ঢাকা, সোমবার 3 December 2018, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ২৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

মধুগ্রামে হাতে ভাজা মুড়িতে স্বাবলম্বী রূপা

খুলনা অফিস : হাতে ভাজা মুড়িতে স্বাবলম্বী হয়েছে রূপা খাতুন।  খুলনা জেলার ডুমুরিয়ার মধুগ্রামকে অনেকে চেনে ‘মুড়ি গ্রাম’ নামে। সবাই যখন গভীর ঘুমে আচ্ছাদিত (রাত ৩টা-৪টা) তখন এ পাড়ার রান্নাঘরগুলোতে আলো জ্বলতে শুরু করে। শুরু হয় মুড়ি ভাজার ধুম। বছরের পর বছর ধরে এখানকার নারীরা হাতে মুড়ি ভেজে স্বাবলম্বী হয়েছে। গড়েছেন পরিবারের ভবিষ্যৎ। তেমনই এক নারী এই রূপা খাতুন। ৭ বছর বয়সে যাকে ধরতে হয়েছে সংসারের হাল।
ডুমুরিয়া উপজেলার রুদাঘরা ইউনিয়নের মধুগ্রামের কান্দরপাড়ায় বসবাস রূপা খাতুনের। যখন তার বয়স ৭ বছর তখন তার বাবা মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। রূপার সংসারে তখন ছোট ২ ভাই, মা এবং অসুস্থ বাবা। পড়লেখা ছেড়ে পাড়ার অন্য নারীদের সাথে মুড়ি ভাজার কাজে লেগে যান। বয়স কম থাকায় মুড়ি ভাজার মূল কাজটি তাকে কেউ করতে দেয় না। তাকে করতে হতো চাল নাড়ানোর কাজ। প্রতি পাইলে (৯ কেজি) চাল নাড়ানোর জন্য সে পেত ৫ টাকা। ধীরে ধীরে রপ্ত করে মুড়ি ভাজার বাকী কাজ। তখন স্থানীয় মুড়ির ব্যাপারী নারায়ণ সাহার সহায়তায় সংগ্রহ করেন মুড়ি ভাজার বাইলের হাড়ি, খোলা হাড়ি, ঝাঝরী, জাইলে, বাউলীসহ সকল সরঞ্জাম। মুড়ি ভাজতে কমপক্ষে দুই জনের প্রয়োজন হয়। তাই তিনি সাথে নেন স্থানীয় কুলসুম বেগমকে। সেই জুটিতে আজও তারা মুড়ি ভাজেন। রাত ৩টা থেকে কাজ শুরু করে সকাল ৮টা পর্যন্ত তারা প্রতিদিন ৫০ কেজি চালের মুড়ি ভাজেন। রূপার বয়স এখন ৪০ এর কাছাকাছি। রূপার বাবা এখন হাল ধরেছেন সংসারের। এক ভাই বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন। আরেক ভাই মৎস্য ঘের করছেন। নিজেদের বাড়ি এখন বিল্ডিং হয়েছে। কিন্তু তার আর সংসার পাতা হয়নি। এখনও মুড়ি ভাজার কাজ করে যাচ্ছেন তিনি।
জানা গেছে, হাতে মুড়ি ভাজতে লাগে দো’চুলা (দুই মুখের চুলা)। প্রথমে চুলায় জাল ধরিয়ে একপাশে বালির হাঁড়ি আরেক পাশে খোলা হাঁড়ি বসাতে হয়। খোলা হাঁড়িতে দো সিদ্ধ চাল দিয়ে তার মধ্যে লবণপানি মিশিয়ে কাঠি দিয়ে নাড়তে হয়। কিছু সময়পর সেই চাল গরম বালির মধ্যে ঢেলে দিয়ে বাউলী দিয়ে হাঁড়ি ধরে নাড়তে হয়। এরপর সেই বালিসহ চাল ঝাঝরীতে ঢেলে নাড়তে থাকলে তৈরি হয় মুড়ি। মুড়িগুলো ঝাঝরীতে থাকে আর বালি পড়ে যায় জাইলেতে। প্রতিদিন বিকেলে স্থানীয় ব্যাপারীরা রূপাদেরকে সিদ্ধ চাল সরবরাহ করে। আর পরদিন সকালে রূপাদের কাছ থেকে নেয় মুড়ি। এক বস্তা (৫০ কেজি) সিদ্ধ চালের মুড়ি ভেজে দিলে ব্যাপারীরা দেয় ৩৩০ টাকা।
স্থানীয় শিউলী ইয়াসমিন জানান, রূপা অনেক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে। সে অনেক উদ্যোমী একজন নারী। তাকে দেখে অনেক কিছু শেখার রয়েছে। সে কখনো হার মানেনি। আমরা মনে করি সে একজন সফল নারী। কুলসুম বেগম জানান, অনেক পুরুষ মানুষও এমনভাবে সংসারের হাল ধরতে পারে না। সে খুব কম বয়সে সংসারের হাল ধরেছে। তার ভাইয়েরা এখন সমাজে প্রতিষ্ঠিত। সবাইকে নিয়ে এখনো এক সংসারে রয়েছে। রূপা জানান, ‘আমার স্বপ্ন পুরুন হয়চে। ভাইদের মুখের দিকে তাকালে আমার মন ভইরে যায়। এইডাই আমার সুখ। এখন মুড়ি ভাজার কল হয়চে। কাজ একটু।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ