ঢাকা, বৃহস্পতিবার 6 December 2018, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ২৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

প্রার্থীদের বৈধতা প্রসঙ্গে

জাতীয় সংসদের আসন্ন নির্বাচনকেন্দ্রিক বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে জটিলতা দিন দিন বেড়ে চলেছে। এই প্রক্রিয়ায় মনোনয়নপত্র বাতিলের ঘটনা এসেছে একটি প্রধান বিষয় হিসেবে। বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলো অভিযোগ করেছে, অতি তুচ্ছ কারণ দেখিয়েও এসব দলের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। বড়কথা, বাতিলের আগে কোনো প্রার্থীকেই কারণ সম্পর্কিত প্রশ্ন যেমন করা হয়নি তেমনি কাউকে আত্মপক্ষ সমর্থনেরও সুযোগ দেয়া হয়নি। সে কারণে প্রার্থীদের অনেকে উচ্চ আদালতে গেছেন। ওদিকে আপিলের হিড়িক পড়ে গেছে নির্বাচন কমিশনে। দৈনিক সংগ্রামসহ বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরে জানানো হয়েছে, এরই মধ্যে কোনো কোনো প্রার্থীর ব্যাপারে রিটার্নিং অফিসার ও নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত বাতিল হতেও শুরু করেছে।
এ বিষয়ে আবারও সংবাদ শিরোনাম হয়েছেন রংপুর জেলার মিঠাপুকুর এলাকায় ২০ দলীয় জোটের প্রার্থী ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা অধ্যাপক গোলাম রব্বানী। পাঁচ বছর আগে এক লাখ ২৮ হাজার ভোটের ব্যবধানে উপজেলা চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত অধ্যাপক রব্বানীর মনোনয়নপত্র গ্রহণ করতেই অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন রিটার্নিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালনরত রংপুরের জেলা প্রশাসক। ওই প্রার্থীর পক্ষে মনোনয়নপত্র জমা দিতে যাওয়া সিনিয়র আইনজীবীদের দীর্ঘ পাঁচ ঘণ্টা অপেক্ষা করানোর পর জানানো হয়েছিল, ‘ওপরের নির্দেশে’ অধ্যাপক রব্বানীর মনোনয়নপত্র গ্রহণ করা যাবে না। ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাই কোর্টে আপিল করেছিলেন অধ্যাপক রব্বানী। আপিলের পরিপ্রেক্ষিতে মাননীয় বিচারপতিরা তার মনোনয়নপত্র গ্রহণ করার আদেশ জারি করেছেন। তাই বলে উচ্চ আদালতের প্রতি যথোচিত সম্মান দেখানো হয়নি। মাননীয় বিচারপতিদের দেয়া আদেশের ভিত্তিতে মনোনয়নপত্র জমা নেয়া হলেও পুলিশ অধ্যাপক রব্বানীর পক্ষের প্রস্তাবককে গ্রেফতার করে পরিস্থিতিকে নতুন পর্যায়ে জটিল করেছে।
এদিকে অন্য কিছু বিশেষ কারণেও বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে ক্ষমতাসীনদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব দেখানোর অভিযোগ উঠেছে। একটি জাতীয় দৈনিকের রিপোর্টে জানানো হয়েছে, অতি তুচ্ছ কারণে বিরোধীদলীয় প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হলেও অনেক গুরুতর কারণ থাকা সত্ত্বেও ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের ক্ষেত্রে রিটার্নিং অফিসাররা সম্পূর্ণ বিপরীত ব্যবস্থা নিয়েছেন। উদাহরণ দিতে গিয়ে রিপোর্টে প্রতিমন্ত্রী ও আওয়ামী জোটের এমন অনেক প্রার্থীর নাম ও তাদের সম্পর্কিত তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে, যাদের মধ্যে একদিকে ১৩ বছর পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে দন্ডিতরা রয়েছেন, অন্যদিকে রয়েছেন ঋণখেলাপিরাও। খেলাপি ঋণের পরিমাণও বিভিন্ন রকমের। উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে কোনো এক দলের মহাসচিবের নাম এসেছে ঋণখেলাপি হিসেবে- যার ঋণের পরিমাণ ৫০২ কোটি টাকা। পরিমাণের দিক থেকে কমবেশি হলেও আওয়ামী জোটের আরো অনেকের নামও রয়েছে ওই রিপোর্টে। কিন্তু দন্ডিত এবং প্রমাণিত ঋণখেলাপি এসব প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়নি। এই সুযোগে তারাও নির্বাচনী কার্যক্রমে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। চালাচ্ছেন প্রচারণা।
বলার অপেক্ষা রাখে না, একই সংসদ নির্বাচনকেন্দ্রিক কার্যক্রমে এ ধরনের পরস্পরবিরোধী নীতি ও সিদ্ধান্ত সমর্থনযোগ্য নয়। অন্যদিকে ‘ওপরের আদেশ’ থেকে শুরু করে নানা অজুহাতে তেমন নীতি ও সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়ার কর্মকা-ই লক্ষণীয় হয়ে উঠেছে। অথচ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও আরো কয়েকজন মন্ত্রীর পাশাপাশি প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং অন্য কমিশনাররাও বারবার বলে এসেছেন, নির্বাচনের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড প্রস্তুত করা হবে এবং সব দল ও প্রার্থীকেই প্রতিটি বিষয়ে সমান সুযোগ-সুবিধা ও অধিকার দেয়া হবে। এখানে প্রসঙ্গক্রমে সিনিয়র নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদারের সর্বশেষ কিছু বক্তব্য উল্লেখ করা দরকার। ইলেক্টোরাল ইনকোয়ারি কমিটির সদস্যদের উদ্দেশে এক বক্তৃতায় গতকাল বুধবারই তিনি বলেছেন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, সংরক্ষণ ও পরিপালনের পূর্বশর্ত হচ্ছে আইনের শাসন। আইনের শাসন না থাকলে গণতন্ত্র অর্থহীন হয়ে পড়ে।
জনাব মাহবুব তালুকদার আরো বলেছেন, একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হচ্ছে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার একমাত্র উপায়। নির্বাচন যদি আইনানুগ না হয় তাহলে সেটা হবে কালো নির্বাচন। আমরা কালো নির্বাচন নয়, স্বচ্ছ ও সাদা নির্বাচন করতে চাই। নিজের বক্তব্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মাহবুব তালুকদার বলেছেন, আইন যদি নিজস্ব খাতে প্রবাহিত না হয় তাহলে তা আইন নয়, আইনের অপলাপ মাত্র। সবার প্রতি সমান আচরণই আইনের মূলকথা। ‘আইনের চোখে সবাই সমান’ কথাটার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তিনি আরো বলেছেন, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সবাই সমান অধিকার ভোগ করতে পারছেন কি না সেটাই বিবেচ্য হওয়া দরকার।
বলাবাহুল্য, সিনিয়র নির্বাচন কমিশনার হিসেবে জনাব মাহবুব তালুকদার মাত্র গতকালই যে কথাগুলো বলেছেন, গণমাধ্যমের কোনো রিপোর্টেই কিন্তু জানা যায়নি যে, সেসব কথার আদৌ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বাস্তবে বরং বিপরীত অবস্থাই দেখা গেছে। এখনো পরিস্থিতিতে কোনো পরিবর্তন হওয়ার সুখবর পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা মনে করি এবং একথা আগেও বলে এসেছি যে, নির্বাচন উপলক্ষে অবশ্যই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকতে হবে এবং ‘কালো’ নয়, নির্বাচন হতে হবে ‘স্বচ্ছ ও সাদা’। ‘আইনের চোখে সবাই সমান’ কথাটারও বাস্তবায়ন করতে হবেÑ যে বিষয়ে জনাব মাহবুব তালুকদার বলেছেন বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে।
আমরা আশা করতে চাই, নির্বাচন কমিশন বিষয়টির প্রতি লক্ষ্য রাখবে এবং সরকারও কমিশনের সঙ্গে সহযোগিতা করবে। এভাবে সকলের মিলিত চেষ্টায় একাদশ সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত হতে পারবে বলেই আমরা আশা করতে চাই।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ