ঢাকা, বুধবার 19 December 2018, ৫ পৌষ ১৪২৫, ১১ রবিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

বিএনপির ইশতেহারে রাষ্ট্রে জনগণের মালিকানা সুদৃঢ় করার প্রতিশ্রুতি

গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির ইশতেহার ঘোষণা করেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর -সংগ্রাম

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল: একাদশ সংসদ নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় গেলে রাষ্ট্রে জনগণের মালিকানা সুদৃঢ় করার প্রতিশ্রুতি এসেছে বিএনপির ইশতেহারে। দলটি নির্বাচনের দিনের গণতন্ত্রকে নিত্যদিনের অনুশীলনে পরিণত করবে বলে অঙ্গীকার করেছে। গতকাল মঙ্গলবার সকালে ইশতেহার ঘোষণা করে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, নির্বাচনে জয়লাভ করে সরকার গঠন করতে পারলে ঐকমত্য, সকলের অন্তর্ভুক্তি এবং প্রতিহিংসাহীনতা এই মূলনীতির ভিত্তিতে বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনা করবে। ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ’ সংবিধানের এই নীতির ভিত্তিতে সরকার পরিচালনায় যাবতীয় পদক্ষেপের ভিত্তি হবে রাষ্ট্রের মালিকদের মালিকানা সুদৃঢ় করা। শুধুমাত্র নির্বাচনে জেতা দলের মানুষের নয়, এই মালিকানায় সকল দল, ব্যক্তি ও মতাদর্শ অন্তর্ভুক্ত হবে। ভোটের ১১ দিন আগে গতকাল মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১১টায় গুলশানের হোটেল লেকসোরে এই নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করা হয়।
ইশেতেহারে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য আনা, দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী পদে না থাকার বিধান, গণভোট পদ্ধতি পূণঃপ্রবর্তন, উচ্চ কক্ষ সংসদ প্রতিষ্ঠা, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার নিয়োগ, ন্যায়পাল নিয়োগ, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, অফিসিয়াল সিক্রেট অ্যাক্ট বাতিল, বিশেষ ক্ষমতা আইন ’৭৪ বাতিল, বেকার ভাতা প্রদানসহ ১৯ দফা প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, এমপি এবং উচ্চ পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব প্রতিবছর প্রকাশ করা এবং রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর চলাচলে যেন সাধারণ মানুষের কোনো ভোগান্তি না হয় সেজন্য বিশেষ ব্যবস্থা করার প্রতিশ্রুতি রয়েছে ইশতেহারে। একই সঙ্গে সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে নিম্ন আদালতের নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রপতির হাত থেকে সুপ্রিম কোর্টের হাতে ন্যস্ত ও বিচার ব্যবস্থার সংস্কারের জন্য একটি জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করার কথা রয়েছে ইশতেহারে।
১৯ দফা ইশতেহারে যা আছে
#  রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য : রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য আনা হবে। পরপর দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী না থাকার বিধান করা হবে। প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং উচ্চ পদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের সম্পদের হিসাব প্রতিবছর প্রকাশ করা হবে।
# সংসদে উচ্চ কক্ষ : বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করে জাতীয় সংসদে উচ্চ কক্ষ প্রতিষ্ঠা করা হবে।
#  গণভোট পূণঃপ্রবর্তন ও ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন : পঞ্চদশ সংশোধনীতে বাতিল হওয়া গণভোট ব্যবস্থা পূণঃপ্রবর্তন করা হবে। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে শর্ত সাপেক্ষে সংসদ সদস্যদের স্বাধীন মত প্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করা হবে।
#  জাতীয় কমিশন গঠন : প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের রাজনীতির বিপরীতে ভবিষ্যৎমুখী এক নতুন ধারার রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করার জন্য নতুন এক সামাজিক চুক্তিতে পৌঁছাতে একটি জাতীয় কমিশন গঠন করা হবে।
#  ন্যায়পাল নিয়োগ : প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য সংবিধান অনুযায়ী ন্যায়পাল নিয়োগ দেয়া হবে।
# র‌্যাবের বর্তমান কাঠামো পরিবর্তন : র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে। র‌্যাবের বর্তমান কাঠামো পরিবর্তন করে অতিরিক্ত আর্মড পুলিশ ব্যাটেলিয়ান গঠন করা হবে। এই ব্যাটেলিয়ান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকবে।
পুলিশ বাহিনীর ঝুঁকিভাতা বাড়ানো হবে। পেশাদারিত্ব বৃদ্ধিতে পদক্ষেপ নেয়া হবে। পুলিশের জন্য কল্যাণমূলক প্রকল্প গৃহীত হবে। ইন্সপেক্টর ও সাব ইন্সপেক্টরদের বেতন ৬ মাসের মধ্যে আপগ্রেড করা হবে। পুলিশ বাহিনীর সদস্যগণ অবসরে গেলে ও তাদের রেশনিং সুবিধা প্রদান করা হবে।
# নিম্ন আদালতের নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিকোর্টে : সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে নিম্ন আদালতের নিয়ন্ত্রণ রাষ্ট্রপতির হাত থেকে সুপ্রিম কোর্টের হাতে ন্যস্ত করা হবে। বর্তমান বিচার ব্যবস্থার সংস্কারের জন্য একটি জুডিশিয়াল কমিশন গঠন করা হবে।
# মত প্রকাশের স্বাধীনতা : ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট, বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪ সহ সকল প্রকার কালা কানুন বাতিল করা হবে।
# সরকারি চাকরির বয়সসীমা : দেশরক্ষা, পুলিশ ও আনসার ব্যতিত শর্তসাপেক্ষে সরকারি চাকুরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রে কোনো সময়সীমা থাকবে না।
# বিডিআর হত্যাকা- ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি প্রতিবেদন প্রকাশ ও তদন্ত : বিডিআর হত্যাকান্ড ও বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি সংক্রান্ত সকল অনুসন্ধান রিপোর্ট জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে। একই সঙ্গে এসবের অধিকতর তদন্তের উদ্যোগ দেয়া হবে।
# জাতীয় প্রবৃদ্ধি হার ১১ শতাংশ : জাতীয় প্রবৃদ্ধির হার ১১ শতাংশে উন্নীত করা হবে। সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ কমিশন ও রাষ্ট্রায়ত্ব ব্যাংক পরিচালনা বোর্ডে যোগ্য, সৎ, দক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগ দেয়া হবে।
# ব্যাকিং ডিভিশন বিলপ্ত : অর্থমন্ত্রণালয়ের ব্যাংকিং ডিভিশন  বিলপ্ত করে রাষ্ট্রায়াত্ব ব্যাংকসমূহ পরিচালনা ও তদারকির ভার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে ন্যস্ত করা হবে।
# দেশে বিদেশীদের কর্মসংস্থানে ওয়ার্ক পারমিট : দেশে কর্মরত সকল বিদেশীদের ওয়ার্ক পারমিটের আওতায় এনে মুদ্রাপাচার রোধ করা হবে।
# বিচারবর্হিভুত হত্যাকা- বন্ধ : বিচারবর্হিভুত হত্যাকা-, গুম-খুন ও অমানবিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অবসান ঘটানো হবে।
# বেকার ভাতা চালু : একবছর ব্যাপী অথবা কর্মসংস্থান না হওয়া পর্যন্ত যেটাই আগে হবে শিক্ষিত বেকারদের বেকার ভাতা প্রদান করা হবে। এদের যৌক্তিক অর্থনৈতিক উদ্যোগে আর্থিক সহায়তা দেয়া হবে। ২৫ বছর পর্যন্ত তরুণদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য ইয়ুথ পার্লামেন্ট গঠন করা হবে।
# মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানিত নাগরিক ঘোষণা : সকল মুক্তিযোদ্ধাকে রাষ্ট্রের সম্মানিত নাগরিক হিসেবে ঘোষণা করা হবে। মুক্তিযোদ্ধা তালিকা প্রণয়নের নামে দুর্নীতির অবসান ঘটানো হবে। মূল্যস্ফীতির নিরিখে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের ভাতা বাড়ানো হবে। দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি রক্ষা ও মুক্তিযুদ্ধকালীন বধ্যভূমি ও গণকবর চিহ্নিত করে যেসব স্থানে স্মৃতি স্তম্ভ নির্মাণ করা হবে। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে নিবিড় জরিপের ভিত্তিতে মুক্তিযুদ্ধে নিহত শহীদদের একটি সঠিক তালিকা প্রণয়ন করা হবে এবং তাদের যথাযথ মর্যাদা ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়া হবে।
# টাস্কফোর্স গঠন : একটি রেন্টাল পাওয়ার প্রজেক্টের উচ্চ ব্যয়ের কারণ তদন্ত করে দেখবে।
# দুঃস্থ, বিধবা ও অস্বচ্ছলদের বয়স্ক ভাতা : দুঃস্থ বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্তা মহিলা ও অসহায় বয়স্কদের ভাতার পরিমান মুল্যস্ফীতির নিরিখে বৃদ্ধি করা হবে। বেসরকারি ও স্বনিয়োজিত খাতে নিয়োজিত ব্যক্তিদের জন্য বার্ধক্যের দুর্দশা লাগবের উদ্দেশ্যে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে একটি পেনশন ফান্ড গঠন করা হবে। গরীব ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা হবে।
# ধর্মীয় সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয় গঠন : দল, মত, জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে ক্ষুদ্র বৃহৎ সকল জাতি গোষ্ঠির সংবিধান প্রদত্ত সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মকর্মের অধিকার এবং জীবন, সম্ভ্রম  ও সম্পদের সম্পূর্ণ নিরাপত্তা বিধান করা হবে। এই লক্ষ্যে ধর্মীয় সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে।
মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আমরা যা যা বলেছি এখানে বাকীটা বিস্তারিতের মধ্যে পাবেন। পুরো ইশতেহার আমাদের ওয়েব সাইটে দেয়া হবে। ইশতেহারে বলা হয়েছে প্রথম তিন বছরে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে দুই লাখ মানুষকে চাকুরি প্রদান করা হবে। আর আগামী ৫ বছরে ১ কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে। তরুণ দম্পতি ও উদ্যোক্তাদের স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য ২০ বছর মেয়াদী ঋণ চালু করা হবে।
ইশতেহার প্রকাশের অনুষ্ঠানে মূলমঞ্চে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।
এছাড়া পেশাজীবী নেতা ঢাবির সাবেক ভিসি অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমেদ, অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহ, অধ্যাপক আনোয়ারুল্লাহ চৌধুরী, অধ্যাপক সদরুল আমিন, অধ্যাপক আফম ইউসুফ হায়দার, অধ্যাপক আখতার হোসেন খান, অধ্যাপক ফিরোজা হোসেন, অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী, অধ্যাপক খলিলুর রহমান, অধ্যাপক আবদুল লতিফ মাসুম, অধ্যাপক আবদুল মান্নান মিয়া, সাংবাদিক মাহফুজউল্লাহ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন অনুষ্ঠানে।
বিএনপি নেতা সেলিমা রহমান, রুহুল আলম চৌধুরী, আবদুল আউয়াল মিন্টু, এজেডেএম জাহিদ হোসেন, শামসুজ্জামান দুদু, আহমেদ আজম খান, গোলাম আকবর খন্দকার, অধ্যাপক সাহিদা রফিক, অধ্যাপক তাজমেরী ইসলাম, এএসএম আবদুল হালিম, আবদুর রশীদ সরকার, আবদুল কাইয়ুম, অধ্যাপক আবদুল কুদ্দস, অধ্যাপক সুকোমল বড়–য়া, শাহজাদা মিয়া, এনামুল হক চৌধুরী, অধ্যাপক সিরাজউদ্দিন আহমেদ, আসাদুজ্জামান রিপন, সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, অধ্যাপক এবিএম ওবায়দুল ইসলাম, অধ্যক্ষ সেলিম ভুঁইয়া, অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম বাচ্চু, তাবিথ আউয়ালও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ