ঢাকা, রোববার 9 December 2018, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ১ রবিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

বাংলাদেশের শীতল পাটি এখন বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ

মুহাম্মদ নূরে আলম : আবহমান বাংলার লোক-ঐতিহ্যের অনন্য স্মারক এই শীতল পাটি। লোক কবিদের কাব্যগানেও রয়েছে শীতল পাটির আলাদা স্থান। শীতল পাটির পরশে প্রাণ জুড়ানোর কাল হয়তো আমরা পেরিয়ে এসেছি, এসি বা ফ্যানের বাতাসেই এখন আমরা গরমে আরাম খুঁজি। তারপরও শীতল পাটির আবেদন আমাদের স্মৃতিকাতর মন থেকে হারাতে পারেনি। হস্তশিল্পের সাথে জড়িতরা কোনো ভৌগোলিক আয়তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তাদের উপস্থিতি অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃত। আর এই শিল্প বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে যোগসূত্র সৃষ্টি করে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্লাটফর্মও শিল্পীদের মধ্যে সংযোগ সাধনের কাজ করে। এ ধরনের একটি প্লাটফর্ম হলো ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ প্লাটফর্ম।
২০১৭ সালের ৬ ডিসেম্বর দক্ষিণ কোরিয়ার জেজু আইল্যান্ডে এর দ্বাদশ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এতে ইন্টারগবার্নমেন্টাল কমিটি অব ইউনেস্কো বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী শীতল পাটিকে (Traditional art of Shital Pati weaving of Sylhet Bangladesh) ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ (আইসিএইচ) হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে। শিল্পপ্রেমীদের কাছে এটি একটি বিরাট মুহূর্ত। শীতল পার্টির অন্তর্ভূক্তির ফলে তালিকায় বাংলাদেশের পণ্যসংখ্যা দাঁড়াল চারে। অন্যগুলো হলো জামদানি শাড়িতে ঐতিহ্যবাহী নক্সা (২০১৩) ও বাউল সঙ্গীত (২০০৮)।
সম্প্রতি অবসরে যাওয়া প্রখ্যাত আমলা সিলেটি-বংশোদ্ভূত গুরুসাদে দত্ত বাংলার লোককলা ও শিল্প রক্ষায় ভূমিকা রাখার জন্য সুপরিচিত। বাংলার হস্তশিল্পের গুরুত্ব সম্পর্কে তিনি লিখেছেন যে এই অঞ্চলের লোকজ শিল্প সাধারণ কৃষকদের আনাড়ি হাতের শিল্প নয়, বরং তা প্রতিটি ব্যক্তির সামাজিক মাত্রার মধ্যে তার শিক্ষা ও অবস্থানের মাত্রার বহিঃপ্রকাশ। আর কারিগর ও তাদের পৃষ্ঠপোষকেরা ভিন্ন কেউ নন, বরং একই সাংস্কৃতিক ধারার অংশবিশেষ।
বাংলাদেশের কোনো কোনো স্থানে শীতল পাটি তৈরির কথা জানা গেলেও মূলত শীতল পাটি হলো মেঝেতে পাতা একধরনের আসন। এটি বাংলাদেশের একটি ঐতিহ্যবাহী কুটিরশিল্প। মুর্তা বা পাটি, বেত বা মোস্তাক নামের গুল্মজাতীয় উদ্ভিদের ছাল থেকে এ পাটি তৈরি হয়। হস্তশিল্প হিসেবেও এ পাটির যথেষ্ট কদর রয়েছে। শহরে শো-পিস এবং গ্রামে এটি মাদুর বা চাদরের পরিবর্তে ব্যাপকভাবে ব্যবহত হয়। সাজসজ্জা দ্বারা সজ্জিত মাদুরকে আবার নকশি পাটিও বলা হয়। শীতল পাটি বোনা হয় বেত-জাতীয় গাছের আঁশ থেকে। এই গাছটি মোস্তাক, পাটিপাতা, পাটিবেত ও পৈতারা। এই গাছটি সিলেট, সুনামগঞ্জ, বরিশাল, টাঙ্গাইল, কুমিল্লা, নোয়াখালী, ফেনি, চট্টগ্রামে জন্মায়। শীতল পাটি সত্যিকার অর্থেই একটি বিরাট শিল্পকর্ম। এই কাজে নারীরা বিশেষ ভূমিকা পালন করে। এই শিল্পের সাথে জড়িতরা তাদের অঞ্চলের নক্সা ও মটিফকে প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। বিশেষ করে শুকনা মওসুমে মুর্তা থেকে বেত তৈরি হয়। বর্ষা মওসুমে দীর্ঘ সময় নিয়ে যতœসহকারে বোনা হয় শীতল পাটি। শীতল পাটিতে কারিগররা দক্ষতার সঙ্গে ফুটিয়ে তোলেন গান, কবিতা, জীবজন্তুসহ প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলি। নকশা করা শীতল পাটি শৌখিন অনেকে গৃহসজ্জার কাজেও ব্যবহার করেন। আর বর-কনেকে শীতল পাটিতে বসিয়ে আপ্যায়নের রীতিও পুরনো।
শীতল পাটির কাহিনি অনেক দীর্ঘ। ব্রিটিশ আমল থেকেই এর কদর। ব্রিটিশ রাজপ্রাসাদে শীতল পাটি শোভা পেয়েছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় সিলেটের ঐতিহ্যবাহী শীতল পাটি মোগল শাসনামলে সম্রাট আওরঙ্গজেব এবং ব্রিটিশ আমলে রানি ভিক্টোরিয়ার রাজদরবারে উপঢৌকন হিসেবে গিয়েছিল এবং রাজরাজারা যারপরনাই প্রীত হয়েছিলেন। জানা যায়, ১৯১৯ সালে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আমন্ত্রিত হয়ে সিলেটে সেখানকার বেত ও বাঁশের বানানো চেয়ার টেবিল, ব্যাগ ইত্যাদি দেখে অভিভূত হয়ে কয়েক ফর্দ কিনে নিয়ে শান্তিনিকেতনে ব্যবহার করেছিলেন। কিন্তু যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে বিশ্বব্যাপী বাজারজাত করার মতো এমন একটি পণ্য আজ অবহেলিত। এর সাথে জড়িত কারিগররাও ধুঁকে ধুঁকে শেষ হচ্ছে। তবে ইউনেস্কোর ‘ইনটেনজিবল কালচারাল হেরিটেজ’ (আইসিএইচ) কমিটি শীতল পাটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ায় প্রায় হারিয়ে যাওয়া শীতল পাটি নিয়ে বাংলাদেশ তথা সারা বিশ্বে হৈ-চৈ পড়ে যায়। ফলে এর সাথে জড়িত পেশাজীবীদের মনে আশার সঞ্চার হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় শীতল পাটির বুনন ও এটি তৈরির প্রধান উপকরণ মুর্তার ব্যাপক চাষ করলে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পরিচিতি আসবে ভিন্নমাত্রায়। শীতল পাটির কারিগর হিসেবেও অনেক বেকার পুরুষ-মহিলার কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ভাটির জনপদে বর্ষার সময় কর্মহীন সময়কে কাজে লাগাতে পারে মুর্তা দিয়ে পাটি তৈরি করে। নানা ডিজাইনের শীতল পাটির কদর রয়েছে ইউরোপ-আমেরিকাসহ মধ্যপ্রাচ্যে।
বৃহত্তর সিলেটের বালাগঞ্জ শীতল পাটির জন্য বিখ্যাত। এ ছাড়া মৌলভীবাজারের রাজনগর এলাকার ১০০ গ্রামের প্রায় ৪ হাজার পরিবার সরাসরি এ কারুশিল্পের সঙ্গে জড়িত। ভাটির জনপদ বলে খ্যাত জামালগঞ্জ, জগন্নাথপুর, ধর্মাপাশায়ও শীতল পাটি তৈরি হয়। দক্ষিণ সুনামগঞ্জের রামেশ্বরপুর গ্রামের শীতল পাটির কথা অনেকেরই জানা। ওইসব অঞ্চলে প্রচুর মুর্তা উৎপাদন হয়। অনেকাটা আগাছার মতো পতিত জমিতে মুর্তার জন্ম। সিলেটের শীতল পাটির বুননশিল্পীরা ‘পাটিয়াল’ বা ‘পাটিকর’ নামে পরিচিত। সংশ্লিষ্টরা জানালেন, সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ প্রদান ও সঠিক বাজারমূল্য নির্ধারণের মাধ্যমে এ শিল্পকে রক্ষা করা সম্ভব। এখনকার দিনে স্বল্প পরিসরে মান বুঝে ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে ১০ হাজার টাকা মূল্যের শীতল পাটি বাজারে পাওয়া যায়। এই সময়ের অর্থমূল্যের তুলনায় শতবর্ষ আগে এই পাটির দাম সোনার দামের চেয়েও বেশি ছিল তা অনুমান করাই যায়।
আমাদের আশার কথা এই যে, দিন দিন বাংলাদেশের নানা ঐতিহ্য ও ইতিহাস এখন বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পাচ্ছে। প্রতœনিদর্শন হিসেবে পাহাড়পুরের বৌদ্ধবিহার ও বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদ, ম্যানগ্রোভ বন হিসেবে সুন্দরবন এবং বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে। এবার এই তালিকায় নাম উঠল সিলেটের শীতল পাটিরও। আমরা যদি বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বেত গাছের চাষ সম্প্রসারণ করতে পারি, পাটিয়ালদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে পারি তবে বিশ্ব ঐতিহ্যের আবেগি পরশ আমাদের নতুন প্রজন্মকেও নিশ্চয় দিতে পারি। সরকারি বা বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় আবার ফিরুক শীতল পাটির অনুপম শিল্প। ঐতিহ্যের আতিশয্যে কাটুক বাঙালি জীবন। সিলেটের ঐতিহ্যের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত শীতলপাটি অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। নিজেদের প্রয়োজনে শীতলপাটি তৈরির প্রধান কাঁচামাল মুর্তা উজাড় করে ফেলার কারণে বিয়ানীবাজারে মুর্তার বাগান হারিয়ে যেতে বসেছে। অথচ একসময় এখানকার বিভিন্ন খাল-বিল ও লোকালয়ের পাশে প্রচুর মুর্তা পাওয়া যেত। কিন্তু বর্তমানে মুর্তা দুষ্প্রাপ্য হয়ে ওঠেছে। উইকিপিডিয়ায় মুর্তাকে পাটিবেত বা পাটিপাতা বা মুস্তাক নামে বর্ণনা করা হয়েছে। মুর্তার বৈজ্ঞানিক নাম ঝপযঁসধহহরধহঃযঁং ফরপযড়ঃড়সঁং. এটি বাংলাদেশে বিছানার মাদুর শীতলপাটি তৈরির প্রধান কাচামাল। মুর্তা উদ্ভিদ জাতীয় সবুজাভ প্রকৃতির। এর গা আকারে বেশি বড় ও লম্বায় এত দীর্ঘ হয় না। গায়ে ২ ইঞ্চি থেকে ৪-৫ ইঞ্চি ব্যাসার্ধ গোলাকার ও লম্বায় দু’হাত থেকে ৫-৬ হাত লম্বা। জাম বা কাঁঠালের পাতার মতো আকারও সবুজ। এতে রজনীগন্ধার ফুলের মতো সাদা ফুল ফুটে তবে ঘ্রাণ নেই। মুর্তা গাছের আবৃত সবুজ অংশের আবরণ পাতলা করে চিলে উঠানো সম্ভব। মুর্তাকে চাকু দিয়ে চিলে যে সরু ও চিকন বেত বের করা হয় তাই মুর্তা বেত। বেতকে বের করার পর ভেতরে যে সাদা অংশ পড়ে থাকে তাকে মুর্তার বুক বলা হয়। মুর্তার বুক শুকিয়ে জ্বালানিতে ব্যবহার করা যায়। কিন্তু শীতলপাটির জন্য উপযুক্ত বেত বের করতে মুর্তা বেত থেকে শুধু সবুজ আবরণটুকু চিলে নেয়ার ফলে আরেকটি সাদা অংশে বেতস্বরূপ পাওয়া যায়। সিলেট অঞ্চলের মাটি ও আবহাওয়া মুর্তা গাছের জন্য সহায়ক। এটি বনাঞ্চলের স্যাঁতসেঁতে মাটি ও বাড়ির পার্শ্ববর্তী ভেজা নিচু জমিতে হয়ে থাকে। ডোবা অথবা পুকুরের একপাশেও মুর্তা গাছ হয়। আধুনিকতা এই শিল্পের টুঁটি চেপে ধরেছে। আগে পাটির শীতলতা মানুষকে যেখানে প্রশান্তি দিত, সেখানে ইলেকট্রনিক্স সামগ্রীর শীতলতায় এখন স্বস্তি নিচ্ছে মানুষ। বৃটিশ আমলে রাণী ভিক্টোরিয়ার প্রাসাদে সিলেটের শীতল পাটি অভিজাত্য হিসেবে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছিল।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ