ঢাকা, শুক্রবার 30 November 2018, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ২১ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

খেজুর গাছি দাদু

শরীফ সাথী :  শীতের দিন। দিন ছোট হওয়ায় ক্ষেত খামারে কাজ করতেই বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে আসে। দিল আলী গাছি দাদুর শীত এলে কাজের মাত্রা বেড়ে যায়। দুপুর পেরুতেই মাঠে ছুটতে হয়। পাটাচোরা তীরধরা মাঠে দিল আলী দাদুর বিশাল খেজুর বাগান। শ' দুয়েক গাছের মধ্যে পালা করে তিন ভাগে তার কাটতে হয়। জিড়েন কাটা গাছের রস খুব ভালো হয়। দিল আলী দাদুআজ একটু আগে ভাগেই এলো মাঠে। ভাড়গুলো ভালো মতো ধুয়ে, শুকনো জায়গায় লম্বা করে মাঝে ধানগাছের পোয়াল বিছিয়ে দুপাশে সারি করে সাজিয়ে পোয়ালের একপ্রান্তে মেছ ঠুকে আগুন ধরালো। আগুন এবং আগুনের ফুলকিতে পাজায় দেওয়া আগুনের মতো সমস্ত ভাড়গুলোর ভিতর শুকিয়ে ঝনঝনে কনকনে হলো। হাতে টোকা দিতেই বেজে উঠলো একেকটি ভাড়। ভালো মতো শুকনো না হলে ভাড়, রস ঘোলা হয়। সবগুলো ভাড়ে দড়ির গলান পেঁচিয়ে নিল।

এবার দাদু একটি কড়া করে পানে চুন সুপারি মশলা দিয়ে সেজে মুখে দিলো। উঠে দাঁড়িয়ে মাজায় গাছ কাটা দড়িসহ ঠোঙা বেঁধে নিলো। ঠোঙার ভিতর দা হেসো ঢুকিয়ে আঙটায় একটি ভাড় বেঁধে নিয়ে গাছের সাথে দড়ি ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে ঠকাস ঠকাস করে উপরে উঠে পড়লো। দিন তিনেক পর  খেজুর গাছ কাটায় সূর্যের আলোয় গাছের কপাল বা ঠিকড়ে বেশ শুকিয়েছে। এপ্রান্ত ওপ্রান্ত সুন্দর পাতলা করে কপাল কাটতেই নলি বেয়ে রস টপটপ করে পড়তে লাগলো। গাছের একপাশে পোতা গোজে ভাড়ের গলান দড়ি কায়দা মতন বেঁধে নলি ভাড়ের মুখে সেট করে  খেজুর গাছের সরপা দিয়ে ভাড়ের মুখঢেকে দাদু নেমে আসলো। সন্ধা অবধি একের পর এক  খেজুর গাছ নলিয়ে রস সংগ্রহে গাছ কাটলো দাদু।

বাংলার গ্রাম্য মাঠে মাঠে এমন বৈচিত্রময় দৃশ্য দেখতে কার না ভালো লাগে? রাস্তার ধারে কিংবা নদীর তীরে আর জমির আইলে এমন অপূর্ব  খেজুর গাছ কাটার দৃশ্য দু'চোখকে এক অনাবিল ছোঁয়ায় পরশ বিলায়। আবেগ আনন্দঘন অদ্ভুদময় গ্রামীন বাড়ি সমাজের দৃশ্যায়ন কত যে মধুময়। ভালো লাগা ভালোবাসার সীমাহীন অকৃত্রিম বন্ধন। পারিবারিক হাসি আনন্দ খুশির এক অন্যরকম ফুরসত। যা স্মৃতি চোখে ভাসা অমলিন ছবি।

 রাত পেরিয়ে ভোর হলো। মুয়াজ্জিনের আযানে ঘুম ভাঙলো দিল আলী দাদুর। হাত মুখ ধুয়ে অযু করে নামাজ আদায় করে দাদু বাক কাঁধে নিয়ে ছুটলো মাঠে। নগা বাঁধিয়ে একেক করে গাছের রস ভর্তি ভাড়গুলো নামালো। উঁচু গাছগুলোয় গাছে তরতর করে উঠে ভাড় নামিয়ে আনলো। সব ভাড়ের রস একেক ভাড়ে ভর্তেই ভাড় বিশেক রসে ভর্তি হলো। বাকের দুদিকে দাদু দু'ভাগ করে সাজিয়ে নিয়ে বাড়ি ফিরে এলো। দুষ্টু নাতি নাতনীদের সবাইকে ডাকলো। ক'ভাড় রস হয়েছে গুণতে বলল। এক দুই তিন নাতিরা গুণতে লাগলো আর দিল আলী দাদু ভাড়ের রস ছাঁকনে ছেঁকে চুলোয় সাজানো জালায় বা টালায় ঢেলতে লাগলো। জালার আকার মুখে দাদি বসে শুকনো বেগো আর নাদার জ্বালে বাইন গনগনে করে তুললো, রসে টলোমলো জালায় ধীরে ধীরে গাঁদ উঠতে লাগলো। ওড়োং দিয়ে এপাশ ওপাশ ঘুরে দাদু গাদ ফেলতে লাগলো। দুষ্টু নাতি নাতনীরা কাপে ঢেলে ঠা-া রস পাট খড়ি পাইপ বানিয়ে চুষে চুষে খেতে খেতে আগুন পোহাতে লাগলো। জালায় জ্বালরত রসগুলো তাত রস পেরিয়ে গুড়ের আকার ধারণ করলো। আচ্ছা মতন ঘুটে জ্বাল নিভিয়ে নিচের একপ্রান্তে দুদিকের হাতল ধরে নামানো হলো জালাসহ গুড়। এবার বিচকাটি দিয়ে মনের মতন গুড়ের বিচ তোলা হলো। নলানো গুড়ে দানা বেঁধে এলো। নাতিদের শুকনো টনটনে ভাড় আনতে বলল। ভাড়ে গুড় ভর্তি করলো। জালায় অবশিষ্ট লেগে থাকা গুড়গুলো নাতিরা আঙুল কেউ কেউ চামুচ দিয়ে চেটে চেটে খেলো।

এবার দিল আলী দাদুনাতিদের সঙ্গে নিয়ে হাত মুখ ধুয়ে ঝাল পিয়াজ দিয়ে ভাত ছেনা করে পানতা ভাত খেতে খেতে হেসে উঠলো। দাদি বলল, কি ব্যাপার বুড়ো, আজ অতো হাসছো যে?

দিল আলী দাদু বলল, আজ সব গুড়গুলো হাটে বেচতে যাবো? সমস্ত টাকা আজ নাতি নাতনীদের শীতের গরম বস্ত্র কিনবো? এমন কথা দাদুর মুখ থেকে শুনা মাত্রই নাতিরা জোরে জোরে হেসে বলল, কি মজা কি মজা, লক্ষী দাদু গুড় বেচে আজকে আমাদের শীতের পোশাক কিনে দেবে। 

একটু বেলা হতেই দাদু নাতি নাতকুড়ি সঙ্গে নিয়ে বাজারে রওয়ানা হলো এবং গিন্নিকে বলল, নতুন গুড় দিয়ে নতুন ধানের চালের আটায় বিভিন্ন রকমের পিঠা বানাও? হাট থেকে ফিরে এসে সবাই মিলে মজা করে খাবো।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ