ঢাকা, বুধবার 26 December 2018, ১২ পৌষ ১৪২৫, ১৮ রবিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

এক টাকায় এক গ্লাস ফিল্টার পানি না হাজারো জীবাণু

ফারুক হোসেন : ঢাকা বাংলাদেশের সব থেকে ব্যস্ত শহর। এই শহর দেশের সর্বোচ্চ ব্যস্ত শহর হওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে এটি দেশের রাজধানী। এই শহরে প্রতিদিন দেশের নানা প্রান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ প্রবেশ করে কাজের সন্ধানে। রাজধানী হওয়ার দরুণ প্রায় সব সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় এখানে অবিস্থত। মন্ত্রীপরিষদ মন্ত্রণালয়, সচিবালয়, সংসদ ভবনও রয়েছে এই শহরে। প্রত্যন্ত অঞ্চল কিংবা বিভাগীয় শহরের শিক্ষিত ও অল্পশিক্ষিত ছেলে মেয়েরা কাজের খোঁজে এই শহরে আসে। জনসাধারণের মুখে একটা প্রবাদ প্রচলিত আছে "ঢাকায় টাকা  উড়ে"। অর্থাৎ এই কথার মাধ্যমে এটাই বুঝানো হয়েছে যে, এই শহরে কাজের কোনো অভাব নেই। এই শহরে মানুষের সেবায় নিয়োজিত রয়েছে হাজারো রেস্তোরা/হোটেল যা মানুষের খাদ্য  চাহিদা মিটিয়ে থাকে। মানুষের প্রকার ভেদে রেস্তোরা/হোটেলের ধরণ একেক রকম। কিন্তু এই শহরের ফুটপাতে রয়েছে হাজারো চায়ের দোকান। এই সমস্ত সস্তা দোকানে নানান পেশার মানুষ চা ও পানি পান করে থাকেন। ফুটপাত কিংবা সস্তা হোটেল থাকার কারণে অল্প আয়ের মানুষ গুলো সকাল দুপুর কিংবা রাতে নাস্তা এবং রাতের খাবার খেয়ে থাকেন। লক্ষ্য করছি এই সমস্ত দোকানের পানি তথা ফিল্টার পানি কতটুকু মানসম্মত বা স্বাস্থ্যসম্মত। ফিল্টার কিংবা পানির জার গুলোর দিকে নজর দিলেই বোঝা যায় এগুলো কতটুকু মানসম্মত। ঢাকা শহরে বেশ কয়েকটি স্থানে ফুটপাতের দোকানদারদের জিজ্ঞাসা করেছিলাম, আপনারা যে, পানি গুলো বিক্রি করেন সে-গুলো কতটুকু নিরাপদ বা স্বাস্থ্যসম্মত? তাদের উত্তর একটাই ছিল যে, "আমরা এগুলো জানিনা। আমরা চা রুটি বিক্রি করি। পানি রাখা লাগে তাই  রাখি। আমাদের কাছে যে গ্রাহকেরা আসে তারা তো আর এক বোতল পানি ১৫ টাকা দিয়ে কিনতে সক্ষম নন। আমাদের কাছে ভ্যান গাড়ীতে করে পানি বিক্রি করতে আসে আমরা তাদের কাছ থেকে রেখে দেই।" আমি প্রশ্ন করেছিলাম, যদি কোনো দিন না আসে তাহলে দোকান পরিচালনার জন্য পানি কোথায় পাবেন? তারা হেসে উত্তরে বললেন যে, "ওয়াসার লাইন থেকে আনতে হয়।" আতিক নামের এক দোকানদার বললেন "যাদের তদারকি করার দরকার তারাই করে না আমরা কি করবো। আমরা তো শুধু বিক্রি করি যদি সরকার বন্ধ করে দেয় তাহলে আমরা করবো না”।
সম্প্রতি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের করা এক গবেষণায় রাজধানীর বিভিন্ন অংশে সরবরাহ করা জারের পানির ৯৭ ভাগ পানিতে মানুষ ও প্রাণীর মলের জীবাণু পাওয়া গেছে। আর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা বলছেন, এ জীবাণুর কারণে ঢাকার মানুষ স্বাস্থ্যগতভাবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। তবে জারের পানিতে ই-কোলাই নিয়ে সবচেয়ে আশঙ্কার কথা হচ্ছে, হেমোলাইটিক ইউরেমিক সিনড্রোম রয়েছে বলে জানিয়েছেন অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ। অধ্যাপক ডা. আব্দুল্লাহ গবেষকদের বলেন, 'রক্তের সেল অর্থাৎ রক্তকণিকা ক্ষয় হয়ে যাওয়া এবং কিডনি বিকল হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনাও ই-কোলাইয়ের কারণে হতে পারে। একইসঙ্গে রক্তকণিকা ক্ষয় হয়ে যাওয়া এবং কিডনি বিকল হয়ে যাবার এই অসুখের নাম হেমোলাইটিক ইউরেমিক সিনড্রোম।'
ফার্মগেট, মতিঝিল, যাত্রাবাড়ী, গুলিস্থান, বাড্ডা, মগবাজার, গাবতলী, মিরপুর, মহাখালী, এছাড়াও কয়েকটি স্থানে দোকানদার ও সাধারণ জনগণ এর সাথে কথা বলে দেখেছি। তারা কেউ সঠিক ভাবে উত্তর দিতে পারে নাই। তবে সবার একটি দাবী ছিল যে, (জারের পানি) যাতে স্বাস্থ্য  সম্মত হয় এই দিকে যেন কর্তৃপক্ষ সু-দৃষ্টি দেয়। আবার অধিকাংশই দাবী জানান যে, যারা জারের পানির ব্যবসা করে তাদের লাইসেন্স যেন বৈধ হয়। আর যারা অবৈধ ভাবে পানির ব্যবসা করবে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। এবং কর্তৃপক্ষ যেন বিষয়টির তদারকিতে সর্বদা সচেষ্ট ও সচেতন থাকে।
বৈশ্বিক পর্যায়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর স্পষ্ট জানিয়েছে বিশুদ্ধ পানির ব্যবহার মানবাধিকারেরই অংশ৷ জাতিংঘের পানি দপ্তরের মানবাধিকার কর্মী কাটারিনা দো আলবুকার্ক ঘোষণা করেছেন, "আমাদের নিশ্চিত করতে হবে, পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ যেন বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করতে পারে কারণ তা মানবাধিকারেরই একটি অংশ৷ নিশ্চিন্ত মনে তারা পানি পান করবে কোন ধরণের আশংকা বা ভয় ছাড়া৷ সুস্থ এবং স্বাস্থ্যসম্মতভাব ব্যবহারের জন্য তারা যেন প্রতিদিন পানি পায় সেদিকে নজর রাখতে হবে৷ এছাড়া প্রতিটি মানুষ যেন স্বাস্থ্যসম্মত, পরিষ্কার টয়লেট ব্যবহার করতে পারে সেদিকে আমাদের খেয়াল রাখতে হবে৷ শুধু বাড়িতে এই সুযোগ-সুবিধা থাকলে চলবে না৷ অফিস-আদালতসহ স্কুলেও এই ব্যবস্থা থাকতে হবে৷ প্রতিদিনই যেন প্রতিটি মানুষ বিশুদ্ধ পানির সংস্পর্শে আসে তা নিশ্চিত করা জরুরি৷" সুতরাং অনুমেয় বিশুদ্ধ পানি আমাদের সবার কতটা অত্যাবশ্যক। আর এই বিশুদ্ধ পানি যাতে ঢাকাশহরসহ সারা দেশে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের নাগালের মধ্যে সহজলভ্য হয় সে জন্য যাথাযথ কর্তৃপক্ষকে থাকতে হবে সজাগ। আর জনস্বাস্থ্যের বিধির স্বপক্ষে গড়ে তুলতে হবে জোরালো সমর্থন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ