ঢাকা, বৃহস্পতিবার 6 December 2018, ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ২৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

কুড়িগ্রামের সকল নদ-নদী পানিশুন্য মারাত্মক হুমকির মুখে জীববৈচিত্র

কুড়িগ্রাম : এক সময়ের প্রমত্তা ধরলা নদীর বুক চিরে জেগে উঠেছে ধূ ধূ বালুচর। যেখানে এক সময় লঞ্চ-স্টিমার ও পালতোলা নৌকা চলতো। মুমূর্ষু রোগীসহ সরকারি ঊর্ধ্বতন কেউ দ্রুত পারাপারের জন্য ছিল স্টিডবোর্ড। কালের আবর্তে ভারতীয় পানি আগ্রাসনের কারণে আজ তা মরুভূমিতে পরিণত হতে চলেছে

মোস্তাফিজুর রহমান কুড়িগ্রাম থেকে : কুড়িগ্রামের উপরদিয়ে বয়ে যাওয়া সর্বগ্রাসি ধরলা, তিস্তা, ব্রক্ষ্মপুত্র, গংগাধর ঝিঞ্জিরাম, হলহলিয়া, ফুলকুমোড় ও নীলকুমোড়সহ ১৬টি নদ-নদী শুকিয়ে ধু-ধু বালুচরে পরিণত হয়েছে। পানি শুন্য  ব্রক্ষ্মপুত্র ও ধরলাসহ সকল নদ-নদীর বুক চীরে জেগে ওঠা বালুচর এখন গোচারণ ভূমিতে পরিণত হয়েছে। মাছ ধরতে খেয়াপাড়ে ছুটে চলা বর্ষায় মাঝি-মাল্লাদের দৌড়-ঝাঁপ আর নেই। নেই পানি আর মাছে পরিপূর্ণ ধরলা । জেগে ওঠেছে শুধুই বালুচর। জেলেরা মাছ ধরতে না পেরে নিদারুন কষ্টে দিনাতিপাত করছে নদী তীরবর্তী হাজারো জেলে পরিবার। নদ-নদীর বুকে বসবাস করা বোয়াল, চিতল, আইড়, বাইগোড়, কর্তী, বৈরালি, বাইন, চিলকি, পাপদাসহ বিভিন্ন প্রজাতির সুস্বাদু মাছ আগেরমত জেলেদের জালে আর মেলে না। অন্যদিকে খাদ্য আর নিরাপদ বাসস্থানের অভাবে হারিয়ে যাচ্ছে হাড়গিলা, কোড়া, বেহুলা, বালিহাঁস, পানকৌরী, শামকুড়া, চখা-চখী ও বকসহ রং-বেরংয়ের বিভিন্ন প্রজাতির পাখি। অপরদিকে শিশু ও তারিয়ালসহ নানা জাতের জলচর প্রাণি আর বিগত দিনের মত চোখে পড়েনা, পড়েনা সবুজ শ্যামলে ছাওয়া পানিতে ভাষমান প্রকৃতির অপরুপ সবুজ উদ্ভিদ ও শ্যাওলা। তাই বিপন্ন হতে চলেছে জীববৈচিত্র।  
নদীতে মাছ না পাওয়ায় কর্মহীন হয়ে পড়েছে হাজারো জেলে পরিবার। এদের অনেকে  লোনের জালে জড়িয়ে পড়ে ছেড়ে দিয়েছেন পৈত্রিক  পেশা। কাজের সন্ধানে অনেকে পাড়ি জমিয়েছেন ঢাকা, চট্রগ্রাম সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। বাপ দাদার পেশা ছেড়ে অন্যত্র গিয়ে ভিন্ন পেষায় জড়িয়ে আয় রোজগার করে পরিবার পরিজনের খাবার জোগাড় করতে বাধ্য হচ্ছে অনেক পেশাজীবী জেলে পরিবারের কর্তা।
এক সময় নদ-নদীর চরে দাপিয়ে বেড়াতো গৃহপালিত প্রাণী গরু মহিষ ছাগল ভেড়ার দল। গৃহস্থদের যার পালে যত বেশী গরু মহিষ থাকতো তার সামাজিক মর্যাদা থাকতো ততোবেশী। প্রতিবছর নদী ভাঙ্গন আর পানি শুকিয়ে যাওয়ায় নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে আঁকাবাঁকা পথে পরিণত হয়েছে। চরে রাখালের বাঁশির সুর আর শোনা যায় না। দিনভর চলে কৃষকের খোঁড়াখুঁড়ি। প্রায় উধাও হয়ে যাচ্ছে কাশবন ঝাউবন আর কাটাবন। একদিন ধরলাসহ সব নদ-নদীর রুপ লাবন্য ঐতিয্য সবই ছিল পরিপুর্ণ। আজ থেকে ৩০ বছর আগেও ধরলা ও  ব্রক্ষ্মপুত্র ছিল ব্যাবসা বাণিজ্যের অন্যতম মাধ্যম। চলতো লঞ্চ ইস্টিমার আর পালতোলা নৌকা। নীলফামারী লালমনিরহাট হয়ে কড়িগ্রামের চিলমারী নৌ-বন্দর দিয়ে চীন, ভারতসহ দেশ বিদেশের বিভিন্ন প্রান্তে পন্য আনানেয়া হতো সামান্য খরচে। সবই আজ শুধুই ইতিহাস। জেগে ওঠা চরগুলোতে কৃষি ফসলও মারাত্মকভাবে হুমকির মধ্যে পড়েছে। অসংখ্য চরে সেচ দেয়ারমত পানিও নেই। ফলে বিপাকে পড়েছে ঐ এলাকার কৃষকসহ নানা শ্রেণী পেশার মানুষ। সব মিলে সবই আজ হুমকির মুখে। এখনই ব্যবস্থা না নিলে এক সময়ের উত্তাল ধরলা নদী মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে।
কুড়িগ্রাম জেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা জায়, ধরলার বুকে বাস করতো প্রায় ৩০ প্রজাতির সুস্বাদু মাছ। পানি না থাকায় সে মাছসহ জলচর সকল প্রাণি আজ বিলুপ্তির পথে। আর প্রাণিসম্পদ অফিসের তথ্যমতে জানা যায়, ধরলায় বাসকরা ৩০ প্রজাতির মাছসহ জীববৈচিত্রের মধ্যে অধিকাংশই এখন বিপন্ন প্রায়।
রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও রিভাইরান পিপলসের পরিচালক নদ-নদী গবেষক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেছেন, শুধু ধরলা নয়, উত্তরাঞ্চলে অন্যান্য সকল নদ-নদী পানি সংকটের কারণে ধীরে ধীরে মরুকরণের দিকে এগুচ্ছে। তিনি আরো বলেন, এ অবস্থা চলতে থাকলে উত্তরাঞ্চলের সকল নদী শুধুই ইতিহাস হয়ে থাকবে। আগামী প্রজন্ম জানবেই না নদী নামের শব্দটি।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড এর সাথে যোগাযোগ করে কোন নদীতে কতটুকু পানি আছে বা থাকার কথাছিল তা জানাতে চাইলে জানাতে পারেনি স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড। নদীগুলো ড্রেজিং করা নদীর নব্যতা সৃষ্টি করা এবং কৃষিতে সেচের ব্যবস্থা করা এখন সময়ের দাবী। তা হলে প্রতি বছর নদী ভাঙ্গন এবং অতি অল্প পানিতে বন্যার হাত থেকে রক্ষা পাবে নদী পারের মানুষ। বেড়ে যাবে আবাদি জমির পরিমাণ। বেচে থাকবে জীববৈচিত্র। বৃদ্ধি পাবে মাছ ও জলজ প্রাণি। রক্ষা পাবে সরকারি ও বেসরকারি স্থাপনা। ধরলাপারে সন্চাগার নির্মাণ করা হলে কয়েক লক্ষ্য হেক্টর জমি আসবে সেচের আওতায়। বৃদ্ধি পাবে কৃষি ফসল।
চিলমারী নৌবন্দর ঃ চিলমারী বন্দর কুড়িগ্রাম জেলা সদর জিরো পয়েন্ট শাপলা চত্বর থেকে ৩৫ কিলোমিটার দক্ষিণে  ব্রক্ষ্মপুত্র নদের তীরে অবস্থিত। যার পূর্বদিকে ব্রক্ষ্মপুত্রের ঐ পাড়ে জামালপুর।  ব্রক্ষ্মপুত্র নদের এবং চিলমারী বন্দরের গুরুত্ব জেলার মানচিত্রে অপরিসীম।  ব্রক্ষ্মপুত্র নদ পৃথিবীর অষ্টম বৃহত্তম নদ। ঐতিহাসিক এ চিলমারী বন্দরকে নিয়ে লেখা ভাওয়াইয়া গায়ক ভাওয়াইয়া স¤্রাট মরহুম আব্বাস উদ্দিনের বিখ্যাত ভাওয়াইয়া গান আজও বাংলার লোকসঙ্গীতের সম্পদ। এই চিলমারী বন্দর সংলগ্ন  ব্রক্ষ্মপুত্র নদী দিয়ে ব্রিটিশ আমলে বড় বড় জাহাজ চলাচল করতো। বর্তমানে এই বন্দর নদীর নব্যতা হ্রাসজনিত কারণে জাহাজ চলাচল একদম প্রায় শুন্যের কোটায় চলে এসেছে। শুধুমাত্র নৌপরিবহন ব্যবস্থাটি কোনো রকমে টিকে আছে। সীমিত আকারে বর্তমানেও ব্যবহৃত হচ্ছে নৌবন্দরটি। তবে তা মারাত্মক অস্তিত্ব সংকটে টিকে আছে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ