ঢাকা, মঙ্গলবার 20 November 2018, ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

‘দুর্নীতি’ নিয়ে মুখোমুখি দুদক-এনবিআর

#  নিরপেক্ষ তদন্ত করলে দুদকেরও দুর্নীতি বেরোবে -এনবিআর চেয়ারম্যান
#  এনবিআরকে দুদক চেয়ারম্যান ‘জেনে-শুনে-বুঝে মন্তব্য করুন’
তোফাজ্জল হোসেন কামাল : ‘দুর্নীতি’ নিয়ে মুখোমুখি হয়ে পড়েছে দুর্নীতি বিরোধী একমাত্র রাষ্ট্রীয় সংস্থা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এক সপ্তাহের ব্যবধানে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ এই দুটি প্রতিষ্ঠানের প্রধানগণ ‘দুর্নীতি’ নিয়ে স্ব-স্ব অবস্থান নিয়ে ‘ইংগিতপূর্ণ’ কথা বলে একে অপরকে দোষারোপ করে বাকযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছেন। পর্যবেক্ষকমহল এটাকে ‘মুখোমুখি’ অবস্থান হিসেবে দেখছেন।
গত ১১ নবেম্বর দুপুরে এনবিআর এর সেগুনবাগিচাস্থ প্রধান কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান  মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেছেন, নিরপেক্ষ তদন্ত করলে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা দুদকেরও দুর্নীতি বেরিয়ে আসবে। এনবিআরের আয়কর বিভাগে দুর্নীতির উৎস চিহ্নিত করে দুদকের প্রতিবেদনের প্রতিক্রিয়ায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান এ কথা বলেন।
তার এক সপ্তাহ পর গতকাল ১৯ নবেম্বর সোমবার দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়ার মন্তব্যে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ। তার বক্তব্যকে ‘হাস্যকর’ উল্লেখ করে তাকে জেনে, শুনে, বুঝে মন্তব্য করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
সাবেক সচিব মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগের এক মামলায় দুদকের হাতে গ্রেপ্তার হয়ে পরে মামলা থেকে খালাস পান।
গতকাল সোমবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে এক অনানুষ্ঠানিক ব্রিফিংয়ে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, ‘কোনো প্রতিষ্ঠানই বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে না, তারা ধোয়া তুলসিপাতা। আমরা বুক ফুলিয়ে স্বীকার করি আমাদের এখানে দুর্নীতি আছে। আমরা ব্যবস্থাও নিই। আমাদের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারীর চাকরি গেছে। অনেকের বিভাগ পরিবর্তন হয়েছে। অনেককে অন্য কোথাও চাকরিতে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে।’
গত ৮ নবেম্বর আয়কর বিভাগে দুর্নীতির উৎস এবং তা প্রতিরোধে সুনির্দিষ্ট সুপারিশমালা পাঠানো হয় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে। তাতে দুর্নীতির ১৩টি উৎস এবং সার্বিক দুর্নীতি প্রতিরোধে ২৩ দফা সুপারিশ ছিল। ওই প্রতিবেদন প্রসঙ্গে এনবিআর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া উষ্মা প্রকাশ করেন। ১১ নবেম্বর আয়কর মেলা নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করলে দুদকেও নানা ধরনের দুর্নীতি বের হবে। তিনি বলেন, শুধু কর ও শুল্ক বিভাগকে লক্ষ্য করে কোনো কিছু করা হলে এবং এসব বিভাগে দুদকের অফিস করতে চাইলে, সেটা হতে দেয়া হবে না।
দুদক চেয়ারম্যান বলেন, ‘এনবিআরের দুর্নীতি দূর করা, কারণ বা উৎস অনুসন্ধান আমাদের কাজ নয়। কাউকে ধরে জেলে দেয়াও আমাদের কাজ নয়। আমরা স্পাই (গোয়েন্দা) নই। এটা আপনার কাজ। আপনার দায়িত্ব। আপনি কী ব্যবস্থা নিয়েছেন, “টেল আস” (আমাদের বলুন)।’
ইকবাল মাহমুদ বলেন, ‘সবকিছু স্বীকার করতে সাহস লাগে। ভিশন লাগে। আমরা চাই সবাই দুদকের দুর্নীতির উৎস খুঁজুক। আমরা সবার সমালোচনা ইতিবাচকভাবেই দেখি।'
আয়কর বিভাগের দুর্নীতির কারণ চিহ্নিত করা ও সুপারিশ প্রসঙ্গে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, সরকারের কাছে দেওয়া ওই অনুসন্ধান ও সুপারিশের বিষয়টি আমলে নেওয়ার দায়িত্ব সরকারের। তিনি আরও বলেন, ‘এটা শতভাগ সঠিক না-ও হতে পারে। আমরা আমাদের প্রতিবেদনের কোথাও কি লিখেছি যে আমরা এনবিআরে আমাদের অফিস বসাতে চাই? এটা নিয়ে হঠাৎ করা তার (এনবিআর চেয়ারম্যান) মন্তব্য হাস্যকর।’
এর আগে আয়কর বিভাগের দুর্নীতি প্রতিরোধে দুদকের পরিচালক মীর মো. জয়নুল আবেদীন শিবলীর নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের প্রাতিষ্ঠানিক টিমের রিপোর্ট অনুমোদন করে দুদক। প্রাতিষ্ঠানিক টিম বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের সাথে আলোচনা করে, আয়কর বিভাগ, কাস্টম এক্সাইজ ও ভ্যাট সংক্রান্ত বিভিন্ন নথি/রেকর্ডপত্র পর্যালোচনা করে ওই প্রতিবেদন তৈরি করেছে দুদক।
দুদক নিয়ে যে কথা বলেছিলেন এনবিআর চেয়ারম্যান
এনবিআরের আয়কর বিভাগে দুর্নীতির উৎস চিহ্নিত করে দুদকের প্রতিবেদনের প্রতিক্রিয়ায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেছেন, নিরপেক্ষ তদন্ত করলে দুর্নীতিবিরোধী এই সংস্থায়ও দুর্নীতি বেরিয়ে আসবে। দুদক কর-কাস্টমস বিভাগকে ‘টার্গেট’ করে সেখানে তাদের ‘অফিস স্থাপনের’ চেষ্টা করলে তা হবে না বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।
এনবিআরের আয়কর বিভাগের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতির ১৩ উৎস এবং এসব দুর্নীতি প্রতিরোধে ২৩টি সুপারিশ করে যে  প্রতিবেদন মন্ত্রিপরিষদ সচিব বরাবর জমা দিয়েছে দুদক, সে বিষয়ে সাংবাদিকরা এনবিআর চেয়ারম্যানের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি এটা (দুদক প্রতিবেদন) এখনও পাইনি। এ ব্যাপারে আমি দুদকের সাথে দ্বিমত পোষণ করি। কারণ হল, আপনি যদি একেবারে নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করেন তাহলে দুদকের দুর্নীতিও কত ধরনের সেটা বের করতে পারবেন। “কাজেই সকলেরই দুর্নীতি আছে আমাদের দেশে, এই সংস্কৃতিটা পরিবর্তন করতে হবে। সেটি পরিবর্তনের জন্য আমাদের সামাজিক ব্যবস্থার পরিবর্তন করতে হবে।”
এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, “দুদক যা-ই বলুক, যে রিপোর্টই দিক না কেন ইনকাম ট্যাক্স আইন এবং কাস্টমস আইন অনুযায়ী যদি তাদের অ্যাক্টিভিটিজ আমাদের এখানে অ্যালাও করে তাহলেই শুধু করতে পারবে, আদারওয়াইজ নট।”
দুর্নীতি আগের চেয়ে কমেছে মন্তব্য করে মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে মানুষের মধ্যে আরও সচেতনতা বাড়ানো দরকার। সরকারের সৎ কর্মকর্তাদের পুরস্কার এবং অসৎ কর্মকর্তাদের তিরষ্কার করার ব্যবস্থা রাখতে হবে।
দুদকের প্রতিবেদনে আয়কর মেলা আয়াজনে ‘বিলাস-বহুল ব্যয় হয়’ বলে যে পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়েছে তার সঙ্গেও দ্বিমত রয়েছে এনবিআর চেয়ারম্যানের। তিনি বলেন, “আপনারা দেখেন কোনটা বিলাসবহুল? একটা একজন চিন্তা করতে পারে সেটি বিলাসবহুল, সেটি বিলাসবহুল হতে পারে; আবার আরেকজন এটাকে প্রয়োজন মনে করে বলে সেটি বিলাসবহুল নয়। এক সময় কোনো বিলাসবহুল হবে না।”

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ