্জ করার শামিল। কয়েক দিন ধরে প্রথম আলোয় এ নিয়ে একাধিক খবর প্রকাশিত হলেও নির্বাচন কমিশন অনেকটা নির্বিকার। একজন নির্বাচন কমিশনার বলেছেন, কমিশন থেকে পুলিশ বিভাগকে এ রকম কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি। তাহলে পুলিশ কি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে কাজটি করছে? যদি তারা তা করে থাকে, নির্বাচন কমিশনের উচিত এখনই বন্ধ করা। কিন্তু তারা সেসব না করে লুকোচুরি খেলছে।
 দৈনিকটির প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর থেকে জানা যায়, প্রায় সব জেলায়ই পুলিশ নির্বাচন কর্মকর্তাদের সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়েছে। আমাদের একজন সহকর্মী সম্প্রতি উত্তরাঞ্চলে গিয়েছিলেন ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কাজে। তিনিও এসে জানালেন, নির্বাচনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা ভয়ভীতিতে আছেন। পুলিশের লোকজন তাদের জিজ্ঞাসা করছেন, আপনি এর আগে নির্বাচনী দায়িত্ব পালন করেছিলেন কি না। আপনি কোনো রাজনৈতিক দলের বা ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে জড়িত কি না? খুবই নিরীহ প্রশ্ন। এই নিরীহ প্রশ্নের আড়ালের সত্যটি হলো, আপনি ‘ক’ দলের সঙ্গে জড়িত থাকলে কোনো অসুবিধা নেই। কিন্তু ‘খ’ দলের সঙ্গে জড়িত থাকলেই সমস্যা।
সংবিধান অনুযায়ী তফসিল ঘোষণার পর প্রজাতন্ত্রের সব কর্মচারী (অন্তত নির্বাচনী কাজে নিয়োজিত) নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ারে চলে গেলে পুলিশ বিভাগের লোকজন তার বাইরে থাকতে পারেন না। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেও যেই প্রশাসন ছিল, এখনো সেই প্রশাসন কাজ করছে। তবে পার্থক্য হলো তারা নির্বাচন কমিশনের এখতিয়ারে চলে গেলেন। আমাদের মন্ত্রীরা একসময় গলা ফাটিয়ে বলতেন, নির্বাচনের জন্য নির্দলীয় বা নিরপেক্ষ (তত্ত্বাবধায়ক শব্দটি ইচ্ছে করেই উল্লেখ করলাম না, সংবিধানবহির্ভূত এ রকম একটি শব্দ ব্যবহারের জন্য তারা মামলাও ঠুকে দিতে পারেন) সরকারের প্রয়োজন নেই। ক্ষমতাসীন সরকারই নির্বাচনকালীন সরকার হিসেবে রুটিন কাজ করে যাবে এবং স্বাধীন নির্বাচন কমিশনই হবে সবকিছুর নিয়ন্তা হবে। এখন দেখা যাচ্ছে, তারা সবকিছুর নিয়ন্তা নন। তাদের ওপরের নিয়ন্তা হচ্ছে পুলিশ।
সার্বিক বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের সিনিয়র শিক্ষক মুহাম্মদ ইয়াহ্ইয়া আখতার বলেন, এটি নির্বাচন কমিশনের ফাইনাল পরীক্ষা। তিনি বলেন, বাংলাদেশে যতগুলো দুর্বল নির্বাচন কমিশন কাজ করেছে, তার মধ্যে একটি হল বর্তমান কমিশন। এ কমিশনের গঠনপ্রক্রিয়া থেকে শুরু করে পৌনে দু’বছরের কাজকর্ম ও বক্তব্য-বিবৃতি বিশ্লেষণ করে এমনটি বলা যায়। কাগজে-কলমে স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হলেও কাজকর্মের মধ্য দিয়ে কমিশন এর স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। সে কারণে কমিশনের ওপর সরকারি দল ব্যতীত অন্যান্য দল ও জনগণের আস্থা গড়ে ওঠেনি। তিনি বলেণ, ইসি এখন কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন। এটাই ইসির ফাইনাল পরীক্ষা। রেফারির ভূমিকা পালন করে নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন করার এ পরীক্ষার প্রথম সেমিস্টারে মনোনয়নপত্র গ্রহণ ও জমাদানের আয়োজনে বিএনপির সঙ্গে বিমাতাসুলভ আচরণ করে ইসি ফেল করেছে। এ পরীক্ষার সামনের সেমিস্টারগুলোয় ইসি অত্যন্ত সতর্ক, স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও পেশাদার ভূমিকা পালন করতে পারলেই কেবল নির্বাচন সুষ্ঠু হতে পারে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ