ঢাকা, রোববার 9 December 2018, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ১ রবিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী দৃষ্টিনন্দন ‘ধনু বেপারী হলুদ মসজিদ’

মুহাম্মাদ আখতারুজ্জামান : পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ‘হলুদ মসজিদ’। মসজিদটির পুরো নাম ‘ধনু বেপারি হলুদ মসজিদ’। রাজধানী ঢাকার নারিন্দার শরৎগুপ্ত রোডে অবস্থিত। নির্মাণের নির্ধারিত দিনক্ষণ জানা না গেলেও মসজিদটি শত বছরের পুরনো বলে জানা গেছে। এ এলাকার প্রবীণ ব্যক্তিরা জানালেন মসজিদটি চাকচিক্যের দিক দিয়ে নতুনের মতো মতো হলেও এটি একটি প্রাচীন মসজিদ। ধনু বেপারি হলুদ মসজিদটিকে বেশির ভাগ মানুষ ‘হলুদ মসজিদ’ নামেই বেশি পরিচিত। এটি শুধু নারিন্দার ঐতিহ্য নয় বরং পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন স্থাপত্যের একটি।
মসজিদের স্থপতি: মসজিদটি যার নামে স্থাপিত, তিনি হলেন ‘ধনু বেপারি’। ধনু বেপারি ছিলেন নারিন্দার অনেক সম্পদশালী ব্যক্তি। ১৮৫০ সালে তিনি মারা যান। ১৮৪০ থেকে ১৮৫০ সালের মধ্যে এ মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। সে হিসেবে মসজিদটির বয়স প্রায় পৌণে দুই’শ বছর। হলুদ মসজিদটি ধনু বেপারি যেভাবে তৈরি করেন সে স্ট্রাকচার বর্তমানে নেই। ১৯৪০ সালে পুরনো মসজিদটিকে ভেঙে নতুনরূপ দেয়া হয়। বর্তমানে ধনু বেপারি হলুদ মসজিদে দেড় থেকে দুই হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। মসজিদটির চতুর্থ ও পঞ্চম তলায় দ্বীন শিক্ষায় রয়েছে মাদরাসা।
দৃষ্টিনন্দন এ মসজিদটি দেখতে ভ্রমন পিপাসুরা পুরান ঢাকায় ঘুরতে যান। ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা মসজিদটি দেখার পাশাপাশি প্রাচীন এ আল্লাহর ঘর মসজিদে নামাজ আদায় করে নিজেকে ধন্য মনে করেন।
হলুদ মসজিদটি নারিন্দার শরৎগুপ্ত রোডে অবস্থিত। ধনু বেপারী সম্পর্কে জানতে চাইলে এলাকাবাসীদের মধ্যে কয়েকজন প্রবীণ ব্যক্তি জানালেন, ধনু বেপারী, শরৎ গুপ্ত এরা ছিলেন নারিন্দার ভূস্বামী। এখানকার বেশিরভাগ সম্পত্তির মালিক এরাই ছিলেন। তা ছাড়া ধনু বেপারীর নানা কারবার ছিল। তারা বলেন, আমরা বিভিন্নভাবে জানতে পেরেছি যে, ১৮৫০ সালের দিকে ধনু বেপারীর মৃত্যু হয়।
এলাকাবাসীর মধ্যে জাহিদ হোসেন নামের একজন সাবেক সরকারী কর্মকর্তার ভাষ্যনুযায়ী, ধনু বেপারীর ছিলেন দুই নাতনি। সায়রা বিবি ও আমিনা বিবি। আমিনা বিবির স্বামীর নাম মনির হোসেন। সায়রা বিবির বংশধরদের কথা জানা যায় না। অনেকে বলেন তিনি নিঃসন্তান ছিলেন। আমিনা বিবি-মনির হোসেন দম্পতির ছেলে আজাহার হোসেন। আজাহার হোসেনের দুই ছেলে মোজাফফর হোসেন ওরফে চান মিয়া (কমিশনার ছিলেন) ও জহির হোসেন ওরফে মাহতাব মিয়া। এই জহির হোসেনের ছেলেই জাহিদ হোসেন। তিনি জানিয়েছিলেন, ১৮৫০ সালের দিকে ধনু বেপারীর মৃত্যু হয়। ১৮৪০ থেকে ১৮৫০ সালের মধ্যে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। সেই হিসেবে মসজিদটির বয়স ১৭০ থেকে ১৮০ বছর।
এলাকাবাসী আরও জানান, আজাহার হোসেনের ছেলেরা দীর্ঘদিন এই মসজিদের মোতাওয়াল্লী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাদের মৃত্যুর পর এখন কমিটির মাধ্যমে মসজিদটি পরিচালিত হচ্ছে। মনির হোসেন নারিন্দার মানুষের কাছে পরিচিত নাম। জীবনের বড় অংশজুড়ে তিনি জনপ্রিয় কমিশনার ছিলেন। তার নামে এখানে সড়ক আছে। এ সম্পর্কে ‘কিংবদন্তির ঢাকা’ বইতে নাজির হোসেন লিখেছেন, ঢাকার পৌর কমিশনার মুনসী মুনীর হোসেন (এই বানানে লিখেছেন) তথা মুনীর হোসেন বেপারীর নামে ১৯২২ সালে নারিন্দার উত্তর পার্শ্ব এলাকাটি মুনীর হোসেন লেন নামকরণ করা হয়।
মসজিদটির নির্মাণ ইতিহাস: হলুদ মসজিদ। দেখতেও হলুদ। পুরো নাম ধনু বেপারী হলুদ মসজিদ। পুরান ঢাকার নারিন্দাবাসীর কাছে একটি গর্বের নাম। পুরোনো স্থাপনার গায়ে সাধারণত নির্মাণ সময়ের সাল-তারিখ উৎকীর্ণ নামফলক থাকে। কিন্তু এর গায়ে কিছুই নেই। মসজিদটি বয়সের কথা জানতে চাইলে এলাকাবাসী জানান, মসজিদটির বয়স প্রায় দুই’শ বছর হবে। তারা যুক্তি দেখিয়ে বলেন, আমাদের বাপ-দাদারাও এ মসজিদে নামাজ আদায় করেছেন বলে আমাদের জানিয়েছেন। সে হিসাবে মসজিদটি প্রায় দুইশত বছরের পুরাতন একটি মসজিদ। ধনু বেপারি ছিলেন নারিন্দার এক সম্পদশালী ব্যক্তি। ১৮৫০ সালে তিনি মারা যান। ইতিহাসবিদদের ধারণা ১৮৪০ থেকে ১৮৫০ সালের মধ্যে এ মসজিদটি নির্মাণ করা হয়। সে হিসেবে মসজিদটির বয়স প্রায় পৌণে দুই’শ বছর।
বর্তমান অবস্থা: ধনু বেপারী মসজিদটির যে কাঠামো নির্মাণ করেছিলেন তার কোনো চিহ্ন আজ অবশিষ্ট নেই। মসজিদটি যখন প্রথম নির্মাণ করা হয় তখন সেটি ছিল ছোট আকারের একটি একতলা মসজিদ। সেই সময় এ এলাকায় এতো ঘনবসতিও ছিল না। দিনে দিনে এলাকায় জনবসতি বাড়তে থাকে। মসজিদটি বড় করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এরপর ১৯৪০ সালের দিকে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সম্মতির ভিত্তিতে বর্তমান কাঠামোটি নির্মাণ করা হয়। আর চারতলা, পাঁচতলা সম্প্রসারিত হয়েছে আরও পরে।
যেভাবে যাবেন: ছুটির দিনে আপনি ঘুরতে যেতে পারেন পুরান ঢাকার নারিন্দার শরৎগুপ্ত রোডে। দেখে আসতে পারেন দৃষ্টিনন্দন ধনু বেপারির হলুদ মসজিদটি। রাজধানীবাসী মসজিদটি দেখতে চাইলে নিজস্ব গাড়ী, রিক্সা, কিংবা সিএনজিসহ আপনার পছন্দ যেকোনো মাধ্যমে যেতে পারেন। আত্মার প্রশান্তির জন্য মহান রাব্বুল আলামিনের হুকুম পালনে নামাজ আদায় করতে পারেন ঐতিহ্যবাহী এ মসজিদে। এরপর মাগরিবের নামাজ শেষে নিরিবিলি ফিরতে পারেন নিজের গন্তব্যে। আর রাজধানীর বাইরে থেকে মসজিদটি দেখতে যেতে চাইলে প্রথমে আপনাকে দুরপাল্লার বাস, ট্রেন কিংবা লঞ্চ যোগে রাজধানীতে পৌঁছাতে হবে। এরপর রাজধানী ঢাকার গাবতলী, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, গুলিস্তান, কমলাপুর কিংবা সদরঘাট থেকে যেকোনো বাহনে নারিন্দার শরৎগুপ্ত রোডে অবস্থিত ‘হলুদ মসজিদ’-এ সহজেই যাওয়া যাবে। সেখানে গিয়েই আপনি দেখতে পারবেন মনোমুগ্ধকর এ মসজিদটি।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ