ঢাকা, রোববার 2 December 2018, ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ২৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

তফসিল ঘোষণার পর ১৩ জন প্রার্থীসহ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ৫২১টি মামলা : গ্রেফতার ১০৮৬ জন

দেশবাসী চরম বিভ্রান্ত। তারা বুঝতে পারছেন না, সরকার এবং ইসি যৌথভাবে কি চায়। সেই ১ বছর আগে থেকেই আওয়ামী সরকার চাচ্ছিলো যে বিএনপি এবং ২০ দলীয় জোট যেন নির্বাচনে না আসে। এজন্য ষড়যন্ত্রের নীলনকশা রচনা থেকে শুরু করে বিরোধী দলকে দমন-নিপীড়নের মাধ্যমে ঠেলতে ঠেলতে দেয়ালে ঠেসে ধরেছিলো। সরকার ভেবেছিলো, বিএনপি এবং অন্যান্য বিরোধী দল হয়তো চিৎকার করে বলবে, আর নয়, আমাদেরকে ছেড়ে দাও। আমরা ইলেকশন করবো না। বিএনপি ও অন্যেরা ইলেকশন করবে না এবং সরকার ফাঁকা মাঠে গোল দেবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ এবং ইসির আশা পূরণ হলো না। বিএনপির একটি দাবিও সরকারও মানলো না, ইসিও মানলো না। তারপরেও সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করে বিএনপি নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করেছে। সরকার তো দেখলো তার সমস্ত আশার গুঁড়ে বালি। সুতরাং শুরু হলো দমনপীড়নের দ্বিতীয় রাউন্ড।
সারা পৃথিবীর নিয়ম হলো এই যে, নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা হলে রাজনৈতিক কারণে আর কাউকে গ্রেফতার করা হয় না। সরকারের সংস্থাপন, স্বরাষ্ট্র ও তথ্য মন্ত্রণালয় ইসির অধীনে চলে যায়। এছাড়াও ইসি যখন যেটা প্রয়োজন মনে করবে তখন সেটা সরকারের কাছে চাইবে এবং সরকার সেটা দিতে বাধ্য থাকবে। কিন্তু এই সবগুলো বিশ^ স্বীকৃত নিয়মনীতির প্রতি সরকার এবং ইসি বুড়ো আঙ্গুল দেখাচ্ছে। আজ অর্থাৎ ১লা ডিসেম্বর, শনিবার মিডিয়াতে বিএনপির মহাসচিব ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কিছু তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। ঐ তথ্যে দেখা যায় যে, গ্রেফতার আতঙ্কে ভুগছেন ধানের শীষের প্রার্থী ও তাদের নেতাকর্মী এবং সমর্থকরা। নতুন পুরনো মামলার খড়গ ঝুলছে তাদের ওপর। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরও বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের এবং গ্রেফতার বন্ধ হয়নি। উল্টো বেড়েছে বলে অভিযোগ হাইকমান্ডের।
এ নিয়ে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) বিএনপি, ২০ দল ও ঐক্যফ্রন্ট আলাদা অভিযোগ দিয়েছে। কিন্তু তেমন প্রতিকার মেলেনি। এখন গ্রেফতার করা হচ্ছে প্রার্থীদেরও। সর্বশেষ বিএনপির প্রার্থী ও দলের যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকনকে গ্রেফতার করে জামিন না দিয়ে বৃহস্পতিবার কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হয়। মনোনয়নপত্র জমা দিয়ে ফেরার পথে ঢাকার এক প্রার্থীকে তুলে নেয়ার পর তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়।
এটি নিয়ে তফসিল ঘোষণার পর কমপক্ষে ১৩ প্রার্থীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। দলীয় মনোনয়নপত্র কিনতে আসা এক প্রার্থীর লাশ মিলেছে বুড়িগঙ্গায়।
গত ১৮ নভেম্বর বিএনপি নির্বাচন কমিশনে যে তালিকা দাখিল করেছে ঐ তালিকা থেকে দেখা যায় যে, একাদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর (৮ নভেম্বর) থেকে এ পর্যন্ত সারা দেশে নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ৫২১টি মামলা হয়েছে। গ্রেফতার হয়েছে ১ হাজার ৮৬ জন। এর মধ্যে ধানের শীষের প্রার্থী আছেন ১৩ জন। ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ৯০ হাজার ৩৪০টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ২৫ লাখ ৭০ হাজার ৫৪৭ আসামী। তাদের মধ্যে কারাগারে আছেন ৭৫ হাজার ৯২৫ নেতাকর্মী। ১৮ নভেম্বর বিএনপি এই তালিকা নির্বাচন কমিশনে জমা দিয়েছে। কিশোরগঞ্জ-৬ আসনের প্রার্থী শরিফুল আলম, নাটোর-২ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী এ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, ভোলা-৩ আসনের প্রার্থী মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমেদ, ভোলা-৪ আসনের প্রার্থী নুরুল ইসলাম নয়ন প্রমুখ বিএনপি প্রার্থী বলেছেন যে, গ্রেফতারের ভয়ে তারা তাদের প্রতিনিধি মারফত তাদের মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। আসন্ন নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া সত্ত্বেও তারা কেউ ঘরে থাকতে পারছেন না। পুলিশ এসে তাদের খোঁজ করছে এবং তাদের সমর্থকদেরকে গ্রেফতার করার জন্য তাড়া করছে। এরা সকলেই বলেছেন যে, আওয়ামী লীগ যখন মহাসমারোহে বিশাল বিশাল ব্যানার ও ফেস্টুন নিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন তখন বিএনপি প্রার্থীরা প্রচারণা চালানো তো দূরের কথা, তারা জামিন লাভের আশায় প্রতিদিন আদালতের বারান্দায় হাঁটাহাঁটি করছেন।
॥দুই॥
আমান উল্লাহ আমানসহ বিএনপির ৫ নেতার বিরুদ্ধে দুর্নীতির যে মামলা রয়েছে সেটি অনেক পুরাতন। কিন্তু এতদিন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ চুপ করে বসেছিলো। যখন তারা বুঝলো যে, বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া নির্বাচন করবেন তখন আমান উল্লাহ আমানদের মামলায় এক অদ্ভুত রায় দেয়া হয়। গত ২৭ নভেম্বর হাইকোর্টের একটি  দ্বৈত বেঞ্চ দুর্নীতির পৃথক পাঁচ মামলায় নিম্ন আদালতের দেয়া দ- ও সাজা স্থগিত চেয়ে বিএনপির পাঁচ নেতার আবেদন খারিজ করে আদেশ দেন। এই পাঁচ নেতার ৮ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত কারাদ- ছিল। ওই পাঁচজন হলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা আমান উল্লাহ আমান, ড্যাব নেতা চিকিৎসক এজেডএম জাহিদ হোসেন, সাবেক সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভূঁইয়া, আবদুল ওহাব ও মশিউর রহমান। এটি হলো অনেকটা সেই ঝিকে মেরে বউকে শেখানো।
বিএনপির সূত্রে বলা হয়েছে যে, গত শুক্রবার ২৩ নভেম্বর পর্যন্ত বিএনপির মোট ১৩ জন মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গত বুধবার মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার পর থেকে ঢাকা-৭ আসনের মোশাররফ হোসেন খোকন নিখোঁজ হন। পুলিশ বৃহস্পতিবার তাকে আদালতের মাধ্যমে রিমান্ডে নিয়েছে। ধানের শীষ প্রতীকের নরসিংদী-১ আসনের প্রার্থী খায়রুল কবির খোকন ও মাগুরা-১ আসনের বিকল্প প্রার্থী মনোয়ার হোসেনকে পৃথক মামলায় কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া ধানের শীষ প্রতীকের ঢাকা-৬ আসনের প্রার্থী সম্পদের তথ্য বিবরণী দাখিল না করা সংক্রান্ত দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি মামলায় সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার ছেলে প্রকৌশলী ইশরাক হোসেনকে চার সপ্তাহের মধ্যে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করতে বলেছেন হাইকোর্ট।
এর আগে ঢাকা-৩ আসনের মনোনয়ন প্রত্যাশী অ্যাডভোকেট নিপুণ রায় চৌধুরীকে গ্রেফতার করা হয়। রিমান্ড শেষে তাকে আদালত কারাগারে পাঠান। এখন পর্যন্ত তিনি কারাগারে। এ ছাড়া প্রার্থীদের মধ্যে কারাগারে আছেন টাঙ্গাইল-২ আসনের সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, টাঙ্গাইল-৭ আসনের আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম-৫ আসনের আসলাম চৌধুরী, পাবনা-৫ আসনের শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, রাজশাহী-৬ আসনের আবু সাইদ চাঁদ, চাঁদপুর-১ আসনের এহছানুল হক মিলন। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, কয়েকদিন ধরে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের শাহজাহানপুরের বাসা সার্বক্ষণিক ঘিরে রেখেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ঢাকা-৮ আসনের প্রার্থী মির্জা আব্বাসের বাসায় ঢোকা ও বের হওয়ার সময় নেতাকর্মীদের লাগাতার গ্রেফতার করা হচ্ছে। এভাবে সারা দেশে ধানের শীষের প্রার্থীদের নানাভাবে হয়রানি করছে পুলিশ।
বিএনপির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দফতরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি-মিডিয়া) সোহেল রানা বলেন, তফসিলের পর নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুসরণ করেই আমরা নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করছি। সেটা মামলা হতে পারে, গ্রেফতার হতে বা অন্য যে কোনো বিষয় হতে পারে। নির্বাচন কমিশন আচরণ বিধি প্রণয়ন করে। তারা নির্বাচন বিধির রক্ষক। কিন্তু দেখা যাচ্ছে যে এই নির্বাচন কমিশন রক্ষক হয়ে ভক্ষকের ভূমিকায় নেমেছে। গণভবনে প্রধান মন্ত্রী আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী এবং আওয়ামী লীগের সাথে বৈঠক করেছেন। এটি নির্বাচনী আচরণ বিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। অথচ, নির্বাচন কমিশন বলেছে যে, এটার ফলে আচরণ বিধির কোনো লঙ্ঘন হয়নি। প্রধান মন্ত্রীর কতখানি তাঁবেদার হলে এমন উক্তি করা যায় সেটি পাঠক ভাইয়েরা ভেবে দেখবেন। কোথায় আমাদেরকে নিয়ে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন? তাদের আচার আচরণ দেখে মনে হচ্ছে যে, তারা যেনো আওয়ামী লীগের এক্সটেনশন।
॥তিন॥
আওয়ামী লীগের প্রতি পক্ষপাতিত্ব অথবা আওয়ামী লীগের তল্পি বহন করতে করতে নির্বাচন কমিশন এখন বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের বিরুদ্ধ শক্তি হিসাবে মাঠে নেমেছে। এর মাধ্যমে এদেশের ভবিষ্যৎ বিশেষ করে এদেশের গণতন্ত্রের যে কত বড় সর্বনাশ করলো বর্তমান ইসি সেটিই ইসির কর্তারা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছেন। বিএনপির শক্তিশালী প্রার্থী মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, আর এক প্রার্থী বিশিষ্ট শিল্পপতি আব্দুল আউয়াল মিন্টু, বিএনপির ফায়ার ব্রান্ড হাবিবুন্নবী সোহেল প্রমুখ নির্বাচন করছেন না। মির্জা আব্বাস দুইটি এলাকার মধ্যে একটি ছেড়ে দিতে বাধ্যহ হয়েছেন। আমান উল্লাহ আমান, বিএনপির চিকিৎসক ফ্রন্টের নেতা ড. জাহিদ প্রমুখ আজ নির্বাচন অংশগ্রহণ থেকে বঞ্চিত। বেগম খালেদা জিয়া সম্ভবত নির্বাচন করতে পারবেন না। ঐক্যফ্রন্টের প্রধান ড. কামাল হোসেন ইলেকশন করছেন না। ঝিকরগাছার বিএনপি নেত্রী সাবেরা সুলতানা মুন্নীর মামলায় দেশনেত্রী বেগম জিয়ার নির্বাচনে অংশ গ্রহণের সম্ভাবনা কিছুটা উজ্জল হয়েছিল। নিম্ন আদালত তাকে ফৌজদারি মামলায় দুই বছরের বেশি দণ্ড দিয়েছিল। তিনি হাইকোর্টে আপিল করলে হাইকোর্টের একক বেঞ্চ গত বৃহস্পতিবার তার দণ্ড স্থগিত করেছিল এবং হাইকোর্টের রায়ে বলা হয়েছিল যে তিনি নির্বাচন করতে পারবেন। এই রায়ের অনুসরণ করে বেগম জিয়াও দণ্ড স্থগিত করার জন্য আপিল করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু গত শনিবার সরকার পক্ষ চেম্বার জজের কাছে সাবেরা সুলতানার রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করলে চেম্বার জজ হাইকোর্টের একক বেঞ্চের রায় স্থগিত করেন। অর্থাৎ তার যে দণ্ড হাইকোর্ট স্থগিত করেছিল চেম্বার জজ সেই স্থগিতাদেশ স্থগিত করেন এবং বিষয়টি চূড়ান্ত ফয়সালার জন্য আপিল বিভাগের ফুল বেঞ্চে পাঠিয়ে দেন। আজ রবিবার আপিল বিভাগে এটির শুনানি এবং রায় হবে। উচ্চ আদালতের সাম্প্রতিক ট্রেন্ড দেখে অভিজ্ঞ মহল ধারণা করছেন যে, চেম্বার জজের সিদ্ধান্তটিই আপিল বিভাগ বহাল রাখবেন। অর্থাৎ সাবেরা নির্বাচন করতে পারবেন না। আর সেই সিদ্ধান্তের আলোকে বেগম জিয়ার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হবে।
এই হলো তফসিল ঘোষণার পরেও সরকার এবং ইলেকশন কমিশনের ভূমিকা। তারপরেও ২০ দলীয় জোট, বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টকে নির্বাচনে যেতে হচ্ছে। এখন বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। তারপরেও সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য যে সব ধরনের অসাধু পন্থা অবলম্বন করবে তাতে কারো সন্দেহ নাই। সরকারের এসব অসাধু পন্থার মোকাবেলা ২০ দলীয় জোট, বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্ট কিভাবে করবে?
Email: asifarsalan15@gmail.com

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ