ঢাকা, বৃহস্পতিবার 6 December 2018, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ২৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ভিকারুননিসার অধ্যক্ষসহ ৩ শিক্ষক বহিষ্কার

সহপাঠীর আত্মহত্যায় প্ররোচণায় অভিযুক্ত শিক্ষকদের শাস্তির দাবিতে গতকাল বুধবারও আন্দোলন অব্যাহত রেখেছে ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীরা -সংগ্রাম

স্টাফ রিপোর্টার : শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌসসহ তিন শিক্ষককে বরখাস্ত করেছে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের গভর্নিং বডি। পাশাপাশি বুধবারের স্থগিত হওয়া বার্ষিক পরীক্ষা আগামীকাল শুক্রবার নেয়া হবে এবং রোববার থেকে সব ক্লাস-পরীক্ষা চলবে বলে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এ দিকে গতকাল বুধবার দ্বিতীয় দিনের মতো বিক্ষোভ করেছে শিক্ষার্থীরা। তারা স্কুলের গভর্নিং বডির অপসারণসহ ৬ দফা দাবি বাস্তবায়নে আজ বৃহস্পতিবার আবারো সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করবে।
গতকালও সকাল থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেইলি রোড শাখার প্রধান ফটকে বিক্ষোভ শুরু করেছে কয়েক শ’ শিক্ষার্থী। তাদের সঙ্গে যোগ দেন অনেক অভিভাবক। তারা নানা শ্লোগান দিতে থাকে। বেলা সাড়ে ১২টার দিকে শিক্ষকরা বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় অংশ নেয়ার আহ্বান জানালেও শিক্ষার্থীরা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার কথা বলে অধ্যক্ষের পদত্যাগ দাবি করে।
অধ্যক্ষকে বরখাস্ত করার বিষয়ে স্কুল কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক ঘোষণাসহ ছয় দফা দাবি তুলে সেসব মেনে না নেয়া পর্যন্ত বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। অধ্যক্ষসহ তিন শিক্ষককে বরখাস্তে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার পর দুপুর পৌনে ২টার দিকে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে এ ঘোষণা আসে।
শিক্ষার্থীদের পক্ষে আনুশকা রায় সাংবাদিকদের বলেন, আমরা শুনেছি, আমাদের কিছু দাবি মেনে নেয়া হয়েছে। আমরা আমাদের অধ্যক্ষ বা মুখপাত্রের পক্ষ থেকে এ সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক ঘোষণা চাই। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না আসা পর্যন্ত আমাদের অবস্থান চলতে থাকবে।
সন্ধ্যায় দ্বিতীয় দিনের মতো আন্দোলন স্থগিত করা হয়। এ সময় স্কুলের গভর্নিং বডির অপসারণসহ ৬ দফা দাবি আদায়ে আজ বৃহস্পতিবার সকাল থেকে ফের সড়কে বিক্ষোভ করবে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা।
গতকাল সন্ধ্যায় সাংবাদিক সম্মেলনে একথা জানায় স্কুলটির নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী আনুষ্কা রায়। আনুষ্কা রায় বলেন, ৬ দফা দাবিতে আজ বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা থেকে আমরা ফের অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করব। ছয়দফা দাবিগুলো হলো- অভিযুক্তদের আত্মহত্যার প্ররোচণায় দণ্ডবিধি ৩০৫ ও ৩০৬ ধারায় শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, ভিকারুননিসা স্কুলে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন বন্ধ করতে হবে, কথায় কথায় বহিষ্কারের ভয় দেখানো যাবে না এবং অপরাধ অনুযায়ী শাস্তির জন্য ডিটেনশন পলিসি চালু করতে হবে, শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মানসিক সুস্থতার জন্য পরামর্শক নিয়োগ, গভর্নিং বডির পদত্যাগ ও অরিত্রীর বাবা-মার সঙ্গে দুর্ব্যবহারের জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে হবে।
গভর্নিং বডির জরুরি সভা: স্কুলের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান গোলাম আশরাফ তালুকদার বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে গভর্নিং বডির জরুরি সভায় বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষসহ তিন শিক্ষককে বহিষ্কার করা হয়েছে। এ সিদ্ধান্তের বিষয়টি সবাইকে চিঠি দিয়ে জানানো হবে। তিনি বলেন, আগামী দুই বা তিনদিনের মধ্যে নতুন করে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নিয়োগ দেয়া হবে। যোগ্য শিক্ষকদের নামের তালিকা করে গভর্নিং বডির সভায় তোলা হবে। সবার সম্মতি দিলে তাকে নতুন করে অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) হিসেবে নিয়োগ দেয়া হবে। আগামী রোববার থেকে স্কুল-কলেজের সব ক্লাস-পরীক্ষা সচল হবে। এসব বিষয় সব অভিভাবক-শিক্ষার্থীকে মেসেজের মাধ্যমে জানিয়ে দেয়া হবে।
শিক্ষার্থীরা গভর্নিং বডির পদত্যাগ দাবি করেছে- এ বিষয়ে সভায় কোনো আলোচনা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে চেয়ারম্যান বলেন, বিষয়টি নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি। আমরা সব অভিভাবকের সঙ্গে আলোচনা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। গভর্নিং বডির কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান তিনি।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ: শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানটির গভর্নিং বডিকে প্রিন্সিপাল (ভারপ্রাপ্ত) নাজনীন ফেরদৌস, বেইলি রোড ক্যাম্পাসের প্রভাতী শাখার প্রধান জিনাত আক্তার ও শিক্ষক হাসনা হেনাকে বরখাস্ত করার নির্দেশ দেয়া হয়।
গতকাল সচিবালয়ে সাংবাদিক সম্মেলন করে তিন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ঘোষণা দেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল নাহিদ। তিনি বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি অরিত্রীর আত্মহত্যার ঘটনায় ‘প্ররোচনার প্রমাণ’ পেয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও কলেজ কর্তৃপক্ষ মঙ্গলবার দুটি তদন্ত কমিটি করে। এছাড়া হাইকোর্টও অরিত্রীর আত্মহত্যার কারণ অনুসন্ধানে শিক্ষা সচিবের নেতৃত্বে একটি কমিটি করতে বলে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার কথা জানিয়ে শিক্ষামন্ত্রী সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, প্রতিবেদন আমরা পর্যালোচনা করেছি। প্রতিবেদনে দোষী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা হয়েছে এবং এই প্রতিষ্ঠানে যে সকল অনিয়ম এবং অসঙ্গতি রয়েছে সেগুলো উঠে এসেছে। অভিভাবকরা নানা ধরনের অভিযোগ করেছেন। এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার পরে আমি অসংখ্য টেলিফোন পাচ্ছি। অনেকে ব্যক্তিগতভাবে এসে তাদের ক্ষোভের কথা জানাচ্ছেন।
অরিত্রীর আত্মহত্যার ঘটনাকে ‘খুবই অমানবিক’ হিসেবে বর্ণনা করে নাহিদ বলেন, তদন্ত কমিটি ভিকারুননিসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌস, প্রভাতী শাখার শিফট ইনচার্জ জিনাত আরা এবং শ্রেণি শিক্ষক হাসনা হেনাকে এ ঘটনার জন্য দায়ী করেছে। এখানে (তদন্ত প্রতিবেদনে) বলা হয়েছে- এই তিনজন অরিত্রীর বাবা-মা যখন আবেদন নিয়ে আসলেন, তারা খুবই অসুস্থ, তাদেরকে ভয়ভীতি দেখান, অরিত্রীর পিতা-মাতার সাথে অধ্যক্ষ, শিফট ইনচার্জের নির্মম ও নির্দয় আচারণ অরিত্রীকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে এবং তাকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করে। অরিত্রী পিতা-মাতার প্রতি অপমান এবং অসম্মানের বিষয়টি মেনে নিতে পারেনি বলেই তাকে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে হয়েছে বলে তদন্ত কমিটির কাছে প্রতীয়মান হয়। যার দায় কোনভাবেই প্রতিষ্ঠানের প্রধান, শিফট ইনচার্জ এবং শ্রেণি শিক্ষিকা এড়াতে পারেন না। এই পরিস্থিতিতে অরিত্রীর আত্মহত্যায় প্ররোচণাকারী হিসেবে তিন শিক্ষকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে বলে মত দেন শিক্ষামন্ত্রী।
তিনি বলেন, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে এই তিন শিক্ষককে বরখাস্ত করতে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এই তিনজনকে আমাদের কমিটির সুপারিশ অনুসারে মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশ দিচ্ছি, তাদের তিনজনকে বরখাস্ত করা হোক, করতে হবে। তাদের বিরুদ্ধে অন্যান্য বিভাগীয় মামলাসহ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করার নির্দেশ দেয়া হচ্ছে। এই তিনজন শিক্ষকের এমপিও বাতিল করার জন্য মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
নাহিদ বলেন, তদন্ত কমিটি কেবল ওই ঘটনার জন্য তিনজন দায়ী ব্যক্তিকে চিহ্নিত করেনি, আরও বেশ কিছু অনিয়ম ও অসঙ্গতির তথ্য অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পেয়েছে। ওখানে বহুদিন ধরে অধ্যক্ষ নেই, একজনকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আমরা বার বার তাগিদ দেওয়ার পরও তারা নিয়ম অনুসরণ করে অধ্যক্ষ নিয়োগের ব্যবস্থা নেয়নি, এটাও একটা বড় ধরনের অনিয়ম।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, আপনারা জানেন, আমরা প্রথম যখন দায়িত্ব নিই, আমরা খবর নিয়ে দেখি যে ১০ লাখ টাকা লাগে একজন শিক্ষার্থীকে ভর্তি করতে। সেটা বন্ধ করার জন্য আমরা প্রভাতী সিস্টেম চালু করি ওই স্কুল থেকে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে যা অনুমতি পায় তার চেয়ে বেশি ভর্তি করে ফেলে। তার মানে অন্য কোনো পথে করে, হয়ে যায়। আমরা শাখা অনুমোদন দিই না, দেখা যাচ্ছে তারা শাখা খুলে বসে আছে। এই তথ্যগুলো কেউ বলে না।
ভিকারুননিসার যে চেহারা প্রকাশিত হয়েছে তা মানুষের দৃষ্টি খুলে দেবে বলে মন্তব্য করেন নাহিদ।
তিনি বলেন, থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে। এর আসল চেহরাটা উন্মুক্ত হয়েছে। আমরা এই চেহারাটা খুলে দেব।
হাই কোর্টের নির্দেশ অনুসারে একজন অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে বুধবারই পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি করা হবে বলেও জানান শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, আমরা আবারও আহ্বান জানাচ্ছি, সব শিক্ষক এই রকম নয়, ভাল শিক্ষক রয়েছেন। দরদী শিক্ষক রয়েছেন, শিক্ষার্থীকে ভালবাসেন এমন শিক্ষক রয়েছেন। তারা আরও বেশি এগিয়ে আসবেন, অন্য শিক্ষককে প্রভাবিত করবেন। ম্যানেজিং কমিটিতে যারা আছেন, তারা শুধুমাত্র খবরদারি করার জন্য নয়, সার্বিকভাবে শিক্ষার উন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের-শিক্ষকের গুণগত মান উন্নয়ন, মানবিক মূল্যবোধের উন্নয়নে আরো বেশি করে নজর দেবেন।
অরিত্রীর আত্মহত্যার ঘটনায় ভিকারুননিসার পরিচালনা পর্ষদ দায় এড়াতে পারে কি না- সেই প্রশ্নে নাহিদ বলেন, আমাদের ক্ষমতা আছে আমরা পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিতে পারি। কাজটা (তিন শিক্ষককে বরখাস্ত) ওদের করতে হবে, না করলে আমরা বাধ্য হব (তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে)।
তিনি বলেন, পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে, থানাও যোগাযোগ করেছে আমাদের সাথে। আমি আশা করছি তারাও ব্যবস্থা নেবেন। আমাদের ফাইন্ডিংসে তাদের প্ররোচক হিসেবে চিহ্নিত করেছি, এর ফলে পুলিশও হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারবে না।
নাহিদ বলেন, ম্যানেজিং কমিটি হাত গুটিয়ে বসে থাকলে তারাও ‘ওই তালিকায়’ পরে যাবে। যদি তারা কোনো ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে বোঝা যাবে পেছনে তাদেরও প্ররোচনা আছে।
প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সাংবাদিক সম্মেলন : এ দিকে স্কুলের পক্ষে পরবর্তী ঘোষণা না দেয়া পর্যন্ত ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সব ক্লাস পরীক্ষা বন্ধ ঘোষণা করা হয়। স্কুলের গভর্নিং বডির শিক্ষক প্রতিনিধিদের একজন মুশতারী সুলতানা অধ্যক্ষের কার্যালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এ কথা জানান। মুশতারী বলেন, অরিত্রীর সহপাঠীরা যারা আন্দোলন করছে, তাদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে। আমরা অরিত্রীর ঘটনায় গভীরভাবে শোকাহত। ছাত্রীরাও গভীরভাবে শোকাহত। তাদের বান্ধবী মারা গেছে, পড়াশোনা করতে পারছে না। এ কারণে পরীক্ষা বাতিল করেছি।
অধ্যক্ষ কোথায় জানতে চাইলে বলেন, তিনি অসুস্থ। আমরা গভর্নিং বডির সদস্যরা মিলে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
শিক্ষকদের বিরুদ্ধে কোচিং ও বাজে ব্যবহারের অভিযোগ বিষয়ে জানতে চাইলে মুশতারী সাংবাদিকদের বলেন, এখানে ৭০০ জনের মতো শিক্ষক আছে। ২ থেকে ৫ শতাংশ শিক্ষক কোচিং করায়। সবাই এক রকম নয়। কারও বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ থাকলে আমরা শিক্ষার্থী অভিভাবকদের লিখিতভাবে দিতে বলেছি।
শিক্ষার্থীদের গভর্নিং বডির পদত্যাগের দাবি বিষয়ে মুশতারী বলেন, এটি তো শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিষয়। তারা পরিবর্তন করে দিলে আমাদের কিছু করার নেই।
মুশতারী সুলতানা প্রেস ব্রিফিং করার আগে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তিন ফটকের বাইরে অবস্থান নেওয়া শিক্ষার্থীদের গিয়ে ক্লাস পরীক্ষা বন্ধ করার বিষয়টি জানিয়ে আসেন।
র‌্যাব-পুলিশকে চিঠি: রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্রী অরিত্রী অধিকারীর আত্মহত্যার ঘটনায় প্ররোচনাকারী হিসেবে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, শাখা প্রধান এবং এক শ্রেণিশিক্ষকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে র‌্যাব ও পুলিশের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
গতকাল বুধবার বিকেলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় র‌্যাবের মহাপরিচালক ও ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনারকে চিঠি দিয়ে এই অনুরোধ জানায়। এর আগে দুপুরে এই ঘটনায় গঠিত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের সারাংশ তুলে ধরেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। ওই কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌস, শাখা প্রধান জিনাত আখতার এবং অরিত্রীর শ্রেণি শিক্ষিকা হাসনা হেনার অশোভন আচরণ, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং অরিত্রীর বাবা-মার সঙ্গে অধ্যক্ষ ও শাখা প্রধানের নির্মম, নির্দয় আচরণ অরিত্রীকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে এবং তাকে আত্মহত্যায় প্ররোচিত করে। এ জন্য কমিটি তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে বলেছে।
এ ছাড়াও তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে ওই তিনজনকে বরখাস্ত করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ঢাকা শিক্ষাবোর্ডকে পৃথক চিঠি দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
এ ছাড়াও এই তিনজনের বেতন-ভাতা বন্ধের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরকে নির্দেশ দিয়ে আরেকটি চিঠি দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
অতীতেও শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে: ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ কর্তৃপক্ষের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে অতীতেও শিক্ষার্থী আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করেছেন প্রতিষ্ঠানটির গভর্নিংবডির সদস্য ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. মো. ইউনুছ আলী আকন্দ। গতকাল সকালে ভিকারুননিসার বেইলি রোডের ক্যাম্পাসের সামনে তিনি সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন ।
তিনি বলেন, ২০১২ সালে চৈতি নামের একটি মেয়ে সায়েন্স পড়তে চেয়েও পারেনি। মেয়েটি এক বছর নষ্ট করে পুনরায় পরীক্ষা দিলেও তাকে সায়েন্স নিতে দেওয়া হয়নি। পরে মেয়েটি আত্মহত্যা করে। যদি চৈতির আত্মহত্যার বিচার হতো, তাহলে অরিত্রী অধিকারীকে মরতে হতো না।
ইউনুছ আলী আরও বলেন, আমি মঙ্গলবার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অভিযুক্তদের বরখাস্ত করতে গভর্নিংবডিকে লিগ্যাল নোটিশ দিয়েছিলাম, তবে তারা তা করেনি। অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তার এখন পুলিশ কাস্টডিতে অথবা সাসপেন্ডেড অথবা জামিনে থাকা উচিত ছিল। কিন্তু কিছুই হয়নি। এই আইনজীবী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বেচ্ছাচারী আচরণের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী আন্দোলন ছড়িয়ে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন।
উল্লেখ্য, অরিত্রীর বাবা দিলীপ অধিকারীর অভিযোগ, রোববার পরীক্ষা চলাকালে শিক্ষক অরিত্রীর কাছে মোবাইল ফোন পান। মোবাইলে নকল করেছে, এমন অভিযোগে অরিত্রীকে সোমবার তার মা-বাবাকে নিয়ে স্কুলে যেতে বলা হয়। তিনি স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে সোমবার স্কুলে গেলে ভাইস প্রিন্সিপাল তাদের অপমান করে কক্ষ থেকে বের হয়ে যেতে বলেন। মেয়ের টিসি (স্কুল থেকে দেয়া ছাড়পত্র) নিয়ে যেতে বলেন। পরে প্রিন্সিপালের কক্ষে গেলে তিনিও একই রকম আচরণ করেন। এ সময় অরিত্রী দ্রুত প্রিন্সিপালের কক্ষ থেকে বের হয়ে যায়। পরে বাসায় গিয়ে তিনি দেখেন, অরিত্রী তার কক্ষে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ওড়নায় ফাঁস দেয়া অবস্থায় ঝুলছে।
অরিত্রীদের শান্তিনগরের বাসা থেকে তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে সোমবার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে চিকিৎসকেরা অরিত্রীকে মৃত ঘোষণা করেন। অরিত্রীর আত্মহত্যার ঘটনার পর প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকেরা ক্ষোভে ফেটে পড়েন। তারা এই ঘটনার যথাযথ বিচার দাবি করেন। এদিকে গত মঙ্গলবার মেয়েকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেয়ার অভিযোগে অধ্যক্ষ-শিক্ষকসহ এই তিনজনকে আসামী করে পল্টন থানায় মামলা করেন অরিত্রীর বাবা দিলীপ অধিকারী।
ভিকারুননিসার ৩ শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা ॥ প্রতিবেদন ৯ জানুয়ারি
স্টাফ রিপোর্টার : শিক্ষার্থী অরিত্রী অধিকারীর মৃত্যুতে ‘আত্মহত্যায় প্ররোচনার’ অভিযোগে ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও কলেজের তিন শিক্ষকের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় আগামী ৯ জানুয়ারি তদন্ত প্রতিবেদন জমার তারিখ রেখেছে আদালত। ঢাকার মহানগর হাকিম সাদবীর ইয়াছির আহসান চৌধুরী পল্টন থানায় অরিত্রীর বাবা দিলীপ অধিকারীর করা এজাহার গ্রহণ করে এ তারিখ রাখেন। আদালতের সংশ্লিষ্ট পুলিশের সাধারণ নিবন্ধন কর্মকর্তা এসআই জালাল আহমেদ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
মামলায় ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও কলেজের অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌস, প্রভাতী শাখার প্রধান শিক্ষক জিন্নাত আরা এবং শ্রেণি শিক্ষক হাসনা হেনাকে আসামি করা হয়েছে। দণ্ডবিধির ৩০৫ ধারায় করা এই মামলায় সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড। এ ধারায় সর্বনিম্ন শাস্তি দশ বছর কারাদণ্ড, সেই সঙ্গে অর্থদণ্ড। তা ছাড়া আসামীর বিরুদ্ধে মামলা প্রমাণিত হলে তাকে যাবজ্জীবন করাদণ্ডও দেওয়া যাবে।
গত সোমবার শান্তিনগরে নিজের বাসায় গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেন বেইলি রোডের নামি প্রতিষ্ঠান ভিকারুননিসা স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী অরিত্রী।
স্কুল কর্তৃপক্ষের দাবি, অরিত্রী আগের দিন রোববার পরীক্ষায় মোবাইল ফোনে নকল নিয়ে টেবিলে রেখে লিখছিলেন। অন্যদিকে স্বজনদের দাবি, নকল করেননি অরিত্রী। এরপর সোমবার অরিত্রীর বাবা-মাকে ডেকে নেওয়া হয় স্কুলে। তখন অরিত্রীর সামনে তার বাবা-মাকে অপমাণ করা হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।
অরিত্রীর স্বজনরা বলছেন, বাবা-মার ‘অপমান সইতে না পেরে’ ঘরে ফিরে আত্মহত্যা করেন এই কিশোরী।
তবে অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌস শিক্ষার্থী অরিত্রীর অভিভাবকদের অপমান করার কথা অস্বীকার করেছেন।
অরিত্রীর আত্মহত্যার খবরে গত দুই দিন ধরে স্কুলের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করছেন শিক্ষার্থী-অভিভাবকরা। বিক্ষোভের মুখে ওই তিন শিক্ষককে বরখাস্তের পাশাপাশি তাদের এমপিও বাতিল এবং তিন শিক্ষকের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে স্কুলটির সবগুলো শাখায় ক্লাস-পরীক্ষা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেছে কর্তৃপক্ষ। তবে শিক্ষার্থীরা ছয় দফা দাবি তুলে সেসব না মানা পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ