ঢাকা, মঙ্গলবার 25 December 2018, ১১ পৌষ ১৪২৫, ১৭ রবিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

‘দিশাহীন প্রজন্ম’র মুখোমুখি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী

শিক্ষাবঞ্চিত রোহিঙ্গারা একটি দিশাহীন প্রজন্মের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে বলে বার বার সতর্ক করা হচ্ছে

 

২৪ ডিসেম্বর, দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট : প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মারণাস্ত্রের আঘাত থেকে নিজেদের জীবন রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছিল যে তরুণেরা, তাদেরকে ‘লস্ট জেনারেশন’ (দিশাহীন প্রজন্ম) নামে চিহ্নিত করেছিলেন নোবেলজয়ী মার্কিন লেখক ও সাংবাদিক আর্নেস্ট হেমিংওয়ে। যুদ্ধের কবলে পড়ে ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার অভাবে অতীতের সঙ্গে সংযোগ আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন হারিয়ে ফেলা প্রজন্মকে বোঝাতেই লস্ট শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন তিনি। এক পর্যায়ে যুদ্ধ-সংঘাতের অভিঘাত আর শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে অতীত-ভবিষ্যতের দিশা হারিয়ে ফেলা যে কোনও তরুণ প্রজন্মকেই ‘লস্ট জেনারেশন’ নামে ডাকা শুরু হয়। সম্প্রতি রোহিঙ্গা শিশুদের বিপন্ন জীবন-বাস্তবতা অনুসন্ধান করে তাদেরকেও ‘দিশাহীন প্রজন্ম’ নামে ডাকা শুরু হয়েছে। উপযুক্ত শিক্ষার অভাবে রোহিঙ্গা শিশুরা দিশাহীন প্রজন্মে পরিণত হতে পারে বলে আগস্টে সতর্ক করেছিল জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ। আর এ মাসে (ডিসেম্বর) যুক্তরাজ্যভিত্তিক রোহিঙ্গা সংগঠন ‘বার্মিজ রোহিঙ্গা অর্গানাইজেশন ইউকে’ (বিআরওইউকে) বলছে, নিপীড়িত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মানুষেরা একটি ‘দিশাহীন প্রজন্ম’র মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। মার্কিন সাময়িকী ডিপ্লোম্যাটের সাক্ষাৎকারভিত্তিক এক প্রতিবেদনে আভাস মিলেছে, সেই ৯০ দশকেও রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর তরুণদের দিশাহীন প্রজন্মে রূপান্তরের প্রচেষ্টা জারি ছিল মিয়ানমারের দিক থেকে। 

কয়েক প্রজন্ম ধরে রাখাইনে বসবাস করে আসলেও রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব স্বীকার করে না মিয়ানমার। গত বছরের আগস্টে রাখাইনে নিরাপত্তা বাহিনীর তল্লাশি চৌকিতে হামলার পর রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পূর্বপরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। খুন, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের সাত লাখেরও বেশি মানুষ।

এ বছরের আগস্টে জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা 'ইউনিসেফ' মুখপাত্র সিমোন ইনগ্রাম সতর্ক করেছিলেন, বাংলাদেশের শরণার্থী শিবির এবং মিয়ানমারে থেকে যাওয়া রোহিঙ্গা শিশুরা উপযুক্ত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এসব রোহিঙ্গা শিশু দিশাহীন প্রজন্মে রূপান্তরিত হতে পারে বলে আশঙ্কা জানিয়েছিলেন তিনি।

কক্সবাজারের শরণার্থী শিবির পরিদর্শন শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে সিমোন বলেছিলেন, 'আমরা রোহিঙ্গাদের নতুন প্রজন্মের চলমান ক্ষতি ও ভবিষ্যত ক্ষতিজনিত ঝুঁকির কথা বলছি। আমরা শুধু বাংলাদেশে বসবাসকারী পাঁচ লাখ শিশুর কথা বলছি না। তাদের কথাও বলছি যারা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে থেকে গেছে। তাদের শিক্ষার সুযোগ একেবারেই সীমিত।' 

এ মাসে প্রকাশিত বিআরওইউকে’র প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, কক্সবাজারের শিবিরে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদেরও আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ নেই। মানবিক সহায়তা প্রদানকারী সংগঠনগুলোর তৈরি অস্থায়ী শিক্ষা কেন্দ্রে তাদেরকে অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করতে হয়। এক বিবৃতিতে বিআরওইউকে’র প্রেসিডেন্ট তুন খিন বলেন, ‘অন্য যেকোনও সময়ের চেয়ে এখন আরও বেশি করে শিক্ষিত রোহিঙ্গা প্রয়োজন, যারা তাদের সম্প্রদায়কে নেতৃত্ব দিতে পারবে। তবে যতদিন শিক্ষাগ্রহণে তাদের ওপর প্রতিবন্ধকতা থাকবে ততোদিন তা অসম্ভব। আমরা একটি দিশাহীন প্রজন্মের মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা করছি।’

গত জুলাই পর্যন্ত ইউনিসেফের করা পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শিবিরে প্রায় ১,২০০ শিক্ষাকেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে। আর এসব কেন্দ্রে অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করছে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার শিশু। দেড় লাখেরও বেশি শিশু যেকোনও ধরনের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। বিশেষ করে ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সীরা। ফর্টিফাই রাইটস-এর মানবাধিকারবিষয়ক বিশেষজ্ঞ জন কিনলি কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের নিয়ে কাজ করছেন। আল জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘বর্তমানে আশ্রয় শিবিরে কোনও ধরনের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা পাচ্ছে না রোহিঙ্গারা। রোহিঙ্গাদের পরবর্তী প্রজন্মের জন্য তা বড় ধরনের উদ্বেগের বিষয়। আমরা অসংখ্য শিশুর কথা বলছি যারা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত।’

কিনলি জানান, মিয়ানমারে জাতিগত বিদ্বেষের শিকার হওয়া রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে কাউকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়াটাও চ্যালেঞ্জের। তিনি জানান, গত বছরের আগস্টে প্রথম ধাপে যে শিক্ষকেরা এখানে পালিয়ে এসেছেন তার মধ্যে মাধ্যমিক পর্যায়ের গ-ি অতিক্রম করার মতো শিক্ষাগত যোগ্যতা রয়েছে মাত্র ২১ শতাংশের। রাখাইনের রোহিঙ্গা শিক্ষকদের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা রয়েছে এবং তারা সরকার পরিচালিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের সুযোগ পান না। রাখাইনে আগস্টের সেই কাঠামোবদ্ধ গণহত্যার প্রথম পর্যায়ের বলিও হয়েছিলেন শিক্ষক ও শিক্ষিত রোহিঙ্গারা। ২০১৭ সালের অক্টোবরে জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের এক প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছিল, শুধু বিতাড়ন নয়, রোহিঙ্গা জাতিকে পুরোপুরি ধ্বংস করার জন্য শিক্ষিত রোহিঙ্গাদের ধরে ধরে হত্যা করছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। এ বছরের জুনে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের এক বিশেষ প্রতিবেদন থেকেও জানা যায়, শিক্ষিত আর ধর্মীয় নেতারাই কাঠামোবদ্ধ হত্যাযজ্ঞের প্রথম শিকার। কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের উদ্ধৃত করে দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট জানায়, ২০১৭ সালের২৫ আগস্ট হামলার পর সেনারা এসে খুঁজছিল এবং জিজ্ঞাসা করছিল, ‘শিক্ষকরা কোথায়?’ ডিপ্লোম্যাটের সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণ থেকেও জানা গেছে, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত নিধনযজ্ঞের শুরু থেকেই শিক্ষিত রোহিঙ্গাদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়। রাখাইনে ৭৩ শতাংশ রোহিঙ্গার নিজেদেরকে অশিক্ষিত বলে পরিচয় দেওয়ার বিষয়টি কাকতালীয় নয় বলে উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে।

বিআরওইউকে’র প্রতিবেদন বলছে, ২০১২ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পর থেকে রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গা শিশু-কিশোরদের স্কুলের যাওয়ার ক্ষেত্রে ভীষণরকমের প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয়। প্রায়শই শিশুদেরকে আলাদা ফ্যাসিলিটিতে রাখা হয় এবং তারা মূল ধারার স্কুলে যেতে পারে না। প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীরাও বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে পারে না। এই ভাষ্যের সত্যতা মেলে ডিপ্লোম্যাটের ওই প্রতিবেদনে। বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরে অবস্থানরত মোহাম্মদ ২০১২ সালের সহিংসতার সময়কার পরিস্থিতি তুলে ধরতে গিয়ে ডিপ্লোম্যাটকে জানান, তখন থেকে বৌদ্ধ-মুসলিম কম্বাইন্ড বিদ্যালয়গুলোতে অভিযান চালায় কর্তৃপক্ষ এবং তাদের আলাদা করে দেয়। রোহিঙ্গাদের আলাদা পড়াশোনা করতে হয় যেগুলোর মান একদমই ভালো নয়। অনেক সরকারি শিক্ষকই রোহিঙ্গা বিদ্যালয়গুলোতে কাজ করতে চান না। শিক্ষার্থীরা প্রায়ই অবহেলার শিকার হয়। মোহাম্মদের সাক্ষাৎকার থেকেই জানা যায়, দিশাহীন রোহিঙ্গা প্রজন্ম সৃষ্টির প্রয়াস আরও আগের। নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘১৯৯০ এর মাঝামাঝি যখন রোহিঙ্গা বলে মিয়ানমার আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ দেয়নি তখন আমারও পালিয়ে যেতে ইচ্ছা করেছে।’ তিনি জানান, ৯০-এর সেই বিচ্ছিন্নকরণ প্রচেষ্টা ২০১২ সালের সহিংসতার পর আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল।বিআরওইউকে বলছে, শিক্ষা বিষয়ে যেকোনও সমাধানে পৌঁছাতে হলে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে এর সঙ্গে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এ জনগোষ্ঠী শিক্ষা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নির্মাণে ‘ব্যাপকভাবে অনুপস্থিত’। বিআরওইউকে মনে করে, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর নিজস্ব স্কুল প্রতিষ্ঠার স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে শিক্ষা কর্মসূচিতে তাদের উপস্থিতি ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। ওই স্কুল কারিকুলাম অনুযায়ী চলবে এবং রোহিঙ্গারা তাদের পছন্দের ভাষা বাছাই করে নিতে পারবে। বিআরওইউকে’র প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘সংকট সমাধানে একমাত্র দীর্ঘমেয়াদী ও টেকসই উপায়টি মিয়ানমারের হাতেই আছে। রোহিঙ্গাদের মানবাধিকারের ওপর আরোপিত সকল প্রতিবন্ধকতা (শিক্ষার সুযোগ ও চলাফেরার স্বাধীনতাসহ) মিয়ানমার সরকারকে অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে এবং জাতীয় আইনের অধীনে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দিতে হবে।’

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ