ঢাকা, শনিবার 8 December 2018, ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ২৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

নির্বাচন নিয়ে সংঘাত-সংঘর্ষ জনগণ চায় না

ইসমাঈল হোসেন দিনাজী : আগামি ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের তারিখ ঘোষিত হয়েছে। দেশের প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকরা নির্বিঘ্নে ও নিরাপদে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য মুখিয়ে আছেন। কারণ ২০১৪ সালে ৫ জানুয়ারিতে জনগণ যে ভোটানুষ্ঠান প্রত্যক্ষ করেছে তা শুধু নির্বাচনের নামে প্রহসনই নয়, বরং ছিল গণতন্ত্রহত্যার দোর্দণ্ড তাণ্ডব। এছাড়া বিনাভোটে ১৫৩ জন সংসদসদস্য মনোনীত হবার ন্যক্কারজনক ঘটনা বাংলাদেশেতো বটেই, পৃথিবীর অন্যকোনও দেশে এমনটি ঘটেছে বলে আমাদের জানা নেই।
গণতান্ত্রিক রীতিনীতি অনুযায়ী রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু বিদ্বেষ ও প্রতিহিংসা থাকা উচিত নয়। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আমাদের রাজনীতিতে বিদ্বেষ এবং প্রতিহিংসা এতোটাই প্রবলতর যে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মিথ্যে ও বানোয়াট অভিযোগে ঘায়েল তো করা হয়ই অহরহ; যেকোনও উপায়ে দুনিয়া থেকে মুছে ফেলবার কূটকৌশলও অবলম্বন করা হয়। এর চাইতে দেশ ও জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক আর কী হতে পারে?
এবারের সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের অন্যতম শর্ত। এজন্য সকল দলের নির্বিঘ্নে নির্বাচনে অংশগ্রহণ এবং শেষপর্যন্ত টিকে থাকা জরুরি। কিন্তু ক্ষমতাসীনদের তরফ থেকে প্রায় প্রতিদিনই বক্তৃতাবিবৃতিতে উসকানি দেয়া হচ্ছে বিএনপির নেতৃত্বে ২০ দল বা ড. কামাল হোসেনের জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে যাতে না থাকে। তাঁরা চাচ্ছেন, ৫ জানুয়ারির মতো এবারের নির্বাচনও যেন ফাঁকা মাঠে অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা এবং পুত্র জনাব সজীব ওয়াজেদ জয় গত ৩ ডিসেম্বর তাঁর এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে এমনই বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে নির্বাচন কমিশনকে নিয়ে একের পর এক অভিযোগ করেই যাচ্ছে বিএনপি। প্রথমে তারা অভিযোগ করলো গ্রেফতার নিয়ে। তাদের কর্মীরা ২০১৩-২০১৫ সাল পর্যন্ত কয়েক হাজার আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটিয়েছে। শত শত নিরীহ মানুষকে পুড়িয়ে মেরেছে, আহত করেছে হাজার হাজার নারী-পুরুষ-শিশুকে।
এসব ঘটনার পেছনে চিহ্নিত বেশির ভাগ লোকই এতদিন লুকিয়ে অথবা দেশের বাইরে পালিয়েছিল। এখন নির্বাচনের আগে তারা গর্ত থেকে বেরিয়ে আসছে, এমনকি নির্বাচনেও অংশ নিচ্ছে। এদের নিয়ে নির্বাচন কমিশনের কি করা উচিত? সামনে নির্বাচন বলে তাদের আইনের আওতায় আনা যাবে না? এদের জায়গা তো জেলখানা নয়। এদের জায়গা ফাঁসিকাষ্ঠ।’
সারাদেশে বিএনপির লাখ লাখ নেতা-কর্মী গ্রেফতার করে জেলে পুরে ও রিমান্ডে নিয়েও ক্ষমতাসীনরা তুষ্ট নন। তাঁরা বিএনপিসহ অন্য দলের সবাইকে ফাঁসিতে ঝুলোতে চান। হত্যা করতে চান। এমন মনোভাবই প্রকাশ করছেন জয় সাহেব।
সজীব জয় আরও বলেন, ‘এখন বিএনপি তাদের মনোনীত প্রার্থীদের মনোনয়ন বাতিল নিয়ে অভিযোগ করছে। বিএনপি’র চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া এবং ভাইস চেয়ারপার্সন দুজনেই আদালতে সাজাপ্রাপ্ত। তারেক, একজন পলাতক আসামী এবং হত্যা ও সন্ত্রাসের দায়ে অভিযুক্ত, লন্ডনে বসে তার দলের প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন। একজন পলাতক খুনীর হাতে নির্বাচিত প্রার্থী আর কেমনইবা হতে পারে? তাদের বেশিরভাগ প্রার্থীই হয় অপরাধী না হয় দুর্নীতিগ্রস্ত। ঋণখেলাপী। এমনকি তাদের নামে হত্যা মামলাও আছে। যেমন আবুল কালাম মোহাম্মদ রিয়াজুল করিম, যিনি পিরোজপুর থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন, ব্রিটিশ আদালতের চিহ্নিত ফেরারি আসামি।
নির্বাচন কমিশনের কি আসলেই উচিত ছিল এসব চিহ্নিত ফেরারি আসামি, ঋণখেলাপীদের নির্বাচন করতে দেওয়া? বিএনপি মোট আসনের দ্বিগুন প্রার্থীকে মনোনয়ন দিয়েছে, প্রতিটি আসনে কমপক্ষে দুইজনকে মনোনয়ন দিয়েছে তারা। কারণ তারা জানে, তাদের বেশির ভাগ প্রার্থীই হয় কোনও মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামী না হয় ঋণখেলাপী এবং এরা নির্বাচনের অযোগ্য। এখন তারা নির্বাচন কমিশনকে কলঙ্কিত করতে এটাকে ব্যবহার করছে।
আসল কথা হচ্ছে, বিএনপি’র ৩০০ জন যোগ্য প্রার্থী নেই যাদের তারা মনোনয়ন দিতে পারে। তারা শেষ যেবার ক্ষমতায় ছিল সেটি ছিল দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে সহিংস এবং দুর্নীতিপরায়ন সরকার। অবশ্য তখন সারা পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার হিসেবে কুখ্যাতিও ছিল তাদের।’
জনাব জয় নিজদলীয় মনোনয়ন সম্পর্কে আরও বলেন, ‘যেসব প্রার্থীর দুর্নাম আছে, আইনি অভিযোগ আছে মাত্র, এমন প্রার্থীদের বাদ দিয়েছে আওয়ামী লীগ। শুধুমাত্র জনমতের কারণে, যেসব বর্তমান সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে কোনও ধরনের অভিযোগ আছে আদালতে তা খারিজ হয়ে গেলেও আওয়ামী লীগ এমন প্রার্থীদের মনোনয়ন দেয়নি। মানুষের জন্য কাজ করে যে দল, তাদের পক্ষেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব।’
রাজনীতিতে নিজদলের সাফাই গাওয়া খুব একটা দোষের মনে করেন না অনেকে। জনগণও তেমন আপত্তি তোলেন না। তাই বলে দিনকে রাত এবং রাতকে দিন বলে চালাতে গেলে জনগণের কাছে ধরা খেতে হয়। এই ধরা খাবার ভয়েই হয়তো ক্ষমতাসীনরা দুর্নীতিবাজদের বাদ দিয়ে মনোনয়ন দিতে বাধ্য হয়েছেন। এজন্য আওয়ামী লীগকে ধন্যবাদ দেয়াই যায়। কিন্তু সারাদেশে হামলা চালিয়ে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার করে ও গায়েবি মামলা ঠুকে যে লেভেল ফিল্ড বানানো হচ্ছে তা দেখে জনগণ তথা ভোটাররা বেশ উদ্বিগ্ন। তাঁরা মনে করছেন, হয়তো আরেকটা ৫ জানুয়ারির নির্বাচনই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। শুধু সজীব জয়ই নন, ক্ষমতাসীনদের অনেকেই হুংকার ছাড়ছেন নির্বাচনের আগেই। ক্ষমতায় আবার এলে কী করবেন কে জানে! প্রধানমন্ত্রীর ত্তথ্যপ্রযুক্তিউপদেষ্টা বিএনপির নেতা-কর্মীদের জেল-জুলুম কিংবা রিমান্ডে নিয়েও খুশি নন, তিনি তাঁদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিতেই প্রস্তুত। জয় সাহেব একা নন, দলটির অন্য নেতারাও বিএনপি-জামায়াত নেতা-কর্মীদের মানুষ  হত্যাকারী ও আগুনসন্ত্রাসী বলে আসছেন। কিন্তু পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর কর্তব্যরতরা কথিত আগুনসন্ত্রাসীদের হাতেনাতে গ্রেফতার করতে পারেনি কেন? এমনকি সন্ত্রাসীদের স্পটে গুলি করতেও কোনও মানা ছিল না। কিন্তু তা রহস্যজনকভাবে ঘটেনি। পরে বিএনপি ও জামায়াতনেতা-কর্মীদের বাড়ি বাড়ি হামলা চালিয়ে এবং গ্রেফতার করে মামলায় ফাঁসিয়ে রিমান্ডে নেবার কা- রীতিমত উদ্দেশ্যমূলক। অমানবিক এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ব্যতীত আর কী হতে পারে? জয় সাহেবের প্রতিহিংসামূলক ফেসবুক স্ট্যাটাস ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের আরও দুর্বিনীত ও প্রতিহিংস করে তুলবে শতগুণ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তথ্যপ্রযুক্তিউপদেষ্টা ও আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত ছেলে এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দৌহিত্রের ফেসবুক স্ট্যাটাসে এমন উসকানি দায়িত্বহীনতার পরিচায়ক বৈকি। আর এমন বক্তব্য শুধু গণতন্ত্র নয়, বর্তমান ক্ষমতাসীন দলটির জন্যও সুখকর হবে বলে মনে হচ্ছে না। এমনকি বুমেরাংও হতে পারে।
আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক নিজদলের কর্মীদের ভয় দেখিয়ে বলেছিলেন, ‘ক্ষমতা হারালে কেউ দেশে থাকতে পারবে না। লাখ লাখ নেতা-কর্মী মারা যাবে।’ এর অর্থ হচ্ছে যেকোনও উপায়ে ক্ষমতা আঁকড়ে রাখতে হবে। ক্ষমতা হারালেই তাঁদের অনেক কিছু হারাতে হবে। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কিছুটা নমনীয় হয়েছেন বলে মনে হয়। তিনি বলেছেন, ‘জনগণ ভোট দিলে ক্ষমতায় থাকবো, না দিলে নেই।’ মন্ত্রীসভায় বৈঠকেও তিনি বলেন, ‘দেখা আর নাও হতে পারে।’ হ্যাঁ, এগুলো হচ্ছে গণতান্ত্রিক কথা। বোধের কথা। নেতৃত্বসুলভ ঔদার্য। এমন মানসিকতা যদি সত্যই হয়, তাহলে সংঘাত-সংঘর্ষের আশঙ্কা থাকবার কথা নয়। কিন্তু মুখে এক কথা আর কাজে যদি অন্যকিছু হয় তাহলেই সমস্যা। আমরা প্রধানমন্ত্রীর শেষকথার বাস্তবায়ন দেখতে চাই নির্বাচন-পূর্ব দিনগুলোতে এবং ভোটের দিনেও। কিন্তু আলামত তেমন দেখা যাচ্ছে না। অন্যদিকে সজীব ওয়াজেদ জয়ের উসকানিমূলক ফেসবুক স্ট্যাটাস দেশের মানুষকে উদ্বিগ্ন করে তুলছে। নির্বাচন সম্পর্কেও উদ্বেগ ছড়াচ্ছে।
দীর্ঘ ১০ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি তথা ২০ দলীয় ঐক্যজোট সহস্র জুলুম-নির্যাতন উপেক্ষা করে কেবল গণতন্ত্র উদ্ধারের স্বার্থে বেগম জিয়াকে ছাড়াই জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতৃত্বে আসন্ন অসম নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রী ও উপদেষ্টারা যদি উসকানিমূলক বক্তৃতা-বিবৃতির মাধ্যমে নির্বাচন ভ-ুল করেন তাহলে পরিস্থিতি সবার জন্যই বিপজ্জনক হয়ে পড়তে পারে। আর এ নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও সবার জন্য অংশগ্রহণমূলক করতে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকাদেরই দায়িত্ব বেশি।
নির্বাচন নিরপেক্ষ, অবাধ ও সুষ্ঠু করবার দায়িত্ব সম্পূর্ণ নির্বাচন কমিশনের হলেও ক্ষমতাসীনদের সহায়তা ছাড়া হবে না। নিকের সেরকম শিরদাঁড়া কোথায়? কমিশনের দুই-একজন সদস্য অবাধ ও সুষ্ঠু  নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে থাকলেও সিইসি এবং সচিব ক্ষমতাসীন দলটির হয়ে কাজ করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ অভিযোগ কেবল কথার কথা এমন নয়। অন্তত তাঁদের কথাবার্তায় ইতোমধ্যে তা প্রমাণিতও। তবে নিক একনিষ্ঠ হয়ে দায়িত্ব পালন করলে আসন্ন নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হতে পারে বলে আমরা আশাবাদ ব্যক্ত করতে চাই। দেশের সাধারণ জনগণও চায় না নির্বাচন নিয়ে কোনও অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হোক। এ নিয়ে কোনও সংঘাত-সংঘর্ষ সৃষ্টি হলে গণতন্ত্র পুনরুজ্জীবনের আশাজাগানিয়া নির্বাচন আবারও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ