ঢাকা, বৃহস্পতিবার 6 December 2018, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ২৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

চার মাস পর জোড়া লাগানো হলো সুমনের ভেঙ্গে যাওয়া মাথার হাড়টি

খুলনা : চার মাস পর সুমন হোসেনের ভেঙ্গে যাওয়া মাথার হাড়টি জোড়া লাগানো হলো....

খুলনা অফিস : বিদ্যুৎ না থাকার সুযোগে ময়লা ফ্যানটি মুছে পরিষ্কার করছিলেন মো. সুমন হোসেন। হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে আসায় ফ্যান চালু হয়। সুমনের মাথায় আঘাত লেগে ডান পাশের মাথার হাড় ভেঙ্গে আলাদা হয়ে যায়। অজ্ঞান হয়ে পড়েন সুমন। ছেলের এ অবস্থা দেখে তার মা মমতাজও অজ্ঞান হয়ে পড়েন। দ্রুত তাদের দুইজনকেই নেয়া হয় খুলনা জেনারেল হাসপাতালে। ডাক্তাররা সুমনের চিকিৎসায় অপারাগতা প্রকাশ করায় নেয়া হয় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানেও এর চিকিৎসা নেই বলে ঢাকায় নেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়। কিন্তু সুমনের পরিবারের সদস্যরা ঢাকায় না নিয়ে ভর্তি করেন নগরীর ময়লাপোতা মোড়ের সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এভাবেই নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখতে থাকেন তিনি। ২৩ বছর বয়সী সুমন খুলনা মহানগরীর সদর থানাধীন ৫১ নম্বর দক্ষিণ টুটপাড়া মহিরবাড়ি খালপাড়ের বাসিন্দা। পিতা আব্দুল লতিফ খুলনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের গাড়ি চালক ছিলেন। মৃত্যুবরণ করেন ২০১৪ সালে। তিন বোনের একমাত্র ভাই সুমন। পিতার মৃত্যুর পর সুমনই সংসারের একমাত্র ভরসা। এজন্যও অনেকটা ভেঙ্গে পড়েন সুমনের মা। সুমনের বড় দুলাভাই মিলন খুলনা সিভিল সার্জন অফিসের গাড়ি চালক। সিটি মেডিকেলে ভর্তির পর তিনি যোগাযোগ করলেন শহীদ শেখ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতালের নিউরোসার্জারী বিভাগের কনসালটেন্ট ডা. মো. ইব্রাহিম খলিলের সাথে। এটি গত ১৭ আগস্টের কথা। ঐ রাতেই তিনি তার টিমসহ সিটি মেডিকেলে সুমনের অস্ত্রোপচার করেন। কিন্তু ভেঙ্গে যাওয়া মাথার হাড়টি রেখে দেয়া হয় বাসার ডীপ ফ্রিজে। দ্বিতীয় দফায় অস্ত্রোপচার হয় গত পয়লা নবেম্বর। অর্থাৎ দীর্ঘ চার মাস ১৪ দিন পর জোড়া লাগানো হলো মাথার ভেঙ্গে যাওয়া হাড়টি। খুলনায় সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ের কোন প্রতিষ্ঠানে এমন অপারেশন এটিই প্রথম বলেও চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।

খুলনা সিটি মেডিকেলের ১৪১৪ নম্বর কেবিনে গিয়ে সুমনকে সুস্থ দেখা গেছে। এসময় তার মা মমতাজ বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘ওর বাবার মৃত্যুর পর ওকে নিয়েই ছিল আমার সব স্বপ্ন। তিনটি মেয়ের মধ্যে দু’টির বিয়ে হয়েছে। ছোট মেয়েটি উচ্চ মাধ্যমিকে পড়ছে। স্বামীর পেনশনের টাকায়ই ছেলের চিকিৎসা চলছে। সুমনের বেঁচে থাকার ওপরই আমার ভবিষ্যৎ। ওকে নিয়েই আমি বেঁচে আছি।’

কথা প্রসঙ্গে মমতাজ বেগম বলেন, তার পিতার বাড়ি পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া উপজেলার জুনিয়া গ্রামে আর তার স্বামীর পিতার বাড়ি বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলায়। তবে অনেক আগে থেকেই তারা খুলনায় বসবাস করছেন। সুমনের পিতার মৃত্যুর কারণে সুমন এসএসসি পরীক্ষাও দিতে পারেনি। সংসারের ভার পড়ে তার কাঁধে। পোষ্য হিসেবে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে মাষ্টার রোলে চাকরী পায় সুমন।

সুমনের বড় দুলাভাই মিলন বলেন, খুলনায় চিকিৎসার সুযোগ না পেলে ঢাকায় নিয়ে চিকিৎসা করানোর মত সামর্থ ছিলনা তাদের। দুইবার অপারেশন করে এ পর্যন্ত তাদের সাড়ে চার লাখ টাকার মত খরচ হয়েছে। সর্বসাকুল্যে হয়ত পাঁচ লাখ টাকার মধ্যেই চিকিৎসা সম্পন্ন হতে পারে। কিন্তু ঢাকায় নিতে হলে প্রথম অপারেশনেই পাঁচ লাখ টাকার বেশী খরচ হত। তাছাড়া তিনি নিজে যেহেতু চাকুরী করেন সে কারণে ঢাকায় গিয়ে খোঁজ খবর নেয়াও সম্ভব হতোনা। এজন্য এ চিকিৎসা তাদের পরিবারের জন্য একটি বিরাট আশির্বাদ বলেও তিনি মনে করেন।

নিউরোসার্জন ডা. মো. ইব্রাহিম খলিল বলেন, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এনেসথেসিওলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. শেখ ফরিদ উদ্দীন আহমেদ ছাড়াও এ অপারেশন টিমে দায়িত্ব পালন করেন-খুমেক হাপসাতালের সার্জারি বিভাগের রেজিষ্টার ডা. শ্যামল কুমার পাল, আবু নাসের হাসপাতালের এনেসথেসিওলজি বিভাগের কনসালটেন্ট ডা. লিপিকা রায় ও ডা. সুজয়সহ অন্যান্যরা। খুলনায় এ ধরনের চিকিৎসা এই প্রথম বলেও ডা. ইব্রাহিম খলিল উল্লেখ করেন।

খুলনা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুল আহাদ বলেন, চিকিৎসা বিজ্ঞানে সারা বিশ্ব যে এগিয়ে যাচ্ছে এবং তা’ থেকে যে খুলনা পিছিয়ে নেই সেটি এই বিরল অপারেশন থেকেই প্রমাণিত।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ