ঢাকা, বৃহস্পতিবার 6 December 2018, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ২৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

আমন চাষিদের মাথায় হাত ॥ উৎপাদন খরচ পাচ্ছে না কৃষক

মুহাম্মদ নূরে আলম: আমন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হলেও ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না। সরকার এবার আমন চালের উৎপাদনের মূল্য নির্ধারণ করেছে ৩৭ টাকা ৯০ পয়সা। কিন্তু সরকারই এই চালের ক্রয়মূল্য নির্ধারণ করেছে ৩৬ টাকা। ধান চাষে ক্রমাগত লোকসান দেয়ায় কৃষক ধান চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। এর ফলে বিগত কয়েক বছরে ধানের চাষ কমে আসছে। এটি জাতির জন্য অশনি সংকেত। বর্তমানে খাদ্য উৎপাদনে দেশ প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। সে ধানের আবাদ কমে গেলে দেশ আবার চাল আমদানি নির্ভর হয়ে পড়বে। তবে একই জমিতে ফসল উৎপাদনের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় মোটের ওপর এখনই চাল উৎপাদন কমছে না। অতি উচ্চ ফলনশীল জাতের ধানের চাষও প্রচুর সারের ব্যবহার করায় ক্রমান্বয়ে জমির উৎপাদিকা শক্তি কমের দিকে। জমির মাটি ঠিক রাখার জন্য চাষিদের কেমিক্যাল সার কম ব্যবহার করতে হবে, অধিক ব্যবহার করতে হবে প্রাকৃতিক সার  গোবর, কম্পোস্ট সার ইত্যাদি।
গত ১১ নবেম্বর খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির (এফপিএমসি) সভায় চলতি মৌসুমে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে প্রতি কেজি ৩৬ টাকা দরে ছয় লাখ টন আমন চাল সংগ্রহের সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু গত ১৩ নবেম্বর আমন চালের উৎপাদন ব্যয় ৩৭ টাকা ৯০ পয়সা নির্ধারণ করে কৃষি মন্ত্রণালয়। সাধারণত সরকারিভাবে ধান-চাল সংগ্রহের আগে কৃষি মন্ত্রণালয় একটি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে উৎপাদনের মূল্য নির্ধারণ করে। এই মূল্যের সঙ্গে লাভ যোগ করে সরকারিভাবে সংগ্রহমূল্য নির্ধারণ হয়। কিন্তু এবার উৎপাদনের মূল্য থেকে আরও দুই টাকা কমিয়ে আমন সংগ্রহের মূল্য নির্ধারণ হয়েছে। সরকার নির্ধারিত ক্রয়মূল্য বাজার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কৃষককে ন্যায্যমূল্য পেতেও সহায়তা করে। খাদ্য মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কৃষি মন্ত্রণালয় আমনের যে উৎপাদনের মূল্য নির্ধারণ করেছে বাজারে এর চেয়ে অনেক কম দামে চাল বিক্রি হচ্ছে। তাদের দাবি, এতে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না।
দীর্ঘদিন ধান উৎপাদনে কৃষকরা লোকসান দিয়ে ধান উৎপাদন করতে পারবে না বলে কৃষি বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন। চলতি ধারা অব্যাহত থাকলে আগামীতে খাদ্য নির্ভরতা হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে তারা মনে করেন। কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসেব মোতাবেক বিগত ৫ বছরে ধান উৎপাদনের খরচা প্রতি কেজিতে বেড়েছে ৫ টাকা ৪৬ পয়সা। সেচের জন্য বোরো ধানের উৎপাদন খরচ আরও বেড়ে দাঁড়ায় ৬ টাকা ৭৮ পয়সা। শতকরা হিসেবে ধানের ব্যয় বেড়েছে ২৯ থেকে ৩৪ শতাংশ। ২০০৯ সালে আমন ধানের কেজি প্রতি উৎপাদন ব্যয় হয়েছে ১৩ টাকা ৪০ পয়সা। ২০১৮ সালে ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩৮ টাকা। কিন্তু সে চাল প্রান্তিক চাষীরা সরকারি গুদামে জমা দেয়ার ক্ষমতা নেই। স্থানীয় দলীয় ক্যাডার, টাউটরা, জোতদার, ধানের ব্যবসায়ীরা ও ধানকলের মালিকরা সিন্ডিকেট করে তারাই সরকারি গুদামে চাল জমা দেয়। সাধারণ চাষিরা গুদামের কাছেও ভিড়তে পারে না। অধিকন্তু সরকারী গুদামের কর্মকর্তারা চাষীদের নিকট থেকে চাল কিনতে আগ্রহী নয়। কারণ তাদের থেকে তারা ‘টু পাইস কামাই করতে পারে না। তারা যা পাওয়ার তা সিন্ডিকেটওয়ালাদের নিকট থেকেই পেয়ে থাকে। অসাধু কর্মকর্তা ও অসাধু ব্যবসায়ীরাই ধান-চালের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। আর তারা অসহায় চাষীদের কম মূল্যে তার ঘামঝরা পরিশ্রমের ফসল জলের দরে বিক্রি করতে বাধ্য করে। তারা তাদের ঋণের টাকা শোধ করার জন্য তাই ধান ধরে রাখতে পারে না। ফলে উৎপাদিত খরচের চেয়ে কম দামে ধান বিক্রি করতে হয়। সরকার এখনও এ অনৈতিক নিয়ম ভাঙতে পারেনি বা দলীয় ক্যাডারদের ‘টু পাইস’ কামাইয়ের পথ খোলা রাখছে। এতে করে চাষিরা ধান চাষে উৎসাহ হারিয়ে ফেলছে। এর খারাপ প্রতিক্রিয়ায় দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হচ্ছে তা বাধাগ্রস্ত হবে এবং খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। তখন লক্ষ লক্ষ টন চাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হবে। এ ব্যাপারে সরকারকে এখনই সতর্ক হওয়া উচিত।
পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার মাছুয়াখালী গ্রামের কৃষক মো. বেলাল মৃধা জানান, এবার আমনের ফলন ভালো। ধান কাটা শুরু হয়েছে। কিন্তু বাজারে এখন ধানের দাম নেই। এক মণ ধান বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায়। প্রতি মণ ধানের দাম ৯০০ থেকে এক হাজার টাকা না হলে কৃষকের লাভ থাকে না। তিনি আরও জানান, বাজারে চালের দাম ৩৫ থেকে ৩৬ টাকা। এতে কৃষকের খরচটা কোনো রকম উঠে আসছে।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সূত্রে জানাযায়, ‘বর্তমানে চালের বাজার দর অনেক কম। বাজারে এখন ৩৩ থেকে ৩৫ টাকায় চাল পাওয়া যাচ্ছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের উৎপাদন খরচ ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের উৎপাদন খরচের মধ্যে একটু হেরফের আছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, উৎপাদন খরচ কোনো অবস্থাতেই ৩৫ টাকার বেশি হয় না। কৃষি মন্ত্রণালয়ের উৎপাদন খরচটা একটু বেশি ধরা হয়েছে।’ ‘বাজার পরিস্থিতি, সবকিছু হিসাব করে বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ-খবর নিয়ে আমরা আমনের ক্রয়মূল্য ৩৬ টাকা নির্ধারণ করেছি। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী উৎপাদন খরচ ৩৫ টাকার কাছাকাছি সাড়ে ৩৪ টাকা পড়ে।’ খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব শাহাবুদ্দিন আহমদ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘কৃষি মন্ত্রণালয় একটা হিসাব (আমনের উৎপাদনমূল্য) দিয়েছে। কৃষিমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সবাই মিলে খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির সভায় আমন সংগ্রহের মূল্য নির্ধারণ হয়েছে। ওই সভায় অর্থমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী, খাদ্যমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সবাই উপস্থিত ছিলেন। আমরা এককভাবে মূল্য নির্ধারণ করিনি।’
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সূত্রে জানাযায়, ‘আমরা আমাদের অ্যাসেসমেন্ট দিয়েছি, তারা (খাদ্য মন্ত্রণালয়) তাদের মতো করে একটি অ্যাসেসন্টে করেছেন। ওই সভায় (এফপিএমসি) সবকিছু নিয়ে আলোচনা শেষে ওই মূল্য (৩৬ টাকা কেজি দরে ক্রয়) নির্ধারণ হয়।’ ‘আমরা উৎপাদনের মূল্য বাস্তবতার নিরিখেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নির্ধারণ করি। জৈব সার, শ্রমের মজুরি (পারিবারিক ও ভাড়াকৃত শ্রম), জমি কর্ষণ বাবদ খরচ, সেচ ও ধান হতে চাল করার মিলিং খরচ (সিদ্ধ ও পরিবহনসহ) বিবেচনায় নিয়ে এই দাম নির্ধারণ হয়।’ ‘(এফপিএমসি সভায়) মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে আরেকটি জিনিস বিবেচনায় নেয়া হয় যে, বাজারে কী দাম চলছে। বর্তমান বাজারে যেকোনো ভাবেই হোক চালের দাম একটু কম। বাজারে এখন চাল ৩৩ টাকা, এটাও একটা ফ্যাক্টর ছিল মূল্য নির্ধারণের জন্য। কৃষক বোরো ও আউশে ভালো ফলন পেয়েছে, এজন্য বাজারটা পড়তির দিকে’- বলেন কৃষি সচিব।
তিনি আরও বলেন, ‘বাজারের চেয়ে বেশি দামে কিনলে মধ্যস্বত্বভোগীরা লাভবান হবেন, এ ধরনের অনেক কিছু হিসাব করে দাম নির্ধারণ হয়।’ কৃষি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (নীতি, পরিকল্পনা ও সমন্বয়) মোহাম্মদ নজমুল ইসলাম মূল্য নির্ধারনী সভায় বলেন, ‘আমনের উৎপাদনের মূল্য নির্ধারণে আমরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন ও কৃষি বিপণন অধিদফতরের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে সংশ্লিষ্ট সকলের সঙ্গে সভায় বসি। সেই সভায় বিবিএস (বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো), খাদ্য অধিদফতরসহ বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তারা থাকেন।’ গত বছর আমনের উৎপাদনমূল্য, ধান ২৪ টাকা ৬৩ পয়সা, চালের ৩৭ টাকা ০২ পয়সা ছিল। তখন ৩৯ টাকা দরে ছয় লাখ এক হাজার ৯৮৪ টন আমন চাল সংগৃহীত হয়। ২০১৬ সালে আমন ধান উৎপাদনে কৃষকের কেজিপ্রতি ১৯ টাকা এবং চাল উৎপাদনে ২৯ টাকা ব্যয় হয়। তখন চালের সংগ্রহমূল্য ছিল ৩৩ টাকা।
এর আগের বছর (২০১৫) সরকার ৩১ টাকা দরে আমন চাল সংগ্রহ করে। তখন উৎপাদন খরচ প্রতি কেজি ধানে হয় ১৮ টাকা ৫০ পয়সা এবং চালে ২৮ টাকা ৫০ পয়সা। ২০১৪ সালে প্রতি কেজি আমন ধানের উৎপাদনে খরচ হয় ১৮ টাকা এবং চালে খরচ ছিল ২৮ টাকা। ওই বছর সরকার ৩২ টাকা দরে চাল কেনে। ২০১৩ সালে খরচ ছিল প্রতি কেজি ধানে ১৭ টাকা দুই পয়সা এবং প্রতি কেজি চালের ২৫ টাকা ৪২ পয়সা। তখন ৩০ টাকা দরে আমন চাল সংগ্রহ করেছিল সরকার। এবার ডিসেম্বরে শুরু হয়ে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত খাদ্য অধিদফতরের মাধ্যমে আমন সংগ্রহ করবে সরকার।
কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে জানা গেছে, গত নভেম্বর মাসের শুরুতে আমন কাটা শুরু হয়। কৃষকরা যাতে ফসলের ন্যায্য মূল্য পায় এজন্য আগেই ধান ও চালের উৎপাদন মূল্য নির্ধারণ করে দেয়া হয়। সরকার এই দামেই অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে আমন কিনে থাকে। এবার প্রতি কেজি আমন ধানের উৎপাদন ব্যয় ২৫ টাকা ৩০ পয়সা ও চালের উৎপাদন ব্যয় ৩৭ টাকা ৯০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বছর এই ব্যয় ছিল ধানে ২৪ টাকা ৬৩ পয়সা, চালে ৩৭ টাকা ০২ পয়সা। এবার প্রতি কেজি ধানে ৬৭ পয়সা ও চালে ৮৮ পয়সা বেড়েছে। গত বছর এর আগের বছরের চেয়ে ধানে ৫ টাকা ৬৩ পয়সা ও চালের ব্যয় ৮ টাকা ২ পয়সা বেড়েছিল।
কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে জানা গেছে, ফসল উৎপাদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট খরচগুলো প্রায় গত বছরের মতোই আছে। এজন্য এবার উৎপাদন ব্যয় সামান্য বেড়েছে। বোরোর পর আমনই দেশের সবচেয়ে বড় ফসল। সরকার প্রতি মৌসুমে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে তিন লাখ টনের মতো আমন চাল সংগ্রহ করে থাকে। গত অর্থবছরে সংগ্রহ কার্যক্রম ৩ ডিসেম্বর শুরু হয়, শেষ হয় চলতি বছরের ৭ মার্চ। গত মৌসুমে প্রতি কেজি ৩৯ টাকা দরে ৬ লাখ এক হাজার ৯৮৪ টন আমন চাল সংগ্রহ করেছিল সরকার।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ