ঢাকা, শুক্রবার 7 December 2018, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ২৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

এক যে ছিল রাজা

মোহাম্মদ অংকন : এক যে ছিল রাজা। তিনি ছিলেন বোকা। কিন্তু তার মন্ত্রী ছিলো চালাক-চতুর। আর চালাকি করে রাজাকে নিত্যদিন ঠকানো-ই ছিল মন্ত্রীর প্রধান কাজ। 

একবার মন্ত্রী রাজকোষ থেকে বিপুল পরিমাণ ধান চুরি করলো। আর রাজাকে বললো, ‘রাজা মশাই, রাজা মশাই, এক্কেবারে সর্বনাশ হয়ে গেছে যে! রাজকোষে রাখা সকল ধান ইঁদুরে খেয়ে ফেলেছে! কি করা যায় এখন, বলুন তো!’ 

বোকা রাজা একবারও চিন্তা করলেন না যে এত ধান ইঁদুর খেতে পারে কি না! তিনি মন্ত্রীকে বললেন, ‘আমি কী করব? তুমি-ই এর ব্যবস্থা গ্রহণ করো।’ 

রাজার কথায় চালাক মন্ত্রীটা সুযোগ খুঁজলেন। মন্ত্রী ভাবলো, ‘ধান চুরি করে এক ধরনের লাভ করেছি, এবার ইঁদুর তাড়াতে ১০০ মোহর আমি রাজার কাছ থেকে ছলেবলে কৌশলে নিয়েই ছাড়ব।’ 

তাই তিনি রাজার কাছে বললেন, ‘রাজা মশাই, রাজা মশাই, যেহেতু ইঁদুর ধান খেয়েই ফেলেছে, এখন তো আর সে ধান ফিরে আনা যাবে না। তাই বলছি কি পরবর্তীতে যাতে আর ধান না খেতে পারে তাই ইঁদুর নিধনের জন্য কয়েকজন বাঁশিওয়ালাকে আনতে হবে।’ 

‘তো বসে আছ কেন? শ্রীঘই যাচ্ছ না কেন?’ 

‘রাজা মশাই, যাবো তো! তারা কী আর বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করবে?’ 

‘আহা! নিয়ে যাও না ১০০ মোহর। ইঁদুর নিধন হওয়া চাই, এই আমার হুকুম। তা না হলে আমি তোমাকেই নিধন করবো।’ 

রাজার এমন কথায় মন্ত্রী ভাবতে লাগলেন,  ‘কী ব্যাপার, রাজা মশাইয়ের বুদ্ধিসুদ্ধি খুলল না কি? আমাকে নিধন করতে চাচ্ছে? যাক গে, ১০০ মোহর তো পেলাম। দু’দিন পর একজন বাঁশিওয়ালাকে ডেকে এনে দু’টো মোহর দিয়ে বলিয়ে নেবো, সব ইঁদুর মারা গেছে।’

রাজ্যে মন্ত্রীর দু নাম্বারী কারসাজি আর কেউ বুঝতে না পারলেও পেট মোটা পেয়াদা সবই আন্দাজ করতে পারতো। তাই এ বিষয়ে তিনি নিশ্চিত যে রাজকোষের ধান ইঁদুর লুট করেনি এবং এটা সম্ভবও নয়। এ মধ্যে ‘কিন্তু’ আছে। বোকা রাজা মশাই সেটা বুঝছেন না। তাই মন্ত্রীকে হাতে নাতে ধরার জন্য রাজ দরবারে পেয়াদা আর মুখ খুললেন না। তিনি সুযোগের অপেক্ষায় রইলেন। গোপনে মন্ত্রীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন।

রাজাকে নামমাত্র দেখানোর জন্য মন্ত্রী পরের দিন একজন বাঁশিওয়ালাকে খুঁজতে রাজ্যের পথে বেরিয়ে পড়লেন। পেয়াদা তার মতিগতি বেশ বুঝতে পারলেন। তাই বাঁশিওয়ালার ছদ্মবেশে মন্ত্রীর নিকট রাস্তায় তিনি দেখা করলেন। মন্ত্রী বাঁশিওয়ালাকে পেয়ে আনন্দে যেন চিৎকার দিয়ে উঠলেন। 

‘পেয়েছি, আমি পেয়েছি।’ 

‘মন্ত্রী মশাই, আপনি কী পেয়েছেন, শুনি? হাতে তো কিছু দেখছি না?’ 

‘ও তুমি বুঝবে না? তোমাকে পেয়েছি। তুমিই পারবে আমার কাজটি সাধন করে দিতে। তোমাকে নগদ ৫ টি মোহর দেওয়া হবে।’ 

‘মন্ত্রী মশাই, আমি আপনার কথা কিছু বুঝচ্ছি না। যদি একটু খুলে বলতেন।’ 

‘তাহলে শোনো, তোমাকে কী কী করতে হবে?..’ 

অতঃপর মন্ত্রী ছদ্মবেশী পেয়াদাকে তার সকল গোপন কু-কর্মের কথা বলে দিলেন এবং এখন কী করতে যাচ্ছেন, তাও বলে দিলেন। এই সুবর্ণ সুযোগে চৌকশ পেয়াদা সব কথাবার্তা টেপরেকর্ডারে তুলে নিলেন। যাতে রাজার কাছে সঠিক প্রমাণ দিয়ে ধূর্ত মন্ত্রীকে শাস্তির ব্যবস্থা করানো যায়। এসব মন্ত্রী বুঝতেই পারল না।

পূর্বের পরিকল্পনা অনুযায়ী পরের দিন বাঁশিওয়ালাকে নিয়ে মন্ত্রী মশাই রাজ দরবারে হাজির হলেন। 

‘কি গো মন্ত্রী, ও তুমি কাকে ধরে এনেছ?’ 

‘জি¦ রাজা মশাই, তাকে আপনি চিনবেন না। তিনি একজন বাঁশিওয়ালা। আর তার চৌকশ বাঁশির আওয়াজে রাজ্যের সকল ইঁদুর ইতোমধ্যে পালিয়ে চলে গেছে। রাজকোষ থেকে ধান লুট করে খাওয়ার মতো আর কেউ নেই, রাজা মশাই। আমি তার পারিশ্রমিক হিসাবে ১০০ মোহর দিয়েছি। আপনি যদি তাকে আরও কিছু পুরস্কার হিসাবে দিতে চান তাতে আমার কোনো আপত্তি নেই।’ 

‘হ্যাঁ, তাকে তো আমি পুরস্কার দিবই, সাথে তোমাকেও দেবো। এত সুন্দর একটি কাজ করলে, তোমরা তা তো পুরস্কারের যোগ্য বটেই। তবে তার আগে আমি বাঁশিওয়ালার বাঁশি বাজানো শুনতে চাই। বাঁশি বাজানো শোনা আমার অনেক দিনের শখ। হে বাঁশিওয়ালা, বাজাও না তোমার বাঁশের বাঁশি।’

ছদ্মবেশী পেয়াদা রাজার এ সুযোগকে কাজে লাগানোর জন্য প্রস্তুতি নিলেন। মন্ত্রী তাকে বললেন, ‘কি ব্যাপার বাঁশিওয়ালা, তুমি থেমে আছো কেন? বাজাও তোমার যাদুকরী বাঁশি। নিশ্চিত পুরস্কার পাবে।’

‘জি¦ হুজুর, আমি এখনই বাঁশি বাজানো শুরু করছি’ বলে পেয়াদা তার টেপরেকর্ডারটি উচ্চস্বরে চালু করে দিলেন। আর সঙ্গে সঙ্গে মন্ত্রীর বলা সকল কারসাজির কথা সবাই শুনতে পেতে থাকল। মন্ত্রী যেন আকাশ থেকে ভেঙ্গে পড়ল! রাজা মশাই তার কারসাজির প্রমাণ পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে মন্ত্রীকে গ্রেপ্তার করতে প্রধান সেনাপতিকে হুকুম দিলেন। তিনি কাল বিলম্ব না করে মন্ত্রীকে রাজজেলে বন্দী করলেন। 

তারপর রাজা মশাই বাঁশিওয়ালাকে প্রশ্ন করলেন, ‘তুমি কেন সব ফাঁস করে দিলে হে বাঁশিওয়ালা?’

তখন তিনি তার ছদ্মবেশ খুলে ফেলে বললেন, ‘আমি পেয়াদা বলছি। মন্ত্রী যে এত বড় প্রতারণা করবে তা আমি আগেই বুঝতে পেরেছিলাম। তাই..’ 

‘হা হা হা, তোমার তো বেশ বুদ্ধি দেখছি। তুমি আমাকে বড় ধরনের প্রতারণার হাত থেকে বাঁচালে পেয়াদা। তোমাকে তো যথোপযুক্ত পুরস্কার প্রদান করা প্রয়োজন মনে করছি।’ 

‘জি¦ হুজুর, আপনার মর্জি হয়।’ 

‘হে প্রিয় রাজদরবারের সদস্যগণ শুনুন, আজ থেকে সে আর পেয়াদা নয়। তাকে আমি এ রাজ্যের মন্ত্রী হিসাবে নিযুক্ত করলাম।’ 

তারপর রাজা মশাই সবাইকে মিষ্টিমুখ করিয়ে নতুন মন্ত্রীকে বরণ করে নিলেন। 

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ