ঢাকা, শুক্রবার 14 December 2018, ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ৬ রবিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

ফারাক্কা বাঁধ চালুর পর পদ্মায় এযাবত পানির উচ্চতা কমেছে ১৮ মিটার

রাজশাহী : পদ্মা নদী পানিশূন্য হয়ে পড়ছে দ্রুতই। ঘটছে চরের ব্যাপক বিস্তার। গত মঙ্গলবার রাজশাহীর দৃশ্য।             ছবি : সোহরাব হোসেন সৌরভ

সরদার আবদুর রহমান : চলতি শুষ্ক মওসুমের আগেই ভরাট হয়ে যাচ্ছে পদ্মা নদীর বুক। প্রতিদিনই পড়ছে নিত্যনতুন চর। ঘটে চলেছে অসংখ্য চরের বিস্তার। স্রোত না থাকায় লাখ লাখ টন পলি পড়ছে নদীর বুকে। জানা গেছে, ফারাক্কা বাঁধ চালুর পর থেকে গঙ্গা-পদ্মায় এযাবত পানির উচ্চতা কমেছে ১৮ মিটার পর্যন্ত।

অন্যদিকে চলতি বছরেও পদ্মায় পানির অভাবে রাজশাহীসহ বরেন্দ্র অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ভূ-গর্ভে পানির স্তর ৩৫ ফুট থেকে ১১০ ফুট পর্যন্ত নীচে নেমে গেছে। এতে চাষাবাদ ও মাছ চাষ হুমকির মুখে পড়েছে বলে বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয়রা জানান। পদ্মায় নদীর তলদেশ শুকিয়ে রাজশাহী নগরীর পাশে নদীর মূল ধারা থেকে দেড় কিলোমিটার চওড়া এবং ২০ থেকে ২২ কিলোমিটার দীর্ঘ চর পড়েছে বলে জানা গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সদ্য বন্যা মওসুম শেষ হওয়ার পর অতি দ্রুত পানি নেমে যায় উৎসের দিকে। অন্যদিকে উজান থেকে প্রয়োজনীয় পানি প্রবাহ না পৌঁছানোয় শুষ্ক মওসুমের শুরুতেই পদ্মায় পানি প্রবাহ বিপুল মাত্রায় কমে যেতে শুরু করেছে। এর পলে পদ্মা ইতোমধ্যেই মরা নদীর রূপ নিয়েছে। স্রোত না থাকায় লাখ লাখ টন পলি এসে পড়ছে পদ্মার বুকে। বছরে পদ্মায় তিন মাস পানি থাকলেও নয় মাসই পানি থাকে নদীর তলায়। এর ফলে নদীর বেশির ভাগ এলাকা জুড়ে জেগে উঠে চর। পদ্মা শুকিয়ে যাওয়ায় এর সাথে সংযুক্ত ২৫টি নদীও এখন মরা নদীতে পরিণত হয়েছে। এর ফলে পদ্মার বুক জুড়ে এখন ধুধু বালু চর। হাজার হাজার মাইল জুড়ে জেগে উঠছে এই চর। আগের তুলনায় এবছর নতুন চর সৃষ্টির হার বেশি বলেও জানা গেছে। উৎস ও উজান থেকে ফারাক্কা পয়েন্টে যথেষ্ট পরিমাণ পানি এসে পৌঁছাতে না পারার কারণে স্বাভাবিক প্রবাহ যেমন ব্যাহত হচ্ছে তেমনি শুষ্ক মওসুমে বাংলাদেশ চুক্তি মোতাবেক পানি থেকে বঞ্চিত থাকছে। বিষয়টি যেন দিনে দিনে গা সওয়া হয়ে যাচ্ছে সংশ্লিষ্টদের কাছে। 

শুধু ফারাক্কা বাঁধ নয়- উজানে গঙ্গার পানি বহুবিধ উপায়ে প্রত্যাহার করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। ভারত ফারাক্কা বাঁধ ছাড়াও ফারাক্কার কাছাকাছি যে প্রকল্পগুলো নির্মাণ করেছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, ভাগীরথী নদীর উপর জঙ্গিপুরের কাছে ৩৯ কিলোমিটার দীর্ঘ ফিডার ক্যানেল। জঙ্গিপুর ব্যারাজ নামের এই প্রকল্পের লক্ষ্যই হলো ফারাক্কা পয়েন্টের ৪০ হাজার কিউসেক পানি হুগলী ও ভাগীরথী নদীতে সরিয়ে নেয়া। এর ফলে একদিকে হুগলী নদীর নাব্য বৃদ্ধি পেয়ে কোলকাতা পোর্ট সারাবছর সচল থাকবে এবং অন্যদিকে ভাগীরথী নদীর বাড়তি পানি ব্যবহার করে বিস্তীর্ণ এলাকায় সেচ সুবিধা বৃদ্ধি করা যাবে। এখানেই শেষ নয়, ফারাক্কার উজানে উত্তর প্রদেশ রাজ্যের কানপুরে গঙ্গার ওপর আর একটি বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। এতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৯৫০ কোটি রুপি। এছাড়া উত্তর প্রদেশ ও বিহারে সেচের জন্য প্রায় চারশত পয়েন্ট থেকে পানি সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এসব পয়েন্ট থেকে হাজার হাজার কিউসেক পানি প্রত্যাহার করা হচ্ছে। পরিণতিতে ফারাক্কা পয়েন্টে পানির প্রবাহ যে কমে যাবে তা পানির মতোই পরিষ্কার। ফলে বাংলাদেশের হাজারো চিৎকার আর আহাজারি সত্ত্বেও ফারাক্কা পয়েন্টে পানি না থাকার ফলে বাংলাদেশ তার ‘ন্যায্য হিস্যা’ দূরে থাক সাধারণ চাহিদাটুকুও পূরণ করতে পারবে না। ভারত তার বহু সংখ্যক সেচ ও পানিবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য মূল গঙ্গা এবং এর উপনদীগুলোর ৯০ ভাগ পানি সরিয়ে নিচ্ছে। ফলে নদীতে পানি প্রবাহিত হতে পারছে মাত্র ১০ ভাগ। 

এছাড়াও নদীসদৃশ বেশ কয়েকটি ক্যানেল প্রকল্প দিয়েও সারা বছর পানি প্রত্যাহার করা হয়ে থাকে। ভারত নদীসদৃশ ৭টি ক্যানেল বা কৃত্রিম খাল প্রকল্পের মাধ্যমে হাজার হাজার কিউসেক পানি গঙ্গা থেকে সরিয়ে নিয়ে কয়েক লাখ হেক্টর জমিতে সেচ প্রদান করছে। তারা অনেক আগে থেকেই গঙ্গায় বৃহদাকার তিনটি খাল (ক্যানেল) প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে, ‘আপারগঙ্গা ক্যানেল প্রজেক্ট’, ‘মধ্যগঙ্গা ক্যানেল প্রজেক্ট’, ‘নিম্ন গঙ্গা ক্যানেল প্রজেক্ট’, ‘পূর্ব গঙ্গা ক্যানেল প্রজেক্ট’, ‘মধ্যগঙ্গা ক্যানেল ২য় পর্যায়’ এবং ‘সমান্তরাল নিম্ন গঙ্গা ক্যানেল’। এ ধরনের প্রকল্পের হাজার হাজার কিলোমিটার খালের মাধ্যমে গঙ্গার পানি সরিয়ে নিয়ে সেচ দেবার ব্যাপক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ‘আপার গঙ্গা ক্যানেল প্রকল্পের’ মাধ্যমে উত্তর প্রদেশের ২৫ লাখ একর জমিতে সেচ দেয়ার লক্ষ্যে ৬ হাজার কিলোমিটারের বেশি খাল কেটে পদ্মার পানি সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। ‘মধ্যগঙ্গা ক্যানেল প্রজেক্ট’ নামের প্রকল্পে মূল ও শাখাসহ খননকৃত খালের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ১,৬০০ কিলোমিটার। ‘নিম্নগঙ্গা সেচ প্রকল্পের’ জন্য ৬ হাজার কিলোমিটার খালের মাধ্যমে পানি সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। এভাবে এসব উৎসের শতকরা ৯০ ভাগ পানি সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। ফলে নদীতে মাত্র ১০ ভাগ পানি স্বাভাবিকভাবে প্রবাহিত হতে পারছে। 

এদিকে উজানে পানিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করায় প্রমত্তা পদ্মা এখন মরা খালে পরিণত হতে থাকলেও চুক্তিটি আর রিভিউ করা হয়নি। ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এইচ ডি দেবগৌড়া গঙ্গা নদীর পানি বণ্টন সংক্রান্ত ৩০ বছরমেয়াদি চুক্তিটি স্বাক্ষর করেন। ১৯৯৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে চুক্তি কার্যকর হয়েছে। চুক্তিতে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে, শুষ্ক সময়ে বাংলাদেশ ৩৫ হাজার কিউসেক পানি পাবে। কিন্তু বাংলাদেশ কোনো বছরই চুক্তির শর্ত অনুযায়ী পানি পাচ্ছে না। চুক্তিতে বলা হয়েছে, এই চুক্তি পাঁচ বছর পরপর উভয় সরকার রিভিউ করবে। যদি প্রয়োজন হয় অন্তরবর্তীকালীন রিভিউ করা যাবে। চুক্তিতে আরো বলা হয়েছে, আগামী দুই বছর পর যদি কোনো পক্ষ চুক্তিটি রিভিউ করতে চায় তা করা হবে। সমঝোতার ব্যত্যয় ঘটলে বা সমন্বয়ের অভাব দেখা দিলে এই রিভিউ হবে। কিন্তু ২২ বছর অতিক্রান্ত হলেও চুক্তিটি রিভিউ করা হয়নি। চুক্তিমতে ফারাক্কায় যে পানি জমে তাই ভাগ করে দেয়া হচ্ছে। কিন্তু গঙ্গার পুরো পানির ভাগাভাগির প্রসঙ্গ চুক্তিতে উল্লেখ নেই। ফলে চুক্তির পানি দিয়ে বাংলাদেশের চাহিদার অর্ধেকও পূরণ হচ্ছে না। ফলে চুক্তির রিভিউ করা জরুরি হয়ে পড়েছে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত।

পানি ও নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকীর মতে, ফারাক্কা বাঁধের কারণে মরে গেছে পদ্মা নদী। ফারাক্কা বাঁধ চালুর পর পদ্মায় এযাবত পানির উচ্চতা কমেছে ১৮ মিটার পর্যন্ত। আর পদ্মা শুকিয়ে যাবার সাথে সাথে মরে গেছে রাজশাহীর আরো ২৫টি নদী। শুধু তাই নয়, এর সাথে রাজশাহীর অনেক অজানা নদী হারিয়ে গেছে। হারানো নদীর মধ্যে রয়েছে চীনারকূপ (দামকুড়া নদী), নবগঙ্গা, রাজশাহী শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদী বারাহী, সরমঙ্গলা (রাইচাদ নদী), চন্দনাসহ আরো অনেক শাখা নদী। এতে বিলুপ্ত হচ্ছে পানির মাছ। মাটি হারাচ্ছে ঊর্বরতা। হারিয়ে যাচ্ছে নদীর সাথে সংশ্লিষ্ট সম্পদ। হারাচ্ছে সুশীতল পরিবেশ। যা পরিবেশকে করছে দুষিত। তিনি জানান, উৎস ও উজানে গঙ্গার উপর ভারত অসংখ্য প্রকল্প নির্মাণ করেছে। উজানে অনেকগুলো কৃত্রিম খালের সাহায্যে গঙ্গার পানি অন্যত্র প্রত্যাহার করে নেওয়া হচ্ছে। তার কারণেই ফারাক্কা পয়েন্টে পানি পৌঁছাতে পারছে না। এসব প্রকল্প অপসারণ করা ছাড়া গঙ্গা-পদ্মায় স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনার অন্য কোনো বিকল্প নেই বলেও মাহবুব সিদ্দিকী উল্লেখ করেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ