ঢাকা, শুক্রবার 23 November 2018, ৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ১৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

রেলে এক বছর ব্যবধানে জ্বালানী তেলের    ব্যবহার বেড়েছে ২৮ হাজার টন বেশি!

কামাল উদ্দিন সুমন : অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে রেলের জ্বালানী তেলের ব্যবহার। এক বছরেরর ব্যবধানে ২৮ হাজার টন বেশি জ্বালানী ব্যবহার হয়েছে রেলে। মূলত জ্বালানীর ব্যবহারের নামে তেল চুরিই মূল উদ্দেশ্য বলে মনে করেছেন সংশ্লিষ্টরা । তবে সব সময় অধরাই থেকে যায় রেলের তেল চোর সিন্ডিকেট। 

রেলপথমন্ত্রী মুজিবুল হক বলেন, রেলের তেল চুরি ঠেকাতে মন্ত্রণালয় একাধিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আগামীতে সফটওয়্যারের মাধ্যমে মনিটরিং করা হবে। আধুনিক এ পদ্ধতি চালু হলে চুরি কমে যাবে। তবে সফটওয়্যার পদ্ধতি চালুর বিষয়টি কিছুটা সময়সাপেক্ষ হওয়ায় মনিটরিং কার্যক্রম এখনো শতভাগ পরিপালন হচ্ছে না বলে স্বীকার করেন তিনি।

সূত্র জানায়, গত দুই বছরে রেলওয়েতে সার্ভিস বাড়েনি, ইঞ্জিনের ব্যবহারও বেড়েছে যৎসামান্য। তারপরও এক বছরের ব্যবধানে জ্বালানি তেলের ব্যবহার বেড়েছে ৬৭ শতাংশেরও বেশি। মূলত চুরির কারণেই রেলে জ্বালানির ব্যবহার অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে বলে জানিয়েছেন খোদ রেল কর্মকর্তারাই।

জানা যায়, বাংলাদেশ রেলওয়েতে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে জ্বালানি তেল (ডিজেল) ব্যবহার হয়েছিল ৪১ হাজার ৬৯৮ টন। কিন্তু ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এসে ডিজেলের ব্যবহার এক লাফে বেড়ে হয় ৬৯ হাজার ৮২২ টন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জ্বালানির ব্যবহার বেড়েছে ২৮ হাজার ১২৪ টন বা ৬৭ দশমিক ৪৫ শতাংশ। যদিও একই সময়ে রেলের ইঞ্জিনের ব্যবহার বেড়েছে মাত্র ৬ দশমিক ৯৭ শতাংশ।

রেলওয়ে ইনফরমেশন বুকস-২০১৭ পরিসংখ্যান প্রতিবেদনে রেলের বিগত ১১ বছরের জ্বালানি তেল ব্যবহারের তথ্য সন্নিবেশ করা হয়েছে। ওই প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, কয়েক বছর ধরে রেলে জ্বালানি তেলের ব্যবহার স্বাভাবিক নিয়মে বাড়লেও ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এসে তা এক লাফে অস্বাভাবিক বেড়ে যায়। রাষ্ট্রায়ত্ত এ পরিবহন সংস্থায় ২০০৭-০৮ অর্থবছরে ৩৫ হাজার ৩৬৮ টন, ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ৩৫ হাজার ৬৫৫, ২০০৯-১০ অর্থবছরে ৩৫ হাজার ৫৫৪, ২০১০-১১ অর্থবছরে ৩৫ হাজার ৪৮৫, ২০১১-১২ অর্থবছরে ৩৪ হাজার ৯৬২, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ৩৫ হাজার ৩৭, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৩৬ হাজার ২৫২ ও ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৩৬ হাজার ৮৯২ টন জ্বালানি তেল ব্যবহার হয়েছে। এ সাত বছরে জ্বালানির মোট ব্যবহার বেড়েছে মাত্র ১ হাজার ৫২৪ টন। কিন্তু ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এসে হঠাৎ করেই জ্বালানি ব্যবহার বেড়ে ৪১ হাজার ৬৯৮ টনে দাঁড়ায়। এর পরের বছর অর্থাৎ ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তা আরো বেড়ে ৬৯ হাজার ৮২২ টনে উন্নীত হয়, যা অস্বাভাবিক বলে মনে করছেন খোদ রেলওয়ে কর্মকর্তারা।

রেলের নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, লোকোমোটিভে জ্বালানি তেলের ব্যবহার খুব একটা না বাড়লেও বিবিধ খাতে এর ব্যবহার বেশ বেড়ে গেছে। গত প্রায় এক দশকে রেলের বিবিধ খাতে জ্বালানি তেলের ব্যবহার এক-দেড় হাজার টনে সীমাবদ্ধ থাকলেও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এ খাতে তেলের ব্যবহার হয়েছে ২৫ হাজার ৮৫৬ টন, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে ২৪ হাজার ২৭১ টন বেশি। মূলত বিবিধ খাতের জ্বালানি ব্যবহার অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাওয়ার ফলে চুরির বিষয়টি সামনে চলে এসেছে। রেলের সংশ্লিষ্ট বিভাগের ঊর্ধ্বতন একাধিক কর্মকর্তা রেলের তেল চুরি হওয়ার বিষয়টি স্বীকারও করেছেন।

রেলের তেল চুরির বিষয়টি উঠে এসেছে রেলপথ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির বিভিন্ন সভায়ও। রেলের অপারেশনাল রিভিউ মিটিংয়েও (ওআরএম) বিভিন্ন সময় তেল চুরির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এসব  বৈঠকে রেলের তেল চুরি ঠেকাতে বিশেষায়িত সফটওয়্যার তৈরির বিষয়েও আলোচনা হয়। তবে একাধিক  বৈঠকে এ বিষয়ে তাগাদা দেয়া সত্ত্বেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।

রেলওয়ে সূত্র জানায়, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরই রেলওয়ে বিভিন্ন রুটে একাধিক নতুন ট্রেন সার্ভিস চালু করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে রেলে জ্বালানি তেলের ব্যবহার আগের কয়েক বছরের তুলনায় বেড়ে যায়। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৩৬ হাজার ৮৯২ টন ডিজেল ব্যবহার হলেও ২০১৫-১৬ অর্থবছরে তা ৪ হাজার ৮০৬ টন বেড়ে ৪১ হাজার ৬৯৮ টনে উন্নীত হয়। কিন্তু গত দুই বছরে রেলওয়ের সার্ভিস বাড়েনি। তার পরও ডিজেলের ব্যবহার এক লাফে ২৮ হাজার টন বেড়ে যাওয়ার কোনো কারণ খুঁজে পাচ্ছে না রেলের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো। এজন্য বিবিধ খাতে জ্বালানি তেল ব্যবহার যুক্ত করে তেল চুরির বিষয়টি সমাধান করতে চাইছে তারা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে রেলের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, রেলের তেল চুরির বিষয়টি কারো অজানা নয়। রেলের সার্ভিস না বাড়লেও এক বছরের ব্যবধানে জ্বালানি তেলের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ার কোনো কারণই নেই। আলোচ্য বছরে রেলের যাত্রী পরিবহন খাতে আয় বেড়েছে শুধু নির্ধারিত ট্রেনগুলোতে স্ট্যান্ডিং টিকিট বিক্রি থেকে। এছাড়া পণ্য পরিবহন খাতে নির্ধারিত ট্রেনগুলোতে কাঙিক্ষত পণ্য পরিবহন হওয়ায় আয়ে প্রবৃদ্ধি দেখা দিয়েছে। ফলে আয় বৃদ্ধির সুযোগ নিতে বিভিন্ন স্থান থেকে তেল চুরির মাধ্যমে রেলের ব্যয়ও উপর্যুপরি বাড়ানো হচ্ছে বলে মনে করছেন তিনি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, লোকোমাস্টার, লোকো ইন্সপেক্টর, শেডম্যান, শেডের বুকিং ক্লাকরাই রেলের তেল চুরির সঙ্গে জড়িত। তবে এসব চুরির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মৌন সম্মতি রয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) থেকে তেল সংগ্রহের সময় এবং শেড কিংবা স্টেশনে ইঞ্জিনে তেল লোডিংয়ের সময় চুরির ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটে। এছাড়া মালবাহী ট্রেনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন স্টপজে থেমে থাকার সময় ইঞ্জিন থেকে তেল সরিয়ে নেয়া হয়। যাত্রীবাহী কোনো ট্রেনে তেল চুরির ঘটনা তেমন একটা না ঘটলেও শেড ও ওয়ার্কশপে থাকাকালীন তেল চুরি হয় বলে দাবি করেছেন রেলের পরিবহন বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা। রেলের অধিকাংশ ইঞ্জিন পুরনো হওয়ায় লিটারপ্রতি ইঞ্জিনের কিলোমিটার গতি নির্ধারণ করতে না পারায় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অভিযোগ পাওয়ার পরও তেল চুরির বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয় রেল কর্তৃপক্ষ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ