ঢাকা, শুক্রবার 7 December 2018, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ২৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

বিদেশিদের অভিমত

বাংলাদেশে দায়িত্ব পালনরত কয়েকটি দেশের কূটনীতিকরা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, এদেশে তারা আবারও ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো কোনো নির্বাচন দেখতে চান না। তারা এমন একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক নির্বাচন দেখতে চান, যে নির্বাচনে সব দল বাধাহীনভাবে ভোটের মাঠে প্রচারণাসহ তৎপরতা চালাতে পারবে। যে নির্বাচনে ভোটাররাও স্বাধীনভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে এবং পছন্দের দল ও প্রার্থীদের ভোট দিতে পারবে। 

দৈনিক সংগ্রামসহ গণমাধ্যমের রিপোর্টে জানানো হয়েছে, গত বুধবার রাজধানীর একটি হোটেলে নির্বাচনের পরিবেশ সম্পর্কে রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ ও নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায় কূটনীতিকরা এসব বক্তব্যের মাধ্যমে নিজেদের অভিমত তুলে ধরেছেন। কানাডা, আইআইডি এবং এনডিআইয়ের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত রুদ্ধদ্বার ওই সভায় কানাডা ছাড়াও সুইডেন, নরওয়ে, অস্ট্রেলিয়া এবং জাপানের কূটনীতিকরা অংশ নিয়েছেন। অন্যদিকে ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টাসহ আওয়ামী লীগ, বিএনপি এবং বিকল্প ধারার প্রতিনিধিরা। তাদের বাইরেও সাবেক নির্বাচন কমিশনার এবং নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা ব্রতী ও সুজনসহ সুশীল সমাজের শীর্ষস্থানীয় প্রতিনিধিরা মতবিনিময় সভায় অংশ নিয়েছেন।

রুদ্ধদ্বার বৈঠক বলে গোপনীয়তা বজায় রাখার ফলে কোনো দল বা সংগঠনের প্রতিনিধিরাই বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেননি। তা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম জানিয়েছেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য সরকারের পক্ষে নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ সম্পর্কে তারা কূটনীতিকদের অবহিত করেছেন। নির্বাচনকে সুষ্ঠু করার পথে যেসব সমস্যা রয়েছে সেগুলো কাটিয়ে ওঠার ব্যাপারে সরকার যে ব্যবস্থা নিচ্ছে সে সম্পর্কেও কূটনীতিকদের অবহিত করা হয়েছে। তারা আরো বলেছেন, সবকিছু সরকারের একার পক্ষে করা সম্ভব নয়। এজন্য নির্বাচন কমিশনের রাজনৈতিক দল ও গণমাধ্যমের সহযোগিতা দরকার।

অন্যদিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য কোন ধরনের ব্যবস্থা নেয়া দরকার সে সম্পর্কে কূটনীতিকদের জানানো হয়েছে। তিনি একথাও জানিয়েছেন, বিদ্যমান রাজনৈতিক সংকটসহ নির্বাচনের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে অবহিত করার পাশাপাশি বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে তারা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড প্রসঙ্গে বলেছেন। সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে অঙ্গীকার করা সত্ত্বেও এখনো যে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড প্রস্তুত করা হয়নি এবং তা সত্ত্বেও বিএনপি এবং অন্য বিরোধী দলগুলো যে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে সে কথাও কূটনীতিকদের জানিয়েছেন তারা।

সরাসরি অভিযোগ না জানালেও বিএনপি নেতা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কিছু কথাও বলেছেন। তার মতে সব জেনেও তারা দীর্ঘ পাহাড়ি ভ্রমণ শুরু করেছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের মাঠে নামার পর মনে হচ্ছে, তারা আরো নিচের দিকে যাচ্ছেন। নির্বাচন কমিশনও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যাপারে জনগণের মধ্যে কোনো আশাবাদের সৃষ্টি করতে পারেনি। কমিশনের ভূমিকা বরং প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। এমন অবস্থায়ও বিএনপি আশা করে, আগামীর বাকি দিনগুলোতে সরকার ও নির্বাচন কমিশন প্রমাণ করবে যে, তারা আসলেও সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে চায়। না হলে বিএনপির পাহাড়ি ভ্রমণ বাধাগ্রস্ত হবে। তারা দুর্ঘটনার কবলে পড়বেন। 

নিজেদের উদ্বেগ-আশংকার কারণ জানাতে গিয়ে আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, দেশে এখন নির্বাচিত সরকার নেই এবং সংসদের প্রতিনিধিরাও জনগণের ভোটে নির্বাচিত নন। ফলে সবই রয়েছে সরকারের নিয়ন্ত্রণে। এমন অবস্থায় সরকারের হস্তক্ষেপ অত্যন্ত স্বাভাবিক। আর সরকার যদি হস্তক্ষেপ করে তাহলে নির্বাচন কমিশনের পক্ষে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা সম্ভব হবে না। ফলে নির্বাচন যেমন প্রশ্নবিদ্ধ হবে দেশও তেমনি ‘খারাপের দিকে’ যেতে পারে।    

প্রাসঙ্গিক অন্য কিছু বিষয়েও বলেছেন জনাব আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তার মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে বিএনপির বক্তব্য ও মনোভাবেরই প্রকাশ ঘটেছে। এমন অবস্থার মধ্যে সব শুনেও কূটনীতিকরা যেহেতু সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের তাগিদ দিয়েছেন সেহেতু সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব অনেক বেড়ে গেছে বলে আমরা মনে করি। আমরা আশা করতে চাই, গণগ্রেফতার ও গায়েবি মামলা বন্ধ করার পাশাপাশি নির্বাচন সংক্রান্ত সকল বিষয়ে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড প্রস্তুত করা হবে এবং সব দলের প্রার্থীরাই সমান সুযোগ-সুবিধা ও অধিকার ভোগ করার সুযোগ পাবেন। ক্ষমতাসীনদের পাশাপাশি নির্বাচন কমিশনকেও বুঝতে হবে, সংখ্যায় স্বল্প হলেও যেক’টি দেশের কূটনীতিকরা বুধবারের মতবিনিময় সভায় অংশ নিয়েছেন সে দেশগুলো বাংলাদেশের সকল উন্নয়ন কর্মকান্ডে সহায়তা করে থাকে। সুতরাং বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থেই সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের উচিত লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড প্রস্তুত করার মাধ্যমে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করা। কূটনীতিকরা যে আবারও ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো কোনো নির্বাচন দেখতে চান নাÑ সে কথাটাও বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলের মনে রাখা উচিত।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ