ঢাকা, শুক্রবার 7 December 2018, ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ২৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

জাতীয় সংসদ নির্বাচন-২০১৮ নিয়ে জনমনে উৎকন্ঠা

এডভোকেট আব্দুস সালাম প্রধান : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০১৮-এর দিনক্ষণ ঠিক হয়েছে। তারিখ ৩০ শে ডিসেম্বর ২০১৮। আজ ৬ ডিসেম্বর ২০১৮ ইং। বাংলার গ্রামগঞ্জে নির্বাচনের পালে হাওয়া লাগেনি। গ্রামগঞ্জ, নগর, মহানগরের ভোটাররা যাদেরকে প্রজাতন্ত্রের মালিক বলা হয়, তারা এখনও জানেন না কে হবেন তাদের এলাকার সংসদ সদস্য প্রার্থী বা তারা কাকে ভোট দেবেন। ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ সাল পর্যন্ত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের মাঝে ভোটের ব্যাপারে অনেক উৎসাহ উদ্দীপনা দেখেছি। কিন্তু তারপর থেকে কেন যেন জনগণ এখন আর ভোটের ব্যাপারে মনের আবেগ নিয়ে অংশ গ্রহণ করতে চায় না। ডিসেম্বর মাসের বিরাট একটি অংশ মনোনয়নপত্র দাখিল, বাছাই, প্রত্যাহার এবং প্রতীক বরাদ্দেই চলে যাবে। ডিসেম্বররের ৩০ তারিখ আসতে মাত্র ২৪ দিন বাকি। এত কম সময়ে দেশের সাধারণ ভোটারদের পক্ষে যোগ্য প্রার্থী যাচাই বাছাই সম্ভব বলে মনে হয় না। গত পাঁচ বছর যাবত সরকারী দল কিংবা বিরোধীদলের পক্ষ থেকে সাধারণ ভোটারদের কাছে গিয়ে সভা সমিতির মাধ্যমে তাদের কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরে নি বা ধরতে পারে নি। এখন সাধারণ ভোটাররা জাতীয় সংসদ সদস্য প্রার্থী এবং তাদের দল থেকে এক রকম বিচ্ছিন্নই বলা যায়। আমি রাজধানী থেকে অনেক দূরে রংপুরে বাস করি। গত ২৮ তারিখ থেকে রংপুরসহ সারাদেশে ২০ দলীয় জোট পক্ষের একজন প্রার্থী জনাব মোহাম্মদ গোলাম রব্বানীর মনোনয়নপত্র জমা না নেয়া নিয়ে নানা ধরনের গুঞ্জন আর নাটকীয়তার জন্ম হয়। বিষয়টি এখন টক অব দ্যা কান্ট্রিতেও পরিণত হয়েছে। ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ এর নির্বাচনের সময় কোন প্রকার জিজ্ঞাসাবাদ ছাড়াই যেকারো কাছে মনোনয়নপত্র নেয়া হত। জানতে পেরেছি জনাব গোলাম রব্বানীর পক্ষে তাঁর একজন সমর্থক মিঠাপুকুর উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ে একটি মনোনয়নপত্র বিগত ২৭/১১/২০১৮ তারিখে জমা দিতে গেলে তাঁকে নাকি গ্রেফতার করা হয়। পরদিন ২৮/১১/১৮ ইং তারিখে জনাব গোলাম রব্বানীর পক্ষে আর একটি মনোনয়নপত্র তার প্রস্তাবকারী সমর্থকরা তাদের আইনজীবীসহ জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার নিকট জমা দিতে যাওয়ার সময় নাকি ভয়ভীতি দেখায়ে প্রস্তাবকারী সমর্থনকারীকে ঐ এলাকা থেকে বিতাড়িত করা হয়। পরে জনাব গোলাম রব্বানীর আইনজীবী মনোনয়নপত্রটি জেলা রিটার্নিং অফিসারের নিকট জমা দেয়ার চেষ্টা করলে মনোনয়নপত্রটি জেলা রিটার্নিং অফিসার প্রস্তাবকারী ও সমর্থনকারীর অনুপস্থিতিজনিত কারণে গ্রহণ করেননি। জনাব গোলাম রব্বানী তার গৃহিত না হওয়া মনোনয়নপত্রটি নিয়ে তা গ্রহণের জন্য নির্বাচন কমিশনের দ্বারস্থ হন। নির্বাচন কমিশন ০২ ডিসেম্বর ১৮ তারিখে জনাব গোলাম রব্বানীর আবেদন না মঞ্জুর করলে তিনি মহামান্য হাইকোর্টে তার মনোনয়নপত্রটি যাতে জমা নেয়া হয় সে জন্য ১৫২৩৮/১৮ নম্বর রীট আবেদন দাখিল করেন। মহামান্য হাইকোর্ট বিগত ০৩/১২/১৮ ইং তারিখে জনাব গোলাম রব্বানীর রীট আবেদন মঞ্জুর করেন। জেলা রিটার্নিং অফিসার মহোদয়কে বাংলাদেশের ১১ তম সংসদ নির্বাচনের রংপুর-৫ আসনের জন্য গোলাম রব্বানীর মনোনয়নপত্র গ্রহণের নির্দেশ দেন। ঐ আদেশের বিরুদ্ধে মহামান্য সুপ্রীম কোর্টের এ্যাপিলেট ডিভিশনে আপিল করা হলে এ্যাপিলেট ডিভিশন মহামান্য হাইকোর্টের আদেশ বহাল রাখে। 

মহামান্য হাইকোর্টের আদেশের জাবেদা কপিসহ গত ৫/১২/১৮ তারিখে জনাব গোলাম রব্বানীর মনোনয়নপত্রটি তার মনোনয়ন প্রস্তাবকারী মোহাম্মদ ওমর ফারুক ওয়াহেদী এবং সমর্থনকারী মোহাম্মদ আমিরুল ইসলাম রংপুর আইনজীবী সমিতির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম মন্ডলসহ প্রায় ২০ জন আইনজীবী রংপুরের জেলা প্রশাসক এবং জেলা রিটার্নিং অফিসারের নিকট জমা দিতে যান। মাননীয় রিটার্নিং অফিসারের প্রশাসন প্রস্তাবকারী ও সমর্থনকারী এবং তাদের সাথে ৩ জন আইনজীবীকে রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে ঢোকার অনুমতি দেয়। তারা মনোনয়নপত্র জমা দিয়ে ফেরার পথে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন মনোনয়ন প্রস্তাবকারী মোহাম্মদ ওমর ফারুক ওয়াহেদী এবং সমর্থনকারী মোহাম্মদ আমিরুল ইসলামকে গ্রেফতারের চেষ্টা করে। এক পর্যায়ে সমর্থনকারী আমিরুল ইসলামকে আইনজীবীগণ ছাড়ায়ে আনতে সমর্থ হলেও প্রস্তাবকারী মোহাম্মদ ওমর ফারুক ওয়াহেদীকে ডিবি পুলিশ অফিসে তুলে নিয়ে যায়। জানতে পেরেছি ঐ দিন বিকালে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়। আজ ৬ ই ডিসেম্বর সকাল ১০ ঘটিকায় মনোনয়নপত্রটি বাছাইয়ের জন্য প্রার্থী ও প্রার্থীর আইনজীবীকে রিটার্নিং অফিসারের অফিস থেকে নোটিশ দেয়া হয়। জনাব গোলাম রব্বানীর মনোনয়ন প্রস্তাবকারী এবং সমর্থনকারী তাদের আইনজীবীদের নিয়ে যথাসময়ে রিটার্নিং অফিসার মহোদয়ের সভাকক্ষে উপস্থিত হন। সেখানে পূর্ব থেকে প্রায় ৫০/৬০ জন সরকারী দলের নেতাকর্মী বসেছিল। রিটার্নিং অফিসার মহোদয় অল্প সময়ের মধ্যে দুটি কারণ দেখিয়ে জনাব গোলাম রব্বানীর মনোনয়নপত্রটি বাতিল ঘোষণা করেন। তাহলো এক ঃ তিনি তথ্য ফরমে তাহার বিরুদ্ধে চলমান থাকা মোকদ্দমাগুলোর মধ্যে দুটির তথ্য দেননি। দুই ঃ তিনি মিঠাপুকুর উপজেলা চেয়ারম্যান হিসাবে শপথ গ্রহণ করেছেন এবং মাননীয় জেলা প্রশাসক রংপুর বরাবর একটি পদত্যাগপত্রও দাখিল করেছেন। কিন্তু তা এখনও গৃহীত হয়নি। জানতে পেরেছি জনাব গোলাম রব্বানী বিগত উপজেলা নির্বাচনে মিঠাপুকুর উপজেলা থেকে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলেও একদিনের জন্যেও তার দায়িত্ব পালনের সুযোগ পাননি। বাছাই পর্বে গোলাম রব্বানীর পক্ষে তার আইনজীবী কিছু বলতে চাইলে রিটার্নিং অফিসার মহোদয় তাতে অনুমতি দিলেও সরকারি দলের কর্মীরা ঐ আইনজীবীর দিকে তেড়ে আসে। পরে রিটার্নিং অফিসার উদ্যোগী হয়ে পরিস্থিতি শান্ত করেন। সাংবাদিকরা ঘটনার খবর সংগ্রহের চেষ্টা করলে সরকারি দলের কর্মীরা তাদেরকেও হেনস্থা করে এবং অনেকের ক্যামেরায় তোলা ছবি ডিলিট করতে বাধ্য করে। ভিন্ন কারণে আমি রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে উপস্থিত থেকে পরিস্থিতির যে ভয়াবহতা লক্ষ্য করলাম তাতে নিজেকেসহ দেশের সাধারণ ভোটারদের জন্য যথেষ্ট অনিরাপদ বোধ করছি। মনোনয়নপত্র দাখিল, মনোনয়নপত্র বাতিল, বাতিলের বিরুদ্ধে আপিল, আপিলের রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট পিটিশন আনয়ন, রিট পিটিশনের বিরুদ্ধে এ্যাপিলেট ডিভিশনে আপিল পুনরায় মনোনয়নপত্র গ্রহণ এবং বাছাই পর্বে পুনরায় মনোনয়নপত্র বাতিল, পুনরায় নির্বাচন কমিশনে আপিল তারপর আপিল আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে পুনরায় আপিল মোকদ্দমা আনয়ন, প্রতীক বরাদ্দ গ্রহণ ইত্যাদি প্রক্রিয়ার মধ্যেই মনে হয় অনেক প্রার্থীর নির্বাচনে অংশ গ্রহণের সাধ মিটে যাবে। নিজের এলাকায় যে পরিস্থিতি লক্ষ্য করলাম তাতে সারা দেশের পরিস্থিতি কি তা অনুমান করা সহজ হয়েছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচন একেবারে আসন্ন। কোন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র গ্রহণ নিয়ে একের পর এক সৃষ্ট জটিল পরিস্থিতি দেখে সাধারণ ভোটাররা যথেষ্ট উদ্বেগ উৎকন্ঠার মধ্যে দিনাতিপাত করছে। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ এখনও ভালভাবে জানে না যে কবে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছে আদৌ ভোট হবে কি? আবার অনেকে বলছেন মানুষ ভোট কেন্দ্রে যেতে পারবে তো? কেউ বলছেন আমার ভোটটি আমি কেন্দ্র পর্যন্ত গিয়ে দিতে পারব কি? আবার কেউ বলছেন ভোটের দিন অনেক হাঙ্গামা হবে। আমরা শান্তিপ্রিয় মানুষ। আমি চাই আমাদের দেশে একটি শান্তিপূর্ণ অবাধ এবং সুষ্ঠু জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক। নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত সকল ধরনের গ্রেফতার, মামলা-হামলা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা হোক। দেশের সাধারনণ ভোটাররা জানতে পারুক যে তাদের ভোটের প্রার্থী কে। ভোটাররা ভোট কেন্দ্রে নিরাপদে পৌঁছবার এবং নিরাপদে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে নিজের ভোট প্রয়োগ করে ঘরে ফেরার নিশ্চয়তা না পেলে তারা কখনই ভোট কেন্দ্রে যাবে না। তা সত্ত্বেও দেশে হয়তো একটি নির্বাচন হবে। কিন্তু তা হবে নির্বাচনের নামে প্রহসন। যা আন্তর্জাতিক বিশ্বে বাংলাদেশের ভাব মর্যাদাকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণœ করবে। দেশের জনগণ এতে আরোও বেশি হতাশায় নিমজ্জিত হবে।

লেখক : রংপুর জেলা জজ কোর্টের আইনজীবী

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ