ঢাকা, শুক্রবার 23 November 2018, ৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস ‘উপমহাদেশ’: একটি পর্যালোচনা

হোসেন মাহমুদ : আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে বড় ঘটনা হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ। সুদীর্ঘকালের স্বাধীনতা আন্দোলনের পরিসমাপ্তি ঘটে এ মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে। নয়মাসের মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন দেশ হিসেবে বিশ্বের বুকে ঐতিহাসিক অভ্যুদয় ঘটে বাংলাদেশের । যে কানো জাতির মতই এই স্বাধীনতা জাতি হিসেবে আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের অমূল্য রতœ। অতুলনীয় সাহস, বীরত্ব, আত্মত্যাগের ভিত্তিভূিমর উপর সগৌরবে আজ দন্ডায়মান স্বাধীন বাংলাদেশ। এর পরিণতিতে আমাদের সাহিত্যে নতুন বিষয় হিসেবে সংযোজিত হয় মুক্তিযুদ্ধ।  এই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এ পর্যন্ত লেখা হয়েছে অনেক উপন্যাস, হচ্ছে এখনো। কোনো কোনো সমালোচক বলেন,  এ পর্যন্ত রচিত আমাদের কোনো উপন্যাসেই মুক্তিযুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ চিত্র নেই। অর্থাৎ জাতীয় জীবনের এই সবচেয়ে প্রধান ঘটনাটির পূূর্ণচিত্রণ আমাদের কোনো উপন্যাসে দেখা যায় না। ২০১৮ সালে মুক্তিযুদ্ধের ৪৭ বছর পেরিয়ে গেছে। এ প্রায় অর্ধ শতক সময়েও আমাদের সাহিত্যের এ অপূর্ণতা ঘুঁচেনি। তবে তা হোক আর না হোক, মুক্তিযুদ্ধ কেন্দ্রিক উপন্যাস লেখা হতে হতে কেউ হয়ত একটি পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস একদিন লিখবেন , এ প্রত্যাশা আমরা করতে পারি। 

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যারা উপন্যাস লিখেছেন, আল মাহমুদ তাদের মধ্যে অন্যতম। আল মাহমুদের প্রধান পরিচয় তিনি কবি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পূর্বে কবিতাই ছিল তার সাহিত্য-অন্বিষ্ট। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে তিনি কথাসাহিত্য রচনায় নিয়োজিত হন। এ পর্যায়ে ছোটগল্পের পাশাপশি তার হাত দিয়ে বেরিয়ে আসে বেশ কয়েকটি উপন্যাস।  সেগুলোর মধ্যে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধ কেন্দ্রিক উপন্যাস। দেখা যায়, আল মাহমুদের এ রকম উপন্যাসের সংখ্যা দু’টি। এগুলো হল ‘উপমহাদেশ’ ও ‘কাবিলের বোন’। উপন্যাস দু’টির মধ্যে প্রথমটি সম্পর্কে ঐপন্যাসিকের নিজ ভাষ্য হলঃ ‘ ‘উপমহাদেশ’ মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক আমার প্রথম বড় রচনা। এ দেশের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গল্প-উপন্যাসের সঙ্গে এই বইটির মৌলিক পার্থক্য আছে। যারা মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন না কিম্বা মুক্তিযুদ্ধের সংঘাত, সংঘর্ষ নিজের চোখে প্রত্যক্ষ করেননি তারাও মুক্তিযুদ্ধের উপর সার্থক গ্রন্থ রচনা করেছেন। ..... তবে ‘উপমহাদেশ’ বইটি সবটাই বানানো নয়। এতে কল্পকাহিনি আছে বটে, তবে প্রত্যক্ষদর্শীর অভিজ্ঞতাও আছে। এ বইটির সার্থকতা এখানে।’ 

২.

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ যে এক অসাধারণ ঘটনা তা বলার অপেক্ষা রাখে না। একই সাথে তা এক ব্যাপকবিস্তৃত ঘটনাও বটে। একটি-দু’টি -দশটি নয়Ñ হাজার হাজার তথা অসংখ্য ঘটনা দিয়ে নয়মাসের মুক্তিযুদ্ধের রক্তলাল মালাটি গাঁথা। ২৫ মার্চ মধ্যরাতের প্রাক্কালে ঢাকায় অপারেশন সার্চলাইট’ শুরুর মাধ্যমে নৃশংস হত্যা ও নির্মম ধ্বংসের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষের জীবনে নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছিল। এপ্রিল থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত গোটা বাংলাদেশই পরিণত হয়েছিল রণাঙ্গনে।  এই যে নয় মাসের কালপর্ব তা একদিকে ছিল পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর হামলাÑ তাদের জ¦ালাও-পোড়াও ও হত্যাযজ্ঞÑ অন্যদিকে ছিল বেদখল মাতৃভূমির মুক্তিপিয়াসী তরুণ-যুব সমাজ, বিদ্রোহী পুলিশ-আনসার-সেনাসদস্যদের মরণপণ লড়াইয়ের ইতিবৃত্তে পূর্ণ। এ হচ্ছে সংঘাতের দিক। মুক্তিযুদ্ধের আরেকটি দিক ছিল সাধারণ মানুষের অপরিসীম দুর্দশা, ভোগান্তি, মৃত্যুভয়, নারীদের সম্ভ্রমহানি, সর্বোপরি পাকিস্তানী সৈন্য ও তাদের দোসরদের অত্যাচার-নির্যাতন থেকে বাঁচার জন্য দেশত্যাগ। শহর-নগরে বাসা , বাড়ি আর গাঁও-গেরামের পৈতৃক ভিটেমাটি ছেড়ে প্রায় এক কোটি মানুষের দেশত্যাগের ঘটনা ছিল গোটা বিশে^ই নজিরবিহীন। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধকালে এত সংখ্যক মানুষ উদ্বাস্তু হয়নি।  এ উদ্বাস্তুরা বাংলাদেশ থেকে ভারত পর্যন্ত পৌঁছতে অনেকেই ডাকাতি-লুটপাটের শিকার হয়ে শেষ সম্বল কানাকড়ি, জিনিস পত্র হারিয়েছেন, মারা গেছেন, নারীদের কেউ কেউ শ্লীলতাহানি, ধর্ষণের মত বিভীষিকাময় পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন। মুক্তির যুদ্ধে বিশে^র অন্য কোথাও যেমন কোরিয়া যুদ্ধ কিংবা কিউবা, ফিলিস্তিন, আলজেরিয়া, ভিয়েতনামের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের মত এত বিপুল সংখ্যক মানুষের এমন উদ্বাস্তু হওয়ার ঘটনা ঘটেনি। এখানে বলা দরকার যে এ সব দেশের কোনোটিতেই বাংলাদেশের মত বিরাট মাপের জনসংখ্যা ছিল না। আর ভারতে যারা উদ্বাস্তু হয়েছিলেন তাদের সিংহভাগই ছিলেন হিন্দু জনগোষ্ঠী যারা ভারতে উদ্বাস্তু হয়েছিলেন তাদের দুঃখ-দুর্দশা ছিল অপরিসীম, অবর্ণনীয়, কিন্তু রোগে মৃত্যু ছাড়া নানা কষ্ট-অসুবিধার মধ্যেও তাদের জীবনের নিশ্চয়তা ছিল। অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে যারা ছিলেন তারা ছিলেন নরকের অধিবাসী, কবি শামসুর রাহমানের কবিতার ভাষায় বন্দীশিবিরে আটক। রাজধানী ঢাকাসহ সকল বিভাগীয়, জেলা, মহকুমা ও থানা শহরগুলোতে পাকিস্তানী সৈন্য, বিহারি, রাজাকারদের ক্যাম্প ছিল। তারা ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের সন্ধান ও দমনে ভীষণ ভাবে তৎপর।  বলা নিষ্প্রয়োজন যে মুক্তিযুদ্ধের গোটা সময়ে সমগ্র শহরাঞ্চল, বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রাম পরিণত হয় সন্ত্রাসের নগরীতে। সারাদেশে বাস, ট্রেন , লঞ্চ, নৌকা ও অন্যান্য যানবাহনে চলাচল ছিল মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। পাকিস্তানী সৈন্য ও তাদের দোসরদের টার্গেট ছিল মালাউন ও মুক্তি। যাকে সন্দেহ হয়েছে তাকেই তারা গুলী করে হত্যা করেছে। কিছু লোককে আটক করে বন্দী শিবিরে নিয়ে হত্যা করেছে বা আটকে রেখেছে, সামান্য কিছু সংখ্যককে জেলখানায় পাঠিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এভাবে হারিয়ে গেছে কত মায়ের প্রিয় পুত্র, কত স্ত্রীর প্রাণাধিক স্বামী, কত সন্তানের ¯েœহময় পিতা। আর অসংখ্য নারী হারিয়েছেন তাদের অমূল্য সম্ভ্রম। 

আমাদের মুক্তিযুদ্ধে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ বিভিন্নভাবে অংশগ্রহণ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধ যুদ্ধ হয়েছে দু’ভাবে। অস্ত্র ছাড়া ও অস্ত্র হাতে। অস্ত্রছাড়া বলতে বোঝায় বে-সামরিক কর্মকান্ড (রাজনৈতিক- কূটনৈতিক কর্মকান্ড, সংবাদপত্র প্রকাশ, স্বাধীন বাংলা বেতারের শব্দ সৈনিকেরা, সঙ্গীত শিল্পীগণ, ফুটবল খেলোয়াড়রা, বিদেশে জনমত গঠন ইত্যাদি)। এতে নেতৃত্ব দেন  শীর্ষ আওয়ামী লীগ নেতাদের একটি অংশ যারা প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার গঠন করে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেছেন। সে সময়ের কিছু তরুণ আমলা ও আরো কিছু কর্মকর্তা তাদের সাথে সরকারের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। অনেক এমপি ও আওয়ামী লীগ নেতা মুক্তিযুদ্ধ সংগঠকের কাজ এবং ভারতের বিভিন্ন সীমান্তে মুক্তিযুদ্ধে যোগদানেচ্ছু তরুণ-যুবকদের আশ্রয় ক্যাম্প পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন।  অস্ত্র হাতে বলতে বোঝায় তাদের যারা মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নিয়েছেন অর্থাৎ রণাঙ্গনে লড়াই করেছেন।  তাদের মধ্যে ছিলেন বাঙালি সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা ও গেরিলারা। নিয়মিত বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন সেনা, বিমান ও নৌ বাহিনীর অফিসার ও সৈন্যরা এবং তৎকালিন ইপিআর সদস্যরা।  সশস্ত্র বাহিনি ও ইপিআর সদস্যরা প্রথমে সেক্টর কমান্ডারদের অধীনে ছিলেন। পরে তাদের এস ফোস, জেড ফোর্স ও কে ফোর্সের আওতায় বিন্যস্ত করা হয়।  মুক্তিযুদ্ধের একেবারে শেষ দিকে আত্মপ্রকাশ করে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী। বেসামরিক তরুণ ও যুবকদের ভারতের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে সংক্ষিপ্ত সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে গঠিত গেরিলা বাহিনী ১১টি সেক্টরে বিভক্ত বাংলাদেশের ১০টি সেক্টরে ১০ জন সেক্টর কমান্ডারের অধীনে মুক্তিযুদ্ধে নিয়োজিত হয়।  মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার বিহীন ১০ নং সেক্টর ছিল নৌ এলাকা  যেখানে সক্রিয় ছিলেন নৌ কমান্ডো দল।  পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা এবং আনসার-মুজাহিদ বাহিনীর যারা ছিলেন তারাও গেরিলা বাহিনীর অন্তর্ভুক্ত হন। এ ছাড়া দেশের অভ্যন্তরে কতিপয় দুঃসাহসী সাবেক সেনা সদস্য বা বেসামরিক ব্যক্তির অধীনে তাদের স্ব স্ব নামে স্বতন্ত্র মুক্তিযোদ্ধা বাহিনী গড়ে ওঠে যারা আমাদের মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।   

উপর্যুক্ত বর্ণনার মধ্য দিয়ে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বৈশিষ্ট্য সমূহের সংক্ষিপ্ত রূপ তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক কোনো উপন্যাসে এসব বৈশিষ্ট্যের উপস্থাপন ছাড়া একটি পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস হওয়ার কথা নয়। কিন্তু একটি মাত্র উপন্যাসে এতসব বৈশিষ্ট্য ও রূপ ধারণ করা প্রকৃতপক্ষে অসম্ভব ব্যাপারই বটে। তাই স্বাভাবিক কারণেই মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে যত উপন্যাস এ পর্যন্ত রচিত হয়েছে তার কোনোটিই মুক্তিযুদ্ধের সমগ্রতাকে ধারণ করেনি। তবে বিভিন্ন ঔপন্যাসিক নিজ নিজ সৃষ্টিশক্তির উপর নির্ভর করে স্বল্প পরিমাণ বাস্তবতা ও ব্যাপক ভিত্তিক কল্পনার সমন্বয়ে মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস রচনা করেছেন।  সেগুলোর অধিকাংশেই মুক্তিযুদ্ধের আবহ আছে, কিন্তু প্রকৃত চিত্রটি অনুপস্থিত। এর মূল কারণ হল অভিজ্ঞতা না থাকা। কারণ আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক উপন্যাস যারা লিখেছেন তারা কেউই ভারতের কোনো প্রশিক্ষণ শিবিরে সংক্ষিপ্ত সামরিক প্রশিক্ষণ নেননি, কেউ সশস্ত্র বাহিনী বা গেরিলা বাহিনির সদস্য ছিলেন না। তারা কেউই সম্মুখ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি।  তারা যুদ্ধক্ষেত্রের ভয়ংকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হননি, তাদের কারোরই গুলী বর্ষণ বা গ্রেনেড ছুঁড়ে পাকিস্তানী বাহিনীর বাংকার ধ্বংসের অভিজ্ঞতা নেই, তারা কানে তালা ধরানো কামানের গোলার বিস্ফোরণের শব্দ শোনেননি, তাদের পাশ দিয়ে শিস কেটে যায়নি শত্রুর বুলেট, তারা কোনো সহযোদ্ধাকে গুলী খেয়ে মৃত্যুবরণ করতে দেখেননি। তারা কেউ কেউ হয়ত পাকিস্তানী সৈন্যদের নির্মম নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ বা অন্যান্য নিষ্ঠুরতার কিছুটা দেখেছেন এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে আরো নানা ধরনের বিবরণ শুনেছেন।  তারই ভিত্তিতে তারা উপন্যাস রচনা করেছেন। অস্ত্র হাতে লড়াই না করলে যে মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস লেখা যায় না তা নয়, তবে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা বিষয়বস্তুকে প্রামাণ্য ও বিশ^াসযোগ্য করতে সহায়তা করতে পারে।  সে অভিজ্ঞতা তাদের কারোরই নেই। 

৩.

আল মাহমুদ আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় ভারতে গিয়েছিলেন তা আমরা তার বরাতেই জানতে পারি। কিন্তু তিনি সম্মুখযোদ্ধা (গেরিলা) ছিলেন বলে আমরা জানি না। তিনি স্বাধীন বাংলা বেতারের সাথে জড়িত হওয়ার পাশাপাশি ভারতীয় পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি করেছেন। তাই তাকে কলম সৈনিক বলাই ভালো।  পরবর্তীকালে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তিনি দুটি উপন্যস লিখেছেনÑ ‘উপমহাদেশ’ ও ‘কাবিলের বোন।’ ‘উপমহাদেশ’ একটি মাসিক পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হয়। পরে ১৯৯৩ সালে শিল্পতরু প্রকাশনী এটি গ্রন্থাকারে প্রকাশ করে। সম্প্রতি প্রকাশিত আল মাহমুদ রচনাবলির ৫ম খন্ডে এটি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। আল মাহমুদের এ উপন্যাসটি যখন প্রকাশিত হয় তার আগের দু’দশকে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বেশ কিছু উপন্যাস প্রকাশিত হয়ে গেছে। বিশেষ করে শওকত ওসমান ও সৈয়দ শামসুল হক এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। কিন্তু তাদের দু’জনের মধ্যে কেউই অস্ত্র হাতে মুক্তিযুদ্ধ করেননি। শওকত ওসমান ‘৭১-এ মুক্তিযুদ্ধকালে ভারতে চলে গিয়েছিলেন এবং দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ফিরে আসেন। অন্যদিকে সৈয়দ শামসুল হক মুক্তিযুদ্ধের সময় লন্ডন চলে যান পরবর্তী কয়েক বছর সেখানেই অবস্থান করেন। কিন্তু তারপরও তারা দু’জনেই সবচেয়ে বেশী মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস রচনা করেছেন।  

‘উপমহাদেশ’ প্রথম পুরুষের বয়ানে রচিত। এর প্রধান চরিত্র তথা সমগ্র কাহিনী বয়ানকারী  নায়ক ঢাকার পাকিস্তান আর্টস কাউন্সিলের লাইব্রেরিয়ান সৈয়দ হাদী মীর। তিনি একজন বেশ পরিচিত কবিও, বয়েস পঁয়ত্রিশের দিকে। ঢাকায় ২৫ মার্চের ঘটনার পর এক পর্যায়ে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় তার নিজের বাড়ির দিকে রওনা হয়ে নারায়ণপুর বাজারে এসে অবস্থান করতে থাকেন। তার আসার দু’দিন আগে তার স্কুল শিক্ষিকা স্ত্রী হামিদা তার ছোটভাইকে নিয়ে ঢাকা থেকে দেশের বাড়ির দিকে রওনা হয়েছিলেন। কিন্তু তার কোনো সন্ধান হাদী মীর পাচ্ছিলেন না। ইতিমধ্যে আগরতলায় অবস্থানরত পার্বত্য চট্টগ্রামের ডিসি, প্রবাসী বাংলাদেশ  সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা তার ভগ্নিপতি  হোসেন তৌফিক ইমাম ও বোনের কাছে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের মাধ্যমে চিঠি দেন। চিঠিতে নিজের বর্তমান অবস্থান জানালে ভগ্নিপতি ও বোন তাকে আগরতলা যাওয়ার জন্য মুক্তিযোদ্ধা আনিসকে পাঠান। নারায়ণপুর থেকে নৌকাযোগে তারা ভারত সীমান্তের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার সময় ঘটে প্রথম নাটকীয় ঘটনা। নৌকায় ত্রিশজনের বেশী যাত্রী নেয়া সম্ভব নয়। (চলবে)

 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ