ঢাকা, বুধবার 26 December 2018, ১২ পৌষ ১৪২৫, ১৮ রবিউস সানি ১৪৪০ হিজরী
Online Edition

রাবিতে লেখক ফোরামের গোলটেবিল বৈঠক অনুুষ্ঠিত

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হলো ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র : লেখকদের দায়বদ্ধতা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় লেখক ফোরামের আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয়েছে ৬ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার বেলা ১১ টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের রবীন্দ্র কলাভবনের শিক্ষক লাউঞ্জে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সমাজ বিজ্ঞানী ও কলামিষ্ট প্রফেসর ড. আব্দুর রহমান সিদ্দিকীর সঞ্চালনায় ও লেখক ফোরামের সভাপতি ও সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর মুহাম্মাদ শরীফুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন রাবি শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও সাবেক সিন্ডিকেট সদস্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. আমজাদ হোসেন বলেন, বর্তমানে আমরা ফ্যাসিবাদের মধ্যে বিচরণ করছি। বিশেষ করে বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থার দিকে তাকালে দেখতে পাই, আমরা আমাদের সাধারণ মতামতটুকু দিতে পারছিনা। আমরা লেখকরা আমাদের লেখনীর মাধ্যমে মনের ভাবটুকু প্রকাশ করতে পারছিনা। বর্তমানে যারা বাক-স্বাধীনতার পক্ষে লিখছেন তাদের উপর নানা অজুহাতে হামলা-মামলা করা হচ্ছে। পুলিশ দিয়ে নির্যাতন করা হচ্ছে। আবার তাতেও কাজ না হলে গুম বা খুন পর্যন্ত করা হচ্ছে। পক্ষান্তরে একটা গোষ্ঠী লিখছেন, তারা কোনো না কোনো ভাবে সরকারের দালালী করছেন। তারা সরকারের পক্ষ নিয়ে দেশ ও জাতিকে নিয়ে বিভ্রান্তির খেলায় লিপ্ত হয়েছেন। এবারের নির্বাচনে লেখকদেরকে জাতীর সামনে প্রকৃত সত্যকে তুলে ধরে সত্যের বিজয় নিশ্চিত করতে হবে।
বিশিষ্ট কথাশিল্পী নাজিব ওয়াদুদ বলেন, গণতন্ত্রের জন্য রাষ্ট্র ব্যবস্থা হলেও বর্তমানে বাংলাদেশের দিকে তাকাতে হবে। কারণ এখানে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থাকে হত্যা করে সৈ¦রতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা কায়েম করার পাঁয়তারা করা হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, প্রত্যেক লেখক একজন প্রান্তিক ও নিঃসঙ্গ মানুষ। কারণ তারা পরের কথায় না লিখে লেখেন নিজের মনের, বিবেক-বুদ্ধি দ্বারা চালিত হয়ে। যেহেতু লেখক সমাজে বাস করেন। তাই তিনি সেই সমাজের অংশ হিসেবে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে লেখেন। আর যেহেতু তার পাঠক ওই সমাজেরই অংশ তাই তার প্রধান কাজ হচ্ছে সমাজের দ্বন্দ্বকে সনাক্ত করা এবং তার লেখনির মাধ্যমে ওই দ্বন্দ্ব বা ফাঁক দূর করা। তবে বর্তমানে যারা লিখছেন তারা এক ধরণের সুবিধাবাদী বুদ্ধিজীবী ধারা। তারা সমাজের দ্বন্দ্ব-কলহ দূর করতে ভূমিকা না রেখে একটি দলের পক্ষ নিয়ে সমাজের মানুষের মধ্যে ভাঙন ধরাতে চেষ্টা করছেন।
প্রফেসর মুহাম্মদ শরীফুল ইসলাম স্বাগত বক্তব্য প্রদানের মধ্যদিয়ে আলোচনা পর্ব শুরু হয়। এরপর বক্তব্য রাখেন বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক, লেখক ও বুদ্ধিজীবীগণ। রাবি সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডীন প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ড. ফখরুল ইসলাম বলেন, আজ উন্নয়নের ডুগডুগি বাজানো হচ্ছে- অথচ দেশের সাড়ে তিনকোটি লোক এখনও দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করছে। চটকদার গল্পে না মত্ত হয়ে সত্যকে বুকে নিয়ে লেখকদের ঝলসে উঠতে হবে। প্রাণীবিদ্যা বিভাগের প্রফেসর ও রাবি সিন্ডিকেট সদস্য ড. মুহাম্মদ হাবীবুর রহমান বলেন, আজ গোলটেবিল বেঠকে বসে বক্তৃতা করার নিয়ম থাকলেও আমি সকল অন্যায়ের তীব্র প্রতিবাদ জানানোর জন্য প্রতীকি অর্থে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দিচ্ছি। জাতীকে জাগিয়ে তোলার এখনই সময়। প্রফেসর ড. শামসুল আলম সরকার বলেন, লেখকগণ যদি সচেতনভাবে দেশের প্রকৃত চিত্র নির্ভয়ে না তুলে ধরেন তবে দেশের স্বাধীনতা বাস্তবে থাকবে না, নামে মাত্র স্বাধীনতা থাকলেও থাকতে পারে। প্রফেসর ড. সি এম মোস্তফা বলেন, যারা প্রধান বিচারপতিকে দেশ ছাড়া করতে পারে তারা মানবাধিকারকে কোন পর্যায়ে নিয়ে গেছে তা সহজেই অনুমান করা যায়। আর ভয় করে লাভ নেই সত্যকে সত্যভাবে বলতে হবে এবং এবারের ভোটযুদ্ধের আগেই লেখকগণকে সত্য কথা জাতির সামনে তুলে ধরতে হবে। বিশিষ্ট কবি ও গবেষক প্রফেসর ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ যদি নিজেদের গবেষণাকর্মে কৃতিত্ব দেখিয়ে দেশ-বিদেশে সুনাম কুড়ানোর যোগ্যতা রাখেন তারা ইচ্ছে করলেই দেশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের পক্ষেÑ মানবতার পক্ষের সত্য কথাগুলো লিখতে পারবেন।
 শুধুমাত্র বিভাগীয় পদোন্নতির জন্য গবেষণা নয়, জাতিকে মুক্ত করার গবেষণায় সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। আরবী বিভাগের প্রফেসর ড. ইফতিখারুল আলম মাসউদ বলেন, আজ জাতীর ক্রান্তিকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকসমাজসহ বুদ্ধিজীবী শ্রেণিকে এগিয়ে আসতে হবে। উর্দু প্রফেসর ও চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, যিনি যে ফিল্ডে দক্ষতা রাখেন তাঁকে সেই বিষয়েই লেখালেখিতে এগিয়ে আসতে হবে। প্রফেসর ড. মুহাম্মদ শহিদুল ইসলাম বলেন, সরকার নির্যাতনের মাত্রা এতোটা বাড়িয়েছে যে, আমি আমার অধিকারের কথাটুকুও বলতে পারিনা। যদি ভয় করে ঘরে বসে থাকি আগামী দিনে ঘরও নিরাপদ হবে না। উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের প্রফেসর ড. আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ জাতির ক্রিম অব সোসাইটি। সমাজের সমস্যাগুলো চিত্রিত করতে আজ আমাদেরকেই এগিয়ে আসতে হবে। প্রফেসর ড. জিএম শফিউর রহমান বলেন, বিবেককে দায়বদ্ধ রেখে রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে হলেও লেখককে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের পক্ষে লিখতে হবে। চট্টগ্রাম থেকে আগত অতিথি কবি ও প্রাবন্ধিক মাঈন উদ্দিন জাহেদ বলেন, আজ দেশে অধিকারের কথা বলা তো দূরে থাক, সাহিত্যের আসরকেও গোপন মিটিং বানিয়ে গ্রেফতার তরা হচ্ছে। কবি ও সম্পাদক আবু সাঈদ মুহাম্মদ হান্নান বলেন, লিখতে হবে সাহস নিয়ে, তবেই জাতীয় জাগরণ তৈরি হবে। বৈঠকে সকল বিশ^বিদ্যালয়ের লেখক ফোরাম ও কবি সাহিত্যিকদের নিয়ে একটি জাতীয় লেখক ফোরাম গঠনের দাবি জানানো হয়।
-হাসান মাহমুদ

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ