ঢাকা, সোমবার 3 December 2018, ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ২৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

৭৫ বছর বৈঠা বেয়েও তীরে ভিড়েনি লক্ষণ মাঝির জীবনের লক্ষ্য!

৭৫ বছর বৈঠা বেয়েও তীরে ভিড়েনি নওগাঁর আত্রাইয়ের লক্ষ্মণ মাঝির জীবনের লক্ষ্য। ছবিটি উপজেলার বাজার সংলগ্ন রাইপুর ঘাট থেকে তোলা -সংগ্রাম

নাজমুল হক নাহিদ, আত্রাই (নওগাঁ) থেকে : আজও ইতিহাস-ঐতিহ্যের দিক দিয়ে আত্রাই নদী কালের সাক্ষী হয়ে বেঁচে আছে লক্ষ মানুষের হৃদয়ে। বাবার সাথে সেই তরুণ বয়সে নৌকার হাল ধরে বিরামহীন ভাবে সে নদীতে নৌকা বেয়ে আজ সে বৃদ্ধের দলে। মাথার চুল-দাড়ি সাদা হয়ে গেছে অনেক আগেই। কর্মঠ পেশি বহুল মেধহীন শরীরে এখনো লক্ষণ মাঝি সবলের মতোই কর্মক্ষম।
সদালাপী নিরহংকার সাদা মনের মানুষ আত্রাই নদীর ভবানীপুর বাজার সংলগ্নে রাইপুর  খেয়াঘাটের প্রবীণ পারের কান্ডারি এই লক্ষণ মাঝি। তার জীবনটাই কাটিয়ে দিয়েছে মানুষ পারাপার করে। অদ্যাবধি তাঁর জীবন তরী কূলে পৌঁছেনি। নদীর সাথে আজন্ম পরিচয় তার। জীবনের পড়ন্ত বেলায় কূল পাবেন কিনা সে প্রশ্ন আজও থেকেই গেল। তবুও বৈঠা ছাড়ার চিন্তা তাঁর মাথায় কখনও আসেনি। সোলানী ফসল ফলে এমন জমি বা বসত ভিটা কোনটিই নেই তাঁর নামে। সেই কিশোর বয়স থেকে বৃদ্ধ বয়সে এসেও বৈঠা হাতে জীবন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে অবিরাম। প্রতিদিন প্রতিনিয়ত সেই কাক ডাকা ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলে তার এ জীবন যুদ্ধ।
জীবনের শেষ সময়ে এ পেশায় থেকে নৌকার হাল ধরে পারাপার করছে শত শত মানুষকে। ঝড় বৃষ্টি বন্যা আর প্রখর রোদে কোন কিছুই লক্ষণ মাঝির জীবনের জীবিকার পথে বাধা হতে পারেনি। লক্ষণ লক্ষণ বলে উত্তাল আত্রাই নদীর বিপুল জলরাশিতে যে মানুষটি নৌকার হাল ধরেছেন, একজন দক্ষ মাঝি হিসেবে আত্রাইয়ের মানুষ লক্ষণ মাঝিকে চেনেন। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এখন লক্ষণ মাঝির চলার পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বার্ধক্য। রোগ ব্যাধিতে নুয়ে পরা লক্ষণ মাঝির এখন জীবন কাটছে নিদারুন কষ্টে।
সরেজমিনে গতকাল গোধূলীর শেষ লগ্নে অশ্রুসিক্ত কন্ঠে আলাপচারিতায় লক্ষণ মাঝি বলেন, তাঁর বাড়ি উপজেলার শাহাগোলা ইউনিয়নের ভবানীপুর গ্রামে। বর্তমানে মৃতপ্রায় আত্রাই নদীর আমিও বেঁচে আছি মুমূর্ষ অবস্থায়। কিশোর বয়সে বাবা রাজু মাঝির সাথে বৈঠা হাতে সেই থেকে শুরু হয়ে চলছে অদ্যাবধি। জীবনের শেষ সময়েও এই নৌকা করে কতই না মানুষ পারাপার করছি কেউ কখনো আমার জীবনের গল্প লেখেনি শোনে নাই সুখ দুঃখের কথা। যার কেউ নেই তার সৃষ্টিকর্তা আছে। এলাকার মানুষ আমাকে যতটুকু সাহায্য করে তা দিয়েই চাল-ডাল কিনে কখনো খেয়ে আবার কখনো না খেয়ে কাটাতে হয় দিনের পর দিন। তিনি বিশ্বাস করেন নি:শ্বাস ত্যাগ করলেও এ ঘাট থেকে তাঁর নাম মুছবে না কোন দিন। এটাই তার জীবনের আত্মতৃপ্তি। জীবন যুদ্ধে সর্বদা হাসি খুশি এ মানুষটি কখনও কারো সাথে মুখ মলিন কথা বলেনি। যুগের পর যুগ কেটে গেল তবুও গড়তে পারেনি বসবাসের স্থায়ী কোন ঠিকানা এটাই তাঁর জীবনের বড় দুঃখ। তিনি আরো বলেন যতদিন আত্রাই নদী বেঁচে থাকবে, তত দিন বাবার স্মৃতি বিজড়িত বৈঠা হাতে বেঁচে থাকবে আমার জীবন-জীবিকার স্বপ্ন।
এ ব্যাপারে ভবানীপুর জিএসউচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাহাবুবুর রহমান বলেন, আত্রাই নদীর রাইপুর ঘাটে নিয়োজিত লক্ষণ মাঝি খুবই সাদাসিধে কিন্তু তার স্বপ্ন প্রজাপতির ডানার মতো রঙিন। প্রতিদিন কর্মব্যস্ত মানুষ আমরা যারা নৌকায় নদী পারাপার হয়ে থাকি, তাদের হয়তো অনেকেই জানেনা নৌকার মাঝির সুখ-দুঃখ, ব্যথা-বেদনার খবর। তারপরও এই সাদাসিধে মনের মানুষটি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলা করে পেশাদারিত্ব টিকিয়ে চলেছেন যুগের পর যুগ ধরে। এ ব্যাপারে শাহাগোলা ইউনিয়ন চেয়ারম্যান মো: শফিকুল ইসলাম বাবু বলেন, লক্ষণ মাঝি আসলেই একটা সাদা মনের মানুষ। কেয়ার টেকার সরকারের আমলে যখন লক্ষণ মাঝির বসবাস স্থল ভেঙ্গে দেয় তখন ইউনিয়ন পরিষদের তরফ থেকে তার জন্য বসবাসের জায়গা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে এবং তার জন্য বয়স্ক ভাতাসহ বিভিন্ন সাহায্য সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ