ঢাকা, বুধবার 5 December 2018, ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ২৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

স্কুলছাত্রীর আত্মহত্যা

রাজধানীর ভিকারুন্নেসা নুন স্কুলের নবম শ্রেণির এক ছাত্রীর আত্মহত্যার খবর সারাদেশে আলোড়ন তুলেছে। জেনে ও শুনে দুঃখিত মানুষ স্তম্ভিত তো হয়েছেই, অত্যন্ত ক্ষুব্ধও হয়েছে। এর কারণ, স্কুল কর্তৃপক্ষ দায়িত্ব অস্বীকার করতে চাইলেও গণমাধ্যমের রিপোর্টে বলা হয়েছে, অরিত্রী অধিকারী নামের ওই ছাত্রীকে আসলে অপমান ও প্ররোচনার মাধ্যমে আত্মহত্যার জন্য বাধ্য করা হয়েছে। অগ্রহণযোগ্য এই ভয়ংকর কাজটুকু করেছেন স্কুলের শিক্ষকরা। খবরে এবং ছাত্রীর পিতামাতাসহ স্বজনদের বিবরণীতে জানা গেছে, ক্লাসের পরীক্ষা দেয়ার সময় ছাত্রী অরিত্রীর কাছে একটি মোবাইল ফোন পাওয়া গিয়েছিল। শিক্ষকরা অভিযোগ করেছেন, মোবাইল থেকে সে নাকি নকল করছিল। অরিত্রী স্বীকার না করা সত্ত্বেও ক্লাস শিক্ষক তার মোবাইলটি কেড়ে নিয়ে প্রথমে তাকে পরীক্ষার হল থেকে বের করে দিয়েছেন। তারপর বলেছেন স্কুল থেকেই চলে যেতে।
এটা গত রোববারের ঘটনা। পরদিন তার পিতামাতাকে ডেকে আনা হয়েছে। তারা প্রথমে স্কুলের ভাইস-প্রিন্সিপালের সঙ্গে দেখা করেছেন। তার সামনে ছাত্রী অরিত্রী নকলের অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং মোবাইল ফোন সঙ্গে রাখার কারণে ভুল হয়ে থাকলে ক্ষমা করে দেয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়েছে। কিন্তু ভাইস-প্রিন্সিপালের মন গলেনি। তিনি বলেছেন, অরিত্রীকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। পিতামাতা যেন পরে একদিন এসে তার ট্রান্সফার সার্টিফিকেট নিয়ে যান। সে অবস্থায় ছাত্রী অরিত্রীর পাশাপাশি পিতামাতাও উপর্যুপরি অনুরোধ জানাতে থাকলে বিরক্ত ভাইস-প্রিন্সিপাল তাদের প্রিন্সিপালের সঙ্গে দেখা করার পরামর্শ   নয়, আদেশ দিয়েছেন। মেয়েকে নিয়ে পিতামাতা এরপর প্রিন্সিপালের কাছে গেছেন। সেখানে অরিত্রী ক্ষমা তো চেয়েছেই, প্রিন্সিপালের পায়ে পর্যন্ত ধরে কান্নাকাটিও করেছে। কিন্তু প্রিন্সিপাল তাদের অভিযোগ ও সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে রাজি হন নি। শুধু তা-ই নয়, মেয়ের কথিত অপরাধের জন্য পিতামাতাকে যথেচ্ছ ভাষায় অপমানিত করেছেন এবং তারপর তাদের তার কক্ষ ও স্কুলের সীমানা থেকে বের করে দিয়েছেন।
অরিত্রী তার পিতামাতাকে না জানিয়ে তাদের শান্তিনগরের বাসায় চলে গেছে। সেখানে গিয়ে ভেতর থেকে নিজের কক্ষ বন্ধ করে সে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে গলায় কাপড় বেঁধে ঝুলে আত্মহত্যা করেছে। কিছুক্ষণ পর পিতামাতা বাসায় ফিরে খোঁজ করতে গিয়ে মেয়েকে ঝুলন্ত অবস্থায় পেয়েছেন। ততক্ষণে তার মৃত্যু ঘটেছিল। তা সত্ত্বেও অরিত্রীকে হাসপাতালে নিয়ে গেছেন তারা। সেখানেই চিকিৎসকরা মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে অরিত্রীর মৃতদেহের পোস্টমর্টেম করা হয়েছে। এতেও দেখা গেছে, ফাঁসিতেই মৃত্যু হয়েছে অরিত্রীর।
নবম শ্রেণির ছাত্রী অরিত্রীর এই মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর ঝড়ের বেগে ছড়িয়ে পড়েছে এবং রাজধানী ছাড়িয়ে আলোড়ন তুলেছে সারাদেশে। ভিকারুন্নেসা নুন স্কুলের ছাত্রী ও অভিভাবকসহ সাধারণ মানুষের মধ্যেও ঘটনাটি ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। সকলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রকাশ্যেই। বলা বাহুল্য, এই ক্ষোভ প্রকাশিত হয়েছে স্কুল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। সাধারণভাবে সকলেই বলেছেন, মোবাইল ফোন থেকে সত্যিই নকল করে থাকলেও পরীক্ষা বাতিলসহ অরিত্রীকে অন্য কোনো পন্থায়ও শাস্তি দেয়া যেতো। কিন্তু তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের কোনো সুযোগই দেয়া হয়নি। তার বক্তব্যকেও বিবেচনা করা হয়নি। শুধু তা-ই নয়, ছাত্রীর কথিত অপরাধের কারণে তার পিতামাতাকে ডেকে এনে মেয়ের সামনেই যথেচ্ছভাবে অপমান করেছেন স্কুলের প্রিন্সিপাল এবং ভাইস-প্রিন্সিপাল। এটা যে কোনো সন্তানের পক্ষেই মেনে নেয়া কঠিন এবং অসম্ভবও। অরিত্রীর ক্ষেত্রেও তেমন প্রতিক্রিয়াই ঘটেছিল। আর সে কারণেই মাত্র ১৫ বছর বয়সের একজন ছাত্রী বাসায় গিয়ে আত্মহত্যা করেছে।
আমরা ভিকারুন্নেসা নুন স্কুলের প্রিন্সিপাল ও ভাইস-প্রিন্সিপালসহ কর্তৃপক্ষের এ ধরনের আচরণের বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা জানাই। অভিভাবকসহ সাধারণ মানুষ তাদের প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন এবং আমরাও মনে করি, নকল বা মোবাইল সঙ্গে নেয়ার মতো অপরাধের জন্য অবশ্যই শাস্তি হওয়া দরকার কিন্তু তারও একটা সীমা থাকা উচিত। এজন্য কোনো শিক্ষার্থীকে সোজা স্কুল থেকেই বহিষ্কার করতে হবে- এমন কোনো সিদ্ধান্ত সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। অন্যদিকে ভিকারুন্নেসা নুন স্কুলের কর্তৃপক্ষ অতি কঠোর সে সিদ্ধান্তই নিয়েছিলেন। শুধু তা-ই নয়, মেয়ের কথিত অপরাধের কারণে তার পিতামাতাকে ডেকে এনেও অত্যন্ত আপত্তিকর ভাষায় অপমান করেছেন তারা। করেছেনও আবার মেয়ের সামনেই।
আচরণ ও কর্মকাণ্ডের জন্য স্কুলের কোনো আইন রয়েছে কি না সে সম্পর্কে জানতে না পারলেও আমরা মনে করি, এত কঠোর ও অমানবিক কোনো আইন থাকা উচিত নয়। থাকলেও তার প্রয়োগ সুচিন্তিত হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু ভিকারুন্নেসা নুন স্কুলের প্রিন্সিপাল ও ভাইস-প্রিন্সিপাল সকল দিক থেকেই তাদের ক্ষমতার দাপট দেখিয়েছেন। যা অবশ্যই নিন্দনীয়।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ