ঢাকা, সোমবার 10 December 2018, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ২ রবিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

নতুন সহিংসতার পর ‘জাতীয় ঐক্য পুনর্গঠনে’র শপথ ফরাসি প্রধানমন্ত্রীর

প্যারিসে কেন্দ্রস্থলে ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনকারীদের মিছিল  -রয়টার্স

৯ ডিসেম্বর, বিবিসি, আনাদুলো এজেন্সি, রয়টার্স : তুমুল বিক্ষোভ-সহিংসতার মুখে ‘জাতীয় ঐক্য পুনঃস্থাপনে’র অঙ্গীকার করেছেন ফরাসি প্রধানমন্ত্রী এদুয়া ফিলিপ। গত শনিবার  চতুর্থ সপ্তাহের মতো বিক্ষোভ থেকে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার পর এ ঘোষণা দেন তিনি। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে এ কথা জানা গেছে।

ফ্রান্সে জ্বালানির কর বৃদ্ধি ও জীবন যাপনের ক্ষেত্রে উচ্চ মূল্যসহ বিভিন্ন ইস্যুতে প্রতিবাদ জানাতে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলছে ‘ইয়েলো ভেস্টস’ আন্দোলন। ফ্রান্সের ইতিহাসে গত এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে এটিই সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ। ক্রমাগত এ আন্দোলন আরও জোরালো হয়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে পরিণত হতে থাকে। একইসঙ্গে সহিংস রূপ ধারণ করে তা। ১ ডিসেম্বর প্যারিসের রাস্তায় কয়েক দশকের সবচেয়ে ভয়াবহ সহিংসতা হতে দেখা গেছে। সহিংসতায় প্রাণহানিও হয়। তুমুল বিক্ষোভের মুখে ফ্রান্স সরকার জ্বালানি কর বৃদ্ধির সিদ্ধান্তটি বাতিল করলেও বিক্ষোভকারীদের অসন্তোষ থেকেই গেছে এবং অন্য ইস্যুগুলো নিয়ে বিক্ষোভ চলছে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বহীন ইয়েলো ভেস্টস বিক্ষোভকারীরা সরকারকে ন্যুনতম পেনশন, কর ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন, অবসরের বয়সসীমা কমানোসহ ৪০টিরও বেশি দাবি-দাওয়া ছুড়ে দিয়েছে। গত শনিবার উগ্র ডানপন্থী ও বামপন্থী দুই পক্ষের আন্দোলনকারীরাই রাস্তায় নামার ঘোষণা দিলে ফ্রান্সজুড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে জোরদার করা হয়। এদিন আগের সপ্তাহের মতো অতোটা ভয়াবহ মাত্রায় না হলেও বিভিন্ন জায়গায় সহিংসতা হয়েছে। এদিন পুলিশ বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে কাঁদানে গ্যাস ও রাবার বুলেট ছুড়েছে। প্রায় ১ হাজার মানুষকে নিরাপত্তা হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। তারপরও অব্যাহত রয়েছে বিক্ষোভ।

এ পরিস্থিতিতে গত শনিবার ফরাসি প্রধানমন্ত্রী এদুয়া বলেছেন, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আলোচনা ‘চালিয়ে যেতে হবে’। তিনি বলেন, ‘কোনও কর ব্যবস্থাই আমাদের জাতয়ি ঐক্যকে বিপন্ন করতে পারে না। আলোচনা, কাজ ও কাছাকাছি আসার মধ্য দিয়ে আমাদেরকে এখন সে জাতীয় ঐক্য পুনঃনির্মাণ করতে হবে।’

ইয়োলো ভেস্ট আন্দোলন শুরু হয় গত নভেম্বরে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে প্রশমিত করতে জ্বালানির কর বাড়ায় ফরাসি সরকার। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলেছেন,এতে চাপ পড়েছে মূলত নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর। এর প্রতিবাদে আন্দোলন সংগঠিত হয়। আইন অনুযায়ী,বেশি আলো প্রতিফলিত করে এমন এক ধরনের বিশেষ নিরাপত্তামূলক জ্যাকেট গাড়িতে রাখতে হয় ফরাসি চালকদের। এর রঙ সবুজাভ হলুদ। আন্দোলনকারীরা এই জ্যাকেট (ভেস্ট) পরে বিক্ষোভ শুরু করলে তাদের নাম হয়ে যায় ‘ইয়োলো ভেস্ট’ আন্দোলনকারী।

ফরাসি সরকারের অভিযোগ,আন্দোলনটি সংক্ষুব্ধ সাধারণ ফরাসিদের দ্বারা সংঘটিত হলেও, এখন সেটি চরম ডানপন্থী এবং নৈরাজ্যবাদীদের দখলে চলে গেছে। তারা সহিংসতা ও অস্থিরতা তৈরি করছে। আন্দোলনের মুখে সরকার জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত বাতিল করলেও,‘ইয়োলো ভেস্ট’ আন্দোলনকারীরা এখন নতুন নতুন দাবি নিয়ে হাজির হচ্ছেন। কর হার কমানো,বর্ধিত হারে নূন্যতম আয় নিশ্চিত করা,জ্বালানির মূল্য আরও কমানো, অবসরকালীন সুবিধা বাড়ানো এবং ফরাসি প্রেসিডেন্টের পদত্যাগের মতো দাবি এখন যুক্ত হয়েছে তাদের তালিকায়।

ফ্রান্সজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে ব্যাপক বিক্ষোভ। শনিবার ‘ইয়োলো ভেস্ট’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ব্যাপক সংঘর্ষে জড়ায় পুলিশ। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টোফে কাস্তানের এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, বিক্ষোভ চলাকালে সারা দেশে ১৭ পুলিশ কর্মকর্তাসহ ১৩৫ জন আহত হয়েছেন। রবিবার এক প্রতিবেদনে এ খবর জানিয়েছে তুরস্কভিত্তিক সংবাদমাধ্যম।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্রিস্টোফে কাস্তানের জানান, সারা দেশে বিক্ষোভে অংশ নিয়েছে এক লাখ ২৫ হাজার মানুষ। এরমধ্যে ৯৭৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

মধ্য প্যারিসে বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশ আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। এতে আন্দোলনকারীরা শহরের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে এবং ছোট ছোট অংশে বিভক্ত হয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার পর আন্দোলনকারীরা গাড়ি, কাঠের শাটারসহ বিভিন্ন জিনিসে আগুন ধরিয়ে দেয়।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বন্ধ করে দেওয়া হয় প্যারিস ও ল্যুভর মিউজিয়ামের মতো পর্যটনকেন্দ্রগুলো। পর্যটকদের রাস্তায় বের না হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

প্যারিসে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দিতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস, জলকামান ব্যবহার করেছে। এমনকি আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে ফরাসি পুলিশ ঘোড়ায় চড়েও তাদের তাড়া করেছে। পুলিশ দাবি করছে, শনিবারের ঘটনায় তুলনামূলকভাবে কম সহিংসতা হয়েছে গত সপ্তাহের তুলনায়। ওই সময় শতাধিক গাড়িও পুড়িয়েছিল আন্দোলনকারীরা। সে সময়কার লুটপাটকে ১৯৬৮ সালের দাঙ্গালুটপাটের চেয়েও বেশি ভয়ঙ্কর হিসেবে চিহ্নিত করে হয়েছে।

আন্দোলনকারীদের একজন বলেছেন, ‘আমাদের হাঁটু গেড়ে বসে পড়তে বাধ্য করা হয়েছে। তারপরও তারা টিয়ার গ্যাস ছুড়েছে।’

আন্দোলনকারীরা ফ্রান্স সরকারের বিরুদ্ধে চলা এই বিক্ষোভকে আখ্যা দিয়েছে ‘অ্যাক্ট ফোর,’ যেন এটা কোনও নাটকের চতুর্থ অঙ্ক। বিক্ষোভকারীদের অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের কারণে প্যারিস পরিণত হয়েছে ভুতুড়ে নগরীতে। দোকান-পাট সব বন্ধ। অথচ এখন বড়দিনের মৌসুম। ব্যবসা-বাণিজ্য তুঙ্গে থাকার কথা।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ