ঢাকা, শুক্রবার 30 November 2018, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ২১ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

মায়ের ছবি

শাহীন রায়হান : রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকজন মানুষ। সবাই আগ্রহ নিয়ে দেখছে একটি ছেলেকে। না, না, ছেলেটিকে নয়। দেখছে ওর ছবি আঁকা। শিশু পার্কের সামনে গাড়ি চলাচলের ব্যস্ত রাস্তা। তার পাশে বিদ্যুতের একটি খুঁটি। সেই খুঁটিতে হেলান দিয়ে এক মনে এঁকে যাচ্ছে ওর মায়ের ছবি। কি চমৎকার সেই ছবি। ওর কান্না মাখা ভালোবাসায়  যেন কথা বলছে ছবিটি। ছবি দেখে সবাই বাহ্বা দিচ্ছে। কেউ কেউ বলছে-“কি অসাধারণ ছবি !। যেন শিল্পীর রং তুলিকে ও হার মানায়। বড় হয়ে ও নিশ্চয়ই বিখ্যাত চিত্রশিল্পী হবে।”

এভাবেই প্রতিদিন ও ছবি এঁকে চলেছে। আর প্রতিদিনই বাড়ছে নতুন নতুন মানুষের ভিড়। সবাই দেখছে ওর ছবি আঁকা কিন্তু ও-কে কেউ দেখছে না। মুছিয়ে দিচ্ছে না ওর গায়ের ধুলা চোখের পানি।

ছবি আঁকিয়ে এ ছেলেটার নাম রাজা। ও ঢাকা রমনা পার্কের বটতলায় বসবাস করে। এ বট গাছটিকেই রাজা ওর মাথা গোঁজার ঠাঁই করে নিয়েছে। ওর মা-বাবা, ভাই-বোন কেউ নেই। ও এতিম। রাজার আরও একটি পরিচয় আছে ও টোকাই। সবাই ও-কে টোকাই রাজা নামেই চিনে।

বরগুনা জেলার পাথরঘাটা থানার মধ্য কালমেঘা গ্রামে রাজার জন্ম। ও বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। ও জন্মের পরপরই ওর বাবা মারা যায়। বাবার চেহারাটা ও এখন ভুলেই গেছে। বাবা মারা যাবার পর মাকে ঘিরেই ওর সব চাওয়া পাওয়া। ওর প্রতি ওর মায়ের আদরের কোন কমতি ছিল না। কমতি ছিল না খাবার দাবার পোশাক পরিচ্ছদের। এক কথায় রাজা ছিল ওর মায়ের অন্তঃপ্রাণ। রাজাও ওর মাকে খুব ভালোবাসত।

চার বছর আগের কথা। সেদিন পড়ন্ত বিকালে রাজা রাস্তার পাশে খেলছিল। এর কিছুক্ষণ পরে মা এসে বলল-“রাজা বাসায় চলে আয়, বাবা।‘রাজা মায়ের ডাক শুনে তখনই বাসায় চলে  এলে মা বলল- “এখন তোর স্কুল বন্ধ। অনেকদিন তোকে নিয়ে কোথাও যাওয়া হয় না। কাল আমরা ঢাকা শিশুপার্কে ঘুরতে যাব।” এ কথা শুনে রাজার যেন কিছুতেই বিশ্বাস হচ্ছিল না। ও আমতা আমতা করে বলল-” সত্যি মা!”। মা বলল- “হ্যাঁরে, হ্যাঁ। ‘মায়ের কথা শুনে রাজার তো আকাশে উড়ে যাওয়ার অবস্থা। রাজা আনন্দে চিৎকার দিয়ে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে শিশুপার্কের বিষয়ে নানান প্রশ্ন করতে লাগল। শিশুপার্ক কোথায়? পার্কে কি কি আছে, আমরা কাল কখন যাব ইত্যাদি ইত্যাদি। রাজার মা ওর কান্ড দেখে যেন মজাই পাচ্ছিল।

পরদিন বৃহস্পতিবার খুব সকালে রাজা ও রাজার মা ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হলো। রাজা রাস্তায় যেতে যেতে মায়ের মুখে শিশুপার্ক সম্পর্কে হরেক গল্প শুনল। রাস্তায় বাস ট্রাক রিক্সা ও হাজারো মানুষের আনাগোনা দেখে ওর মন আনন্দে ভরে গেল। রাজা মনে মনে ভাবলো ওর মা কত্ত ভালো। ওর মায়ের চেয়ে ভালো মা যে পৃথিবীতে নাই।

শুক্রবার সকাল ১০.০০ টা। রাজা ও রাজার মা পার্কের সামনে এসে দাঁড়াল। পার্কের সামনে তখন হাজারো মানুষের ভিড়। রাজার যেন আর তড় সইছিল না। কখন যে পার্কে ঢুকবে সেই চিন্তায় ও অস্থির হয়ে উঠল। আরও দীর্ঘক্ষণ পরে রাজা ওর তার মা টিকিট কেটে পার্কে ঢুকল। রাজার কাছে এ যেন খুশির মহাসমুদ্র। ও বাঁধভাঙা আনন্দে সারাদিন ঘুরে বেড়ালো। এ আনন্দ যেন ভোলার নয়।

বিকাল পাঁচটা। রাজার মন যেন পার্ক থেকে বের হতে চাচ্ছিল না। তবুও মায়ের কথায় ও ছেলে পার্ক থেকে বের হয়ে রাস্তা ক্রস করছিল। ধীরে ধীরে তখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। আর মনের মধ্যে বাড়ছে বাড়িতে ফেরার উৎকন্ঠা।

এমন সময় বেপরোয়া একটি বাসের ধাক্কায় রাজা ছিটকে গেল রাস্তার পাশে কিন্তু ওর মা ঘাতক বাসের নিচেই চাপা পড়ে গেল। রাজার মাথা দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছিল কিন্তু সোডিয়াম বাতির আবছা আলোতে ও হাতড়ে বেড়াচ্ছিল ওর মাকে। অবশেষে ও ওর মাকে খুঁজে পেল ঠিকই কিন্তু সে যে জীবিত নয় মৃত। 

সেই দিন থেকেই রাজা এঁকে চলেছে ওর মায়ের ছবি। এঁকে যাবে আমৃত্যু।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ